একাদশ অধ্যায়
হুমায়ুনের উজ্জয়ন যাত্রা। বাহাদুর শাহের চিতোর দখল, মার্চ ১৫৩৫। মান্দসোরের যুদ্ধ এপ্রিল ১৫৩৫
হুমায়ুন আর বাহাদুর শাহের পত্রাঘাত পাল্টা পত্রাঘাত পর্বের শেষ সময়ে জানুয়ারি ১৫৩৫এ হুমায়ুন সারংপুর পৌঁছলেন। হুমায়ুন বাহিনী নিয়ে পূর্ব মালোয়ার দিকে অপ্রতিহত গতিতে এগোনোতে সিঁদুরে মেঘ দেখলেন বাহাদুর। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে এক সময় চিতোরের অবরোধ তুলে রাজধানী বা মাণ্ডুতে ফিরে এসে হুমায়ুনের বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়ার ভাবনা ভাবছিলেন। বাহাদুরের সেনাপতি সদর খান পরামর্শ দিলেন আগে চিতোর জিতুন তারপরে মুঘল বাহিনী নিয়ে ভাববেন। অন্যদিকে মীরাট-উল-আলমের বক্তব্য বাহাদুর স্বয়ং হুমায়ুনকে অপেক্ষা করতে বলেন। তবে অনেকেই বলেছেন, বাহাদুর যখন চিতোর অবরোধ করছেন, সেই মুহূর্তে যদি হুমায়ুন চিতোরের পক্ষে দাঁড়ানোর মত জলদি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাহলে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস অন্যখাতে বইত।
হুমায়ুন চিতোর না গিয়ে ফেব্রুয়ারি ১৫৩৫-এ উজ্জয়নীর দিকে এগোলেন। ৮ মার্চে চিতোরের পতন পর্যন্ত তিনি উজ্জয়নীতে অপেক্ষা করবেন। তিনি চিতোর না গিয়ে উজ্জয়নীতে থাকার যে সুবিধা পেলেন সে বিষয়ে আমাদের মত তুলে দেওয়া গেল
১) শত্রর বেশ কিছুটা অঞ্চল দখল নিলেন, ফলে বেশ কিছু সম্পদ তার নিয়ন্ত্রণে এল। বাহাদুরের সঙ্গে চিতোর অবরোধে যাওয়া আলম খান জিঘট তার জায়গির হারালেন।
২) সারাংপুর আর পরে উজ্জয়নীতে থাকার সময় তিনি মালোয়ার জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তাদের সমর্থন জিতে নিলেন। বিশেষ করে পূর্বাইয়া রাজপুতদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হল। তারা বাহাদুরের ব্যবহারে হতাশ হয়েছিল। বাহাদুরকে আক্রমন করার থেকেও বেশি হুমায়ুনের মাথায় ঘুরছিল বাহাদুরের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোর জনগণের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তাদের সমর্থন জিতে নেওয়ার ভাবনা — যে জন্য তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে উজ্জয়নীর দিকে এগোচ্ছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য যদি বাহাদুরের শিবির আক্রমন করাই হত, তাহলে তিনি উত্তর পশ্চিম দিকে অভিযান করতেন — তাহলেই তিনি অতি সহজে শত্রুর রাজধানী বা গুজরাটে পৌঁছতে পারতেন।

৩) তিনি শিবির ফেললেন মাণ্ডুগড় আর গুজরাট বাহিনীর মধ্যের অঞ্চলে। গুজরাটি বাহিনীকে মাণ্ডুতে আসতে গেলে মুঘল বাহিনীর বিশাল সেনা শিবির টপকাতে হবে। চিতোর দখলের পরে বাহাদুর বিশাল বিশাল কামান নিয়ে ধীর গতিতে আহমেদাবাদে পৌঁছবার আগেই হুমায়ুন গুজরাট ঢুকেপড়বেন। তাছাড়া বহু ঐতিহাসিকেরই ধারণা গুজরাটের সুলতান তাদের অবরোধ করায় পরোক্ষে রাজপুতেরা হুমায়ুনকে সমর্থন দিয়েছে — তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য নেই।
চিতোরের পতন ঘটল ৮ মার্চ ১৫৩৫, তিন মাস অবরোধের পর। শহরটি তিন দিন ধরে লুঠ করা হল। রুমি খানের গোলান্দাজিতে যে সব বড় ক্ষতি হয়েছিল, সে সব ক্ষত সারাই করা হল। সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে নতুন করে কামান বসানো হল। এক বছরের রসদ জমা করা হল। আবারও কেল্লার প্রশাসনিক ভার রুমি খানকে দেওয়া হল না, দায়িত্ব পেলেন মালিক নাসির খান।
অথচ রুমি খান দক্ষতাসম্পন্ন সেনাপতি। গুজরাটের সমুদ্র বন্দরের গোলাবারুদ দপ্তরের প্রধান ছিলেন তিনি। বাহাদুর শাহের বিভিন্ন অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন রুমি খান। বাহাদুর শাহের হয়ত আশংকা ছিল রুমি খানের মত দক্ষ সেনানী চিতোরের মত আঁটোসাঁটো রক্ষণের কেল্লা দখলে পেলে গুজরাটের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
চিতোরের অবরোধ তুলে নেওয়ার পরে বাহাদুর আতান্তরে পড়লেন। প্রথমত যুদ্ধ করে তার বাহিনী যথেষ্ট ছোট হয়ে গেছে, তিন মাসের খুবই সক্রিয় অবরোধে অংশ নিয়ে সেনারা ক্লান্ত। রাজপুতেরা অবসন্ন, শ্রান্ত। বাহাদুরের আশংকা তারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করতে পারে। সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে মুঘলেরা। হুমায়ুন উজ্জয়নীতে ছাউনি ফেলে রাজধানী মালওয়া যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। এ সবের থেকে আরও বড় কথা তার নজর গুজরাট রাজ্যে; সঙ্গে থাকা রুমি খানকে নিয়ে তারা মাথা ব্যথা — উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনাপতি কখন কী পদক্ষেপ করে আন্দাজ করা মুশকিল।
বাহাদুরের প্রথম কাজ হল রুমি খানকে তার বাহিনী থেকে ঝেড়ে ফেলা। সেই কাজটা তিনি নিজেও নিতে পারেন বা অন্য কোনও সেনাপতিকে দিয়েও করাতে পারেন। তাছাড়া বিদ্রোহ করার বাহানায় রুমিকে গ্রেফতার করে বন্দী করার পর হত্যাও করা যেতে পারে।
বাহাদুর খান একা হলে এই সমস্যা নিজেই সাল্টে নিতে পারতেন, কিন্তু মুঘলেরা বড় বালাই। তিনি পানিপথে নিজের চোখে দেখেছেন মুঘলদের জোরের জায়গা হল কামান। ফলে তাক্র কামান আর গোলান্দাজির ওপর নির্ভর করতে হল। তিনি এই পর্বের শেষ অংশটা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাঁকে যদি পুরোপুরি কামান বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়, তাঁর গোলান্দাজি দপ্তরের অস্ত্রাগার যদি বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কখনও না কখনও তারা তাদের নিয়োগকারীকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে পারে। তিনি এই সম্ভাবনাটা বোঝেন নি এমন নয়। কিন্তু পানিপথের অভিজ্ঞতা তাকে বাধ্য করল গোলান্দাজদের সঙ্গে নিতে যাদের ব্যবহার করে তিনি মুঘলদের অভিযান রুখতে পারেন। ফলে তাকে বিষবৃত্তে ঢুকেপড়তে হল — তাঁকে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে; তার জন্যে তারা কামান চাই; কামান চালাতে দক্ষ বিদেশি গোলান্দাজ চাই; শেষ পর্যন্ত তিনি জানতেন বিদেশি গোলান্দাজেরা রাজ্যকে বিপদে ফেলতে কসুর করব্র না।
তাকে তাজ খান নারপালি আর সাদার খান জানালেন শেষ পর্যন্ত তিনি যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তই নেন, তাহলে তাকে মুঘল বাহিনীর নিরাপত্তা রেখা ভেদ করতেই হবে। যেহেতু চিতোরের জন্যে তার বাহিনী অনেকটাই উজ্জীবিত হয়ে আছে, তাই মুঘলদের বিরুদ্ধে এই যথেষ্ট উজ্জীবিত বাহিনীর সর্বাত্মক যুদ্ধে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু রুমি খান তাকে এই পরামর্শ নিতে বারন করলেনও তিনি রুমি খানের ওপর যেমন বিশ্বাস রাখতে পারছেন তেমনি তার পরামর্শও উপেক্ষা করতে পারছেন না। তার ধারণা উচ্চাকাঙ্ক্ষী রুমি খান তলে তলে হুমায়ুনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছে।

হুমায়ুন উজ্জয়নী থেকে শিবির তুলে মান্দাসোরে ঘাঁটি গেড়ে গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদের আরও কাছাকাছি পৌঁছলেন। হুমায়ুনের অবস্থান ওপরের চিত্রে পরিষ্কার হবে। (চলবে)