উনবিংশ অধ্যায়
২৬ জুন, ১৫৩৯এ চৌসার যুদ্ধ; ১৭ মে ১৪৫০ কনৌজের যুদ্ধ
আমরা এবারে হুমায়ুনের দিকে নজর ঘোরাই। তীরতে পৌঁছেই তিনি দ্রুত চুনারের দিকে এগোলেন। আহত, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সম্রাট সেখানে বেশি দিন থাকলেন না। আরাইলে পৌঁছলে কয়েকশত অনুগামী জুটল। প্রতিবেশী রাজা বীরভান তার সাহায্যে ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ সেনা দিলেন। বীরভানের বাহিনী মীর ফরিদের বিরুদ্ধে গৌড় যুদ্ধে বাহিনীর পিছনে লড়েছে। হুমায়ুনের বাহিনীকে খাওয়ারদাওয়ার দিলেন। মুঘলেরা রাজার নিরাপত্তায় কিছু দিন থাকলেন, বেশ কিছু ঘোড়াও কিনলেন। বীরভানের আতথ্য ছেড়ে কারায় গিয়ে সেখানেও কিছু দিন থাকলেন; রসদ জোগাড় করলেন ঘোড়ার জাবনা কিনলেন। আরও এগোতে গিয়ে দেখলেন আফগানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কনৌজ হয়ে যেতে হবে; ফলে তিনি গঙ্গার পাড় ছেড়ে যমুনার পাড় ধরলেন। নদী পার হয়ে দক্ষিণের তীরের কাল্পী শহরে পৌঁছলেন। তার সঙ্গে আফগান গোষ্ঠী নেতা শাহ মহম্মদ কারমালি দেখা করলেন, তাঁর সঙ্গে আসা আফগানেরা মুঘলদের লাঞ্ছনা করে নি।
পথ চলতে চলতে হুমায়ুনের অনুগামীর সংখ্যা ক্রমশ কমেছে; যারা বাহিনীতে রইল, তাদের অধিকাংশ সম্রাটের ভাল-মন্দ বিষয়ে নিস্পৃহ, প্রত্যেকেই নিজেদের দল নিয়ে ব্যস্ত। এলাকায় হুমায়ুনের পৌঁছনোর সংবাদে কাসিম কারাছার ছেলে ধুমধাম করে উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করলে, কাসিমের বাবা পুত্রকে বললেন পলাতক সম্রাটের জন্যে এতসব কিছু সম্পদ খরচ করার কীই বা দরকার। বাবার কথায় উপহারের সংখ্যা কমে গেল। উপহার দেওয়া অনুষ্ঠানের আগে হয় হুমায়ুন জানতে পেরেছিলেন কারাছা গোষ্ঠীর বাবা-ছেলের কথোপকথন অথবা উপহারগুলো বা দেওয়ার তারিকা তার পছন্দ না হওয়ায় একটামাত্র হাওদা রেখে সব উপহার ফিরিয়ে দিলেন অবহেলে, হাওদাটিও তিনি কামরানকে প্রতিউপহার দলেন। বাংলায় সেনা পাঠানো নিয়ে কামরান তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও বাবরের উপদেশ স্মরণ করে তিনি ভাইকে বকলেন না, ভাইকে রসেবশে রাখলেন। কল্পিতে হুমায়ুন খবর পেলেন ১৫৩৮-এর শের শাহ চৌসার দিকে আসছেন। তিনি নতুন করে শত্রুর কবলেও না পড়তে তাড়াতাড়ি আগরা পৌঁছনোর জন্যে পথে হাঁতার গতি বাড়িয়ে দিলেন।
আগরায় দেখা হল কামরানের সঙ্গে। অতীতের নিজের কর্মকাণ্ডে লজ্জিত হিন্দাল আলোয়ারে মুখ লুকিয়েছেন, হুমায়ুনের সামনে আসতে সংকোচ। কামরান তাকে সম্রাটের সামনে নিয়ে এসে ক্ষমা চাওয়ালেন মাথা নামিয়ে। হিন্দালের ত্রিহুত ছেড়ে যাওয়া বা পরের সময়ে হিন্দালের সিংহাসন দখল যে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, হুমায়ুন হয় এই তত্ত্ব-তথ্য বুঝলেন না, না হয় ভাইএর অস্বস্তির জন্যে উল্লেখ করলেন না। চার ভাই এক সঙ্গে কয়েকদিন কাটালেন মহাআনন্দে। মহম্মদ সুলতান মির্জাও তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। তিনি জীবনভোর হুমায়ুনের বিরোধ করে তাকে বার বার বিপদে ফেলেছেন। এমন কী বিহারে আফগানদের মুঘল বিরোধী অবস্থান নিতে সহায়তা করেন, কিন্তু তিনি বিহারেই বুঝলেন তাঁর এত সাহায্য সত্ত্বেও আফগানেরা তাকে নিজেদের করে তো নেয়ই নি, বরং তাঁকে বহিরাগতের মত ব্যবহার করছে সারাক্ষণ। তাছাড়া আফগানদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়াও হচ্ছিল। তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে ভেঙেপড়া কিন্তু জ্ঞানী মানুষ হিসেবে হুমায়ুনের আশ্রয়ে ফিরে এলেন। এর পরে আর সুলতান মির্জার সম্রাট বিরোধী বিদ্রোহের সংবাদ পাই না।
যুদ্ধের পর প্রায় প্রত্যেক প্রধানা মুঘল জেনানা আগরা পৌঁছলেন। গুলবদন লিখছেন হুমায়ুনের সঙ্গে এই সময় আগরায় আনন্দে কাটানো দিনগুলোর কথা। হিন্দালের মায়ের সঙ্গে সম্রাটের বৈঠকের কথাও লিখছেন। তবে আমরা গুলবদনের সূত্রে জানতে পারলাম, যদিও কামরান, হিন্দালকে সম্রাটের কাছে ক্ষমা চাওয়াবার জন্যে নিওয়ে আসে, আদতে পর্দারে পিছনে কলকাঠি নেড়েছিলেন সম্রাটের সৎ মা দিলদার বেগম। তিনিই হিন্দালকে ক্ষমা চাওয়াবার জন্যে উদ্যোগী হন(আমরা এর আগে বলেছি, হিন্দাল যখন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন, সে সময় কীভাবে প্রকাশ্যে তাঁর মা দিলদার, শোকের প্রতীক নীল আলখাল্লা পরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন — অনুবাদক)।
চৌসা যুদ্ধে হুমায়ুন আহত হন। ক্ষতস্থানে পচন ধরছিল। ক্ষত সারেয়াতে তাঁকে ৪০ দিন অন্তঃপুরে বিশ্রামে কাটাতে হয়। কামরানও এই সময়ের অসুস্থ হয়ে পড়েন। কামরান বহুদিন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান নি। এটাও হুমায়ুনের অসুস্থতার আরেকটা কারন। হুমায়ুনের বিরাট বাহিনী প্রথমে বাংলায় পরে চৌসায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। তাঁর আশা ছিল ভায়ের দক্ষ ২০০০০ সেনা নিশ্চই আগামী দিনে সাম্রাজ্যের কাজে ব্যবহার করা যাবে; সম্রাটের ইচ্ছা, ভায়ের সেনাবাহিনী নিয়ে আবারও আফগানদের মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু কামরান দাদার প্রস্তাব গ্রাহ্য করলেন না, তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে দিলেন। তার মনে হয়েছিল হুমায়ুন যুদ্ধ জেতা বা নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তি নন। চৌসায় ভিস্তি দিয়ে জল সরবরাহ করী তাঁকে তীরে উঠতে সাহায্য করার প্রতিদান হিসেবে এক দিনের জন্যে সিংহাসনে বসার অধিকার এবং তার সামনে রাষ্ট্রীয় তিজোরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল পদক্ষেপ। এটা প্রশাসক সম্রাট চরিত্র নয়। তাছাড়া তিনি মনে করেন, চৌসা যুদ্ধে রণনীতির খামতিও মুঘল বাহিনীর পরাজয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে। কামরান দাদাকে জানাল আফগানদের বিরুদ্ধে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে মুঘল বাহিনীর নেতৃত্ব তিনিই দেবেন, হুমায়ুন নন, কারন বাহিনী তাঁর, সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। হুমায়ুন যখন বললেন সম্মান উদ্ধারের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁকে প্রতীকী নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হোক, কামরান সেই প্রস্তাবেও রাজি হলেন না।
অসুস্থ কামরান তৎকালীন প্রখ্যাত হেকিম মীর আবুল বাকার অধীনে থাকলেও চার মাসেও তাঁর রোগ সারল না। ক্রমশ হাত পায়ের এবং কথা বলার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকলে। উদ্বিগ্ন কামরান লাহোরে ফিরে যেতে চাইলেন। হুমায়ুন প্রতিবাদ করলেও কামরান শিবিরের ধারণা হচ্ছিল তাকে নিশ্চই বিষ দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা কামরানকে পাঞ্জাবে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।
হুমায়ুন আবারও নতুন করে কামরানকে আফগানদের বিরুদ্ধে বাহিনী ব্যবহার করার প্রস্তাব দিলেন। অসুস্থ কামরান নিস্তেজভাবে প্রতিবাদ জানালেন। ঠিক হল মীর আবদুল্লা মুঘলের নেতৃত্বে ৩,০০০ সেনা হুমায়ুনের সঙ্গে থাকবে, বাকি সেনা খাজা কালানের নেতৃত্বে ফিরে যাবে তার সঙ্গে লাহোরে। বলা হয় খাজা কালানই বাবরের সময়ের মত, এবারও গাঙ্গেয় সমভূমিতে মুঘল সেনা অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন।
দাদাকে সেনা না দেওয়ার অন্য একটা কারন হল তার নিজের সুরক্ষা। তাঁকে দুদুবার ইরানীরা আক্রমন করেছে প্রথমবার ১৫৩৫-এ স্বয়ং শাহ আবার ১৫৩৭-এ। তাই তিনি নিজের সুরক্ষা ক্ষুণ্ণ করে এই বড় বাহিণী ভাইকে উপহার দিতে চান নি। তাদের আশংকা ছিল এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই আবারও কাবুল আক্রমন করতে পারে। দুই ভায়ের মধ্যে এই বিতর্ক চলল সাত মাস জুলাই ১৫৩৯ থেকে মার্চ ১৫৪০। (চলবে)