দশম অধ্যায়
হুমায়ুন বাদশা আর সুলতান বাহাদুর শাহের পত্রালাপ, ১৫৩৪-৩৫
এই পর্বেও হুমায়ুন, সুলতান বাহাদুরের পাশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নি। নুর মহম্মদ খলিল প্রভু সুলতান বাহাদুরের লেখা চিঠি, অসামান্য চিত্রবিচিত্র কোরাণের নকল, বিচিত্র ধরণের উপঢৌকন নিয়ে সম্রাট হুমায়ুনের দরবারে পৌঁছলেন। হুমায়ুন, সসম্মানে কোরাণ নিজের হাতে তুলে নিলেন, কোরাণ লেখকের হস্তাক্ষরের প্রশংসা করলেন আর কোরাণের শপথ নিয়ে অক্ষরে অক্ষরে চুক্তি মেনে চলার অঙ্গীকার করলেন নতুন করে। নুর মহম্মদ খলিল গুজরাটে ফিরে সম্রাট হুমায়ুনের আন্তরিকভাবে চুক্তি পালন করার কথা সুলতানকে ভরা দরবারে জানিয়ে সম্রাটের পাঠানো ফরমান তাঁর হাতে তুলে দিলেন। একজনও গুজরাটি দরবারি সম্রাটের কথা বিশ্বাস করে নি।
সুলতান বাহাদুর নিরক্ষর ছিলেন। মুনসি মুল্লা মুহম্মদ লারিকে হুমায়ুনের পাঠানো ফরমান পড়তে নির্দেশ দিলেন। মুনসি কখনও হুমায়ুনের প্রশাসনে মাঝারি পদে ছিল। সম্রাটের ওপর কোনও কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মুঘল সাম্রাজ্য ছেড়ে গুজরাটে স্থায়ীভাবে অভিবাসিত হয়ে আসেন। তাঁর ঠাঁই হয় সুলতানের দরবারে। চিঠিটির বক্তব্য শোনার পরে সুলতান মুনসি মুল্লা মুহম্মদ লারিকে উত্তর লিখতে দিলে, মুঘল সম্রাটের ওপর ক্ষোভ প্রকাশের সুযক্সোগ পেলেন তিনি। তিনি জানেন নিরক্ষর সুলতান চিঠি পড়তে পারবেন না। তাঁর যত রেয়াগ তিনি চিঠির বয়ানে ঢেলে দিলেন। নির্বোধ আমলার মত বয়ান তৈরি করে নেশায় থাকা সুলতান আর তার বয়স্যদের সামনে পাঠ করলেন। বেহুঁশ সুলতান আর তার অনভিজ্ঞ যুবা দরবারিদের বয়ান শুনে মনে হল দিল্লিকে মুখের ওপর জবাব দেওয়া গেল। নেশার ঘোরে সুলতান অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝলেন, চিঠিটা দিল্লিতে পৌঁছোলে তিনি সমস্যায় পড়তে পারেন; তবুও সুলতান কোনও দুর্বোধ্য কারনে নিরব রইলেন। যে অঘটন ঘটার কথা ঘটে গেল – করণিকেরা তড়িঘড়ি চিঠি যথাবিদ্য আমলাতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে দিল্লির উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিল। পরের দিন সকালে দরবারে মন্ত্রী চিঠির বিষয়টা জানতে পেরে বুঝলেন রাজ্যের বড় সর্বনাশ হয়েছে। তিনি কড়াভাষায় খলিলকে গালি দিয়ে সুলতানকে বাধ্য করলেন হরকরাকে থামিয়ে চিঠিটা উদ্ধার করতে। মালিক নিশান আর ওয়াজুলমুলক হরকরার পিছনে ঘোড়সওয়ার পাঠালেও তাকে আর ধরা গেল না, ধাওয়াকারীরা নারওয়ার গিরিখাতের মুখ থেকে ফিরে এল।
যুদ্ধের বর্ণনায় যাওয়ার আগে মধ্যযুগের মুসলমান দৌত্য এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক মনোভাব বুঝে নেওয়া যাক —
১) রাষ্ট্রগুলো একে অপরের রাজ্যে স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ করত না। প্রয়োজনে দৌত্য/দল পাঠাত — প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিযোগী রাষ্ট্রে তাদের থাকার নির্ভর করত সেই রাষ্ট্রের রাজার ইচ্ছের ওপর বা অনেক সময় দূতের পাঠানো সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় তার রাজা কবে ফেরত আসার খবর পাঠান তার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় গোয়েন্দাকর্ম করার অভিযোগে দূতকে রাজ্য থেকে নির্বাসন দেওয়া হত। সাধারণত দূতেরা রাজার জন্যে চিঠিতে লেখা বার্তা আনা ছাড়াও দামি পণ্য আনতেন উপঢৌকন হিসেবে। দূতের যখন ফিরে যাওয়ার সময় হয় বা তাকে প্রত্যার্পণ বা বহিষ্কার করা হয় — দুই ক্ষেত্রেই পাল্টা একজন দূত তার যায়গায় যেতেন রাজার পক্ষ থেকে। সাধারণত একটি দৌত্য দলের ফিরে আসতে অন্তত এক বছরের বেশি সময় লাগত।
২) ভারতবর্ষের মুসলমান শাসকেরা, মুসলমান রাষ্ট্র এবং হিন্দু রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করতেন। মুসলমান বিচার ব্যবস্থা হিদয়া (Hiddya) বলছে, মুসলমান রাষ্ট্র বিধর্মী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখবে না।
হিন্দু প্রজার সংখ্যা যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনায় অনেক বেশি এবং হিন্দুরা জাতিভেদে বিভক্ত, তাই তারা ইসলামি আগ্রাসন রুখতে পারে নি। তাই মুসলমান রাষ্ট্রের প্রতিবেশী হিন্দু রাজ্যগুলো সাধারণত মুসলমান বিচার ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হত। এই বক্তব্যের পক্ষে দুটো উদাহরন দেব —
ক) ১৫৩৩-এর রানার সঙ্গে চুক্তিতে বিপুল অর্থ দেওয়া ছাড়াও বড় এলাকা ছেড়ে দিতে হলেও বাহাদুর শাহ কোনও কারন ছাড়াই দু-বছর পরে বিধর্মী চিতোর ধ্বংস করে।
খ) বাহাদুরের ঠাকুর্দা সুলতান মাহমুদ বেগারহা গিরনামকের মান্দালক রাজাকে ইসলাম ধর্ম নিতে বাধ্য করে।
এই ধরণের কর্মকাণ্ডের উদাহরণ খুব কম হলেও ভারতবর্ষের প্রথম দিককার মুসলমান কীর্তিকলাপের বর্ণনায় ধর্মীয় নিপীড়নের চিহ্ন প্রবল। কিন্তু কোনও হিন্দু রাজ্য যদি মুসলমান রাজার অধীনতা মেনে নিত, তাহলে তাদের ওপর কোনও মুসলমান কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হত না, বিজয়ীরা বিজিতদের সংগঠন এবং প্রথার ওপর হস্তক্ষেপ করত না।
তবে বলা হয়েছে মুসলমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামি একটু বেশিই ছিল। বহু লেখকের দাবি মুসলমানেরা ভারতবর্ষে বহু মন্দির ধ্বংস করেছে। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখা দরকার, বেশ কয়েকশ বছরের মুসলমান শাসনে যদি সত্যি মন্দির ধ্বংসের পরিকল্পনা রূপায়িত করত তাহলে আওরঙ্গজেবের সময় ধংস করার মত এই মন্দির টিকে থাকত না। মুসলমানদের মন্দির মূর্তি ধ্বংসের চারটে কারন খুঁজে পেয়েছি
প্রথমত তারা একেশ্বরবাদী। ফলে তারা মূর্তি পুজো ঘৃণা করে। বিজীত মুসলমান সেনাবাহিনী চিরাচরিত ঘৃণার জন্যে বিজয়ীদের মন্দির, মূর্তি ধ্বংস করেছে। এই জন্যই মুসলমান শাসনে ৭৫% মন্দির ধ্বংস হয়েছে।
দ্বিতীয়ত বহু উদার মুসলমান শাসকও রাজনৈতিক কারনে এবং মোল্লাদের চাপে পড়ে মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দিতে বাধ্য হত। এই জন্যই অযোধ্যায় রামমন্দির ভাঙা হয়েছে বাবরের সময়ে। ধর্মান্ধ মোল্লা আর ঐতিহাসিকেরা শাসকদের বাধ্য করত মন্দির-মূর্তি ধংস করতে।
তৃতীয়ত, মুসলমান বিশ্বের প্রশংসা পাওয়ার জন্যে বহু শাসক মন্দির ভেঙেছে, অমুসলমানদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে এনেছে। বলা হয় আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি এইসব মানুষেরা প্রভাবিত হতেন। কিন্তু মুসলমান বিশ্ব এই ধরণের কাজকর্ম পছন্দ করত কী না সেটা অন্য প্রশ্ন।
চতুর্থত শত্রুর উপাসনা স্থলকে নিজেদের উপাসনা স্থল হিসেবে রূপান্তরিত করার ইচ্ছেও কাজ করেছে। দিল্লির পৃথ্বীরাজের ঠাকুরদ্বারকে কুতুবুদ্দিন কাওয়াল-উল-ইসলাম মসজিদে পরিণত করেন। যুদ্ধের সময় মন্দিরকে নানা ভাবে দখল রেখেও অপবিত্র করা হয়, মালপত্র রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। হিন্দুরা এইজন্যে মুসলমানদের ব্যবহৃত মন্দির ব্যবহার করে না। অনেক সময় পুরোনো মুসলমান কাঠামো থেকে উপকরণ নিয়ে মসজিদ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। শের শাহের পুরানা কিলা তৈরি হয়েছিল আলাউদ্দিন সিরির কাঠামোর উপকরণ দিয়ে। এই সপব ঘটনা শুধু ভারতে হয়েছে ভাবলে ভুল হবে। স্পেনেও মসজিদ চার্চে পরিণত করা হয়েছে। কর্দোবায় ১২৩৮ থেকে মসজিদ চার্চ হিসেবে কাজ করছে।
হুমায়ুন, কাল্পির আলম খানের পালানোর বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন নি। তাতার খানকে যে বাহাদুর খান আশ্রয় দিয়েছেন, সে নিয়ে তিনি কিছুটা নরম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, কিন্তু এর বেশি বড় পদক্ষে নেওয়ার কথা ভাবেন নি। কিন্তু মহম্মদ জামান মির্জার ক্ষেত্রে তিনি অনমীয় হলেন। তার গুজরাটে আশ্রয় নেওয়াকে তিনি ক্ষমা না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করে ফেললেন সেনা অভিযানে যাওয়ার। মাথায় রাখতে হবে বাহাদুরের যদি সেই সামরিক ক্ষমতা থাকত, তাহলে সে হুমায়ুনের বাহিনীকে আক্রমনের জন্যে এত দিন দেরি করত না। (চলবে)