দ্বাদশ অধ্যায়
বাহাদুর শাহের পলায়ন। মাণ্ডু, ক্যাম্বে, চম্পানীরের ১৫৩৫-এ পতন
আক্রমনের প্রথম চমক শেষ হওর পর সুশৃঙ্খল মুঘল বাহিনী শত্রু শিবিরে প্রত্যাঘাত করে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে। তিন দিন ধরে ক্যাম্বে শহর লুঠ আর তছনছ করার নির্দেশ দেন ক্ষিপ্ত হুমায়ুন। এখানেই দুই প্রখ্যাত বন্দী সদর খান আর জাম ফিরোজকে হত্যা করা হয় সম্রাটের নির্দেশে।
ক্যাম্বেতে হুমায়ুন কয়েক দিন অবস্থান করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন মন দিয়ে। ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলের শেষ ভূমিটুকু এখন থেকে তার দখলে। আমাদের ধারণা তিনি এইরকম লাইনে ভাবছিলেন —
১) চম্পানীর ছাড়া গোটা মধ্য গুজরাট মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে এল।
২) সুলতান বাহাদুর শাহ আপাতত সর্বহারা, পর্তুগিজদের ভরসায় তার জীবনযাপন; কিন্তু পর্তুগিজ আর সুলতানের মধ্যে অনাক্রমন চুক্তি হলেও বাস্তবিকভাবে দুই পক্ষের দীর্ঘকালীন সমঝোতা সম্ভব ছিল না, তাই হুমায়ুন ভাবলেন তিনি মাথা থেকে বাহাদুর শাহের চিন্তা দূর করে দেবেন।
৩) তার পরের কাজ হল মধ্য গুজরাটের বিজয়লব্ধ ভূমিতে প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্ঘবদ্ধ প্রশাসন বসানো এবং এর পরে চম্পানীর দখল করা। তার এই উদ্যমে মানুষ শান্ত হবে। মানুষের কাছে তার ঠিকঠাক রাজনৈতিক ছবি তৈরি হওয়া দরকার। সে কাজ প্রশাসনের।
৪) তার কাছে খবর এল চম্পানীরে বিপুল সম্পদ রাখা আছে। এখন থেকে গুজরাটে অন্য সব পরিকল্পনা সরিয়ে রেখে হুমায়ুনের প্রথম কাজ হবে চম্পানীর এবং তার সম্পদ দখল।
৫) উত্তর আর দক্ষিণ গুজরাটের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ায়, তিনি দুটো অংশকেই নিজের মত করে শাসন করার অবস্থায় এসেছেন।
হুমায়ুন বাহাদুরকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে জুলাই ১৫৩৫-এ চম্পানির দখলের উদ্যোগ নিলেন। চম্পানীরে সাধারণ অবরোধ তৈরি করা হল। হুমায়ুন পৌঁছে দেখলেন অবরোধের সমস্ত প্রকরণ তৈরি। চম্পানীরের বাহিনী যাতে বাইরে থেকে কোনও রকম সাহায্য, রসদ না পায়, তার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। বহুদিন অবরোধ চললেও কাজ হল না। দুইস্তরে প্রতিরোধ তৈরি করা ইখতিয়ার খান আর নরসিং দেও প্রভূত প্রতিরোধ খাড়া করলেন। তাদের হাতে শক্তিশালী কামান ছিল, দক্ষ গোলান্দাজও ছিল। দুমাস ধরে অবরোধ চলল। মূল প্রতিরোধের শক্তি নরসিং দেও মারা যাওয়ার পর বোঝা যাচ্ছিল চম্পানীর দখলের কাজে মুঘলদের আর বেশি দিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। ইখতিয়ার খান যতটা না যোদ্ধা, তার থেকে বেশি পড়ুয়া, তিনি প্রতিরোধের পতাকা বেশ কিছু দিন তুলে ধরলেন ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষয় চলছিল। হঠাত মুঘল বাহিনী আবিষ্কার করল, অবরোধকারীদের চোখে ধুলো দিয়ে, হালোল অঞ্চলের প্রান্ত থেকে স্থানীয় মানুষেরা দেওয়াল বেয়ে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে যায়। জায়গা দেখে হুমায়ুনের ধারনা হল অবরোধ হটানোর প্রশিক্ষিত সেনাদের পক্ষেও এই ৬০-৭০ গজ উঁচু এবং খাড়াই দেওয়াল বেড়ে ওঠা নামুমকিন। কিন্তু সমাধান হাতের কাছেই ছিল। মুঘলেরা ৭০-৮০টা বড় পেরেক জোগাড় করে দেওয়ালে পর পর লাগাতে থাকল, তার ওপর মই ঝোলালো। গুজরাটিরা স্বপ্নেও ভাবে নি হালোলের দিক থেকেও মুঘল আক্রমন আসতে পারে। ফলে সেই দিকে তারা পাহারা বসায় নি। ঠিক হল ৩০০ সেনার যে মুঘল দল দেওয়াল চড়বে সেই দলের নেতৃত্ব দেবেন স্বয়ং ২৭ বছর বয়সী হুমায়ুন। তিনি নিজে প্রথম কেল্লার মাথায় চড়লেন। এই সময় বাইরে থেকে মুঘলেরা গুজরাটি বাহিনীর ওপরে কামান দাগা শুরু করল প্রবল বেগে। মুঘল আক্রমনে ইখতিয়ার খান পিছিয়ে পাওয়াগড়ে আশ্রয় নিলেন। হুমায়ুন ইখতিয়ার খানের জ্ঞানচর্চার বিষয়টা জানতেন, সম্মান করতেন। তিনি তাকে আত্মসমর্পনের সহজ শর্ত দিলেন – হয় সম্রাটকে সঙ্গ দাও, না হয় বাহাদুরের কাছে ফিরে যাও। ইখতিয়ার খান হুমায়ুনের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। চম্পানীরের পতনের তারিখ বাদাউনি আর আবুলফজল উভয়েই লিখেগেছেন ক্রোনোগ্রামের মাধ্যমে। কিন্তু ঠিক তারিখটা পাচ্ছি আবু তুরাব আলির লেখায়, তার বাবা আর কাকা উভয়েই ঘটনাস্থলে ছিলেন।তুরাব আকবরের আমলেও সম্মান পেয়েছেন। তুরাবের উল্লেখ করা ৯৪২এর ৬ষ্ঠ সফর দিনে চম্পানীর দখল হল।
ইখতিয়ার খান পরে হুমায়ুনকে জানান, তার বিবেক যদি সায় দিত তাহলে গুজরাটি প্রতিরোধ আরও বেশ কিছু দিন চলত। আশেপাশের অঞ্চলগুলো মুসলমান রাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর, এই প্রতিরোধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া বা প্রতিরোধ তুলে নেওয়ার স্পষ্ট যুক্তি তিনি ধর্মীয় গ্রন্থে খুঁজে পান নি। হুমায়ুন যেহেতু নিজে পড়ুয়া ছিলেন, তাই তিনি ইখতিয়ারকে পছন্দ না করে পারেন নি।
চম্পানীর দখলের সঙ্গে সঙ্গে মধ্য গুজরাটও হুমায়ুনের নিয়ন্ত্রণে এল।
ত্রয়োদশ অধ্যায়
চম্পানীরে হুমায়ুন। আহমেদাবাদের পতন। গুজরাটে মুঘল প্রশাসন, ১৫৩৫
চম্পানীর পতনের পরে হুমায়ুনের বেশ কিছু দিন সেখানে থেকে গেলেন। এর দুটো কারন ছিল —
১) বিগত দশ মাসের নিরন্তর সামরিক অভিযানের ফলে তিনি মালওয়া আর মধ্য গুজরাট নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এখন সময় প্রজা কল্যাণ এবং রাজার সুখ্যাতির পরিবেশ তৈরি করার জন্যে সুদৃঢ় বেসামরিক প্রশাসন উপহার দেওয়ার কাজ করা তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি মনে করতেন প্রশাসন যদি যোগ্যতা অনুযায়ী, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে বাকি গুজরাট মুঘল করতলে আসা সময়ের ব্যাপার। রাজ্যে প্রশাসন বলতে কিছুই নেই — এই রাজ্যের অসহায় শাসক দিউতে আশ্রয় নিয়েছে এবং জায়গিরদারেরা ঘটমান বর্তমানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই অবস্থায় প্রশাসন যদি একটু প্রজা-মুখী কাজ করে, সে সব কাজ মানুষের কাছে কিছুটা হলে জনপ্রিয়ও হয়, তাহলে গোটা গুজরাটে মুঘল শাসন ছড়িয়ে পড়া সময়ের অপেক্ষা বই অন্য কিছু নয়।
২) চম্পানীরে সুলতান বাহাদুরের বিপুল পরিমান সম্পদ মুঘল শাসকদের হাতে এল। এর এক অংশ তিনি অনুগামীদের মধ্যে বেঁটে দেবেন, আর বাকিটা রাজ্যে প্রভাব বাড়াবার কাজে ব্যবহার করার জন্যে তুলে রাখবেন। এই সম্পদ দেখে তিনি অভিযান পর্বটা আপাতত স্থগিত রেখেছেন। (চলবে)