প্রথম অধ্যায়
শাহজাদা হুমায়ুন, ১৫০৮-৩০
তো প্রশ্ন হল শাহজাদাকে রাজধানীতে ডেকে নেওয়ার কারন কী হতে পারে। গুলবদন এবং আবুল ফজল স্পষ্ট বলছেন, বাদশা হুমায়ুনকে নিজের অসুস্থতার জন্যে আগরায় তো ডাকছেনই না, বরং ডাকছেন তাঁর প্রিয় পুত্রের আনওয়ার বা আলোয়ারের মৃত্যুর সংবাদ সূত্রে। হুমায়ুনকে ডেকে নেওয়ার আরও একটা কারন আমরা দেখতে পাচ্ছি। হুমায়ুন বহু দিন থেকেই বেশ কয়েকবার বাবাকে চিঠি লিখে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছে জানাচ্ছিলেন। হুমায়ুনের এই ধরণের ভাবনাচিন্তাতে বাবর ক্ষুব্ধ হন। অবসরের মত শব্দের অপব্যবহারের থেকে তার মনকে দূরে রাখতে নির্দেশ দেন, ‘চিঠিতে লেখা বা উচ্চারণ করা অবসর শব্দ সার্বভৌমত্বের পক্ষে তীব্র ক্ষতিকর; …প্রশাসনিক কর্তব্যের সঙ্গে অবসর শব্দটা খাপ খায় না’।
বড় ছেলের মনে চলতে থাকা প্রক্ষোভ শান্ত করতে তাকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন সম্রাট বাবর। চিঠিতে যে বাহ্যিক কারনগুলো উল্লেখ করেছেন, সেই হুঁশিয়ারি প্রত্যেক যুদ্ধঅভিজ্ঞ, বুদ্ধিমান বাবা তার ছেলেকে দিয়ে থাকেন। তার মন ছেলেকে কাছে পাওয়ার জন্যেও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিল। হুমায়ুনের আগরায় পৌঁছনোর আগেই তিনি ঘনিষ্ঠ মহলে বড় ছেলের জন্যে সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছিলেন বেশ কয়েকবার। তাঁর ছেলের বয়স এখন ২২। ৩০ বছরের বেশি সময় যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়ে সম্রাট পদ ছেড়ে দরবেশ হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করাটাও বাবরের পক্ষে খুব একটা অযৌক্তিক পদক্ষেপ ছিল না। সে সময়ে ‘দরবেশ’ বাবরের সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবে, সাসনের সঙ্গে জুড়ে থাকা কোনও পক্ষই খুব অবাক হয়েছিলেন বলে মনে হয় না। বাবর লিখলেন
আমি দরবেশদের সঙ্গী নই/ তবুও হৃদয়ে আত্মায় তাঁদের অনুগামী।/ বলা হয় কোনও রাজাই দরবেশদের সঙ্গ ছাড়া থাকতে পারেন না,/ আমি রাজা, তবুও আমি দরবেশের ভৃত্য/দাস’।
Though I be not related to dervishes,/Yet am I their follower in heart and soul./Say not a king is far from a dervish,/I am a king but yet the slave of dervishes।
হুমায়ুনের রাজধানীতে ফিরে আসার আনন্দে শাহী বাগানে ভোজ উৎসব আয়োজন করা হল। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল এখানেই বাবর, তাঁর বড় ছেলেকে ‘অতুলনীয় সহচর’ an incomparable companion আখ্যা দেবেন। সম্রাটের এই প্রকাশভঙ্গীতে স্পষ্ট, যে হুমায়ুনের আগমনে বাবর যারপর নাই খুশি হয়েছিলেন।
বড় ছেলে হুমায়ুনের আগমনে খুশিতে ভরপুর বাবর কিন্তু জায়গির ব্যবস্থাপনা হেলাফেলা করলেন না। বাবরের সঙ্গে হুমায়ুন বেশ কয়েক মাস কাটানোর পরে, সম্রাটের পিতৃত্বের অনুভূতি কানায় কানায় পূর্ণ হল। তিনি চাইলেন সাম্রাজ্যের স্বার্থ সুরক্ষায় সীমান্ত অঞ্চলের প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ হুমায়ুন বাদাকশনে ফিরে যান। তাঁর বড় ছেলে ইতিমধ্যে বেশ কিছু যুদ্ধে জিতেছেন, আমু দরিয়া ছাড়িয়ে বেশ কিছু এলাকা মুঘল সাম্রাজ্যে জুড়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল বাবরের মাথা ব্যথা বাড়িয়ে এত দূরে হুমায়ুন যেতে চাইলেন না। মনে হয় বাবর তাঁর প্রতিবাদ খুশি মনে মেনে নিয়েছিলেন। সে অঞ্চলের প্রশাসন পরিচালনায় বাবরের পরের পছন্দ ছিলেন খলিফা নিজামুদ্দিন আলি। তিনিও বাবরের প্রস্তাবে রাজি হলেন না। ফলে সম্রাট বাধ্য হয়ে ওয়ায়িস মির্জার ছেলে সুলেইমান মির্জাকে এই কাজের জন্যে বেছে নিলেন। তারিখইরশিদি বলছে সুলেইমানের দাবি, ৩০০০ বছর উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি বাবার দিক থেকে মির্জা উপাধিধারী, আর বাবার মা, সুলতান নিগান খানের দিক থেকে তিনি খান উপাধিধারী। বাবরের দাবি তিনি ম্যাসিডোনিয়ার আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকারী। সুলেইমান খানের বংশলিতিকা দেওয়া হল —

সুলেইমানের অবস্থান এবং নিরাপত্তা জোরদার করতে বাবর কাশগরের সৈয়দ খানকে বলে পাঠালেন সুলেইমান তাদের দুজনের কাছেই পুত্র সমান। তিনি সৈয়দ খানকে নতুন প্রশাসককে ব্যতিব্যস্ত না করার হুঁশিয়ারি দিলেন। মুঘল সম্রাট বাবরের এই অঞ্চলটিকে দখলে রাখার উদ্দেশ্য ছিল কোনও না কোনও দিন নিজের জন্মস্থান বিজয় সম্পূর্ণ করা। তখনও বাবরের মাথায় মধ্য এশিয়া বিজয় স্বপ্ন তলিয়ে যায় নি। তার আশা ছিল সুলেইমান তাঁর মধ্য এশিয়া জয়ের স্বপ্ন সফল করতে তার রাজ্যের মধ্যে দিয়ে মুঘল সেনাবাহিনী নিয়ে যেতে বাধা হয়ে দেবে না। শ্রীমতী বেভারিজ, ১৫২৯-৩০-এর আহমদ ইয়াদগার সূত্রে যে কাবুল পর্যন্ত মুঘল সেনা অভিযানের কথা বলছেন, সেটা হয়ত এই পরিকল্পনার অংশ ছিল। কেন সম্রাট সেই অভিযান সম্পূর্ণ করতে পারলেন না, সেই বিষয় আমরা এই আলোচনায় আনছি না।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে হুমায়ুনকে তার জায়গিরদারি, সম্ভলে যাওয়ার অনুমতি দিলেন সম্রাট বাবর। ছমাস শাহজাদা তার জায়গিরে কাটানোর পর এক সময় তীব্র অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে প্রথমে দিল্লি, পরে নৌকো করে আগরায় না হল। আসার সময় মথুরায় মায়ের সঙ্গেও দেখা করলেন। আগরায় তাঁকে সে সময়ের নামীতম হাকিম দেখলেন। ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে সে সময়কার ফাজিল মীর আবুল বাকা, সম্রাটকে শাহজাদার প্রিয় জিনিসপত্র জনগণকে দান করার পরামর্শ দিলেন। বাবরের মাথায় আবুল বাকার কথাটা গেঁথে গিয়েছিল। তিনি জানেন পুত্রের কাছে সব থেকে প্রিয়, তার বাবা। বাবা ঠিক করলেন, তাঁর প্রাণ অসুস্থ পুত্রকে উপহার দেবেন।
ছেলের রোগ নিজের দেহে নেওয়ার অনুষ্ঠান সম্রাটের কন্যা গুলবদনের স্মৃতিকথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি পুত্রের বিছানার চার দিকে ঘুরতে ঘুরতে হজরত আলির কাছে দুহাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন, ‘হে সর্বশক্তিমান, তোমার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যদি জীবন বদল করার বিধান থাকে, আমি সম্রাট বাবর, তোমার সামনে বিনীত প্রার্থনা করছি, আমার জীবন পুত্র হুমায়ুনের জীবনের সঙ্গে বদল কর’। পরের দিন থেকেই তাঁর প্রার্থনা সফল করতে সম্রাট উপবাসে বসেলেন। সম্রাট বাবরের দেহে ক্রমশ অসুস্থতা ফুটে উঠতে দেখা গেল; ক্ষইতে থাকলেন সুস্থ সবল সম্রাট, আর অন্য দিকে বিছানা ধরা অসুস্থ হুমায়ুন ক্রমশ সেরে উঠছিলেন। ফরিস্তা বলছেন দশ মাসের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় সম্রাট বাবর প্রয়াত হলেন। পিতার অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দেওয়া ২২ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ হুমায়ুন কিলিঞ্জরে ঘুরতে গিয়ে পাথরে খোদাই করছেন, Muhammad Humayun, Badshah-i-Ghazi, dated the last day of the sacred month of Rajab 936 A. H.'(৩০ জুন ১৫৩০)।
বোঝাগেল বাবরের অসুস্থতা সারার নয়। অবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করে আমীরেরা হুমায়ুনকে রাজধানীতে ডেকে নিলেন। হুমায়ুন ফিরে এসে বাবার শয্যার পাশে ভেঙে পড়লেন আর হাকিমদের প্রতি অনুনয় করতে লাগলেন বাবাকে ভাল করে দেওয়ার জন্যে। শেষ কয়েক মাসে সম্রাট, তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও পারিবারিক কর্তব্যে অবহেলা দেখান নি। তিনি দুই কন্যা গুলরঙ বেগমকে বিয়ে দিয়েছেন ইশান তিমুর সুলতানের সঙ্গে আর গুলচেহারা বেগমকে বিয়ে দিয়েছেন তুখতা বুঘা সুলতানের সঙ্গে। সুলতানদের বংশ লতিকা তুলে দেওয়া গেল —

এটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ পারিবারিক কাজ। বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করার পর বাবর বুঝলেন তাঁর আর সুস্থ হওয়া ভাগ্যে লেখা নেই। আবুলফজল লিখছেন, তাঁর শেষের দিনগুলো এগিয়ে আসছে বুঝতে পেরে তিনি খাজা খলিফা, কামবার আলি বেগ, তারদি বেগ এবং হিন্দু বেগের মত মহান আমীরদের ডেকে হুমায়ুনকে সিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়া দেখলেন। ছেলের প্রতি তাঁর শেষ উপদেশ ছিল, যদি তারা যোগ্য না হয়, তাহলেও তুমি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে না, Do naught against your brothers, even though they may deserve it। হুমায়ুন বাবার বাণী মেনে চলেছেন। তিন দিন পর ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর প্রয়াত হলেন।(চলবে)