দশম অধ্যায়
হুমায়ুন বাদশা আর সুলতান বাহাদুর শাহের পত্রালাপ, ১৫৩৪-৩৫
আমরা দেখেছি ১৫৩৪-এর এপ্রিলে দিনপনাহ শহর তৈরি হওয়ার দু-মাস পরে বাহাদুর শাহ হুমায়ুন বাদশাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে বাহাদুর শাহকে বিপুল উপঢৌকন সাজিয়ে পাল্টা দূত পাঠিয়েছিলেন বেশ কিছু রাজনৈতিক বিষয় আলোচনার উদ্দেশ্যে। বাহাদুর শাহের সঙ্গে আলোচনায় হুমায়ুনের দূত আলম খান আলাউদ্দিনের পুত্র তাতার খানের নাম করে জানান, তাঁকে গুজরাটে আশ্রয় দেওয়া তাঁর প্রভু হুমায়ুন খুব ভালভাবে নিচ্ছেন না, তা সত্ত্বেও তিনি সম্রাটের হয়ে বাহাদুর শাহকে শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্বের বার্তা পৌঁছে দিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বাহাদুর শাহকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, শাহ যেন মাথায় রাখেন, গুজরাটের দরবার দিল্লির পলাতকদের নিশ্চিত আশ্রয় না হয়ে দাঁড়ায়। এই সব অনিভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে থাকলে দু-পক্ষের মধ্যে যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেই সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। তিনি আশা করেন, গুজরাট দিল্লির পলাতকদের আগামী দিনে আশ্রয় দেবে না। আলাপের শেষে জানান রাজ্যের উন্নতি নির্ভর করে পরস্পরের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে। মানুষ বিশ্বে কয়েক দিনের জন্যেই এসেছে, তাই বিশ্বটা যেন সর্বশক্তিমানের উপাসনার স্থলে রূপান্তরিত হয় এটা আমাদের সকলের দেখা দরকার।
বাহাদুর দূতকে সম্মান দিয়ে নিজের প্রাসাদের পাশেই রাখলেন, যতরকম সুযোগ সুবিধে আছে সব কিছু তাকে দিলেন, অর্থ এবং পণ্য দিলেন হাত খুলে। মুঘল দূত এতই আশ্চর্য হলেন যে তার মনে হয়েছিল গুজরাটেই থেকে গেলে ভাল হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বাহাদুরের পাঠানো দুর্দান্ত সব উপহার নিয়ে দিল্লি পৌঁছলেন। সঙ্গে এল হুমায়ুনের উদ্দেশ্যে লেখা সংক্ষিপ্ততম চিঠি, যা আমরা আবদুল্লার আরবি হিস্ট্রি অব গুজরাট মার্ফৎ পাচ্ছি — to hear is to obey যা শুনলাম, মান্য করে চলব। অর্থাৎ তিনি হুমায়ুনের ইচ্ছে জেনেছেন, নিশ্চিতভাবে সে সব পালন করবেন। হুমায়ুনকে পাঠানো বাহাদুরের বিনয়ী উত্তরে সম্রাটের মনে হয়েছিল তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে ইচ্ছুক এবং বাহাদুর মালওয়া বিজয় থেকে যে সব কিছু পেয়েছিলেন সে সব তাঁকে রাখতে অনুমতি দেওয়া হল।
এ সব ঘটনা ৯৪০ আলহজ্বের। পরের বছর ১৫৩৪-এর সেপ্টেম্বরে তিনি কাল্পি গেলে সেখানকার প্রশাসক আলম খান তাঁর প্রতি অনুগত না হয়ে গুজরাটে বাহাদুরের দরবারে পালিয়ে গেলেন। বাহাদুর জানতেন হুমায়ুন আর আলম খানের মধ্যে দ্বন্দ্বের সম্পর্ক, তা সত্ত্বেও তিনি আলম খানকে গ্রহণ করলেন, তাকে জায়গিরদার হিসেবে রাইসেন, ভিলসা, চান্দেরি উপহার দিলেন। তাছাড়া বাহাদুর চিতোর অবরোধের সময় অনেক আমলার পদ, মহম্মদ জামান মির্জার পদের সমান করলেন। বোঝা যাচ্ছিল বাহাদুর শাহের মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে। তিনি খুব তাড়াতাড়ি মুঘলদের আক্রমন করার মানসিকতা পোষণ না করলেও, বোঝা যাচ্ছিল যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
কাল্পি থেকে হুমায়ুন দ্বিতীয় কড়া চিঠি লিখলেন মহম্মদ জামান মির্জাকে আশ্রয় দেওয়া সূত্রে। চিঠির শুরুতেই তিনি বলছেন শাহী পরিবার থেকে পলাতকদের আশ্রয় দেওয়া তাঁর শেষ দেওয়া কথাকে কন্ট্রাডিক্ট করছে। বাহাদুর তাঁকে দায়িত্ববান হওয়ার কথা দিয়েছিলেন। নবীর উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তিনি লিখলেন pledge was a part of one’s faith, বিশ্বাসের অঙ্গ হল অঙ্গীকার।
হুমায়ুন বাহাদুরের চিঠির উত্তর পেলেন আগরায় ১৫৩৪-এর নভেম্বরে। বন্ধুত্বের বার্তা ছিল। কিন্তু সমস্যা হল, তিনি যে বন্ধুত্বের বার্তা দিচ্ছেন, সেটা তো তাঁর মুঘল বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়া বা রাজপুত যুদ্ধ, এবং আগামী দিনে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে বিশালভাবে সেনা সংগ্রহ’র কাজকর্মর সঙ্গে মেলে না। মাথায় রাখতে হবে তিনি সে মুহূর্তে রাজপুতদের সঙ্গে যুদ্ধ চালাচ্ছেন, তার পক্ষে এক্ষুণি দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করার সমস্যার। তাই তিনি চিঠিতে যতটা পারা যায় বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে কথা বলেছেন।
তিনি লিখলেন
সর্বশক্তিমান সাক্ষী, আপনাকে দেওয়া কথা মেনে চলব
আমায় ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে ঘাতক হবে।
তিনি সাফাই দিয়ে বললেন তাঁর ধারনা ছিল জামান মির্জা হুমায়ুনের পুত্র স্বরূপ। এর পর থেকে তিনি মুঘল সম্রাটের ইচ্ছা পালন করবেন।
হুমায়ুনের পরের চিঠিটা অনেকটা রূপকার্থে লেখা। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন এই বিশ্বে সব থেকে অসহায় কে? তাঁর উত্তর, যার কোনও বন্ধু নেই। কিন্তু অন্য কেউ তাঁকে বলে, ‘না, বিশ্বে সব থেকে অসহায় মানুষ হল যার বন্ধু আছে, অথচ সে তার বন্ধুত্ব হারাচ্ছে’। তিনি মর্মার্থ হিসেবে লিখছেন, হাজার বন্ধু, একজন শত্রুর কাছে অসহায় বোধ করে। অর্থাৎ বাহাদুর যেন তাঁর বন্ধুত্ব না হারায়। চিঠি শেষ করছেন বহুপ্রচলিত এক উদ্ধৃতি দিয়ে
বন্ধুত্বের গাছ লাগাও, তাতে হৃদয়ের ইচ্ছে পরিপূর্ণ করার ফল ফলতেও পারে
প্রতিকূলতার চারা উপড়ে ফেল, সে অগণিত অসুখের জ্জন্ম দেয়।
আরবিক হিস্ট্রি অব গুজরাটে বাহাদুরের যে উত্তরটা লেখা আছে, আবদুল্লা বলছেন সেটা খুবই মোটা দাগের এবং কঠোর। সুলতান চিঠি শুরুই করেছেন যুদ্ধ কেন শুরু হয় তার ৫ কারন দেখিয়ে
১) রাজত্ব তৈরি করার উদ্যম
২) নিজের রাজত্ব নিরাপদ করার উদ্যম
৩) ন্যায়ের তরবারি নিয়ে অন্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়া রাজত্ব আক্রমন করার উদ্যম
৪) আরু বেশি সম্পদ তৈরি করার উদ্যম
৫) সব থেকে দুষ্ট উদ্যম হল, জয় করা, লুণ্ঠন করা বা বশ্যতা স্বীকার করানোর অহংকার থেকে বিশ্বকে দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ করার উদ্যম।
তিনি লিখছেন, ওপরের একটাও কারন তার মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায় না। বরং সম্পদ বন্টনের উদ্দেশ্য নিয়ে পবিত্র যুদ্ধের জন্যে সেনা নিয়োগ করা।
তিনি লিখছেন,
দুই জগতের কোনোটিতেই আমি অন্য কোনও অসৎ ইচ্ছার বিরুদ্ধে নেই
যদি কেউ আমার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সর্বশক্তমানের করুণ যেন তার ওপর বর্ষিত হয়
শেষ করছেন এই কবিতা দিয়ে
সরাইখানার অতিথি হয়ে জাত মাতালের কাছে শোভন হও
মাতলামি বাড়লে অসুখ মাথায় ওঠে, সমস্যায় নিমজ্জিত করে।
হুমায়ুনের চতুর্থ চিঠিটা আবু তোরাপ ওয়ালির হিস্ট্রি অব গুজরাট, মীরাটি সিকন্দরি এবং আবুলফজলের আকবরনামায় উল্লিখিত হয়েছে, তার সারাংশ হল
সম্মান ইত্যাদি দেওয়ার পরে ইত্যাদি… জানাগিয়েছে কাজি আবদুল কাদির এবং মহম্মদ মাকিম এখানে উপস্থিত হয়ে আপনার অঙ্গীকার এবং ব্যস্ততা সম্পর্কে জানিয়েছে। আমরা যারা একতা আর পরস্পর মিলনে বিশ্বাস করি, আমাদের বিশ্বাস হয় না আপনি কোরানের O ye, that believeth, abide by your agreements ওহে বিশ্বাসী চুক্তি মেনে চল, নির্দেশ উল্লঙ্ঘন করবেন, বা এই উক্তিটা ইগনোর করবেন verily, the best of the pacts are a part of the Faith নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম চুক্তি হল ঈমানের অংশ।
আমরা আপনার কাছে আমাদের পক্ষ থেকে সালাহউলমূলক মৌলানা কাসিম আলি এবং গিয়াসুদ্দিন কুরচিকে পাঠাচ্ছি, আপনি যদি বন্ধুত্ব আর একতার পথে অটল থাকেন তাহলে যে সব বিদ্রোহী আপনার কাছে আশ্রয় নিয়েছে, হয় তাদের আপনি আমাদের কাছে পাঠাবেন, না হয় আপনি তাদের রাজ্য ত্যাগ করার নির্দেশ দেবেন যাতে আমাদের রাজত্বের অন্য প্রজা ভক্তি ও আনুগত্যের পথ থেকে বিপথে চালিত না হয় (পক্ষ পরিবর্তনের উদাহরণে)।
আমি আপনার যথোপযুক্ত উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছি, যাতে সন্দেহ আর শত্রুতার বাতাবরণ দূর হয়ে যায়, এবং একতার নির্মল জলধারা বয়ে চলে আর পরস্পরিক বন্ধুত্বের বাগানে আন্তরিকতার চারাগাছে ফল ধরে। (সুলতান বাহাদুরের উকিল) নুর মহম্মদ খলিল আমাদের দূতের সঙ্গে আপনার অঙ্গীকার বিষয়ে আমায় সন্তুষ্ট করতে পারে নি, আবি সত্যই অবাক হয়েছি।
মহম্মদ জামানের বিষয়ে আপানি অতীতের ঘটনাবলীর দোহাই, উদাহরণ দিয়ে লিখেছেন আপনার বাবা সুলতান মুজফফরের সঙ্গে দিল্লির সুলতান সিকন্দর লোদির বন্ধুত্ব আর একতার সম্পর্ক ছিল এবং আলাউদ্দিন সহ অন্য আমীর যখন আগরা ছেড়ে গুজরাটে আশ্রয় নিল, তখন দুই সুলতানের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন হল না। আপনি লিখেছেন, ‘তাহলে মহম্মদ জামান যদি আমার কাছে আশ্রয়ই নেয়, তাহলে কীসের সমস্যা?’ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনাকে আপনি এক করে দেখছেন দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম — দুটো ঘটনার মিল কোথায়? আমার উপদেশ হল অতীতের চুক্তি এবং বাধ্যবাধকতার প্রতি অটল থাকা আপনার পক্ষে মঙ্গলদায়ী হবে। তাই হয় তাদের আমাদের হাতে অর্তপণ করুন না হয় তাদের রাজ্য থেকে বহিষ্কার করুন। আপনি যদি আমার পরামর্শ মত চলেন তাহলে স্পষ্ট হবে আপনার পেশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মধ্য দিনের সূর্য আপনার হৃদয়ে অবস্থান করে।
হে তুমি, যে প্রেমময় হৃদয়ের গর্ব করে
যদি তোমার হৃদয় আর জিহ্বা একমত হয় তোমাকে অভিবাদন।
সম্ভবত সুলতান জানেন যে সাহেব-কিরান তৈমুর ইল্ডেরিম বায়েজিদ থেকে দীর্ঘ উস্কানি সত্ত্বেও তুরস্ক আক্রমণ করা থেকে বিরত ছিলেন, কারন তিনি ইওরোপের খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু যখন কাইজার কারা ইয়ুসুফকে তুর্কোমান এবং সুলতান আহমদ জালাইরকে আশ্রয় দিলে, তৈমুর বহুবার অবিশ্রান্ত এবং বিফলভাবে তাদের রাজত্ব থেকে দূর করার জন্যে প্রভাবিত করলেন। কাইজার তৈমুরের কথা পাত্তা দিলেন না, তার ফল কী হয়েছে, সেটা সকলেরই জানা
বন্ধুত্বের গাছ লাগাও, তাতে হৃদয়ের ইচ্ছে পরিপূর্ণ করার ফল ফলতেও পারে
প্রতিকূলতার চারা উপড়ে ফেল, সে অগণিত অসুখের জন্ম দেয়।
সুখের প্রাসাদে যিনি থাকেন
সাদির আলাপের একটি শব্দই যথেষ্ট।
(পরামর্শ হিসাবে) এটাই যথেষ্ট, যদি আপনি কান দেন,
কাঁটা গাছ রোপন করে, জুঁই ফোটানো যায় না।
যেহেতু আপনার যে চিঠি মহম্মদ মাকিম পাঠিয়েছে তাতে উদ্বেগজনক খবর এবং নির্যাতনমূলক ব্যবস্থার উল্লেখ আছে, আমি বাধ্য হচ্ছি গোয়ালিয়র যেতে। নুর মহম্মদ খলিল আপনার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটা আমার সামনে আনলে আমি সেটা খুঁটিয়ে পড়ে আমি ব্যবস্থা নেব। আপাতত আমি বিশ্বস্ত শায়েখ ইব্রাহিমকে আমার উত্তর লিখে পাঠাচ্ছি। আমার আশা তার মিশন শেষ হলে, তাকে চলে আসার অনুমতি দেবেন। যারা নির্দেশ মেনে চলে তাদের ওপর শান্তিবর্ষিত হোক। (চলবে)