অষ্টাদশ অধ্যায়
গৌড়ে হুমায়ুন, চৌসায় ফিরে আসা, আগস্ট ১৫৩৮-এপ্রিল ১৫৩৯
সেই সময়ে শের খানের কাজকর্মের দিকে নজর ঘোরানো যাক। ততদিনে বেনারস তার কব্জায় এসেছে। এবারে একের পর এক কারা (এলাহাবাদের ৪০ মাইল উত্তর পশ্চিমে), বাহারহাইচ, কনৌজ, সম্ভল দিকে হাত বাড়ানোর পরিকল্পনা তৈরি। জৌনপুর হাতে এল না বাবা বেগ জলৈ-এর লড়াই-এর বদৌলত। ১৫৩৯-এর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কোশি থেকে গঙ্গা পর্যন্ত ৫শ মাইলের বেশি এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে এল। এ প্রসঙ্গে তিনটে বিষয় মাথায় রাখা দরকার, ১) জাম্মার দক্ষিণ থেকে এর উত্তর পর্যন্ত অঞ্চল তখনও মুঘলদের নিয়ন্ত্রণে কায়েম; ২) বিহারে হিমালয়ের পাদদেশ, তরাই থেকে গণ্ডোয়ানা পর্যন্ত অঞ্চল আফগানদের নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্যে হুমায়ুনকে যদি বাংলা থেকে দিল্লি ফিরতে হয়, তাহলে তাকে শত্রুপুরীর ওপর দিয়েই দিল্লি পৌঁছতে হবে; ৩) যে সব অঞ্চল শের খান তাঁর প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োগ করেছিলেন, সেই সব এলাকার মানুষজন সরাসরি শের খানের পক্ষে ছিলেন।
হুমায়ুন বুঝতে পারছেন যে তিনি বাংলায় একা পড়ে গেছেন এবং তার বাহিনীও ছোট হয়েগেছে, ভাইরাও তাঁকে সাহায্য করার প্রশ্ন না বলে দিয়েছেন। ফলে তাকে মরিয়া হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হল, ভাগ্যে যা ঘটে ঘটুক তিনি বাংলা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাহিনীকে তিনটে টুকরিতে ভাগ করলেন একটার নেতৃত্ব দেলওয়ার খান লোদি, খানইখানানের নেতৃত্বে আগেভাগেই মুঙ্গেরের দিকে পাঠালেন; দ্বিতীয় বাহিনীটা নিজের কাছে রেখে তিনি স্বয়ং খানইখানানের বাহিনীর পিছন পিছন আসার পরিকল্পনা করলেন; বাকি ৫ হাজার বাছা সেনা জাহান্দার কুলি বেগের নেতৃত্বে গৌড়ে রেখে গেলেন। একে খুব সুসমঞ্জস্য পরিকল্পনা বলা যাবে না। অসুখ থেকে সেরে ওঠা সেনাদের যদি একসঙ্গে থাকত তাহলে হয়ত সাফল্য আসত। তিন দলে ভাগ করে বাহিনীকে দুর্বল করলেন। এর ফল কী হল, সেটা নতুন করে বলে দেওয়া যাক মুঙ্গেরে দেলওয়ার খান লোদি, খানইখানানের নেতৃত্বে বাহিনী পৌঁছনো মাত্র খাওয়াস খান বিনা আয়াসে তাকে পরাজিত করে গোটা দুর্বল, হতাশ বাহিনীকে গ্রেফতার করে। গৌড়েও একই ঘটনা ঘটল; শের খান পৌঁছনো মাত্র জাহান্দার কুলি বেগ আত্মসমর্পন করে। শের খানের নেতৃত্বে গোটা বাহিনীকে হত্যা করা হল।
হুমায়ুন যখন বুঝলেন তার পরিকল্পনা চরম ব্যর্থ হতে বসেছে, তিনি সাহায্যের জন্য আসকরির কাছে আবেদন জানালেন। আসকরি তাঁকে উদ্ধারের আশ্বাসও দিলেন এবং প্রথমে শর্ত হিসেবে চারটে জিনিস চাইবেন ভেবেছিলেন বাংলার নাচ বালা, বাংলা জাত প্রচুর খোজা, আড়ম্বর এবং ইন্দ্রিয়সুখের জিনিসপত্র, পরে মন পাল্টে সেনা, বিখ্যাত অভিজাত আমীর আর হুমায়ুনকে উদ্ধার করার জন্যে যে বাহিনী প্রয়োজন হবে, সে জন্যে প্রচুর নগদ অর্থ চাইলেন। হুমায়ুন বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে আসকরির সব শর্তেই রাজি হয়ে আসকরির জন্যে কাসিক কারাছা খান, টগলান বেগ কোকা, বাবা বেগ কুরবেগের মত বিখ্যাত মীরদের নাম পাঠিয়ে দিলেন। আসকরি বাহিনী নিয়ে গঙ্গার তীরে কাহেলগাঁও ছুঁয়ে মুঙ্গেরে পৌঁছলেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে হুমায়ুনের দেখা হওয়ার কথা। হুমায়ুন দৃশ্যত বাধা ছাড়াই ভায়ের শিবিরে মিললেন।
মার্চ ১৫৩৯ অযোধ্যা আর চুনার মুঘলদের হাত ছাড়া হল। শহর ছেড়ে জৌনপুরের মুঘল প্রশাসক মিরাক বেগ আর মুঘল বেগ মুঘল বাহিনীতে যোগ দিতে পূর্ব দিকে এগিয়ে এলেন। সবে মিলে তৈরি হল বিশাল বাহিনী, শুরু হল খাদ্য সমস্যা। অর্থের অভাব ছিল না, শস্যের অভাব দেখা দিল। ফসলের দাম বাড়ল। বাদাউনি বলছেন খাদ্য সংকটের কারন হল বিহার বাংলায় অধিকাংশ মুঘল আমীরের জায়গির ছিল না, বাহিনীর জন্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চয় করা গেলনা।
মুঙ্গেরে নতুন এক পরামর্শদাতা উপস্থিত হলেন, আমাদের পূর্বে আলোচ্য, অদক্ষ মুয়ায়িদ বেগ, যে সেনাপতি শের খানের বাহিনী বাগে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিল আক্রমণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারার অক্ষমতায়। সে এবারে সম্রাটের পরামর্শদাতা হল। হুমায়ুন, আসকরির কথা না শুনে মুয়ায়িদ বেগের পরামর্শকে গুরুত্ব দিলেন। হুমায়ুন জানতেন মুঘল বাহিনীর উচিৎ ফেরার সময় যতটা পারা যায় শত্রুর জোরের জায়গাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু মাথা মোটা মুয়ায়িদ সম্রাটকে অন্য ছোট রাস্তা ধরে যাওয়ার গুরুত্ব বোঝালেন। মুঘল বাহিনী নদী পার করে দিল্লি যাওয়ার পুরোনো শাহী রাস্তা ধরল।
নদীর উত্তরের রাস্তা না ধরে তিনি উল্টো দিকের দক্ষিণের রাস্তা ধরায় মুঘল বাহিনী শের শাহের নিয়ন্ত্রণে চলে এলেন। উল্টো দিকের রাস্তা ছোট থাকলেও তাকে আগরার আগে নদী পেরোবার প্রয়োজন ছিল না। তিনি তার অগ্রবাহিনীর মাধ্যমে শের খানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চললেন। রাস্তায় বিপক্ষের দখল বিষয়ে অজ্ঞ হুমায়ুন বিহিয়ার দিকে বাঘের গুহার মুখে চললেন, সেখান থেকে পৌঁছবেন চৌসা। সেখানেও আবার তাকে নদী পেরোতে হল। শের খান এতক্ষণ মুঘল বাহিনীকে সত্যিকারের পথ দেখাচ্ছিলেন। চৌসার আবারও একবার নদী পেরোবার কথা মাথায় আসতেই শের খান মুঘল বাহিনীকে উপর্যুপরি আক্রমনের গেরিলা লড়ায়ের পরিকল্পনা ছকলেন। শুরু হল দুপক্ষের ছোটখাটো লড়াই, হাতাহাতি থেকে কামান বন্দুক নিয়ে লড়াই চলল চৌসায় গঙ্গা পার না হওয়া পর্যন্ত।
এতদিন শের খান মুঘল বাহিনীর পিছন পিছন আসছিলেন। হুমায়ুন নদী পেরোবার আগেই শের খান তৈরি হলেন গঙ্গা পেরোনো মুঘল বাহিনীকে শেষ ঘা দেওয়ার জন্যে। তিনি একটু পিছিয়ে থেকে মুঘলদের তীরে উঠতে দিলেন। ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে পিছনে রেখে মুঘলদের ওপর আক্রমন শানালেন। হুমায়ুন বুঝতে পারছিলেন মুঘল বাহিনী মানসিকভাবে হেরে বসে আছে। তিনি যুদ্ধের গতি কমিয়ে দিলেন। তিনি যদি সেনাদের উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধটা লড়তে পারতেন, অথবা তিনি যদি শের শাহের গেরিলা লড়াই উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতেন, তাহলে হয়ত ফল অন্যরকম হতেও পারত। তিনি অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শের খানের পুতুলের মত মার খেয়েগেলেন খুব একটা বড় প্রতিক্রমনে না গিয়ে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলল তিন মাস এপ্রিল থেকে ২৬ জুন ১৫৩৯।
এই রকম সমস্যাজনক পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন আরেকবার অবস্থা সামাল দিতে শের খানের সঙ্গে নতুন করে কথা শুরুর উদ্যম নিয়ে বেশ কিছু শর্ত দিলেন। ততদিনে অবস্থা পাল্টে গেছে। আমরা এর আগে দেখেছি শক্তিশালী হুমায়ুনকে চুক্তির নানান ধারা ভাঙতে। এখন যখন তিনি দয়ে পড়েছেন, তার বাহিনী হারের মুখে দাঁড়িয়ে, শের খানের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে হুমাইয়ুনের শর্ত মেনে নেওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। হুমায়ুন যখন বললেন, মুঘল বাহিনী সম্মান রক্ষার জন্যে আফগানেরা যদি হারার অভিনয় করে এবং মুঘল বাহিনী তাড়া করার অভিনয় করে তাহলে তার পিছিয়ে যাওয়া সম্মানজনক হয়। প্রথমেই শের খান হুমায়ুনের প্রস্তাব একেবারেই বাতিল করেন নি। তিনি হুমায়ুনের দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালালেন। ফরিস্তা আর নিজামুদ্দিন সূত্রে জানছি হুমায়ুন এবারে বাংলা বিহার দুটোই শের খানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন এবং বললেন তাদের রাজস্বও দিতে হবে না, শুধু তার নামে খুতবা পড়া আর মুঘলদের নামে মুদ্রা ছাপালেই মুঘলেরা বাংলা বিহারে আফগানদের অধিকার মেনে নেবে। অন্য অংশগুলো মুঘলদের অধিকারে যাবে। শের খান শুধু বললেন তিনি চুনার কেল্লাটিই শুধু চান। অপরিমানদর্শী পলাতক সম্রাট শের খানকে চুনার দিতে অস্বীকার করলে চুক্তির দরকষাকষি সেখানেই শেষ হয়ে যায়। হতভাগ্য, অবিষ্যত দেখতে না পাওয়া সম্রাটের ভাগ্যে মুক্তি দূরঅস্ত হল। যে চুক্তি স্বাক্ষর করা তার মুক্তির দিশারী হতে পারত, সেই চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করাই হয়ে গেল তার দেশ ছাড়ার চাবুক।
মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হুমায়ুন আবারও, শেষবারের মত শায়েখ বাহালুলের অনুগামী মুল্লা মীর মহম্মদ পারঘারিকে শের খানের কাছে পাঠালেন। শের খান ফরিদ শাকারগঞ্জের নবপ্রজন্ম শায়েখ খলিলকে আলোচনার জন্যে পাঠালেন। শের খানের সঙ্গে আলোচনার সময় মুঘল পক্ষ স্পষ্ট প্রশ্ন তুললেন আফগানেরা মুঘলদের সঙ্গে শান্তি চায় কী না। শের খান মুঘলদের এই অবদি ঠেলে নিয়ে আসতে চাইছিলেন। সেই ফাঁদে মুঘলেরা পা দিল। শের খান এখানেই আলাপে দাঁড়ি টানলেন।
হুমায়ুন তার আশেপাশে ঘটতে থাকা শের খানী ঘটনা বিষয়ে চোখ বুজে থাকার বেয়াদপি দেখেছি, বিশেষ করে যখন শের খানের অনুগামীরা পূর্ব ভারতের গণ্ডী ছাড়িয়ে দ্রুত উত্তর ভারতের দিকে ডানা ছড়াচ্ছিলেন, সে সময়ও তিনি প্রায় নিষ্ক্রিয়ই ছিলেন। লখনৌ আফগানের দখলে গেল। সেখান থেকে কনৌজের পূর্বাঞ্চলের রাজদ্ব আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হল। (চলবে)