অষ্টাদশ অধ্যায়
গৌড়ে হুমায়ুন, চৌসায় ফিরে আসা, আগস্ট ১৫৩৮-এপ্রিল ১৫৩৯
হিন্দালের কাছে পাঠানো শায়েখ বাহালুলের দৌত্য ব্যর্থ হওয়া প্রত্যাশিত ছিল। শায়েখ বাহালুল হিন্দালকে তাঁর দাদার কাছে যেতে বলায় জাহিদ বেগের প্ররোচনায় হিন্দাল জানাল সে দিল্লির তখত দখল করতে যাচ্ছে। বাহালুল প্রতিবাদ করে খুন হল। এর আগে হুমায়ুন, শালা জাহিদ বেগকে বাংলার সুবাদারির প্রস্তাব দিলে সে চিৎকার করে প্রত্যাখ্যান করে, হিন্দালকে নিয়ে সে বাগী হয়েছিল। গুলবদন বেগম অসামান্য লেখিকা, কিন্তু হিন্দালের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তিনি বাহালুলের মৃত্যু বছর বলেছেন ১৫৩৯-এর জানুয়ারি। সমস্যার হল, বিদ্রোহী ভাই হিন্দালের ভাবমূর্তি বাঁচাতে তিনি বলছেন, বাহালুল মুঘলদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। বাহালুল ছিলেন হুমায়ুনের আধ্যাত্মিক গুরু। ঐতিহাসিকভাবেই বাহালুলের মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার তথ্য ঠিক নয়।
পারিপার্শ্বিক ঘটনাক্রম নিশ্চিতভাবে শের খানের স্বার্থ পূরণ করার দিকে এগোচ্ছে। শের খান দূর থেকে ঘটমান বর্তমানের দিকে গভীর নজর রেখে বেনারস দখল নিলেন, ফৌজদার মীর ফাজিলকে হত্যা করে মুঘলদের বাংলা দিল্লির যোগাযোগের তৃতীয় শৃঙ্খলও ভেঙে দিলেন। এর আগে ত্রিহূত আর কনৌজ মুঘলদের হাতছাড়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জৌনপুরের মুঘল সুবাদার হিন্দু বেগের প্রয়াণ হয়। পূর্ব প্রদেশগুলোর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি মুঘলদের হাতছাড়া হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। সুবাদার বাবা খান জালাইরের জৌনপুর সামলানোর দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ছিল না। হঠাতই এক দক্ষ আমীর ইব্রাহিম বেগ চাবুকের ছেলে ইয়ুসুফ বেগ জৌনপুরে হাজির হয়ে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োগ করে অবস্থা সামাল দিলেন। শের খান, ছেলে জালাল খানকে জৌনপুর আক্রমনের নির্দেশ দেন। যুদ্ধে ইয়ুসুফ মারা যান, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে তিনি বাবা খানকে উদ্বুদ্ধ করে যান অঞ্চল রক্ষার কাজে। তিনি হুমায়ুন আর দিল্লি আগরার প্রশাসকদের সাহায্যের আর্তি জানালেন। গৌড়ে ঘাঁটি গেড়ে থাকা হুমায়ুনের পক্ষে তাকে সাহায্য পাঠাবার সুযোগ ছিল না। দিল্লির মীর ফকির আলি আর আগরার মীর মহম্মদে মুনসি সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাঁরা শাহজাদা হিন্দালকে অনুরোধ করলেন কালপিতে এগিয়ে গিয়ে ইয়াদগার নাসির মির্জার থেকে যুদ্ধের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করতে। ইয়াদগার নাসির মির্জা বাহিনীর জন্যে অর্থ এবং যথাবিহিত খাদ্য আর অন্য রসদ সরবরাহ করার জন্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজে হিন্দাল মির্জার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আগরার সীমান্তে এগিয়ে গিয়ে কীভাবে আফগানদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হবে সে বিষয়ে বাবা বেগের সঙ্গে আলাপও করলেন।
ইতিমধ্যে জাহিদ বেগ কনৌজে নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে হিন্দালকে দলে টানার পরিকল্পনা করে হিন্দালের সঙ্গে দেখা করতে চললেন। হিন্দাল সে সময় ভাবছিলেন, আদৌ তিনি মীর ফকির আলি আর মীর মহম্মদ মুনসির প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কী না। ইতিমধ্যে জাহিদ বেগ আর নাসিরুদ্দিন, হিন্দালকে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করেন এবং সেই মুহূর্তে বাহালুল (বাহালুল ছিলেন গোয়ালিয়রের প্রখ্যাত জ্ঞানী শায়েখ মহম্মদ ঘাউসের ভাই। তাঁর নাম আবুলফজল আর বাদাউনি শ্রদ্ধাভরে উল্লেখ করেছেন, একমাত্র তারিখইরশিদিতে তাকে তান্ত্রিক বলা হয়েছে) সেখানে পৌঁছলে তাকে কতল করা হয়।
তখনও হুমায়ুনের সব আশা শেষ হয়ে যায় নি। হুমায়ুনের বাংলায় আটকে থাকার সুযোগ নিয়ে সৎ ভাই হিন্দাল মির্জা সম্রাট উপাধি নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে বসলেন। কিন্তু হুমায়ুনের জেনানা মহল এবং দুই সহকারী মীর ফকর আলি আর মীর মহম্মদে মুনসি হুমায়ুনের পক্ষে ছিলেন এবং তাঁরা বারংবার হিন্দালের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হিন্দালের মায়ের প্রতিবাদের ধরণ উল্লেখ্য। যেদিন হিন্দাল সিংহাসনে উঠলেন [তাঁর নামে কোনও মুদ্রা প্রকাশিত হয় নি বা খুতবা পড়ারও উল্লেখ পাচ্ছি না, হয়ত রাজধানী জুড়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েপড়ার জন্যেই খুতবা পড়া হল না], হিন্দালের মা দিলদার বেগম শোকের চিহ্ন হিসেবে নীল রঙের আলখাল্লা পরলেন। মির্জা তাঁকে নীল কাপড় পরার কারন জজ্ঞাসা করলে তিনি ছেলেকে উত্তর দিলেন ‘অদ্ভুত! তুমি আমায় আজ জামাকাপড়ের রঙ নিয়ে প্রশ্ন করছ? আমি তোমার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে শোক জানাতেই নীল রঙের আলখাল্লা পরেছি। আমি আশা করিনি তোমার মত যুবা দুই অযোগ্য বিদ্রোহীর কথায় নেচে উঠে সত্যের পথ থেকে এইভাবে বিচ্যুত হবে। তুমি নিজেকে ধ্বংস করার জন্যে কোমর বেঁধেছ’। বাহালুলের মৃতুর জন্যে দায়ি হিন্দাল বিদ্রোহের পথ থেকে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না; ফলে সে মায়ের কথা উপেক্ষা করল যৌবনের উচ্ছৃংখলতায়’।
মীর মহম্মদে মুনসিও তার মত করে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যে উন্মার্গগামী যুবক তার পরমারাধ্য মায়ের হুঁশিয়ারিকে নজর আন্দাজ করে, সে কেন এক উচ্চপদস্থ মুঘল আমলার কথায় কান দেবে! তবুও তিনি মরিয়া স্বরে হিন্দালকে বললেন, ‘তুমি বাহালুলকে খুন করেছ, আমায় মেরে ফেলছ না কেন’? হিন্দালের বিদ্রোহের পর মীর ফকর আলি, কাল্পিতে ইয়াদগার নাসির মির্জার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ঠিক করলেন যে দিল্লি শহর এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতকে হিন্দালের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। দুজনেই দিল্লি পৌঁছে বুঝলেন অনেক দেরি হয়েগেছে, ঘটনাক্রম অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, হিন্দাল দিল্লি অবরোধ করেছে। তাঁরাও দিল্লিতে হিন্দালের বিরুদ্ধে অবরোধের সিদ্ধান্ত নিলেন। একটা বিষয় পরিষ্কার, সেই মুহূর্তে হিন্দালের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া ইয়াদগার নাসির মির্জার বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়। তারা কামরানকে হিন্দালের বিরুদ্ধে দাঁরাবার বার্তা দিয়ে চিঠি লিখে হিন্দালের কীর্তিকলাপ ব্যাখ্যা করলেন, হিন্দালের বিরুদ্ধে লড়াইতে তাদের সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন। প্রথমে কামরান ঠিক করতে পারছিলেন না যে তিনি বাংলায় হুমায়ুনের পাশে দাঁড়াবেন না কী নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল্লির ক্ষমতা দখল করবেন। শেষ পর্যন্ত দিল্লি অভিযানেরই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। বিশাল বাহিনী নিয়ে দিল্লি থেকে ২৭ মাইল দূরের সোনাপেটে ঘাঁটি গাড়লে হিন্দাল স্নায়ু হারিয়ে দিল্লির অবরোধ তুলে আলোয়ারে আশ্রয় নিলেন। কামরান দিল্লি পৌঁছলেন। ফকর আলি কামরানের উদ্দেশ্য বুঝে প্রথমে তাঁকে দিল্লিতে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকার করলেন এবং তাকে বাধ্য করলেন হিন্দালের সঙ্গে সমঝোতা করতে। দিল্লি থেকে কামরান আগরা পৌঁছলেন। হিন্দাল দেখলেন তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা তাসের ঘরের মত ঝুর ঝুর করে ভেঙ্গে পড়ছে। গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে মায়ের সঙ্গে কামরানের সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁকে আর তার অনুগামীদের ক্ষমা করা হল।
হিন্দালের বিদ্রোহ দমন করার পরে হুমায়ুন কিছুটা হলেও শান্তি বোধ করলেন। দিল্লিতে তখন তিন শাহজাদা কামরান, হিন্দাল আর ইয়াদগার নাসের। ইয়াদগার আগরা থেকে এসেছেন। ভাইদের মধ্যে একমাত্র শাহজাদা কামরানই কামদার শাসক, কারন তিনি হিন্দুকুশ থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত জটিল দুর্গম অঞ্চল একা হাতে সামাল দেন। একমাত্র তিনিই পারতেন বাংলায় বিপদে পড়া হুমায়ুনকে উদ্ধার করতে। শাহজাদারা যৌথভাবে অনেকটা পূর্ব দিকে এগিয়ে যমুনার তীরে শিবির পাতলেন। কিন্তু ভাইদের মধ্যে বাংলায় অভিযান করা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে এর বেশি আর এগোনো গেল না। ভাইরা হুমায়ুনকে ইঙ্গিত দিলেন হুমায়ুনের বাঁচা মরা তার নিজের দায়। ভাইরা তাকে সাহায্য করতে এর বেশি এগোবে না। (চলবে)