নবম অধ্যায়
গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ আর মুঘল সাম্রাজ্যের শাহী উদ্বাস্তুরা (১৫৩৪)
১৫৩৪-এ বাহাদুরের রাজত্বে শরণ নিলেন বাবরের বড় জামাই, হুমায়ুনের থেকে কয়েক বছরের বড় শাহী পরিবারের সদস্য মহম্মদ জামান মির্জা। বাবরের বিহার অভিযান সফল করতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি মহম্মদ জামান মির্জা, বাবর তাঁকে পছন্দও করতেন। কিন্তু তিনি দুবার বিদ্রোহ করেন, প্রথমবার হুমায়ুনের সিংহাসনে আরোহন করার পরে দ্বিতীয়বার ১৫৩৪-এর জুলাই মাসে প্রকাশ্যে সাম্রাজ্য প্রধান হিসেবে হুমায়ুনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে গুজরাটে পালিয়ে আসার আগে। বাহাদুরের জানেন মহম্মদ জামান মির্জার গুরুত্ব। মির্জার একমাত্র পরিচয় তিনি মুঘল শাহী পরিবারের সদস্য এবং মির্জা মুঘল শাহী পরিবারের সদস্য বলেই বাহাদুরের সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিক্লল্পনায় তিনি খাপে খাপ খেয়ে যান। তাঁর পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে বাহাদুর তাঁর রাজনৈতিক এবং সাম্রাজ্য স্বার্থ পূরণ করতে চাইলেন। সম্রাটের জামাইকে স্বাগত জানিয়ে তার আর্থিক চাহিদা পূরণ করলেন (একই সঙ্গে বাদাউনি বলছেন, শাহী জামাইএর বুকের ব্যাথা সারাতে বাহাদুর, জামানকে এক গাড়ি গোলাপ পাঠালেন), দরবারের মুঘল আমীরদের মাথায় বসালেন জামানকে।
বাহাদুরের কব্জায় থাকা দুটি পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় গোষ্ঠীই দিল্লি জয় করতে চায়; প্রথম দলে ছিল আফগান গোষ্ঠীনেতারা; তারা গোষ্ঠীর হারানো সিংহাসন এবং সম্মান উদ্ধার করার মানসিকতা নিয়ে দিল্লির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্যে তৈরি। এদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাতার খান বাবার সিংহাসন উদ্ধারের দিকে লক্ষ্য রেখে। আরেকদল মুঘল আমীরেরা মহম্মদ জাহান মির্জার নেতৃত্বে দিল্লি থেকে হুমায়ুনকে সরাতে চায়, নিজেদের প্রতিনিধি বসাতে চায়। দুই গোষ্ঠীই যে তাঁর রাজনৈতিক, সাম্রাজ্যিক উচ্চাশা পূরণের কাঁচামাল এটা তিনি হাড়ে হাড়ে জানেন এবং সেইভাবেই গুটি সাজাচ্ছেন বাহাদুর। এই দুই দলকে সমর্থন দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারলে, খুব খারাপ হলে বাহাদুর দিল্লি দখল করা হয় মুঘল না হয় আফগানদের রাজস্বদায়ী সামন্ত হবেন। তাঁর বাবা পাশের রাজ্যে এক শাহজাদাকে রাজত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার ধাক্কা বুঝেছিলেন যুদ্ধ করে। ফলে তিনি এটাও জানেন যে তিনি সেই মুহূর্তে তার বাবার থেকেও খারাপ অবস্থায় আছেন। তিনি তাতারকে সামরিক সাহায্য দিয়ে তাতারের বাবাকে দিল্লির সিংহাসনে বসিয়ে দিলে, তাতারের বাবা আদৌ বাহাদুরকে রাজত্ব থেকে উৎখাত যে করবেন না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
দিল্লি দখলে উদগ্রীব দুই দলের উৎসাহ এবং দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক ঘটনাক্রমকে খুব তাড়াতাড়ি পাকিয়ে দিল। তাতার খান দিল্লি দখলে সর্বদা এক পায়ে খাড়া। সমস্যা হল মুঘলদের নিয়ে। গুজরাটে আশ্রয় নেওয়া মহম্মদ জামান জানালেন তিনি তড়িঘড়ি দিল্লি দখলে উতসাহী নন। নিজেকে তৈরি করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। উল্টোদিকে তাতার খান জানালেন তিনি মুঘল সীমান্তে অভিযানে তৈরি। বাহাদুর, তাতারকে চিতোর রাজ্যের বাইরের থানা বা আউটপোস্ট দখল করতে নির্দেশ দিইয়ে ১ কোটি গুজরাটী টঙ্কা ব্যয় করে বাহিনী তৈরি করে রণথম্বোর দখল এবং মুঘল সাম্রাজ্য দখলের ভিত্তি হিসেবে রনথম্বোরকে ব্যবহার করার জন্যে তাতারের পরিকল্পনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। ঠিক হল তাতার নতুন সাজানো বাহিনী নিয়ে আগরা দখলে রওনা হবেন। তাতারের আগরা অভিযান থেকে মুঘলদের দৃষ্টি ঘোরাতে আলমখান আলাউদ্দিন আর বাহাদুর-উল-মুলক নারপালি যুদ্ধ যাত্রায় তৈরি হলেন। আলাউদ্দিনের লক্ষ কিলিঞ্জর দখল, হুমায়ুন সেটাকে পুরোপুরি কব্জায় আনতে পারেন নি, তিনি রাজার থেকে সোনা নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছেন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন নি। আর নারপালির বাহিনীর কাজ হবে দিল্লির আশেপাশের পাঞ্জাব রাজ্যে গণ্ডগোল তৈরি করা।
অভিযানের খবর হুমায়ুনের কাছে পৌঁছল। কানার Kanar থেকে বিহারে আফগানদের বিরুদ্ধে অভিযান আপাতত স্থগিত রেখে তিনি দ্রুত আগরা ফিরলেন। আগরায়া ফিরে বুঝলেন তাঁর আরও আগে পৌঁছনো উচিৎ ছিল। শত্রু মুঘলদের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে তৈরি।
হুমায়ুনের তড়িঘড়ি রাজধানীতে ফেরার সিদ্ধান্ত বাহাদুরের পরিকল্পনার বাস্তবায়িত হওয়াকে অনেকটাই ব্যর্থ করে দিল। হুমায়ুনকে বিহারে আটকে রাখা গেলে তাতার, আলম আর বাহার-উল-মূলকের বাহিনীর পক্ষে আগরা দখল করার কাজ সহজ হয়ে যেত। বাহাদুরের পরিকল্পনা ছিল এই তিন বাহিনী তাড়াতাড়ি আগরা দখল করবে, হতাশ মুঘলদের মুখোমুখি হয়ে বাকি জয়ের কিলক পোঁতার কাজটা তিনি সম্পন্ন করবেন। তিনি তাতার খানকে কিছুটা রক্ষনাত্মকভাবে এগোতে নির্দেশ দিয়ে শেষ পর্বে তার জন্যে অপেক্ষা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুঘলদের সামনে পড়ে যে তাতার খানের বিশ্রী পরাজয় হবে, এ অঙ্কটা তার ভাবনায় আঁকা ছিল না।
যা ঘটেছে, সংক্ষেপে বলা যাক। কোনও বাধা না পেয়ে তাতার খান তারুণ্যের স্পর্ধায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে চললেন, বিয়ানা দখল নিয়ে বড় বাহিনী পাঠালেন আগরার দরজায়। ততদিনে শহরের বাসিন্দাদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লি থেকে ১৮,০০০ সেনা আর কাসিম হুসেইন সুলতান, জাহিদ বেগ, দোস্ত বেগের মত সেনাপতিদের নিয়ে আসকরি আর হিন্দাল আগরা ঢুকলেন। মুঘল বাহিনী বিয়ানা দখল নিলে, তাতার খান মান্দ্রায়েলে পিছিয়ে গেলেন। ৪০,০০০ সেনা নিয়ে তিনি বাবাকে সামনে রেখে দিল্লিতে নতুন করে লোদি সাম্রাজ্য তৈরির পরিকল্পনা ভাঁজছিলেন। কিন্তু মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সম্ভাবনা দেখা দিতেই তার বাহিনী থেকে সেনা পালিয়ে যেতে লাগল। মীরাটি সিকান্দারি বলছে আফগানদের বিশাল বাহিনী, মুঘলদের আসার কথা শুনেই যেন হঠাৎই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মাথায় রাখতে হবে সেনাদের কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই বিপুল অর্থ দিয়ে সেনা কেনা হয়েছিল। সেনাপতিদের মধ্যে বিন্দুমাত্রও সমঝোতা তৈরি হয় নি। বিয়ানা থেকে সেনারা তাদের বাহিনীর প্রধানদের উসকাচ্ছিল পালিয়ে যাওয়ার জন্যে। তার যখন বুঝল দক্ষ যোদ্ধা মুঘলদের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ আসন্ন, তারা তাতারের সঙ্গে রইল না।
মান্দ্রায়েলে তাতার খান বুঝলেন দিল্লির সিংহাসন দখল করা তার স্বপ্নই থেকে যাবে। পিছন ফিরে দেখলেন তাঁর বিশাল ঘোড়সওয়ার বাহিনী ৩,০০০তে নেমে এসেছে। বিয়ানা উদ্ধার করে হিন্দাল ৫০০ বাহিনী নিয়ে এগিয়ে তাতারের মুখোমুখি হলে বিপুল যুদ্ধ হল। তাতার পালাতেও পারলেন না, কারন বাহাদুর তাকে রক্ষণাত্মকভাবে ধীরে এগোতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তার কথা অমান্য করে হারের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেলেন নভেম্বর ১৯৩৪-এ। তাতার খানের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আগরা দখলের আফগান আর বাহাদুরের যৌথ প্রকল্প মাঠে মারা গেল। কিলিঞ্জর আর দিল্লি বিজয়ে বেরোনো দুই বাহিনীরও তথৈবচ অবস্থা। তারা এত দূর দাঁড়িয়ে আছে যে, তাদের এক জোট হয়ে আগরা দখন প্রায় নামুমকিনই।
এই যুদ্ধ প্রচেষ্টায় দুই সম্রাটের সম্পর্কে খুব একটা প্রভাব পড়ে নি। হুমায়ুন দাবি করেন নি যে তাতারের পিছনে বাহাদুর আছেন। এবং বাহাদুর এই বিষয় নিয়ে আর এগোন নি। হয়ত হুমায়ুনের মনে হয়েছিল যুদ্ধের পিছনে তাতার খানের উৎসাহটাই সর্বাধিক প্রণোদনা। হুমায়ুন অন্য দুই যুদ্ধপ্রচেষ্টাকেও নজরআন্দাজ করলেন।
কিন্তু বাহাদুর যে বিস্তৃত পরিকল্পনা করে চক্রান্তর জাল ছড়াতে শুরু করেছিলেন, সেই বিস্তৃত ছড়ানো জালকে তার পক্ষে গুটিয়ে নিয়ে, নিজেকে বেরিয়ে আসা মুশকিল ছিল। সব থেকে বড় কথা হুমায়ুন যে ব্যক্তির প্রথম বিদ্রোহ উদার চিত্তে মাফ করে তাকে দ্বিতীয় বিদ্রোহের জন্যে বন্দী করেছিলেন, বাহাদুর সেই মুঘল শাহী পরিবারের বিদ্রোহী জামাই। বাহাদুর পলাতক মহম্মদ জামান মির্জাকে গুজরাটে ঠাঁই দিলেন, দুই রাজার মধ্যে সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকে।
আরেকটু পিছনে ফেরা যাক। ১৫৩৪-এ দিনপনাহ তৈরি উপলক্ষ্যে হুমায়ুনকে তিনি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তেমনি হুমায়ুন তাঁর মালওয়া, রাইসেন, রণথম্বোর, আজমেঢ় এবং নাগোর দখল নিয়ে উচ্চবাচ্য করেন নি। দুপক্ষের মধ্যে বন্ধুত্বের এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়েগেল বাহাদুরের মহম্মদ জামান মির্জাকে আশ্রয় দেওয়ায়। হুমায়ুন একে বেআদপি হিসেবে শুধু দেখলেন না, অতীতে তাতার খানের যুদ্ধ প্রক্রিয়া যে তিক্ত মনোভাব তৈরি করতে পারে নি, জামান মির্জাকে আশ্রয় তার মনে হল, বাহাদুর শাহ তাঁর আগরার সিংহাসন দখলের উদ্যম নিচ্ছেন। এর আগে তিনি ভোজপুরে বিদ্রোহীদের যুদ্ধের মাঠেই গ্রেফতার করে তাদের কোতল না করে উদারতা দেখিয়ে তাঁর কারাপ্রধান মামা এবং বেগা বেগমের বাবা মির্জা ইয়াদগার বেগ তাঘাইএর অধীনে বিদ্রোহীদের তুলে দিয়ে, মহম্মদ সুলতান মির্জা আর ওয়ালি খুব মির্জাকে অন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্তু এই বন্দী দশা থেকে মহম্মদ জাহান মির্জা পালালেন। এবারে তিনি তাঁর আগের ভুলগুলো রিপিট না করতে বদ্ধ পরিকর। তাঁর শ্বশুর মির্জা ইয়াদগার বেগ তাঘাইও হুমায়ুনের ভয়ে নভেম্বর ১৫৩৪-এ চিতোরে বাহাদুরের সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছে আশ্রয় নিলেন।
দিল্লির সম্রাটের বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি দু-দুবার বিদ্রোহ করে গুজরাটের সুলতানের কাছে আশ্রয় নেয়, যে সুলতান মাত্রে কয়েক মাস আগে সম্রাটকে শুভেচ্ছাপত্র পাঠিয়েছেন,হুমায়ুন স্বাভাবিকভাবে ধরে নেবেন তাঁকে শত্রু হিসেবেই গণ্য করবেন। একসময়ের বন্ধুর বিরুদ্ধে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাই ছিলেন না, তিনি গোয়ালিয়রে শিবির পাতলেন। তাঁর আশা ছিল অতীতের মত তাঁর এই পদক্ষেপে বাহাদুর নিজের ভুল বুঝতে পারবেন এবং চিতোর অবরোধ তুলে নেবেন। কিন্তু বাহাদুর চিতোর অবরোধ তুললেন না। হুমায়ুন কঠর সংকল্পে সারাংপুরের দিকে রওনা হলেন। (চলবে)