চতুর্দশ অধ্যায়
সুলতান বাহাদুর শাহের গুজরাট উদ্ধার। মালওয়া থেকে হুমায়ুনের প্রস্থান ১৫৩৫-৩৬
সার্বভৌমত্ব বিষয়ে প্রশ্ন — তারদি বেগ যেহেতু আসকরির ওপর বিন্দুমাত্রও ভরসা করতেন না, তাই আসকরির হুমায়ুন আনুগত্য নিয়েও তার মনে প্রশ্ন ছিল। বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর প্রেক্ষিতে হিন্দু বেগ চাইছিলেন আসকরি সম্রাট অধিধা গ্রহণ করুন। আসকরি আন্দাজ করেছিলেন হিন্দু বেগের এই প্রস্তাবের ভুল ব্যাখ্যা হবে তাই তিনি তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। আজ আসকরির এই সুবুদ্ধিকে বাহবা না দিয়ে পারছি না। কিন্তু পরের দিকে আসকরি দেখলেন তারদি বেগ, তার সমস্যাকে পাত্তা দিলেন না; আরও বড় কথা তার বড় ভাই সম্রাট হুমায়ুনের তার নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। তাই কুড়ি বছর বয়সী যুবা আসকরি, মুঘল সাম্রাজ্যের দুই বয়স্ক মানুষ, একজন তার ভাই, অন্য জন মুঘল উচ্চপদস্থ সেনাপতি, তার প্রতি দেখানো উদাসীনতা সহ্য না করতে পেরে, বয়সের হঠকারিতায় পরিকল্পনা করলেন তারদি বেগের থেকে যতটা পারা যায় সম্পদ দখল করে আগরায় গিয়ে ভাঙচুর করে নিজের চরম হতাশা প্রকাশ করবেন। আর তখনও যদি হুমায়ুন, আগরায় না এসে মাণ্ডুতে সময় কাটান, তাহলে তিনি আগরার মানুষকে বোঝাবেন, কেন তিনি সত্যিকারের বিদ্রোহ করেছেন, কেন আগরার মানুষ হুমায়ুনের ওপরে নয়, তাঁর ওপর ভরসা করা উচিৎ। এবং এইভাবে আগরার মানুষের সামনে হুমায়ুনের সম্মান হানি ঘটাবেন, জনগণ যাতে হুমায়ুনের শাসন যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সেই পরিবেশ তিলে তিলে তৈরি করবেন। মাথায় রাখতে হবে এই সব ঘটনা ঘটালে আসকরির যে খুব একটা সরাসরি ফয়দা নেই এটা বোঝা যায়, কারন হুমায়ুনের পরের ভাই কিন্তু আসকরি নয়, কামরান, যদি সিংহাসন দখলের প্রশ্ন ওঠে তাহলে সেটা কামরানেরই প্রাপ্য ছিল[এখানে লিখতে হবে বড় ছেলের সিংহাসনে আরোহনের কোনও স্বীকৃত প্রথা গুরখানি বংশে ছিল না — ছিল ভাইদের মধ্যে লড়াই করে সিংহাসন দখল করা। আসকরির এই প্রচেষ্টা সেই প্রথারই অঙ্গ ধরে নেওয়া দরকার]।
আসকরির সাম্প্রতিক কালের প্রচেষ্টায় আগরায় অসন্তোষের আশংকা করে হুমায়ুন আসকরির নিয়ে যে সব সমীক্ষা তাঁর কাছে এসেছে, সে সব পাঠ করে একটাই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, পথভ্রষ্ট ভাই আগরা পৌঁছবার আগেই তাঁকে আগরায় পৌঁছতে হবে। আসকরি যে তার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ব্যাপারে খুব একটা সচেষ্ট ছিলেন, এ কথা বলা যাবে না কারন হুমায়ুনের যাত্রা শুরুর বহু আগে তিনি আগরার উদ্দেশ্যে রওনা হলেও, পিছনে রওনা দেওয়ার পরেও হুমায়ুন তার ভাইকে চিতোরে পার হয়ে শিবির পাতেন। এই চিতোরেই শাহী জেনানার মহিলাদের উদ্যমে দুই ভাই সমঝোতা করলেন এবং আগরার দিকে যৌথভাবে এগিয়ে চললেন।
মাণ্ডুতে থাকাকালীন সময়েই প্রশাসক হিসেবে তাঁর সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার হচ্ছিল (এবং হয়ত এই সময়েই তিনি আফিম পান করার প্রতি আকৃষ্ট হবেন এবং নেশায় ডুবে যাবেন)। অধ্যায় শেষ করার আগে আমরা এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম সেটি একবার ফিরে দেখা যাক।
প্রথমত চম্পানীরে যে বিপুল সম্পদ পেয়েছিলেন সেটি হুমায়ুন সরিয়ে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করেন নি। চম্পানীরের সম্পদ যদি আগরা বা দিল্লিতে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে ভবিষ্যতের অনেক অদেখা, হঠাৎ উঠে আসা সমস্যা সামাল দিতে পারতেন। ঠিক যেমন বুদ্ধিমান শের খান গৌড়ের সম্পদ রোহতাসে নিয়ে যান। হুমায়ুন কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন না, বোধগম্য হল না। এবং তারদি বেগের পশ্চাদপসরনের পরে সম্পূর্ণ সম্পদ আবার বাহাদুরের নিয়ন্ত্রণে গেল।
দ্বিতীয়ত মালওয়ায় মুঘল প্রশাসন কার্যকরার কোনও উদ্যোগ হুমায়ুন নেন নি। তিনি বেরিয়ে আসার পর প্রদেশটিতে যেমন প্রসাসকও রইল না, সেনাবাহিনীও রইল না।
তৃতীয়ত উত্তরে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি বাহাদুর সম্বন্ধে পুরোনো ধারণা বদলালেন না, তার কাজকর্ম ফিরে দেখে তার সঙ্গে গুজরাট নিয়ে একটা সমঝোতা তৈরিও করে গেলেন না, যাতে বাহাদুরের সম্মান হানিও না হয় আবার হুমায়ুনের রাজত্ব সার্থও বজায় থাকে, বাহাদুর শাহের সঙ্গে শের খানের সম্পর্ক ভাঙার চেষ্টা করলেন না, সর্বোপরি গুজরাট আর দিল্লির মধ্যে পর্তুগিজ বিরোধী একটা জোট তৈরি করার কথাও ভাবলেন না।
চতুর্থত তাছাড়া হুমায়ুন যেহেতু দক্ষ গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তোলেন নি, তাই আসকরির দুষ্কর্মগুলো বা বাহাদুরের ভূমি দখল, কোনও সংবাদই তাঁর কাছে উপযুক্ত সময় ঠিকভাবে পৌঁছয় নি।
হুমায়ুন নেতা হিসেবে ব্যর্থ, ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন না। তিনি উপযুক্ত রাষ্ট্র নায়ক ছিলেন না ফলে গুজরাটে তিনি আর তার অনুগামীরা যে সব ক্ষত তৈরি করে গিয়েছেন, সে সব পূরণ করার মত কাজ তিনি করে যেতে পারেন নি। তিনি শুধু যে বাহাদুর আর শের খানের মধ্যে মুঘল বিরোধী সমঝোতা ভাঙতে পারেন নি তাই নয়, তিনি বাহাদুরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে শে খানকে এক ঘরে করার ভাবনা ভাবতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার অদূরদৃষ্টির কর্মফল তিনি পেয়েছেন, গুজরাট থেকেই তার খারাপ সময়ের শুরুয়াত হবে।
পঞ্চদশ অধ্যায়
মির্জাদের অসন্তুষ্টি, ১৫৩৬-৪০
মহম্মদ জামান মির্জা আর মহম্মদ সুলতান মির্জা হেরাটের প্রখ্যাত শাসক সুলতান হুসেন বায়াকারার নাতি। বায়াকারা বাবরের ভারতবর্ষ অভিযানের সমর্থক হলেও তার নাতিরা হুমায়ুনের রাজত্বে চরম বিরোধিতা করেগেছে। হুমায়ুন তাদের দু’দুবার ক্ষমা করেছেন কিন্তু তারা হুমায়ুনের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেদেরও ভবিষ্যৎ নষ্ট করল আর রাজত্ব ধ্বংস করল।
প্রথমে আমরা মহম্মদ জামান মির্জাকে নিয়ে আলোচনা করব। আমরা তাকে শেষ দেখেছি বাহাদুরের শিবিরে। মান্দাসোরে তিনি সুলতানের পক্ষে লড়াই করেছেন। সুলতান পালিয়ে যাওয়া সুরক্ষিত করতে তাকে নির্দেশ দিয়ে যান, হুমায়ুনের সেনাকে ব্যস্ত রাখতে আর বাহাদুরের পালিয়ে যাওয়ার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে বিভিন্ন জায়গায় হুমায়ুনের বাহিনীতে সমস্যা তৈরি করতে।
এরপর আমরা মহম্মদ জামান মির্জাকে বাহিনী নিয়ে পৌঁছতে দেখি সিন্ধুতে শাহ হুসেইন আরঘুনের দরবারে। কিন্তু শাহ আরঘুন দক্ষ প্রশাসক। তিনি মহম্মদ জামানকে জানিয়ে দেন সিন্ধুতে তিনি অবাঞ্ছিত। তাকে সামরিক দিক থেকে পরাজিত করা যাবে না। মির্জাকে ঠারেঠোরে জানিয়ে দেন তিনি যদি তার কথা না শোনেন তাহলে হালত খারাপ হবে। তিনি লাহোরে কামরানের রাজত্বে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
সে সময় কামরান কান্দাহার অভিযানে ছিলেন। কামরান, লাহোরের পাশাপাশি মুলতান, কাবুল কান্দাহারও শাসন করতেন। অন্য দুটো সুবা ভালভাবে শাসন করতে পারছেন না বলে তিনি মুলতান আর কাবুল, বাবরের দীর্ঘকালের সাথী খাজা আমীর কালানকে শাসন করতে দেন। সে সময় ইরানের শাসক ছিলেন, বাবা শাজ ইসমাইলের মতই শাহ তামস্প, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, শাসনক্ষেত্র বাড়াবার কাজে সদা উৎসাহী এবং কান্দাহার দখলে রাখার পরিকল্পনায় অগ্রণী। ভাই শাম মির্জা, মির্জার শিক্ষক আঘঝিওয়ার খান আর মুরাদ আফসরের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী পাঠান কান্দাহার দখলের উদ্দেশ্যে। ৮ মাস ধরে ইরানিরা কান্দাহার অবরোধ করার পরে কামরান পৌঁছলেন ২০,০০০ সেনা নিয়ে। কামরান বাহিনীর ধাক্কায় ইরানীরা এক স্তর পশ্চিমে পিছিয়ে গেলে দুই মুঘল বাহিনী এক জোট হয়ে পারসিকদের চূড়ান্তরূপে পরাজিত করে। আঘঝিওয়ার খান ধরা পড়েন। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ২৫ জানুয়ারি ১৫৩৬। দ্বিতীয়বারের জন্যে শাহ আবার কান্দাহার আক্রমন করে কালানকে বাধ্য করেন আত্মসমর্পণ করতে। আবার কামরান পৌঁছে কান্দাহারের প্রশাসক বুদাঘ খান কাজার-এর হাত থেকে কান্দাহার শহর উদ্ধার করেন। (চলবে)