প্রথম অধ্যায়
শাহজাদা হুমায়ুন, ১৫০৮-৩০
সেই বছরেই, ১৫২০ থেকে বাদাকশনের প্রশাসন চালনা করা সম্রাট বাবরের ভাইপো ওয়ায়িস খান মির্জার মৃত্যুতে হুমায়ুন বাদাকশন দখলে গেলেন। বাবর আন্দাজ করছিলেন, বিগত ৭ বছর শাসকের অযোগ্যতায় বাদাকশনি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ ধরছিল, প্রশাসনের অস্তিত্ব প্রায় ছিলই না বললেই চলে। তাই সম্রাট বাবর বাদাকশন জায়গির সমস্যার সমাধানে হুমায়ুনকে বেছে নিলেন। এই কাজে হুমায়ুনকে বেছে নেওয়ার জন্যে আরও দুটো স্পষ্ট কারন ছিল। প্রথমত খানুয়ায় যুদ্ধের অধিকাংশ সেনা হিন্দুকুশের ওপর পার থেকে এসছিল, তারা আর মুঘল হিন্দুস্তানে থাকতে রাজি হচ্ছিল না। বাবর মুঘল বাহিনীতে এই দক্ষ যোদ্ধা দলটাকে ধরে রাখতে চাইছিলেন। তাই তাদের অসন্তোষ দূর করতে এই দলটাকে তাদের পছন্দের অঞ্চলে পাঠানো দরকার হয়ে পড়ছিল। দ্বিতীয়ত বাবরের বহুকালের ইচ্ছে ছিল বলখ, হিসর এবং সমরখন্দ দখল করার। তিনি চাইছিলেন হয় হুমায়ুন নিজে থেকে এই কাজে উদ্যম নিয়ে সফল হোন বা বাদাকশনে গিয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করুক।
দিল্লিতে হুমায়ুনের একটি লজ্জাজনক কাজের বর্ণনা ইতিহাসে পাই। তিনি দিল্লিতে অনুমতি ছাড়াই বেশ কিছু খাজাঞ্চি দখল নিয়ে সে সব সম্পদ নিজের অধিকারে নেন। হুমায়ুনের এই দুষ্কর্মের জন্যে বাবর বার বার তাঁর বড় ছেলের নিন্দা করেছেন। বেভারিজ মনে করেন বাবরের প্রধানমন্ত্রী খলিফা, বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুনের শাসন যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চেঙ্গিজি-চাঘতাই পরিবারের হাত থেকে সাম্রাজ্য পরিচালনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনার ভিত্তি ছিল হুমায়ুনের এই অসদাচরণীয় পদক্ষেপ। পরের দিকে আমরা এই বিষয় নিয়ে বিশদে আলোচনা করব।
হুমায়ুন বাদাকশনে দুবছরের বেশি সময় ১৫৩৭ থেকে ১৫২৯ পর্যন্ত থাকেন। তিনি যেখানে কার্যকর প্রশাসন এবং দুর্বিনীতদের বিরুদ্ধেও সামরিক অভিযান করেন। কিন্তু যেহেতু সমরখন্দে তাঁর অবস্থানের সময়কাল খুবই কম ছিল, তাই তার পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনার সুযোগ ছিল না। তবে আমরা যেন মনে রাখি তিনি সমরখন্দে থাকার সময় বহু গোষ্ঠীর আক্রমণ রুখেছেন; পাল্টা অভিযান চালালেও সে সব অভিযানে খুব একটা সাফল্য আসে নি। হুমায়ুনের জোটসঙ্গী ছিল স্থানীয় গোষ্ঠীপতি সুলতান ওয়াইস কুলাবি এবং তার ছোট ভাই শাহ কুলি। তারা যৌথভাবে ১৫২৯-এর জানুয়ারিতে আমু দরিয়ার উত্তর পাড়ের হিসার আর কাবাদিন শহর ৪০,০০০ বাহিনী নিয়ে দখল করে। মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে উত্তরের এই অংশ এই প্রথম কোনও চাঘতাই বংশের শাসক জয় করলেন। শাহজাহানের রাজত্ব পর্যন্ত মধ্য এশিয়া দখলের স্বপ্ন প্রত্যেক মুঘল শাসককে তাড়া করে বেড়িয়েছে। কিন্তু হুমায়ুন এই অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তৃতির যে নজির রেখেছেন, যে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেই সাফল্য ছোঁয়া, অথবা তার কাছাকাছি পৌঁছনোর ক্ষমতা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্য কোনও উত্তরাধিকারীর হয় নি।
১৫২৯-এর জুলাইতে হুমায়ুন তার পদ ছেড়ে আগরায় আসেন। এরস্কিন আর বেভারেজ বলছেন শাহজাদা তার দায়িত্ব ত্যাগ করে পালিয়ে এসেছেন। তারা পরোক্ষে বলছেন, হুমায়ুন মা মাহাম বেগের সঙ্গে কথা বলেই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
হুমায়ুনের বাদাকশন সুবায় প্রসাসক হিসেবে যাওয়া প্রসঙ্গে আমরা একটা প্রশ্ন তুলছি, তিনি বাদাকশন ছেড়ে চলে আসার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমান্ত কী অসুরক্ষিত হল? আমরা আগেই দেখেছি, স্থানীয় সুলতান ওয়ায়িস আর তার ভায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন। সুলতান কন্যা হারাম বেগমকে জনৈক মির্জার সঙ্গে বিয়ে দেন এবং এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তর সীমা আমু দরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হুমায়ুন সিন্ধু পার হওয়ার আগেই তার জায়গায় শাসনের কাজ দেখার জন্যে হিন্দাল আর তাঁর আতলিক ফকর আলিকে পাঠিয়ে দেন। তাঁর বাদাকশন ছেড়ে আসা আর হিন্দালের বাদাকশনে পৌঁছনোর মধ্যে মাত্র কয়েক দিনের পার্থক্য। প্রথমত সুলতান ওয়ায়িজ সেখানে ছিলেন, শাসন কাজে তার সঙ্গেও যোগ দিলেন ফকর আলি। ফলে শাসন কাজের ব্যর্থতার প্রশ্নই উঠতে পারে না।
আকবরনামায় আমরা হিন্দালের রাজত্বে বাদাকশন আক্রমনের সংবাদ পাচ্ছি। কিন্তু এই আক্রমন অপ্রত্যাশিত ছিল। বাবরের মামা সুলতান আহমেদের পুত্র কাশগরের শাসক সৈয়দ খান দেখলেন বাদাকশন শাসন করছেন ১০ বছরের বালক। তিনি অবিলম্বে বাদাকশন আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিন মাস কিলা আলি জাফর অবরোধ করলেন। ব্যর্থ, হতাশ হয়ে নিজের ওপর রাগ করে স্বরাজ্যে ফিরে গেলেন। এ ছাড়া বাবরের শাসনে বাদাকশনে অন্য আক্রমনের সংবাদ পাচ্ছি না। আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি, হুমায়ুন সীমান্ত রাজ্য আক্রমনের জন্য উন্মুক্ত করে চলে যান নি, তিনি যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিয়েই বাদাকশন ছেড়েছেন।
পরের প্রশ্নটা হল হুমায়ুনের বাদাকশন ছেড়ে আগরা যাওয়ার যুক্তিযুক্ত কারন কী থাকতে পারে। হুমায়ুনের মা যে তাঁকে আগরা আসার পরামর্শ দেন নি, এ তথ্য পরিষ্কার, কেননা তিনি স্বামীর সঙ্গে বহু দূরে ছিলেন এবং আগরা দরবারে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে কী ধরণের চক্রান্ত চলছিল, সেটা তাঁর পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। দশ বছর ধরে কাশ্মীর শাসন করা বাবরের আত্মীয় ঐতিহাসিক হায়দার মির্জা হুমায়ুনের বাদাকশন ছাড়ার কারন হিসেবে লিখছেন, বাবর পাদশা হুমায়ুন মির্জাকে হিন্দুস্তানে ডেকে নিলেন… তিনি হুমায়ুনকে ফরমান পাঠিয়ে বললেন, তাঁর যদি হঠাত মৃত্যু হয়, তার আগে তিনি তাঁর পাশে কোনও এক উত্তরাধিকারীকে দেখতে চান (Babur Padshah recalled Humayun Mirza into Hindustan …. He sent for Humayun in order that he might have one of his sons (continually) by him so that if he were to die suddenly, there would be a successor near at hand)’ [এলিয়াস আর রসের অনুবাদে তারিখইরশিদি]। এরস্কিন এবং শ্রীমতী বেভারিজ হায়দার মির্জার বক্তব্যকে সত্য হিসেবে স্বীকার করেন নি কারন বাবরের মত জ্ঞানী, পারদর্শী শাসক, সীমান্ত রাজ্যের নিরাপত্তা যথাযোগ্যভাবে সুনিশ্চিত না করে সেখানকার শাসক, তার পুত্র, হুমায়ুন রাজধানীতে ডেকে নেওয়াটা খুবই ব্যতিক্রমী, অ-বাবরীয় সিদ্ধান্ত। একইভাবে তাঁরা আহমদ ইয়াদগার [ইয়াদগারের বাবা গুজরাটে আসকরির মন্ত্রী ছিলেন। ইয়াদগার ফারসিতে মুঘল ইতিহাস রচনা করেন জাহাঙ্গীরের আমলে] ‘রিখইসাতাতিনইআফগানিয়া’র বক্তব্য সূত্রে তারা বাবরের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার তথ্য মানতে অস্বীকার করেছেন, এবং তারা মনে করেন, বাবরের দ্রুর স্বাস্থ্যহানি এবং হঠাৎ অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর আগের বছর মুঘল সম্রাট রীতিমত সুস্থ ছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজত্ব চালিয়েছেন। প্রথম যুক্তি আমরা আগেই খণ্ডন করেছি।
আমাদের মনে হয় বাবর জানতেন, তিনি যখন হুমায়ুনকে ডেকে নিচ্ছেন, তখন হুমায়ুন কোনও ঝুঁকি না নিয়েই, বাদাকশনের জন্য কোনও না কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা করেই আগরার দিকে রওনা হবেন না। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটা অনুধাবনযোগ্য। বাবরের স্বাস্থ্য কখন ভেঙে পড়ল? ফরিস্তা বলছেন আকবর রজন ৯৩৬ বা ফেব্রুয়ারি ১৫৩০ থেকেই অসুস্থ ছিলেন, মারা যাবেন দশ মাস পরে ৯৩৭-এর জামাদল-অওলের ৫ তারিখ অর্থাৎ ১৫৩০-এর ২৬ ডিসেম্বর। ফরিস্তা আর আহমদ ইয়াদগারের বক্তব্যকে মিলিয়ে মিশিয়ে বলতে পারি বাবর ১৫৩০-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুস্থ দেহে নিজের রাজত্বে বিরাজ করেছেন, এবং দশ মাস পরে ডিসেম্বরে অসুস্থ অবস্থায় মারা যাবেন। ফলে আমরা নিসন্দেহে সিদ্ধান্ত করতে পারি, ১৫২৯-এর জুলাই মাসে হুমায়ুন যখন বাদাকশন ছাড়ছেন, সে সময় বাবর সুস্থ এবং নিরোগ। (চলবে)