অষ্টাদশ অধ্যায়
গৌড়ে হুমায়ুন, চৌসায় ফিরে আসা, আগস্ট ১৫৩৮-এপ্রিল ১৫৩৯
শের খানের সঙ্গে হুমায়ুনের দরকষাকষির পর্ব ভেঙে পড়লে, শের খান আরও সক্রিয় হয়ে উঠলেন। মুঘল বাহিনীতে চলতে থাকা তীব্র ডামাডোল বিষয়ে তিনি আফগান আমীরদের দৃষ্টি করে তাদের সক্রিয় হতে নির্দেশ দিলেন। তখনও তিনি মানসিকভাবে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে মহড়া নেওয়ার জন্যে তৈরি নন — তখনও তিনি শাসকীয় বিচক্ষণতায় সতর্কভাবে পদসঞ্চার করছেন। তিনি ক্রমশ ধীরে ধীরে নিজের শিবির ঘিরে ট্রেঞ্চ কাটতে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তিনি সুযোগ বুঝে বিপক্ষের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন – আর মুঘল বাহিনী যদি দুর্যোগ সামলে নিতে পারে, তাহলে দরকষাকষিকে হাতিয়ার করবেন। বূঝা যাচ্ছিল মুঘল বাহিনীর অসুখ গোড়ায় পৌঁছেছে, সেরে ওঠা প্রায় নামুমকিন। তিনি আক্রমনের সিদ্ধান্তই নিলেন। মুঘলদের ওপর আক্রমনের ঘোষণা বাহিনীতে সহর্ষে গৃহীত হল, বোঝাগেল আফগান চরিত্র তিনি বদল করে ছেড়েছেন।
ভাগ্যও যেন শের খানের সঙ্গ দিচ্ছে। তিন মাস বাদে বর্ষাকালে মুঘলেরা আটকে পড়ল দুটো নদী — গঙ্গা আর কর্মনাশার মধ্যের অঞ্চলে। মুঘল শিবির জলে থইথই — দাঁড়াবার উপায় নেই, সব কিছুই যেন ভাসছে। মুঘল বাহিনীকে শুকনো এলাকার সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে, এই ভারি বর্ষায় সাহায্য করার কেউ নেই। মুঘল শিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মুঘলেরা শিবির বদল করার সিদ্ধান্ত নিতে না নিতেই শের খান তার আফগান বাহিনীকে মুঘল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন।
রণনৈতিকভাবে/সামরিকভাবে আপারহ্যান্ড নিয়ে ফেলা আফগানেরা মুঘলদের ঘাড়ে চেপে বসার পরিকল্পনা করল। কিন্তু মুঘলদের যেহেতু দুটো নদী গার্ড দিচ্ছে তাই দুটো বর্ষার জলে উপছে পড়া পেরিয়ে বিপক্ষকে আক্রমন করার কাজে আফগানদের সামরিক দক্ষতার চূড়ায় উঠতে হবে।
শের খান সামান্য সামরিক পরিকল্পনায় মহারাথা চেরো (Maharatha Chero) সমাজকে কাজে লাগাবার পরিকল্পনা করলেন। মহারাথা চেরোদের গোষ্ঠীতে বাড় আর সাভার দুটো গোত্র। তারা পাহাড়বাসী। তারিখ-ই-শেরশাহতে মহারাথা চেরো গোষ্ঠীর নেতা মহাপরিক্রমী মহারথের কথা বলা হয়েছে। সাহাবাদ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে বলা হয়েছে the power of this chief appears to have been considerable; it is said in the Makhzan-i-Afdghina that he used to descend from his hills and jungles and harass the tenants round about and that he closed the door to Gaur and Bengal। চেরো গোষ্ঠীর অবাধ্যতা, বার বার শহর আক্রমন ইত্যাদি শের খানের অপছন্দের ছিল, এবং তিনি তাদের মাথা নোয়াবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। বর্ষাকালে হুমায়ুনের উল্টো দিকের আফগান শিবিরে প্রায় অকর্মন্য হয়ে বসে থাকতে থাকতে তিনি চেরোদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেন। তবে মুঘলদের পরাজিত করার আগে তিনি এই কজে সফল হন নি। বাহাদুর যখন চিতোর আক্রমন করেছিলেন তারা নিরপেক্ষ ছিল।

২৫ জুন ১৫৩৯-এ তিনি চেরো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমন শানালেন। এই খবর মুঘল বাহিনীতে ছড়িয়ে যেতে নিজেরা একটু স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার কথা ভাবছে, ভোরবেলা শের খান চেরোদের গ্রাম আক্রমন আর যুদ্ধ মাঝখানে থামিয়ে ফিরে আসার রাস্তায় ঘুমন্ত মুঘল বাহিনীকে অবাক করে আক্রমন শানালেন।
উনবিংশ অধ্যায়
২৬ জুন, ১৫৩৯এ চৌসার যুদ্ধ; ১৭ মে ১৪৫০ কনৌজের যুদ্ধ
এর আগের অধ্যায় শেষ করেছি মুঘল বাহিনীর ওপর আফগানদের হঠাত আক্রমনের সংবাদে। ২৫ জুন ১৫৩৯-তে মহম্মদ জামান মির্জা ছিলেন রাতের পাহারাদারদের নেতা। তাকে বলা হয়েছিল খাওয়াস খানেরা রাতে আফগান শিবির থেকে বড় বাহিনী নিয়ে বেরিয়েছে, সে সেই হুঁশিয়ারিতে জান না দিয়ে শিবিরের এক কোণায় এক কোনায় ঘুমিয়ে কাদা। অনুগামীরাও নেতার অনুসরনে ঘুমোচ্ছিল। গোটা মুঘল শিবির ছিল নিরাপত্তা শূন্য। (১ছবি)
ওপরের ছবিতে আমরা আফগান আর মুঘল শিবিরের অবস্থান দেখিয়েছি। ওপরের ছবি থেকে প্রমান, দুই বাহিনীই গঙ্গার এক দিকে আর শাখা নদী কর্মনাশার দুপাশে শিবির দেলেছিল। আফগানেরা মুঘলদের থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত ছিল, ওপরের ছবি থেকে পরিষ্কার। চেরো রাজ্য ছিল কর্মনাশার দক্ষিণে। (২ ছবি)
দ্বিতীয় ছবিতে আক্রমনের ধারা দেখানো হয়েছে। শের খান একটা বিপজ্জনক পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন। তিনি মুঘল শিবির আক্রমনে নেতাদের এগিয়ে আসার কথা বললে একমাত্র খাওয়াস খান হাত তোলেন, অন্যরা মুঘলদের আক্রমন করার কথা শুনেই চুপ হয়ে যায়। শের খানের ছেলে জালাল খান আর ভলেন্টিয়ার করা সেনাপতি খাওয়াস খানকে নিয়ে মুঘল শিবির আক্রমন করল আফগান সেনা স্বয়ং শের খানের নেতৃত্বে।

জালাল চৌসা শহরের মুখের দিক থেকে আক্রমন করলেন, শের খান শত্রু শিবিরের মাঝখান থেকে আর খাওয়াস খান গঙ্গার তীরে মুঘল শিবিরের পিছন থেকে আস্তাবলের দিক থেকে নদীর সেতু উড়িয়ে দিয়ে ঢুকলেন। ঘুমন্ত মুঘল শিবির কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই তিন আফগান সেনাপতি তিন দিক থেকে শত্রু শিবিরকে হতচকিত করে ঘিরে ধরল। মুঘলরা জেগে উঠে দেখে পালাবার সেতুটাও ভাঙা আর সেতুর আশেপাশের অঞ্চল খাওয়াস খানের সেনা পাহারা বসেছে দলে দলে। ঘোর বর্ষা কালে সাধারণভাবে পূর্বাঞ্চলের যে কোনও নদী বিশাল আকারের চওড়া হয়ে যায়, যে নদী সাধারণ সময়ে হেঁটে পার হওয়া যায়, বর্ষাকালে সে চিন্তা মাথা থেকে বার করে দিতে হয়। কর্মনাশার মত উপনদীও ভীষণাকার হয়ে উঠেছে।
শত্রুরা মুঘল শিবিরের প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা ভেঙে ঢুকে এলেও অধিকাংশ সেনাপতি শত্রুর মহড়া নেওয়ার জন্যে অপ্রস্তুত। যে সেনাপতি মহম্মদ জামান মির্জার ক্যালাসনেসে এই রকম একটা ঘটনা ঘটতে পারল, সে লোকটা কাউকে কোনও জানান না দিয়ে চুপিসারে সাঁতার কেটে নদী পার হয়ে পগারপার হতে গিয়ে জলে ডুবে মারাগেল। বাবা বেগ জালাইর, তারদি বেগ, কোচ বেগ তাড়াহুড়ো করে হুমায়ুনের তাঁবুতে পৌঁছোলেন তাঁকে শিবিরের সঙ্গীন অবস্থা বুঝিয়ে বলতে। তারদি বেগের মত বড় সেনাপতি তাকে খবর দিতে এসে দেখেন, হুমায়ুন শত্রুর আক্রমনের খবর জানেন, তিনি তখন জামাকাপড় পরে ঘোড়ায় ওঠার তোড়জোড় করছেন।
ততক্ষণে মুঘল বাহিনী দিশাহারা, চার দিকে উদ্দেশ্যবিহীন ছোটাছুটি — প্রত্যেকের উদ্দেশ্য যে কটা সেতু আছে সব কটা ধরেই সবার আগে শত্রুর আক্রমনের হাত থেকে বাঁচা। কিন্তু দেখাগেল অনেক আগেই এ সব সম্ভাবনা ভেবে নিয়েই, সেই অঞ্চলে যে সব সেতু ছিল, সবকটা ভেঙে রেখে শের খান মুঘল শিবির আক্রমন করেছেন। ফলে নদী পার হওয়ার দুটো পদ্ধতি হয় সেতু করে পার হওয়া [নদী সেতু বলতে মূলত নৌকা সমান্তরালভাবে সাজিয়ে তার ওপর হাঁটার মত পল্টুন সেতু] বা হেঁটে পার হওয়া। পরের অসম্ভাবনার বিষয়টা আগেই আলোচনা করেছি। (চলবে)