ষোড়শ অধ্যায়
শের শাহের শুরুর সময়, ১৪৭২-১৫৩৬
এই ধরণের বৌদ্ধিক পরিবেশে ফরিদ [অর্থাৎ আমাদের পার্শ্ব নায়ক, ভবিষ্যতের শের খান এবং শের শাহ] পড়তে এসে দেখলেন প্রাচীনকালের ছাত্রদের জন্যে শর্কি জলপানি বরাদ্দ না থাকলেও জৌনপুরে ছাত্রদল আর উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব নেই। অবহেলিত, বিভ্রান্ত ফরিদ জৌনপুর শহরের বৌদ্ধিক পরিবেশে মনের শান্তি খুঁজে পেলেন। ১৪৯৪ থেকে ১৪৯৭ — এই তিন বছরে কঠোর পরিশ্রমে পাঠ গ্রহণ করে মৌলভী উপাধিলাভ করলেন, আফগানদের মধ্যে তিনিই এই উপাধি প্রথম পেলেন। তাঁর পাঠ্যক্রমে ছিল শেখ সাদি’র পারসিক গুলিস্তাঁ বুস্তাঁ, নিজামীর সিকন্দরনামা, আরবি খাফিয়া আর ফিরিদৌসির শাহনামা।
পাঠ্যক্রমের শেষের দিকে ফরিদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল। ফরিদের শুভচিন্তকেরা, বাবাকে ছেলের শিক্ষায় উৎকর্ষলাভ সম্বন্ধে জানালে, তিনি জৌনপুরে জামাল খানের কাছে এসে, তার জায়গির ফরিদের নামে লিখে দিলেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে জামাল খানের সঙ্গে রইলেন। এইভাবে শুরু হল ফরিদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জনের যুগ (১৪৯৭-১৫১৮)। ফরিদ নিজেকে কঠোর প্রশাসক হিসেবে গড়ে তুললেন। তাঁর নীতি ছিল —
১) ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং শাস্তি ছাড়া ন্যায়বিচারের অস্তিত্ব থাকতে পারে না এবং রাজাদের কর্তব্য হল, রাজারা তাদের কর্মজীবনের পৃষ্ঠাগুলিকে ভক্তি আর সেবার চেতনায় আলোকিত করবে, যাতে তাদের অনুগামী, কর্মচারী এবং প্রজাদের, প্রদেয় সেবার প্রতি ভালবাসা তৈরি হয় (There could be) no state without justice and no justice without punishment. It is incumbent on kings that they should illumine the pages of their careers with (the spirit of) devotion or service, in order that their servants and subjects may develop a love for service.।
২) তিনি রায়তের ভাল চাইতেন বলে রাজস্ব কমিয়ে দিলেন একটাই শর্তে, যে সে কোনও অংশ বকেয়া রাখতে পারবে না;
৩) আমলারা কঠোর নিয়ন্ত্রণে কাজে জুড়লেন। তাদের জন্যে মাইনে ছাড়াও ছোট ছোট অতিরিক্ত বরাদ্দ অর্থ উৎসাহ দিতে দেওয়া হল যেমন জমি মাপিয়ে আর রাজস্ব আদায়কারীদের জন্যে ক্ষুদ্র পরিমান অর্থ বরাদ্দ হল, রোজকার খাওয়ার অর্থ মেটানো হত;
৪) জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হল। ক) তারা যদি ব্যক্তি হত, তাদের অবাধ্যতা, রাজপথ ডাকাতিতে জুড়ে থাকলেই মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হত। মোরল্যান্ড দ্য এগরারিয়ান সিস্টেম অব মোসলেম ইন্ডিয়া বইতে বলছেন, এ ধরণের এক দুর্বৃত্ত ধরা পড়ার পরে পুরুষদের হত্যা করা হত, মহিলাদের দাসী বানানো হত, গ্রাম উজাড় করে দেওয়া হত আর খালি গ্রামে দূর দেশের পরিবার এনে বসানো হত। খ) তবে ডাকাতেরা যদি গোষ্ঠীবদ্ধ হয়, জাতি নিবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের তুলনামূলকভাবে হাল্কা সাজা দেওয়া হত।
তার প্রশাসনের তিনটি চরিত্র ছিল ১) পূর্ব সময়ের চার অংশদারি ব্যবস্থা ক) খেত-বাতাই, খ) কানকুটি, গ) বাতাই বা ভাওতি, ঘ) লাঙ্ক বাতাই থেকে তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে নতুন পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ করে নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করলেন; এর আগে যেহেতু উৎপন্নের মোট পরিমানের ওপর রাজস্ব নির্ধারণ করা হত, জমির মাপে নয়, তাই বহু সময়ে হিসেবে গোলমালের সুযোগ থেকে যেত; তিনি নির্দিষ্ট জমির নির্দিষ্ট মাপ করালেন, জমির মাপের ওপর রাজস্ব নির্ধারণ করা হল। তিনি আগ্রাসী সংস্কারবাদী ছিলেন না, যে সব কৃষক পুরোনো প্রথায় রাজস্ব দিতে চায়, তিনি তাদের মানা করলেন না, নতুন পদ্ধতিতে আসতে বাধ্য করলেন না। ২) প্রশাসনিক শান্তি রাখার জন্যে দিল্লি রাজের দেওয়া জৌনপুরে নিরাপত্তা রক্ষী ব্যতিরেকে তিনি ২০০ ঘোড়সওয়ার নিযুক্ত করলেন। ৩) গরীব থেকে গরীবতর, সাধারণ থেকে সাধারণতর মানুষ যাতে তাঁর কাছে ক্ষোভ জানাতে পারে, তার ব্যবস্থা করলেন। তদন্তে আমলার গাফিলতি পাওয়া গেলে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হল।
জায়গীরে তিনি যে প্রশাসনিক কার্য শুরু করলেন, সেটাকে আমরা আগামী দিনে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠার শিক্ষানবিশী পর্ব হিসেবে দেখতে পারি। তিনি যে আগামী দিনে প্রশাসননিয়ন্ত্রণে অসামান্য দক্ষতা দেখাবেন তার বর্ণজ্যোতি যেন জৌনপুরের প্রশাসনিক কাজে প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছিল প্রতিনিয়তই। রায়তদের প্রতি তার ভালবাসা, জমিদারদের নিয়ন্ত্রণের কাঠামো, আমলাদের কাজকর্মে কঠোর নজরদারি, এবং সর্বোপরি ভূমি-রাজস্ব মূল্যায়ন বিষয়ে তার শক্তিশালী বুদ্ধিমমান ব্যবস্থা থেকে প্রমান হয় পেশাদারি প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনায় ফরিদের সন্দেহাতীত জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, তাকে আগামী দিনের ভারতবর্ষের পরিচালক হিসেবে গড়ে তুলছিল।
অন্যসব কিছু বাদ দিলেও তার ভূমি-রাজস্ব নির্ধারণের ব্যবস্থাপনাই আগামী দিনে তাঁর রাষ্ট্রনেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতার পরিচায়ক ছিল। অসামান্য কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও এত দিন রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে কৃষি কোনও দিন মুখ্য ভূমিকা নেয় নি। কৃষিকর্ম শুধু দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রধান জীবিকাই নয়, অথব রাষ্ট্রীয় সঙ্গঠনগুলোর অস্তিত্ব শুধুই কৃষির ওপর নির্ভরশীলই নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ভাগ সংগ্রহ হয় কৃষি উদ্বৃত্ত থেকে। আমরা বলতে পারি আজকে যাকে আমরা গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প বলে থাকি, সে বিষয়টাই শুরু হয়েছিল, শের খানের উৎসাহ উদ্দীপনাময় পরিকল্পনায়। আজ সরকারগুলোর সামনে কৃষির যে সব সমস্যা মাথা ব্যথা হয়ে আছে, তিনি সে দিন সে সব বিষয় সমাধান করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
জমিদারদের নিয়ে তাঁর উদ্যমের ফলে পরের দিকে আফগান গণতন্ত্র মজবুত হল। প্রথম থেকেই তিনি বাগী আর দুর্বিনীত ব্যক্তি জমিদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গহণ করলেন, কিন্তু জমিদারদের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিলেন। আজকে গণতন্ত্রের মূল চরিত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষ্যের প্রাধান্যের সূত্রপাত কিন্তু তার সময়েই ঘটেছে, গণতান্ত্রিক সঙ্গঠনগুলোর স্বাস্থ্যকর বিকাশের বিরুদ্ধে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারকে রোখার কাজও তিনি করেছেন। (চলবে)