উনবিংশ অধ্যায়
২৬ জুন, ১৫৩৯এ চৌসার যুদ্ধ; ১৭ মে ১৪৫০ কনৌজের যুদ্ধ
মুঘল বাহিনীতে তুর্কি, এশিয়া মাইনর, ইরাক ইত্যাদি অঞ্চলের সেনা চাকরি করত। মুঘল নাকাড়ার শব্দে শের খানের ৭০,০০০ সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মুঘলদের মাত্র ৩০০ সেনা একজোট হল — বোঝা গেল অধিকাংশ আফগানদের তৈরি করা চাপে শিবির ছেড়ে পালিয়েছে, বাকি যারা ছিল পালাবার তোড়জোড় করছে। অকুতোভয় হুমায়ুন ছোট বাহিনী নিয়ে বিশাল আফগান বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। সম্রাটকে সামনে রেখে মুঘল-আফগান বাহিনীর মধ্যে অসম লড়াই চলল। হাতিতে বসা হুমায়ুন বল্লম চালিয়ে সামনের দিক থেকে তেড়ে আসা বিপক্ষের হাতিকে আহত করলেন, উল্টোদিকে হাতিতে বসা আফগান সেনার ছোঁড়া বর্শায় কিছুটা আহত হলেন। নদী তীরের একতরফা গণহত্যা উৎসবে সম্রাটের পিছনে লড়াই করা ৩০০ সেনাও বিপদ বুঝে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আশেপাশে লড়াই করতে থাকা কয়েকজন সেনা দেখলেন সম্রাট নিজের সুরক্ষা না নিশ্চিত করেই সমানে লড়েচলেছেন। কয়েকজন অনুগামী তাঁকে ঘিরে নিয়ে ঘোড়ার লাগাম ধরে লড়াই ক্ষেত্রের বাইরে নদীর দিকে নিয়ে গেল। কিন্তু দেখাগেল নদীর ওপরের কিছু সেতু আফগানেরা ধ্বংস করেছে, বাকিগুলো শত্রুর দখলে। প্রশ্ন উঠল সম্রাট পালাবেন কী করে? কাউকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে শাহী হাতিতে বসে হুমায়ুন খরস্রোতা নদীতে নেমে গেলেন। নদীর স্রোত এতই তীব্র ছিল যে জলের টানে হাতিতে বসে থাকতে পারলেন না, হাওদা থেকে জলে পড়ে গেলেন। সম্রাট নদীগর্ভে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন দেখতে পেয়ে নিজাম নামে জনৈক ভিস্তিওয়ালা তাঁকে ভিস্তি ভাসিয়ে উল্টো দিকের তীরে পৌঁছে দেয়। সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি ভিস্তিওয়ালার নাম জানলেন এবং তাঁর সঙ্গে হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার তুলনা করলেন। আসকরিও তার কাছাকাছি সময়ে তীরে উঠলেন। তার পালানোর ঘটনা জানা যায় না।
দুই শাহী ভাই ছাড়া হাতে গোণা কয়েকজন আফগান হত্যালীলার হাত থেকে বাঁচল। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউ নদী পার হতে গিয়ে প্রাণ দিল। সে রাতে কত সেনা মারা গেছে, স্বাভাবিকভাবে মুঘল ইতিহাস লেখকেরা তার কোনও হিসেব নেওয়ারই চেষ্টা করেন নি।
যে সব বিখ্যাত সেনাপতি সে দিন প্রাণ দিলেন তাদের নাম উল্লেখ করা যাক। আগেই বলেছি যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তে পালাতে গিয়ে মহম্মদ জামান মির্জা ডুবে মারা যায়। তিন মৌলবী মহম্মদ পারঘরি, থাট্টার জালালুদ্দিন আর কাসিম আলি সদর প্রাণ দিলেন। বেগা বা হাজি বেগমের গ্রেফতার হওয়ার সংবাদে যে চার সেনাপতিকে পাঠালেন, তাদের মধ্যে একমাত্র তারদি বেগ ছাড়া বাবা বেগ, কোচ বেগ আর মীর বাচকা বাহাদুর যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ হারালেন। তাজকিরাতউলউমারা বলছে মীর পালওয়ান বদাকশিও মারা গিয়েছেন। মহিলাদের মধ্যে যারা জলে ডুবে মারা গেছেন, তাদের কয়েকজনের নাম গুলবদন বেগম উল্লেখ করছেন চাঁদ বিবি, সাদ বিবি, বেগা বেগমের এক মেয়ে, সুলতান হুসেইন বায়াকারার কন্যা আয়েশা বেগমও।
ধরা পড়লেন সম্রাটের প্রধান রাজ্ঞী বেগা বেগম। তিনিই মুঘল সাম্রাজ্যের একমাত্র বিপক্ষের হাতে গ্রেফতার হওয়া রাজ্ঞী। মুঘল শিবিরে ব্যাপক গণ্ডগোলের মধ্যেও শের খান সম্রাটের প্রধান রাজ্ঞী বেগা বেগমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন মুঘল মহিলাদের গ্রেফতার বা দাস বানানো যাবে না। মুঘল মহিলাদের এক জোট করে বেগা বেগমের তাঁবুতে সুরক্ষা বলয় তৈরি করে রাখা হল। শের খান রাজা হলে এদের নিজেদের বাড়িতে পাঠানো হল। বেগা বেগমও পরে হুমায়ুনকে বলেছিলেন তিনি তো দূরস্থান, একজনও মুঘল মহিলার দেহে একটুকরো আঁচড় লাগে নি। বেগা বেগম বা পরে হাজি বেগমকে আকবরও অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন, তাঁকে দ্বিতীয় মা গণ্য করতেন [আকবর আবুলফজলকে বলেছিলেন অনেকেই তাঁর মা হিসেবে হামিদা বেগমের নাম জানেন না, মনে করেন তাঁর মা বেগা বেগমই।

শের খান জেতার পরে লিখলেন
শের খান মুঘলদের ওপর নামিয়ে আনা হত্যালীলা বন্ধ করিয়ে সেনা বাহিনীকে গৌড়ে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে ৫,০০০ Be it said as a tribute to his magnanimity that Sher Khan refrained from pursuing and slaughtering the Mughals. Instead, he departed eastward to Gaur, and captured the Mughal contingent of 5,000, left behind under Jahangir Quli Khan.
মসনদ-ই-আলি ঈশাখানকাকবুরে বলা হয়েছে মুঘলদের বিরুদ্ধে জয়ের পরে মসনদিআলা ঈশা খান তাকে রাজা হিসেবে মেনে নেন। তিনি লিখছেন ফাতা-নামা উপাধি দিতে পারে একমাত্র দেশের রাজা। তার অবর্তমানে এই উপাধি অর্পণ করা যায় না। ঈশা খানের প্রস্তাব সমর্থন করেন আজম হুমায়ুন সারওয়ানি আর মিঞা বিবান লোদি। অন্য আফগান নেতাও তার তারিফ করলেন। শেষ পর্যন্ত শের খানের দীর্ঘকালের স্বাধীন রাজা হওয়ার শখ মিটল। তার উপাধি হল সুলতান শের শাহ আসসুলতানইআদিল আবুল মুজফফর ফরিদুদ্দুনিয়উদ্দিন। রাজা হয়ে তিনি দুটি হত্যাকে জাস্টিফাই করলেন একটা হল গৌড়ে জাহাঙ্গীর কুলি খান এবং তার ৫,০০০ সেনা এবং দিলাবর খান খানইখানান। মাথায় রাখতে হবে দিলাবরকে মুঙ্গের থেকে গ্রেফতার করে তাঁকে কালকুঠুরিতে বন্ধ করে রাখেন। আফগানেরা তার আনুগত্যকে ঘৃণা করত আর মুঘলেরা তার মৃত্যু চাইত। তারা তাকে প্রত্যেক দিন আধ সের রান্না না করা বার্লি খেতে দিত। তাতেও তাঁর মৃত্যু হয় নি। ফলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। তাঁর অনুগামীরা আফগান হলেও, হয় তাদের মুক্তি দেওয়া হল, না হয় তাদের বাহিনীতে চাকরি দেওয়া হল। শের শাহ তার প্রশাসন সাজিয়ে নিতে বাংলায় কয়েক সপ্তাহ থেকেগেলেন। (চলবে)