পঞ্চদশ অধ্যায়
মির্জাদের অসন্তুষ্টি, ১৫৩৬-৪০
লাহোরে পৌঁছে মহম্মদ জামান মির্জা লাহোরিদের আত্মসমর্পণ করতে হুকুম দেন। কথা না শুনলে তিনি লাহোর অবরোধ করেন। কিন্তু নিজের নার্ভ ধরেরাখতে পারলেন না কামরানের বিজয়ী বাহিনীর ফিরে আসার খবরে। তাড়াহুড়ো করে বাহিনী শুদ্ধ মির্জা দিল্লিতে আশ্রয় নিলেন। আগস্টে হুমায়ুন আগরা আসার পরে তিনি দিল্লিতে ছিলেন। কিন্তু যখন বুঝলেন দিল্লিতে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তিনি আমার গুজরাটে পৌঁছনোর পরিকল্পনা করলেন। আশা অতীতের মত সমাদর লাভ।
১৩ ফেব্রুয়ারি ১৫২৭ অপুত্রক অবস্থায় সুলতান বাহাদুর মারা যাওয়ার খবর এলে মহম্মদ জামান মির্জা ভাগ্য ফেরাতে আহমেদাবাদে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে দৌড়লেন। পুরোনো সময়ে বেশ কিছু কাল আহমেদাবাদে থাকার অভিজ্ঞতায় ৭০০টা সোনার বাক্স আর ১২,০০০ মুঘল এবং অন্য সেনা জড়ো করলেন কায়দা করে। প্রয়াত সুলতানের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মত করে নিজের জামাকাপড় ফালাফালা করে ছিঁড়ে জেনানায় ঢুকে সুলতানের মৃত্যুর জন্যে দোয়া করলেন। বাহাদুরের মা তাঁকে ৩০০ শিরোপা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জেনানায় প্রশ্রয় পেয়ে সুযোগ পেয়ে জেনানার মহিলাদের জানালেন তিনি সিংহাসনের দাবিদার, তাকে যেন তারা সমর্থন করেন। জেনানার মহিলারা মুখের ওপর জানিয়ে দেন, গুজরাটি শাহী পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারোর এই রাজ্যের সিংহাসনে বসার অধিকার নেই। তবুও নরাধম মির্জা ছাড়বার পাত্র নন। তিনি মহিলাদের আশ্বাস দিলেন সুলতানের হত্যার বদলা তিনি নেবেন এবং পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। ভোল পালটে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে প্রধান মসজিদ থেকে তার নামে খুতবা পড়ালেন।
কিন্তু তার সমস্যা হল গুজরাটিরা মহম্মদ জামান মির্জার চরিত্রের দুটো সমস্যা দেখে আর তাকে নিজেদের নেতা হিসেবে মানতে রাজি হন নি। প্রথমটা হল তার ওজনহীন, সহজে বয়ে যাওয়ার মত অস্থিতধী চরিত্র — মদ, আফিম আর ভাঙ সেবনে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। বড় পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার কাছে বহু ভাগ্যান্বেষী জড়ো হতে থাকে আর তিনি যা শুনতে চান, তাই বলে তাকে তুষ্ট করে বিপুল অর্থ নিয়ে যেতে শুরু করে। এই ধরণের মানুষের পক্ষে বাহাদুরের মত কর্মক্ষম, চিন্তাশীল নেতা-প্রসাসকের জায়গা নেওয়া না মুমকিন। দ্বিতীয়ত তিনি বিদেশি এবং মুঘল পরিবারের সঙ্গে জুড়ে থাকা। যে মানুষটা জীবনের একাংশ কাটিয়ে দিল মুঘলদের বিরোধিতায় এবং প্রাণও গেল মুঘলদের জন্যে, সেই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও ব্যক্তিতে গুজরাটের সিংহাসনে বসাবার প্রশ্নই ওঠে না। কৃষ্টি যাই হোক না কেন, গুজরাটিরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা বিষয়ে খুবই রক্ষণশীল। মহম্মদ জামান যদিও চিতোর এবং অন্য যুদ্ধে সুলতানের সঙ্গী ছিলেন, কিন্তু দিনের শেষে হুমায়ুনের মতই তিনি ভাল বিদেশিই।
তাছাড়া প্রয়াত সুলতান তার উত্তরাধিকারী চিহ্নিত করে গিয়েছেন। তিনি ভাই লতিফ খানের ছেলে মীরন মহম্মদ শাহকে তার যোগ্য শাসক হিসেবে গণ্য করতেন। তাই তিনি মীরনের হাতে শাসনকাজ তুলে দিতে বলেগিয়েছেন। অভিজাতদের মনে সুলতানের প্রতি এতই শ্রদ্ধা ছিল যে তারা তাঁর নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করত — তাঁর আদেশ ছিল চূড়ান্ত পালনীয়, এবং সে আদেশ যতই সমস্যাযোগ্য হোক না কেন, তারা সেও আদেশ রক্ষা করার চেষ্টা করত। বহুকাল মহম্মদ জামান অভিজাতদের বিরোধিতা সহ্য করেছেন। বাস্তব হল প্রথমের দিকে তিন্নি যদি জোর করে আহমেদাবাদে ঢুকতে পারতেন অনেকেই তাকে শাসক হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্যে তৈরি ছিল। কিন্তু তিনি আসতে দেরি করলেন, অলিগলি দিয়ে, চতুরভাবে ক্ষমতায় আসতে গেলেন। দাস থেকে অভিজাত হওয়া জনৈক ইমাদুলমুলক স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মির্জা জামান যদি এর বেশি চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে তিনি তুলে কারাগারে ফেলবেন। কিন্তু তার মিষ্টি বচনে মুগ্ধ হয়ে দুই প্রভাবশালী অভিজাত ইখতিয়ার খান আর ফজল খান তাকে উপপ্রধান পদে নিয়োগ করার বিষয়ে রাজি করিয়ে ফেললেন। তিনি এক লাখ টঙ্কার একটি জায়গির তার এক সেনার নামে অধিকার করলেন। এই সুযোগে তিনি ৪০ হাজার সেনার এক বাহিনী তৈরি হয়ে গেল।
গুজরাটের সম্ভাব্য শাসক মীরন মহম্মদের থেকে উৎসাহ পাওয়াগেল। মীরন সে সময় মাণ্ডু বিজয় অভিযানে ছিলেন। তিনি তাঁর অনুগামীদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, তাঁর সিংহাসনের দাবি যৌক্তিক ও বৈধ। ইখতিয়ার খান আর ফজল খান তাঁর পাশে দাঁড়ালেও ইমাদুলমুলক কিন্তু মীরন মহম্মদের দাবি সমর্থন করলেন না। তাঁর আশংকা ছিল মীরন মহম্মদের জন্যে গুজরাটিদের মনে খণ্ডেশের মান বৃদ্ধি পাবে আর আহমেদাবাদ হয়ত মফস্বল শহরে পরিণত হবে। দুই আমলা ইমাদুলমুলককে জানাল বাহাদুরের দ্বিতীয় মনোনীত মাহামুদ মহম্মদের উত্তরাধিকারী হিসেবে গুজরাটিদের প্রতিনিধিত্ব করবে। ইমাদুলমুলককে আরও নিশ্চিত করতে তারা জানাল গুজরাটি বংশের প্রতিষ্ঠাতার নাম উল্লেখ করা হবে। ইমাদুলমুলক তাদের পাশে দাঁড়ালেন।
নিজের সিংহাসনে আরোহনের বিষয়টি নিশ্চিত করে মীরন মহম্মদ, মহম্মদ জাহান মির্জার সঙ্গে দেখা করতে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে চললেন এবং মুঘল বাহিনীর কিছু দূরে এসে শিবির ফেললেন। তার ধারনা ছিল, সিংহাসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তার বাহিনীকে আক্রমন করবে। মহম্মদ জাহান মির্জা প্রকাশ্যে এধরণের উদ্যম দেখালেন না বরং নিজের চার পাশে পরিখা খুঁড়ে মীর খলিফার (এই মীর খলিফাই বাবরের মৃতুর পর হুমায়ুনের সিংহাসন আরোহন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এখানে দেখছি দুই হুমায়ুন বিরোধী একজোট হয়েছেন) পুত্র হিসামুদ্দিন মীরনকে তার প্রধান সেনাপতি নির্বাচন করলেন। ছোটখাটো লড়াই চলতে থাকল। একটা সময় পরে বোঝা গেল, বড় যুদ্ধে মির্জাদের জয় সুনিশ্চিত নয়। হিসামুদ্দিন মীর, প্রভু মহম্মদ জাহান মির্জাকে পালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দিলেন। সুযোগ বুঝে হিসামুদ্দিন মীরও পালিয়ে গিয়ে মহম্মদ জাহানের সঙ্গে যোগ দয়ে দুজনেই দেশ ছাড়া হলেন। ইমাদুলমুলক, মহম্মদ জাহান মির্জাকে দেশ ছাড়া করার কথা রাখল।
মহম্মদ জাহান মির্জা আবার ভবঘুরে হলেন। আবার সিন্ধুর দিকে রওনা হলেন (১৫৩৭)। কিন্তু সেখানে আগেও কোনও রকম সমস্যা তৈরি করতে পারেন নি, এবারেও পারলেন না। কিন্তু তার মত ভোগলালসায় ডুবে থাকতে ভালবাসা চরিত্রহীন ব্যক্তির পক্ষে বেশি দিন পালিয়ে থাকা অবস্থা সমস্যার। তাঁর অনুগামীরা থিতু হতে চায়। শেষ পর্যন্ত হুমায়ুনের পায়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল্লি গেলেন। তাঁর দুর্ভাগ্য ততদিনে হুমায়ুন পূর্বের দিকে রওনা হয়েছেন। মহম্মদ জাহান মির্জা আর সম্রাটের ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি নন। তিনি আগ্রায় পৌঁছে, স্ত্রী মাসুমা সুলতান বেগমকে বাধ্য করলেন তাঁর পক্ষ নিয়ে সম্রাটকে অনুরোধ করতে। হুমায়ুন জানালেন তিনি সব কিছু ভুলে যেতে রাজি আছেন। সম্রাটের থেকে ক্ষমার আশ্বাস পেয়ে তিনি পূর্বের দিকে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার জন্যে রওনা হলেন।
তাঁকে প্রভূত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করলেন সম্রাট। দুজনের মিলনের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন আবুল ফজল। প্রথম বড় আমলারা এগিয়ে গিয়ে, পৌঁছনোর এক দিন আগে থাকেতে তাঁকে সম্রাটের পক্ষে অভ্যর্থনা জানালেন। আসকরি আর হিন্দাল দুজনেই প্রথাগতভাবে আমন্ত্রণ জানান আসকরি হাত হাত বুকের কাছে হাত নিয়ে আর হিন্দাল মাথায় হাত ঠুকে। এর পরে তারা দুই শাহজাদার সঙ্গে সম্রাটের শিবিরে পৌঁছলে তাকে অসাধারণ সম্মান দেখিয়ে খেলাত, কোমরবন্দ তরবারি আর একটা ঘোড়া উপহার দেওয়া হয়।
হুমায়ুন তার এই বিশ্বাসঘাতক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে সম্মানিত করার সময় কঠোর মানসিক নিয়ন্ত্রণ আর সহনশীলতা দেখান। হুমায়ুন লিখছেন, In short, his Majesty Jahanbam Jannat Ashyam in spite of rebellion so great that (even) to pardon it were improper, became an expounder of the Divine ethics and returned good for evil।
আমরা আবুল ফজলের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত হলাম না। বারে বারে বিশ্বাসঘাতকতা করা আত্মীয়কে হুমায়ুনের ক্ষমাশীল হয়ে উদারভাবে বুকে টেনে নেওয়া ঠিক হয় নি। উদারতার মূল্য তাকে চুকোতে হয়েছে। জামান নিয়ে হুমায়ুনের এই অবস্থান যে ঠিক ছিল না, তার কারন বিশ্লেষণ করা গেল। মহম্মদ জামান মির্জার অতীত খুবই সমস্যাজনক ছিল। দুবছর পরে চৌসায় হুমায়ুনের যে বিপদে পড়ে তার জন্যে সম্পূর্ণ মির্জা দায়ি। তার জন্যে যুদ্ধের শুরু থেকেই শত্রুপক্ষ মুঘল বাহিনীকে কোণঠাসা করেছে। হুমায়ুনের বোঝা দরকার ছিল, মির্জার বংশমর্যাদার অযুতগর্বীয় ভান আর দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মুঘলদের বিপদে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। হুমায়ুনের রাজধর্ম পালনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর ভালমানুষি এবং দাগি বিদ্রোহীদের ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা। বাবা মৃত্যুশয্যায় আত্মীয়দের ক্ষমা করার উপদেশ তাঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই বিশেষ করে তার সৎ বড় দিদি মাসুমা বেগম এবং অন্যদের, কিন্তু তিনি হয়ত ভুলে গিয়েছিলেন that stern daughter of the voice of God। (চলবে)