ত্রয়োদশ অধ্যায়
চম্পানীরে হুমায়ুন। আহমেদাবাদের পতন। গুজরাটে মুঘল প্রসাসন, ১৫৩৫
হুমায়ুন খুব শান্তিতে যে গুজরাট প্রশাসন তৈরির কাজ শুরু করতে পারলেন এমন নয়। ৪০০ অনুগামী আর এক ইমামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া তার অনুগামীদের ওপর বিরূপ প্রভাব যে ফেলল এ কথা বোখ বুজে বলা যায় আজ। মুষড়েপড়া অনুগামীদের উৎসাহিত করতে প্রত্যেককে চম্পানীর থেকে উদ্ধার করা বিপুল সম্পদ থেকে একটা বড় অংশ বিতরণ করেলেন — গোণা হল না, সময় বাঁচাতে আর সম্রাট অভিজাতদের নিজের পাশে রাখতে, প্রত্যেককে ওজন করে টাকা পয়সা বিতরণ করলেন হাত খুলে।
বাবরের দেখাদেখি সম্পদ বিতরণে এই প্রশাসনিক বাড়াবাড়িতেও হুমায়ুনের ইমেজের খুব একটা ক্ষতি করল না। আলম খান, ধান্ধুকা (Dhandhuka) থেকেও প্রচুর সম্পদ উদ্ধারের খবর আনলেন। ধান্ধুকার একটি বিশাল চৌবাচ্চার জল ছেঁচে বিপুল সোনা রা রূপোর বাট উদ্ধার হল। বাবার মতই বেপরোয়া উদার তিনি কোনও পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া উদ্ধার হওয়া সব সোনারূপো অনুগামীদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। সকলে দেখল হুমায়ুন কীভাবে পূজনীয় বাবার কৃতকর্মের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং হয়ত এতেই তাদের গর্বে বুক ভরে উঠছিল। তখনও এই প্রদেশের অন্য সম্পদ সঞ্চয়ে হাত পড়ে নি।
হুমায়ুন গুজরাটের কৃষকদের স্বস্তি দিতে, তাদের থেকে রাজস্ব না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু হুমায়ুনের এই জেশ্চারকে গুজরাটের জনগণ সমর্থন করল না। তারা রাজার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব হুমায়ুন নয় সুলতান বাহাদুরের প্রতিনিধিকেই দিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে সুলতানের কাছে প্রতিনিধি পাঠানোর পরিকল্পনা করল। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বেশ সুদূরপ্রসারী হবে —
১) জনগণ মনে করছিল রাজস্ব আদায় সরকার, রাজার আইনি দাবি, তারা সেটার মান্যতা দিল;
২) হুমায়ুনের ধারণা হয়েছিল সুলতান বাহাদুরের আর খুব একটা প্রত্যাঘাত করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার হারানো রাজত্বের প্রজারা প্রাক্তন শাসকের ওপর ভরসা হারায় নি;
৩) তাছাড়া গুজরাট বড় সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে যাওয়া প্রজাদের পছন্দ ছিল না। তাদের মনে হচ্ছিল এর ফলে গুজরাটের শহরগুলোর ক্ষমতা গুরুত্ব হ্রাস পাবে;
৪) নিজেদের প্রদেশের সম্পদ অন্য কোনও প্রদেশে মানুষের কাজে লাগুক সেটা তারা চায় নি।
সমস্যা হল, দিউতে আশ্রয় নেওয়া বাহাদুর শাহ তক্ষুণি গুজরাটি অভিজাতদের রাজস্ব সংগ্রহ করার জন্যে তার কোনও প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। কিন্তু ইমাদুলমুলক এগিয়ে এসে প্রস্তাব দিলেন, তিনি এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে চান একটা শর্তে, তিনি সেই সম্পদ কোন খাতে খরচ করবেন, বা তার অনুগামীদের কোন কোন জায়গির বিতরন করবেন, সে বিষয়ে কেউ যেন কোনও প্রশ্ন না তোলে। তাঁর শর্ত মান্যতা দেওয়া হল। তিনি রাজস্ব আদায়ে বিপুল সাফল্য পেলেন। তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন ৭০ হন অনুগামী নিয়ে, তিনি যখন আহমেদাবাদে প্রবেশ করছেন, তখন তার সাথে ১০,০০০ সেনা এবং কিছু দিন বাদে সেই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াবে ৩০,০০০। আকবরনামা থেকে জানতে পারছি, প্রতি জোড়া ঘোড়ার জন্যে ইমাদুলমুলক খরচ করেছিলেন ১ লক্ষ গুজরাটি টঙ্কা। অনান্যরা সাহায্য করতে এগিয়ে এল। জুনাগড়ের মুজাহিদ খান ১০,০০০ বাহিনী নিয়ে সাহায্য করতে এলেন। হুমায়ুন দূর থেকে দেখছিলেন ইমাদুলমুলকের বাহিনী তৈরি করার উদ্যম। তিনিও চুপ করে বসেছিলেন না। তিনিও বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন। হুমায়ুনের এগোনোর সংবাদে ইমাদুলমুলকও আহমেদাবাদ বসে না থেকে মুঘল বাহিনীর মুখোমুখি হতে এগোলেন। দুপক্ষ আহমেদাবাদের ১৭ কিমি দক্ষিণ পূর্বে মাহামুদাবাদে মুখোমুখি হল। আসকরি ছিল ভ্যানগার্ড বাহিনীর সেনাপতি। ইমাদুলমুলক প্রথম আক্রমনে গিয়ে আসকরিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বার করে দিলেন। পরের দিকে ইয়াদগার নাসির মিররেজা, হিন্দু বেগ এবং কাসিম হুসেইন খান বিপুল সেনা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় হলে ইমাদুলমুলক খুব খারাপভাবে পরাজিত হলেন। হুমায়ুন যুদ্ধক্ষেত্রে দেখলেন কম করে ৪,০০০ গুজরাটি সেনা মৃত, মুঘল বাহিনীরও হতাহত কম নয়। এই বিপুল যুদ্ধের বিপক্ষের সেনাপতি ইমাদুলমুলক কী অন্য কোনও যুদ্ধ লড়েছিলেন কী না, হুমায়ুন জানতে চাইলেন। তাঁকে প্রবীন মন্ত্রী খুদাবন্দ খান জানালেন ইমাদুলমুলক নিজে এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, কিন্তু তার আগের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল কী না তিনি জানেন না।
গুজরাট বাহিনী প্রায় ধ্বংস, আহমেদাবাদ এখন হুমায়ুনের দয়ার ওপর নির্ভর করে আছে। হুমায়ুন তড়িঘড়ি আহমেদাবাদ শহরে ঢুকলেন না। আসকরি আশংকা করছিলেন, অতর্কিতে তাদের ওপর আক্রমন চালিয়ে মুঘল বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টাও পরাজিত পক্ষ করতে পারে। প্রথম দিন বাহিনীর শিবির শহরের ১ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে কাঙ্কারিয়া তালের পাশে তৈরি হল। পরের দিন সরখেজ আর তৃতীয় দিন বাটওয়ায়। আসকরিকে শহরে ঢুকে প্রজাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হল। বাটওয়ায় হুমাইয়ুন হজরত কুতুবুল আলমের সমাধিতেও মাথা ঠেকাতে গেলেন। হুমায়ুন যে শহরে প্রবেশ করতে খুব যে একটা ইচ্ছুক নন, সেটা গত কয়েক দিনের তাঁর আচার আচরণে প্রকাশ পাচ্ছিল। তাঁর যাত্রাপথ এই ছবিতে উল্লিখিত হল।

আহমেদাবাদের পতনে গুজরাটের দ্বিতীয় স্তর দখলের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হল। প্রথম পতন হয়েছিল চম্পানীরের। কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ আর দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের কয়েকটা জেলা তখনও মুঘলদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে গেল। তবে যেহেতু জায়গিরদারি বন্টনে ঝামেলা হল না, তাই হুমায়ুন অবিজিত অঞ্চল তক্ষুণি দখল করতে উৎসাহী ছিলেন না।
জায়গির বন্টনের প্রথম পাত্র হলেন আসকরি, যেহেতু তিনিই প্রথম হুমায়ুনকে শহরে প্রবেশ না করার সলাহা দিয়েছিলে। তিন তিনি আসকরিকে আহমেদাবাদের সুবাদার করলেন এবং তার পরামর্শ দাতা হিসেবে নিয়োগ করলেন হিন্দু বেগকে। অন্য পসাধিকারীরা হলেন —

এই ব্যবস্থাপনার বিশেষ চরিত্রটি উল্লেখ করা গেল ১) হুমায়ুন এখানে খালসা জমি রাখলেন না; ২) প্রশাসনে মির্জা আসকরিকে রাখলেন স্বাধীন ক্ষমতায়।

ওপরের মানচিত্র থেকে আন্দাজ করা যাবে হুমায়ুন কামরানকে গুজরাট রাজ্যে কতদূর অঞ্চল শাসন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি গুজরাটিদের সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তি জানতেন, তা সত্ত্বেও তার আশা ছিল মুঘলেরা গুজরাট শাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ভবিষ্যতে যদি বাহাদুর শাহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়, তাহলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
হুমায়ুন কাথিয়াবাড় এবং পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের ভাবনা নজরআন্দাজ করলেন। তার ইচ্ছে ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা কাথিয়াবাড় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া, কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি পূর্বাঞ্চল দখলের পরিকল্পনা মাথা থেকে বার করে দিলেন। তাঁর নজর একন মালওয়াকে নতুন প্রশাসন দেওয়া। আমরা দেখব কীভাবে তার নীতিমালা এই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছিন্নতা তৈরি করল। তাঁর আশা তিনি অতীতে যে সব ভুল করেছেন, সেগুলো যেন আর রিপিট না হয়। অথচ পৌঁছে বুঝলেন মালওয়ার জনগণ ক্ষোভে আর অসন্তোষে ফুটছে। মালওয়ার তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসক বাহাদুরের অন্যতম বালক ভৃত্য মাণ্ডুর মাল্লু খান, সাওওয়ার সিকন্দর আর হান্ডিয়ার মিথার জাম্বুর যৌথভাবে উজ্জয়নীর দরবেশ আলি কিতাবদারের নেতৃত্বে মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে কোমর বেঁধেছে। অগ্রবাহিনীর সঙ্গে শত্রুদের লড়াই হল, মুঘল বাহিনীর বেশ কিছু সেনা হতাহত হয়ে ফিরে এসে প্রধান সেনাপতিকে প্রতিরোধের সংবাদ দিল।
হুমায়ুনের প্রধান কাজ হল মালওয়া উদ্ধার। তিনি প্রথমেই মাল্লু খানকে উচ্ছেদ করে মাণ্ডুকে তার প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করে অন্য দুই প্রতিবেশী বিদ্রোহীর ওপর চাপ তৈরি করলেন। কিন্তু সম্রাটের মাণ্ডুতে দীর্ঘকাল আটকে থাকা কতদূর যুক্তিযুক্ত ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দেওপ্যার জন্যে সেই মুহূর্তে উত্তর ভারতবর্ষের অবস্থা বুঝে নেওয়া যাক। উত্তর ভারতে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছিল আগরার মির্জাদের অর্থাৎ মহম্মদ সুলতান মির্জা, তার ছেলে এবং নাতিদের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ অযোধ্যার পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় ঘটনাটা হল শের খানের উত্থান। ১৫৩৪এ তিনি বিহারের সুরজগড়ের যুদ্ধে লোহানি গোত্রপ্রধানদের আর বাংলার নবাব সুলতান মহম্মদ শাহের যৌথ বাহিনীকে হারিয়ে সম্রাটের গুজরাট অভিযানের সুযোগে মুঙ্গের পর্যন্ত প্রভাব তৈরি করলেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মালওয়ায় থাকাটা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল? হয় তিনি গুজরাটের সুলতানের সঙ্গে সমঝোতা করে সেটিকে শাসনব করার জন্যে তার করদ রাজা হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে এবং আহমেদাবাদে যেমন আসকরিকে প্রশাসনিক প্রধান করেছেন তেমনি চিতোর মালওয়ায় হিন্দালকে দায়িত্ব দিয়ে বা মালওয়ার প্রশাসন কেন্দ্রের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে পূর্বে তৈরি হতে থাকা সমস্যার দিকে নজর ঘুরিয়ে আগরা এসে উত্তর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যে স্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে হিন্দালের মনে ক্ষোভ বা শের খান নিজেকে বাড়িয়ে চড়িয়ে প্রথমে বাংলা সরকারের আর পরে মুঘল সরকারের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থিত করার সুযোগ ঘটত না।
হুমায়ুন মালওয়া প্রবেশের ফলে খুব তাড়াতাড়ি মালওয়া শান্ত হল। তিনি সেখানে তার জেনানা মহল নিয়ে এসে অনির্দিষ্টকাল বাস করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার মনে হচ্ছিল তিনি যদি একটু বেশি সময় থাকেন তাহলে একটি পরিচ্ছন্ন প্রশাসন এবং দান-ধ্যান করে জনগণের মধ্যে অসন্তোষকে শান্ত করতে পারবেন। কিন্তু তার আশা পূরণ হল না। কয়েক মাস পরে তিনি আগরার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। আকরা পরের অধ্যায়ে দেখব তিনি মাণ্ডু ছাড়া মাত্র মালওয়া আর গুজরাট তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে। (চলবে)