একাদশ অধ্যায়
হুমায়ুনের উজ্জয়ন যাত্রা। বাহাদুর শাহের চিতোর দখল, মার্চ ১৫৩৫। মান্দসোরের যুদ্ধ এপ্রিল ১৫৩৫
বাহাদুর বুঝলেন তিনি বিপদে পড়েছেন। মুঘল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ছাড়া তার অন্য কোনও রাস্তা নেই। বিশালাকার হ্রদের দুই পাশে দুই মহাবলী বিশাল সেনাবাহিনী শিবির ফেলল। প্রথমে ছোটখাটো লড়াই ঝগড়া দিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হল। দ্বন্দ্বে বাহাদুরের বাহিনীর পিঠ দেওয়ালে ঠেকতে থাকায় সদ্য রাজস্থান থেকে যুদ্ধ জিতে আসা বাহিনী ক্রমশ মনোবল হারাতে শুরু করে পিছু হটার অবস্থায় পৌঁছে যায়। বাহাদুর, রুমি খানের পরামর্শে তুর্কি পদ্ধতিতে খোলা মাঠে শিবির তৈরি করে, তার চার দিকে পরিখা খোঁড়ালেন আর একই সঙ্গে বিপক্ষের দিকে তাক করে রাখলেন কামান, ওয়াগন আর বিশাল সাঁজোয়া বাহিনী। বাহাদুরের উদ্দেশ্য নিজের বাহিনী থেকে সেনা পালানোর সমস্ত প্রচেষ্টা আটকে দেওয়া এবং প্রয়োজনে যুদ্ধ জয়ে শের খান আর বাংলার সুলতানের থেকে সাহায্য চাওয়া।
বাহাদুর বিপক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করলেন। হুমায়ুন চেষ্টা করলেন যুদ্ধের প্রথম চোটেই ব্যাপক ধাক্কায় শত্রুকে ধরাশায়ী করতে। কিন্তু বাহাদুরের বাহিনী মুঘলদের প্রতিআক্রমন প্রতিরোধ করল, রুখে দিল। এই যুদ্ধে মুঘলদের ব্যাপক ক্ষতি হল। হুমায়ুন বুঝলেন এই রাস্তায় যুদ্ধ জেতা যাবে না। সরাসরি আক্রমনের পথ থেকে সরে এসে মুঘল সম্রাট শত্রুর গোলাবারুদ বাহিনীর রসদ জোগাড়ের পথে কার্যকর বাধা তৈরি করলেন। গুজরাটি শিবিরের প্রত্যেকটি খবর হুমায়ুনকে পৌঁছে দিচ্ছিল বাহাদুরের ওপর বিরক্ত তুর্কি গোলান্দাজ রুমি খান।
অবরোধ চলল ১৬ দিন, ১০ থেকে ২৫ এপ্রিল ১৫৩৫। বাহাদুরের রসদ সরবরাহ আটকে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যায় ঘোড়া মরতে লাগল, সেনারা অভুক্ত থাকল দীর্ঘকাল। যখন বাহিনীর পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে, শেষ চেষ্টা হিসেবে পরামর্শদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রত্যাঘাত করে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করার সিদ্ধান্ত নিলেন বাহাদুর। তিনি পালানোর চেষ্টা করলেন ২৫ এপ্রিল ১৫৩৫। পালানোর আগে সব গয়না, কামান, পশু মাটিতে পুঁতে দিলেন। সুলতানের দুই প্রিয় হাতি শারজা আর পট সিঙ্গারকে হত্যা করলেন, দুটো প্রধান কামান লায়লা আর মজনু ধ্বংস করে, কষ্টে চিৎকার করে কাঁদলেন। ২৫এর সন্ধ্যায় গুজরাটি শিবরে যখন গণ্ডগোল চরমে উঠেছে, বাহিনীর মনোবল তলানিতে ঠেকেছে, চুপিসাড়ে রুমি খান হুমায়ুনের বাহিনীতে যোগ দিয়ে গুজরাটি বাহিনীতে গোলযোগের প্রকৃত অবস্থা ব্যাখ্যা করলেন। বিপক্ষ বিপদে পড়া সত্ত্বেও সারারাত কিন্তু হুমায়ুন নিজে ঘোড়ায় চড়ে ৩০,০০০ মুঘল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়ে জেগে থাকলেন যাতে বিপক্ষের হঠাত আক্রমন রোখা যায়।
তিনি কেন ভয়ে ভীত বিপক্ষের সেনার ওপর আঘাত হানলেন না, তার কয়েকটা ব্যাখ্যা আছে, প্রথমত সাহসী হুমায়ুন বিপক্ষের বিপদে সুযোগ নিতে চান নি। তাছাড়া সুলতানের অতীতের সেনা চালনার দক্ষতার কথা তার অজানা ছিল না। দ্বিতীয়ত বাহাদুরের সামরিক দক্ষতার ওপর তাঁর সম্ভ্রম ছিল। কিন্তু রুমি খান দল ভেঙে চলে এসে তাঁকে আসল খবর দিলেও তিনি সেই পড়ে পাওয়া সামরিক সুযোগ নিতে চান নি। তৃতীয়ত তিনি রাতে বাহিনী নিয়ে সামরিক অভিযান চান নি। তিনি জানতেন আক্রমনে একটু ভুলচুক হলেই গোটা আক্রমন হঠকারী হয়ে যেত। একটা বিষয় পরিষ্কার তিনি বাবারমত বাহিনীর ওপর কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ চারিয়ে দিতে পারেন নি।
হুমায়ুনের বিপক্ষ দলকে আক্রন না করার সিদ্ধান্তের ফায়দা তুলনেন বাহাদুর শাহ। তিনি বাছা বাছা পাঁচ অনুগামী নিয়ে পালালেন, যাদের মধ্যে ছিলেন খণ্ডেশের মহম্মদ এবং মাল্ললু খান বা কাদির শাহ মাণ্ডুলি। তিনি জানতেন তার পালানোর পথ দুর্গম আর বিপদে ভরা। হুমায়ুন দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর দুই রাজধানী মাণ্ডু আর আহমেদাবাদের মধ্যেকার রাস্তায়। তাই তিনি পালানোর জন্যে নতুন রাস্তা পরিকল্পনা করলেন। সোজা দক্ষিণের দিকে না গিয়ে তিনি প্রথমে উত্তরে আগরার দিকে এগোলেন, কিছু দূর গিয়ে ঘুরে মাণ্ডুর রাস্তা ধরে মাণ্ডু পৌঁছলেন।
বাকি ১৫ থেকে ২০ হাজার বাহিনী সদর খান আর ইমাদউলমুলকের যোগ্য সেনাপত্যে সোজা রাস্তা ধরে আহমেদাবাদ ফিরে চলল। তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণে বাহিনীকে উজ্জীবত করে এমনভাবে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন যে পিছু পিছু আসা মুঘল বাহিনী তাদের আক্রমন করার সাহস করছিল না। কেউ কেউ বলছেন হুমায়ুনের ধারণা ছিল এই ফিরে চলা বাহিনীর সঙ্গে বাহাদুর খান ছিলেন। তাই তিনি গুজরাটি বাহিনীকে আক্রমন করেন নি। কিন্তু হুমায়ুন কেন আক্রমন করলেন না বাহাদুর শাহের ওপর সমবেদনায় না কী তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গিয়ে নিজের বাহিনীতে হতাহতের সুংখ্যা বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চান নি?
বাহাদুর পালাবার পরের দিন সকালে মুঘল বাহিনী গুজরাটি শিবিরে গিয়ে দেখল পালানোর তাড়ায় তারা নিজেদের শিবিরে পোড়ামাটির নীতি নিলেও কিছু কিছু জিনিসপত্র ধ্বংস হয়েছে, তাড়াহুড়োয় অধিকাংশ বস্তু একইরকম রয়েছে। তারিখইগুজরাট (হিস্ট্রি অব গুজরাট) বইতে মীর আবু তুরাব ওয়ালি বলছেন গোটা শিবিরটা ১ মাইল ব্যাসওয়ালা – রাজকীয় জেনানা, দরিবার, নক্কর খানা মিলিয়ে ১৫৩০ ইলাহি গজ। তাঁবুর কাপড় বোনা হয়েছিল রেশমের ওপর জরির কাজে, দড়িগুলো রেশমের তৈরি, খুঁটিগুলো সোনা বা রূপোর। তার শিবির দেখে হুমায়ুন বলে উঠেছিলেন, এই মানুষটা কেন পৃথিবী আর সমুদ্রের সম্রাট হবেন না Why should it not be so, he is the lord of both Land and Sea। মীরাট-ই-সিকন্দরি অন্যভাষায় বলছে দিল্লি রাজস্বের জন্য তার গম এবং বাজরার উপর নির্ভর করে যখন গুজরাট তার প্রবাল এবং মুক্তার উপর নির্ভর করে Delhi relies on its wheat and millets for revenue while Gujrat counts upon its corals and pearls।
বন্দীদের মধ্যে দুজন বিখ্যাত মানুষকে পাওয়া গেল — উচ্চপদস্থ মন্ত্রী খুদাবন্দ খান আলজী আর থাট্টার প্রাক্তন শাসক বাহাদুরের শ্বশুর।
৮০ বছর বয়সী খুদাবন্দ চারজন রাজাকে সেবা করেছেন; ঘোড়া চড়তে পারতেন না, তাই শিবিরে বাধ্য হয়ে আটকেছিলেন। তিনি বাহাদুরের পলায়নের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, পালকিতে চড়ে বাহিনী চালনা করতেন। তিনি যেহেতু হাঁটতে পারতেন না, গুজরাটি বাহিনী তাড়াহুড়োয় পালানোর সময় তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভুলেগিয়েছিল। মুঘল সেনারা তাকে গ্রেফতার করে হুমায়ুনের সামনে নিয়ে গেলে, তার বয়স, বুদ্ধি আর জ্ঞান পরীক্ষা করে হুমায়ুন মুগ্ধ হলেন। হুমায়ুনের গুজরাট অভিযানে তিনি সম্রাটের পরামর্শদাতাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হবেন। তিনি হুমায়ুনকে হাদিস শিক্ষা দেন।
অন্য বন্দী, জাম ফিরোজ ১৫২১-এ শাহ বেগ আরঘুনের কাছে রাজ্য থাট্টা হারান (আরঘুন ইত্যাদিদের নিয়ে আমি মে মাসে ফেবুকে লিখেছিলাম ‘মুঘল আর সাফাভির বাফার স্টেটের শাসক সুলতান মাহমুদ খান’)। তারপর থেকেই তিনি বাহাদুরের আশ্রয়ে। হুমায়ুন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে চললেন কিন্তুয় ক্যাম্বেতে বিদ্রোহের সময় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মান্দাসোর বিজয়ে আরও দুটো ঘটনা ঘটে। প্রথমটা হল মহম্মদ জামান মির্জা বাহাদুরকে বিপদে পড়া দেখে পালালেন লাহোরে। আশ্রয় নিলেন কামরানের দরবারে। কামরান তখন লাহোরে ছিলেন না। যতদিন না শাহজাদা পৌঁছলেন, লাহোরে তিনি কামরানের প্রশাসনের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ান।
দ্বিতীয় ঘটনা হল রাজপুতদের চিতোর উদ্ধার। বুন্দিরে নির্বাসিত ১৬ বছরের রাণা বিক্রমজিত এসে ১৫৩৫ থেকে রাজত্ব করলেন, পরের বছর তার তুতোভাই কুঁয়র বনবীর সিংহ তাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল নেয়। (চলবে)