ষোড়শ অধ্যায়
শের শাহের শুরুর সময়, ১৪৭২-১৫৩৬
প্রজাদের বৈধ উচ্চাশাকে তিনি যেমন সম্মান জানিয়েছেন, তেমনি তাদের রাষ্ট্রীয়নীতি প্রভাবিত করার উদ্যমও স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মনে করতেন তিনি একাই প্রজাদের উন্নতির জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি যেন প্লেটোর দার্শনিক সম্রাট, যিনি নিজেকে প্রজার একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী বলে দাবি করতেন এবং ভাল করার সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশ করতেন আর সেই ভাবনাড়া প্রয়োগও করতেন। ভাল মেষ পালকের মত তিনি প্রজারূপী মেষের লালনপালন করতেন এবং তাদের নিরাপত্তাও দিতেন।
আমরা একটা বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করতে পারি, শের খান, আগামী দিনে সাসারাম আর খাওয়াসপুত-তাণ্ডার প্রজাদের জন্যে যে অসামান্য উচ্চমানের প্রশাসনিক সেবা দেবেন, তার মুখড়া শুরু হয়েছিল বাবার জৌনপুর জায়গির দেখাশোনা এবং ব্যবস্থাপনা করার মধ্যে দিয়েই।
কিন্তু তার প্রশাসনিক কাজকর্মের সাফল্যই পতনের কারন হল। ১৫১৮-য় শের খানের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বাবার প্রিয় পত্নী, তার সৎ মা, বাবাকে বাধ্য করলেন শের খানকে সেই জায়গির ব্যবস্থাপনার কাজ থেকে বহিষ্কার করতে। জৌনপুরে বাবার সঙ্গে তিনি যে চুক্তিতে উপনীত হয়েছিলেন, বাবার এই সিদ্ধান্ত সেই চুক্তির শর্ত বিরোধী। মিঞা হাসান পারিবারিক দ্বন্দ্ব সামলাতে না পেরে জৌনপুরেরর জায়গিরিটি পুত্র ফরিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজের হাতে তুলে নিলেন। ফরিদ একে অন্যায় মনে করলেও বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন না। কিন্তু মনে অসন্তোষ সম্বল করে নিজের ভাগ্য আর বুদ্ধিবলের ওপর নির্ভর করে আগরা পৌঁছে সুলতান ইবরাহিম লোদির শরণাপন্ন হলেন। সুলতানকে অনুরোধ করলেন জায়গিরকে আবার যাতে তাঁর হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করতে। কিন্তু সুলতান ফরিদের আবেদনে সম্মতি দিলেন না। তিনি পারিবারিক দ্বন্দ্বে মাথা গলাতে চান না। মন ভ্বঙ্গে গেলেও সত্ত্বেও ফরিদ আগরা ছাড়লেন না, মাথা ঠাণ্ডা করে তিনি আগরায় থানা গাড়লেন। সেখানেই তার কয়েক বছর কেটে গেল।
হঠাতই সুযোগ যেন আকাশ ভেদ কজরে ফরিদের কোলে এসে পড়ল। ১৫২৫-এ তিনি জৌনপুর থেকে সংবাদ পেলেন বৃদ্ধ পিতা প্রয়াণের। এবারে আর সুলতান ইবরাহিম লোদির পক্ষে সেই জায়গির আর ফরিদের নামে করার আর বাধা রইল না। তিনি ফরিদের দক্ষতা যাচাই করে সন্তুষ্ট হয়ে তার বাবার জায়গির তাকে ফিরিয়ে দিলেন। ফতিদ পরগণায় ফিরে গিয়ে দেখলেন বাবার মৃত্যুর পর সেখানকার রাজনৈতিক অবস্থা পালটে গেছে। ফরিদ সম্পূর্ণ জায়গির দখল নেওয়ার চেষ্টা করলেও পুরো জায়গির দখল নেওয়া হল না, অর্থাৎ জায়গিরের পুরো অংশ তাঁর হাতে রইল না। প্রতিবেশী চৌন্দ-এর ক্ষমতাশালী মনসবদার মহম্মদ খান শূর এবং ফরিদের সৎ ভাই সুলেইমান তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এলেন। মহম্মদ খান শূরের উদ্দেশ্য ছিল, দুই ভাইকে লড়িয়ে, তাদের ধ্বংস করে অথবা দুর্বল করে জায়গির দখল নেওয়া। কিন্তু ফরিদ আগেভাগেই কী ঘটতে যাচ্ছে, সেই ঘটনাক্রম কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া তিনি বুঝলেন, তাঁর পক্ষে ক্ষমতাশালী মহম্মদ খানের মুখোমুখি হয়ে খুব কিছু করে ওঠা সম্ভব হবে না, তিনি মহম্মদ খান শূরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিহারের সুলতান মহম্মদ নুহানির আশ্রয় নিলেন। কিন্তু ১৫২৬-এর পানিপথের বিধ্বংসী যুদ্ধ সব রাজনৈতিক পরিবেশ ওলটপালট করে দিল চিরতরে। দিল্লির লোদি সাম্রাজ্য উচ্ছেদ হয়ে বাবরের উদ্যমে প্রতিষ্ঠা হল মুঘল সাম্রাজ্যের। এইরকম এক উত্তেজকর করিস্থিতিতে আফগানেরা সুলতান মহম্মদকে তাঁর নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। এই রাজনৈতিক টালমাটালের সুযোগে ফরিদ, মহম্মদ খান শূরের বিরোধিতা নাকচ করে নিজের জায়গির ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হল।
নতুন নেতার অধীনে কাজ দেখিয়ে সেই আগের উৎসাহ, এবং নিবেদনে ফরিদ নিজেকে প্রয়োগ করে চললেন। নিজের জীবনের ওপর আঘাত আসার আশংকা থাকলেও তিনি তাঁর প্রভু সুলতান মহম্মদ নুহানিকে বাঘের আক্রমন থেকে রক্ষা করেন। প্রভুর প্রতি তাঁর যথাযোগ্য নিবেদন সুলতানের দৃষ্টি এড়াল না, তিনি ক্রমশ ফরিদকে নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে টানতে শুরু করলেন। আমাদের পার্শ্ব নায়ক, শাহজাদা জালালুদ্দিন নুহানির শিক্ষক বা আতলিক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি ফরিদকে শের খান উপাধি দেবেন।
কিন্তু শের খান তো এই অবস্থায় খুশি থাকার মানুষ নন, তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য হারানো জায়গির ফেরত পাওয়া। কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ হল না। শের খান দেখলেন তাঁর বিশ্বস্ত, বুদ্ধিমন্ত কাজের পরিশ্রমিক হিসেবে অতিরিক্ত জমির অধিকার দেওয়া তো দূরস্থান, মহম্মদ খান শূর, তার বিরুদ্ধে যে দুর্ব্যবহার আর চালাকিগুলো করছেন, সে সবে অনৈতিক কাজকর্ম সুলতান হস্তক্ষেপ করে সমাধান করতে অসমর্থ হচ্ছেন। উত্তর ভারতজুড়ে এই রকম এক রাজনৈতিক উথালপাথাল পরিস্থিতিতে সুলতান মহম্মদ নুহানি নতুন এক যুবা উদ্যোগীর ভরসায় পুরোনো মনসবদারকে চটাতে চাইছিলেন না। দুবছর অপেক্ষা করে শের খান সাসারামে পৌঁছলেন তাঁর জায়গির উদ্ধারের মনসায়।
শের খান চলে যাওয়ার পরে মহম্মদ খান শূরের সুযোগ হল প্রভুর মনে তার বিরুদ্ধে বিষ ভরে দেওয়ার। দীর্ঘকাল শের খানের অনুপস্থিতির বাহানায় তিনি সুলতানকে অনুরোধ করলেন শের খানের জায়গির হুকুম দখল বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে নিতে। সুলতান, মহম্মদ খানকে বিষয়টা মেটাবার দায়িত্ব দিলেন। দায়িত্ব পেয়ে মহম্মদ খান, শের খানের জায়গিরে পৌঁছে সেটি টুকরো টুকরো করে ভাইদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। উদ্দেশ্য জায়গিরের বিভিন্ন অংশে তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। প্রশাসনিক বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ শের খান জায়গির ভাগের আইনি যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তাঁর যুক্তি রোহ দেশের [আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পুরো পাহাড়ি অঞ্চল। আহমদ শাহ দুরানি আফগান গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গোষ্ঠী জোট সংগঠন উলুস তৈরি করেন – দুরানি, খলজি, সুর, আর বর [আপার] দুরানি হল তার প্রশাসনিক কেন্দ্র। বর দুরানিতে রইল ইয়ুসুফজাইরা, তাদের সঙ্গে থাকল মহম্মদ, আফ্রিদি, বাঙ্গাস আর খট্টক সমাজ। বর দুরানি হল রো রাষ্ট্র যেখান থেকে রোহিলা শব্দ তৈরি হয়েছে। এই গোটা দল যে অঞ্চলে বাস করতে শুরু করে সেই ভূখণ্ডের নাম হল রোহিলাখণ্ড।
নাজিবুদৌলা ছিলেন বড় ইয়ুসুফজায়ি রোহিলা প্রধান। তিনি নাজিবাবাদ শহর তৈরি করেন আর ১৭৫৭-র আহমদ শাহ দুরানির দিল্লি আক্রমনে অন্যতম নেতা হন — অনুবাদক] আইন অনুযায়ি ভাইদের মধ্যে জায়গির ভাগ নাযায়েজ। জায়গির রাষ্ট্রের ফরমান দ্বারা সামরিক সেবার বিনিময়ে প্রাপ্ত সাম্মানিক ভূখণ্ড — তাই এটী হস্তান্তর করতে ফরমানই লাগবে, কোনও আধিকারিকের মুখের কথায় জায়গির ভাগ হওয়া অসম্ভব। বর্তমানে এই রাষ্ট্র সেবাটি যেহেতু অদৃশ্য, তাই বর্তমান জায়গিরও অদৃশ্য। একমাত্র রাষ্ট্রের ফরমান বলেই জায়গিরের আইনি উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা যায়। যেহেতু সুলতান ইবরাহিম লোদি তাঁকেই জৌনপুরের জায়গিরের ফরমান দিয়েছেন, তাই আইন অনুযায়ী এই জায়গির এখন তাঁর অধীনে থাকা উচিৎ, অন্য কারোর অধিকার নেই এই জায়গিরের অধিকার ফরিদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার। শের খান যুক্তির কথা বলছিলেন, কিন্তু মহম্মদ খান শূর যেহেতু যেনতেন প্রকারেন ভূখণ্ডটি দখল নিতে বদ্ধপরিকর তিনি শের খানের যুক্তির ধার ধারলেন না। দুজনের মধ্যে লড়াই হল, শের খান হেরেগেলেন। হেরেও তিনি নিজের অবস্থানে স্থির থেকে জায়গির দখল রাখা নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেলেন। তিনি সাহায্য পেলেন অদ্ভুতভাবে মুঘল শিবির থেকে। জৌনপুরের প্রশাসক সুলতান জুনায়েদ বারলাস, তার শত্রু ১৫২৭-এ মহম্মদ খানকে হারিয়ে জমি দখল নিলেন। মহম্মদ খান হারের ফলে তাঁর জমি উদ্ধার হলেও, শের খান, মহম্মদ খানের প্রতি বিদ্বেষ দেখালেন না। তিনি মহম্মদ খান একটা বিষয় খেয়াল করলেন, মুঘল সেনার উপস্থিতিতে তার সম্মান কমতে শুরু করেছে। তাঁকে সাহায্য করার জন্যে মুঘলদের কৃতজ্ঞতা জানালেন। তিনি তাদের উপহার দিলেন এবং সেনাবাহিনীকে তার জমি থেকে সরে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন। উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর মহম্মদ খানকে চিঠি লিখে তার হারানো জমি উদ্ধারের প্রস্তাব দিলেন। হতবাক হয়ে মহম্মদ খান তার পুরোনো জায়গীরে ফিরে এলেন। আর কোনও দিন জায়গির ভাগের কথা তোলেন নি। (চলবে)