পঞ্চদশ অধ্যায়
মির্জাদের অসন্তুষ্টি, ১৫৩৬-৪০
এবারে আরেক মির্জা, মহম্মদ সুলতান মির্জার কথা আলোচনা করব। তার অংশলতিকা দেওয়াগেল
<এখানে ছবি ঢুকবে>
মহম্মদ সুলতান মির্জা বাবরের বাহিনীতে যোগ দেন পানিপথ যুদ্ধের ঠিক আগে এবং তিনি খানুয়ার যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। বাবরের রাজপুত বিজয়ের পরে তাঁকে ৩০ লক্ষ দামের কনৈজে জায়গির সামলানোর জন্য দেওয়া হয়, উপাধি পেলেন, the Honourable, Upright and Fortunate brother, Chosen of the Creator মাননীয়, ন্যায়পরায়ণ এবং ভাগ্যবান ভাই, এবং স্রষ্টা মনোনীত।
হুমায়ুনের রাজত্বে তিনি মহম্মদ জামানের সঙ্গে মিলে দু-দুবার হুমায়ুনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, দ্বিতীয় বিদ্রোহে ধরা পড়ার পর তাঁকে অন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বক্তব্য তাঁর কিছুটা হলেও দেখার ক্ষমতা রয়ে গিয়েছিল। বন্দী করার পর দুজনকেই একই কারাগারে রাখা হয়। মহম্মদ জামান পালাবার পরে তিনিও পালিয়ে নিজের জায়গীরে পৌঁছন।
হুমায়ুন গুজরাট অভিযানের ফলে মহম্মদ সুলতান মির্জার পলায়নের বিষয়টা খুব বেশি তিনি নজরদারি করতে পারেন নি। আমরা আগের তালিকায় দেখছি মহম্মদ সুলতান মির্জার খুবই দীর্ঘ বংশ পরম্পরা থাকায়, তিনি অন্ধ বা কিছুটা অন্ধ হয়েগেলেও তার ছেলেরা হুমায়ুন বিরোধিতার ঝাণ্ডা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তারা গঙ্গার উল্টো তীরে বিলগ্রাম আক্রমন করে, প্রশাসক, বাবরের সঙ্গে নানা যুদ্ধে অংশ নেওয়া খুসরু কোকলতাস বা কোকা আর তার ছেলেদের সেই জমিদারি হঠিয়ে দেয়। মহম্মদ সুলতান মির্জা বিলগ্রামকে নিজের প্রশাসনিক সদর বানানলেন এবং তার দুই ছেলেকে পূর্ব দিক জয় করার জন্যে প্ররোচনা দিলেন। বড় ছেলে উলুঘ মির্জা আরও পূর্বের দিকে অভিযান করে মুঘল অঞ্চল জৌনপুর দখল নিলেন। পরের সন্তান শাহ মির্জা আরও দক্ষিণ পূর্বের দিকে অগ্রসর হয়ে কারা-মাণিকপুর পর্যন্ত নিজেদের দখলে নিলেন। সব মিলিয়ে নতুন ২০০ মাইল দৈর্ঘে আর ১০০-র কিছু বেশি মাইল প্রস্থের অঞ্চল তাদের অধীনে এল। মহম্মদ সুলতান মির্জার তিনটে সদর হল, মিলগ্রাম, জৌণপুর আর কারা-মাণিকপুর।
দিল্লির মুখল শাহী মহম্মদ সুলতান মির্জার অগ্রগতিতে দুটী সুবা হারিয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখলেন। হিন্দাল বুঝলেন এই দখলদারিকে নজরআন্দাজ করলে আখেরে সামগ্রিক মুঘল সাম্রাজ্য হুমকির মুখে পড়বে। তিনি জানেন মির্জাদের দূর করে দিতে না পারলে সম্রাট তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হতেই পারেন, অকৃতিত্ব তাঁর। তিনি কম আয়াসে তাদের তাড়িয়ে দিলেন। সুলতান মহম্মদ তার অবস্থান জোরদার করতে সেনা ভাগ করে এক ভাগ উলুঘ মির্জাকে জৌনপুরের জন্যে দিলেন, আরেক ভাগ দিলেন কাছে থাকা শাহ মির্জাকে। সেনা ভাগ করার সংবাদে আঠেরো বছরের শাহজাদা হিন্দাল মুহূর্তের মধ্যে, সম্রাট আসার আগেই বাহিনী নিয়ে বিলগ্রাম পৌঁছলেন এবং তোকলান বেগের প্রচেষ্টায় তার দাদার বাহিনী নিয়ে আসার আগেই মহম্মদ শাহকে আক্রমলন করে যসম্পূর্ণরূপে পরাজিত করলেন। দুমাস পরে তারা অযোধ্যায় মুখোমুখি হলেও হিন্দাল বড় বাহিনীকে পরাজিত করেন। মির্জারা পালাল। হিন্দাল তাদের পিছু নিলেন। মির্জারা আফগানদের বসতি বিহারকুন্ডায় [বা বিহার খণ্ড] আশ্রয় নিলেন।
মির্জাদের তাড়া করে হিন্দাল জৌনপুরে পৌঁছলেন। এর পরে হুমায়ুনের সরাসরি নির্দেশ ছাড়া তিনি বিহারে ঢুকবেন কীনা সে বিষয়ে হিন্দাল সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। হিন্দাল জৌনপুরে শিবির ফেললেন। তিনি জানেন বিহারে ঢোকার অর্থ হল ক্ষুব্ধ আফগানদের আরও চটিয়ে দেওয়া। কিছু দিনের মধ্যেই হুমায়ুন আগরা পৌঁছলেন। জৌনপুরে প্রসাসনিক ব্যবস্থাপনা না করেই তাড়াহুড়ো করে হিন্দাল আগরা পৌঁছবার জন্যে পিছু ফিরলেন।
আগামি দুবছর মহম্মদ সুলতান মির্জা বিহারে আফগানদের সঙ্গে থাকার সময়ে শের খান প্রথমে বাংলা জয় করেন, পরে হুমায়ুনকে চৌসায় পরাজিত করেন (২৬ জুন ১৫৩৯)। শের খানের উত্থান দেখে সুলতান মির্জার মনে হল, শের খান যে কোনও মুঘল বাহিনীকে হারানোর মত ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছেন। তাসত্ত্বেও তিনি দিল্লিতে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দিলেন ঠিকই কিন্তু হুমায়ুনের প্রতি রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারলেন না। পরের বছর ১৭ বমে ১৫৪০-এ মুঘলেরা বিলগ্রামে শের শাহের মুখোমুখি হলে, তিনি আর তাঁর পুত্ররা বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান।
শেষে বলব মির্জারা হতভাগ্য প্রাণী; তারা বংশগরিমায় উজ্জ্বল হয়েও বিশ্বাসঘাতক প্রমানিত হলেন। তাদের সঙ্গে রেখে হুমায়ুন রাজনীতিগতভাবে বারবার বিপদে পড়েছেন। মুঘল শত্রুদের সঙ্গে সমঝোতা করে তারা মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষতি করেছেন। তাদের জন্যে মুঘলদের গুজরাট অভিযান ভেস্তে গিয়েছে। তারা শের খানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হুমায়ুনকে ভারতবর্ষ ছাড়া করেছে। এই সব ঘটনা ঘটেছে হুমায়ুন ভালবাসা মির্জাদের মত অপাত্রে দান করায়। হুমায়ুন জানতেন তারা বার বার তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তার পরেও তিনি তাঁদের সাদরে বুকে টেনে নিয়েছেন। হুমায়ুন ভুলে গিয়েছিলেন রাজকীয়তা আত্মীয়তার বন্ধন মানে না।
ষোড়শ অধ্যায়
শের শাহের শুরুর সময়, ১৪৭২-১৫৩৬
শের শাহের জীবন নিয়ে ডক্টর কালিকারঞ্জন কানুনগোর একটা অসামান্য বই আছে। হুমায়ুনের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার আগে তাঁর কৃতিত্বগুলো শুধু আলোচনা করব। ভবিষ্যতের শের খান, ফরিদ নামে জন্মগ্রহণ করেব ১৪৭২-এ এক আফগান পরিবারে। বাবা মিঞা হাসান ছিলেন মনসবদার। হাসানের চার স্ত্রী আর আট পুত্র।
সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর আকর্ষণে তিনি বড় ছেলে ফরিদ আর তার মাকে বঞ্চিত করতে থাকেন। ফরিদ বাবার অবহেলা সহ্য করতে না পেরে ১৪৮৪-তেই জৌনপুরে পড়তে যান। পঞ্চদশ শতাব্দের জৌনপুর শর্কি রাজাদের (মালিকুলশার্ক ছিল সুলতানি আমলে বাংলার শাসনকর্তাদের অভিধা। জৌনপুরের শর্কি শাসনের অর্থ পূর্ব অঞ্চলের শাসক — অনুবাদক) কল্যাণে উত্তরভারতের শিক্ষা দীক্ষা কৃষ্টি এবং বৌদ্ধিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জৌনপুরে ২০টা বিদ্যালয় ছিল, প্রত্যেক বিদ্যালয়ে কয়েকশ ছাত্র পাঠ নিত। বলা দরকার জৌনপুর উত্তর ভারতের কৃষ্টিকেন্দ্র হিসেবে দিল্লির হেজিমনিকে চ্যালেঞ্জ জানাবার অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল — সে সময়ে সেই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ভারতের সিরাজ। আমরা যেন মাথায় রাখি ষোড়শ শতকের মাহাদাভি পরে আলাই আন্দোলনের জনক মহম্মদ জৌনপুরী এই অঞ্চলের মানুষ। তার তাত্ত্বিক অবস্থান অনুসরণ করেছেন আবুলফজলের বাবা শেখ মুবারক। জৌনপুরই আমাদের এই অধ্যায়ের নায়ক, শের খানের বিদ্যাশিক্ষাভূমি। এই শহরের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র ১৫৮১-তে আকবরের ধর্মীয় স্বেচ্ছাচারীতার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন। প্রশাসনিক বিভাগটি পরে জৌনপুর থেকে চুনারে চলে যাওয়ার পরেও জৌনপুর তার কৃষ্টি গৌরব উচ্চে তুলে ধরেছে। জৌনপুরের স্থাপত্যও চলিত ধারার স্থাপত্যের কাঠামো থেকে আলাদা। আজও তিনটে শর্কি আঙ্গিকের মসজিদ জৌনপুরে দাঁড়িয়ে আছে ১) অটলাদেবী, ২) লাল দরওয়াজা, ৩) জামি মসজিদ। (চলবে)