চতুর্দশ অধ্যায়
সুলতান বাহাদুর শাহের গুজরাট উদ্ধার। মালওয়া থেকে হুমায়ুনের প্রস্থান ১৫৩৫-৩৬
আবার আমাদের আসকরির তৈড়ি করা গজনফর সমস্যার কাছে ফিরে যাওয়া দরকার। গজনফর একবার জেলে কয়েকদিন গারদের পিছনে কাটিয়ে মাথামোটা শাসক বন্ধু আসকরির এত দিনের মুরগিপোষা ভালবাসা বুঝে গুজরাটের সুলতানকে গড়গড়িয়ে গুজরাটে মুঘলদের খাস্তা অবস্থা, আহমেদাবাদের দুর্দশা, বাহিনীর দুর্বলতার সব কিছু উগরে দিলেন। গজনফর কসম খেয়ে বললেন, তার কথা অবিশ্বাস করলে কয়েক দিন কয়েদ করে রেখে, তথ্য বাজিয়ে নিয়ে তাকে মুক্ত করবেন।
সঙ্গে ৩০০ অনুগামী নিয়ে গজনফরের পালানো, গুজরাটে মুঘল বাহিনীকে আরও বড় দুর্দশার দিকে ঠেলে দিল। মুঘল বাহিনীকে আতান্তরে পড়তে দেখে আরও কয়েকজন মুঘল আমীর গজনফরের পথ ধরল। হাতে গোনা কয়েকজন হতাশ সেনা নিয়ে আসকরির, পলাতক রাজ্য হারানো বাহাদুর শাহের আক্রমনের জন্যে অপেক্ষা করিতে লাগল। তারদি বেগ অবিবেচক আসকরির সমস্যার সমাধানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারলেন না, তিনি হুমায়ুনকেও গজনফরের পালানোর তথ্য চিঠিতে লিখতে লজ্জা পাচ্ছিলেন।
আহমেদাবাদের প্রশাসনিক কেন্দ্রে বসে মির্জার মনে মনে আশা করছিলেন, যাহায্য কোনও না কোনও এক এক অপ্রত্যাশিত আকারে এসে মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর ছেয়ে থাকা অন্ধকার মেঘ কেটে যাবে, কিন্তু যে মানুষটা নিজের পায়ে কুড়ুল মারছেন তাকে সাহায্য করবে কোন ত্রাতা। আসকরি হিন্দু বেগের দেওয়া রাজা হওয়ার প্রস্তাব অসম্ভব বুঝে বাতিল করে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আরেক সেনানায়ক তারদি বেগ আসকরির পাশে দাঁড়ালেন না। রাইসেন থেকে দারিয়া খান আর মুহাফিজ খান পাটন দখল করতে পারলেও তার অনেক কাছাকাছি থেকেও, আসকরির সৎ ভাই, সম্রাট হুমায়ুন আহমেদাবাদে তাকে উদ্ধার করতে আসলেন না, তাকে বাহাদুর খানের মুখে খাদ্য হিসেবে তুলে দিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে রইলেন।
গজনফরের দেওয়া তথ্য নির্ভর করে বাহাদুর দিউ থেকে আহমেদাবাদের দিকে রওনা হয়ে সরখেজে শিবির বসালেন। আসকরিও বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন মুখোমুখি হতে। যুদ্ধের শুরুতে আসকরির কামান বাহাদুরের রাজকীয় পতাকা উড়িয়ে দিল। সারা দিনের যুদ্ধে এক চুলও কেউ এগোতে না পারলেও রাতে শাহজাদা সবরমতীর তীরে গেলেন। বাহাদুর পিছু নিয়ে মাহামুদাবাদ পৌঁছলে সেখানে বাহাদুরের সামনের বাহিনী আর আসকরির পিছনের সারির ইয়াদগার নাসির মির্জার দলের মধ্যে এক চোট লড়াই হল। যুদ্ধের পরে তাড়াহুড়োয় নদী পেরোতে গিয়ে মুঘলদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শাহজাদা নদী পেরিয়ে চম্পানীরে ঢুকলেন। তারদি বেগের কাছে শাহজাদা যুদ্ধ চালাবার জন্যে প্রচুর অর্থ দাবি করলেন এবং জানালেন এর জন্যে হুমায়ুনের অনুমতি নেওয়ার সময় নেই। তারদি বেগ আসকরির দাবি হুমায়ুনকে জানালেন, সঙ্গে জুড়ে দিলেন গত কয়েক মাসে আসকরি আর হিন্দু বেগের কথাবার্তা। হুমায়ুন জানলেন তার সৎ ভায়ের মতলব খারাপ, হয়ত তাদের অন্তিম লক্ষ্য আগরা দখল নেওয়া।
কিন্তু সত্যিই কী আসকরির লক্ষ্য আগরা ছিল? তারদি বেগ হুমায়ুনকে যে বার্তা পাঠালেন, সেটা কী যথাযথ ছিল? ইতিহাস কী বলে? প্রথমত তবাকতইআকবরির লেখক খাজা নিজামউদ্দিন আহমেদ, গোটা ঘটনায় দায় তারদি বেগের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে বলেছেন আসকরির আগরা দখলের বদ মতলব ছিল না। কিন্তু তারিখইফরিস্তা তাবাকত থেকে তথ্য নিলেও এ বিষয়ে তবাকতইআকবরির সঙ্গে একমত নয়। তাঁর বক্তব্য আসকরি যে অর্থ দাবি করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে সম্রাট হিসেবে দেখার পরিকল্পনা পূরণ করা। আকবরনামার দাবি আসকরির দল যে অর্থ দাবি করেছিল, সেটা যদি তাকে না দেওয়া হত, তাহলে সে তারদি বেগকে গ্রেফতার করত, চম্পানীরের সম্পদ দখলে নিত, এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৫ কোস দূরে মাহী নদীর তীরে শিবির করে বসা বাহাদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেত। সেখানে যদি সে সফল হত, তাহলে তো তার স্বাধীন রাজা হওয়ার স্বাদ মিটেই গেল আর যদি ব্যর্থ হত, সে মাণ্ডুতে বাস করা হুমায়ুনকে টপকে আগরা দিয়ে শূণ্য সিংহাসন দখলে নিত। বাদাউনি মুনতাখাবউলতাওয়ারিখে বলছেন, আসকরির ইচ্ছে ছিল হিন্দু বেগের সাহায্যে তার নামে খুতবা পড়ে এবং যুদ্ধটুদ্ধ না করে সে চম্পানীর দখল নেওয়া। এবং তারদি বেগ তার জন্যে হুমায়ুনকে চিঠি লিখুন এই দাবি জানানো। তুরাব ওয়ালির তারিখইগুজরাট জানাচ্ছে আসকরি দল নিয়ে চম্পানীর গেলে তারদি বেগ প্রথমে তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান, প্রত্যেককে ঘোড়া উপহার দিলেন এবং শাহজাদার সম্মানে ভোজসভারও আয়োজন করা হয়। কিন্ত স্পষ্টভাবে জানান সম্রাটের অনুমতি ছাড়া শাহী সম্পদ থেকে একটা কাণা কড়িও তাঁকে দেওয়া যাবে না। শাহজাদা তারদি বেগের ওপর বলপ্রয়োগ করার চেষ্টা করলে শাহজাদার শিবিরের ওপর তারদি বেগ তার বাহিনীকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিয়ে প্রত্যেককে চম্পানীরের বাইরে বার করে দেন। আবদুল্লার আরবিক হিস্ট্রি অব গুজরাটে এর কাছাকাছি মন্তব্য করা হয়েছে। মির্জা আসকরি, তারদি বেগের সঙ্গে দেখা করে বাহাদুরের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবার জন্যে আরও অর্থ চান। কিন্তু এর পরেই তারদি বেগ হঠাত আবিষ্কার করেন মির্জার উদ্দেশ্য হল চম্পানীরের সম্পদ দখল করে আগরার দিকে অভিযান করে সিংহাসন দখল করা।
ঐতিহাসিকদের ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য উল্লেখ করে আমরা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি।
প্রথম বাহাদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ — আসকরি যে বাহাদুরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হয়ে তার হৃত সম্মান উদ্ধারের চেষ্টা করার উদ্যম নিয়েছিলেন, এ তথ্য পরিষ্কার। সেনাদের পুরোনো বকেয়া মেটানো, নতুন সেনা জোগাড় করার জন্যে অর্থ প্রয়োজন ছিল। তার হাতে যেহেতু অর্থ ছিল না, তিনি তারদি বেগের দ্বারস্থ হন। আসকরি আর তার দলবলের দঙ্গে তারদি বেগের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মানসিকভাবে কষ্টে থাকা শাহজাদা আর তার সঙ্গীরা বিরূপ ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে, তারদি বেগকে গ্রেফতার করে সম্পদ দখলের ভাবনা ভাবতে থাকে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা সূত্রে তারদি বেগ জানেন, শাহজাদা স্রেফ অকম্মের ধাড়ি। প্রশাসনিক যোগ্যতা শূণ্য। হুমায়ুন যে সম্পদ তারদির ওপর বিশ্বাস করে রেখে গেছেন, সেই সম্পদ আসকরির হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করলেন তিনি। তিনি জানতেন আসকরির গুজরাটকেও সুস্থ স্বাভাবিক প্রশাসন উপহার দেওয়ার সময় সুযোগ ছিল, তিনি মদ্যপান আর একের পর এক ভোজসভা আয়োজন করে সে সব সুযোগ হেলায় উড়িয়ে দিয়েছেন ধনীর উন্মার্গগামী সন্তানের মত। এই ধরণের উচ্ছৃঙ্খল শাহজাদাকে অর্থ দিলে সে সব উপযুক্ত কাজে আদৌ ব্যবহার হবে কী না সে বিষয়ে তারদি বেগ নিশ্চিত নন বরং তিনি নিশ্চিত যে সে সব সম্পদ আসকরি ধনীর উন্মার্গগামী সন্তানের মত অপব্যবহার করবেই। (চলবে)