প্রথম অধ্যায়
শাহজাদা হুমায়ুন, ১৫০৮-৩০
দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করার পর বাবর বুঝলেন সুস্থ হওয়া তাঁর ভাগ্যে লেখা নেই। আবুলফজল লিখছেন, তাঁর শেষের দিনগুলো এগিয়ে আসছে বুঝতে পেরে তিনি খাজা খলিফা, কামবার আলি বেগ, তারদি বেগ এবং হিন্দু বেগের মত মহান আমীরদের ডেকে হুমায়ুনকে সিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়া দেখলেন। ছেলের প্রতি তাঁর শেষ উপদেশ ছিল, যদি তারা যোগ্য না হয়, তাহলেও তুমি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে না, Do naught against your brothers, even though they may deserve it। হুমায়ুন বাবার বাণী মেনে চলেছেন। তিন দিন পর ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর প্রয়াত হলেন।
পুত্রের জীবনদানে বাবরের প্রাণদান বিষয়ে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা গেল —
১) মধ্য যুগে একজনের দেহের রোগ, অন্যজনের দেহে সঞ্চারের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, আজও কোথাও কোথাও সেই ধারণার অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়;
২) বাবর, আলির কাছে পুনর্জন্ম চেয়েছিলেন; সাধারণত সুন্নিরা আলির খলিফাত্ব স্বীকার করে না;
৩) এক দেহ থেকে অন্য দেহে রোগ টেনে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা খুবই ধীর; ফলে হুমায়ুন নিজে বুঝল যে তার সুস্থ হতে অনেকটা সময় লেগেছে;
৪) তবে শাহজাদার রোগ কিন্তু বাবরের দেহে প্রবাহিত হয় নি। হুমায়ুনের প্রবল জ্বর হয়, আর বাবরের পেট খারাপ আর অন্ত্র সমস্যা ছিল। বাবরের হেকিমদের ধারণা চার বছর আগে ইব্রাহিম লোদির মা তাঁর দেহে যে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন, তারই প্রভাবে বাবর অসুস্থতা দেখা দেয়।
আগ্রার চারবাগ বা আরাম বাগে কবর দেওয়া হয়। শের শাহের রাজত্বকালে বাবরের পঞ্চম পত্নী আফগান কন্যা বিবি মুবারিকা ইয়ুসুফজাই [বিবি মুবারিকা এবং ইয়ুসুফজাই সমাজ — বিবি মুবারিকা আফগান ইয়ুসুফজায়ী গোষ্ঠীপতি মালিক শাহ মনসুরের কন্যা। তাঁর ঠাকুর্দার নাম মালিক সুলেইমান শাহ এবং তুস খানের ভাইঝি। মুবারিকার এক ভাই মীর জামাল বাবরের সঙ্গে ভারতে আসেন ১৫২৫-এ, খান উপাধি পান এবং হুমায়ুন আর আকবরের আমলে বড় পদে চাকরি করেছেন। বাবর মুবারিকাকে ১৫১৯-এর ৩০ জানুয়ারি বিবাহ করেন। মুবারিকার পারিবারিক দৌত্যে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইয়ুসুফজায়ী গোষ্ঠীর সুসম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁকে বাবর খুবই ভালোবাসতেন। মুঘল মহিলা দলের সঙ্গে ১৫২৯-এ ভারতবর্ষে আসেন। তিনিই আগ্রা থেকে বাবরের দেহ শের শাহের আমলেই কাবুলে দাফন করান। খুবই বড় যোদ্ধা দল। পুস্তু ভাষা বলে। প্রথম উল্লেখ পাচ্ছি বাবরনামায়। বাবর কাবুল দখল করেন ১৫০৪-এ। তিনি লিখছেন On Friday we marched for Sawad (Swat), with the intention of attacking the Yusufzai Afghans, and dismounted in between the water of Panjkora and the united waters of Chandāwal (Jandul) and Bajaur. Shah Mansur Yusufzai had brought a few well-flavoured and quite intoxicating confections। মুঘল ইয়ুসুফজাই চুক্তি হিসেবে বাবর মুবারিকাকে বিয়ে করেন। ইব্রাহিম লোদিকে হারাতে ইয়ুসুফজাইদের বড় অবদান ছিল। মুবারিকার ভাই মীর জামাল ইয়ুসুফজাই মুঘল সেনাপতি হন। ইয়ুসুফজাইদের রোশনিয়া মুভমেন্ট নতুন করে শুরু হল আকবরের আমলে পীর রোশনের প্রপৌত্রের নেতৃত্বে। আকবর বাহিনী পাঠান। তারপর থেকেই মুঘলদের সঙ্গে বিবাদ চলতে থাকে। আওরঙ্গজেব জিতলেও সুখে ছিলেন না। আহমদ শাহ দুরানি গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গোষ্ঠী সংগঠন উলুস তৈরি করেন — দুরানি, খলজি, সুর, আর বর [আপার] দুরানি প্রশাসনিক কেন্দ্র হল। ইয়ুসুফেরা বর দুরানিতে রইল। তাদের সঙ্গে থাকল মহম্মদ, আফ্রিদি, বাঙ্গাস আর খট্টক। বর দুরানি হল রো রাষ্ট্র যেখান থেকে রোহিলা এসেছে। এই গোটা দল যে অঞ্চলে বাস করতে শুরু করে তার নাম হল রোহিলাখণ্ড। নাজিবুদৌলা ছিলেন বড় ইয়ুসুফজায়ি রোহিলা প্রধান। তিনি নাজিবাবাদ শহর তৈরি করেন আর ১৭৫৭-র আহমদ শাহ দুরানির দিল্লি আক্রমনে অন্যতম নেতা হন। লুঠের পর নাজিবুদৌলা দিল্লিতে দ্বিতীয় আলমগিরকে সিংহাসনে বসান। তিনি ভারতে থেকে যান। সাহারানপুর আর দেরাদুনের শাসক হলেন। ছেলে জাবিতা খান মারাঠাদের কাছে হেরে রোহিলাখণ্ডে পালান। এর আত্মীয়রা থেকে যান এবং ১৫৫৭-র যুদ্ধে অংশ নিয়ে হেরে যান। ১৫৪৯-এ সাইদু বাবার নেতৃত্বে ব্রিটিশেরা ইয়ুসুফজাই সোয়াত রাষ্ট্র তৈরি করে। একই সঙ্গে আজকের উত্তর পাকিস্তানে দীর রাষ্ট্রও তৈরি করল ইয়ুসুফজাই আখুন্দ ইলিয়াসের নেতৃত্বে। ব্রিটিশেরা ১৮৯৭-তে দীরের প্রধানকে দীরের নবাব আর সোয়াতের প্রধানকে সোয়াতের ওয়ালি উপাধি দেয়। ১৫৬৯ অবদি এরা স্বাধীন ছিল। এর পরে পাকিস্তানের সঙ্গে মার্জ করে যায় — অনুবাদক] বাবরের দেহ কাবুলের শাহইকাবুল পাহাড়ের সানুদেশে কবর দেন। ক্রমশ বাবরের স্মৃতিতে এখানে একটি বাগান গড়ে ওঠে। ছুটি, সময় কাটাতে এখানে বহুমানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। বাবর এবং মুবারিকার বহু আত্মীয়কে এখানেই কবর দেওয়া হতে থাকে। উত্তরাধিকারীরা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতিতে বাগানে সাজসজ্জা বাড়াতে থাকেন এবং শাহজাহান একটা মসজিদও বানিয়ে দেন আর তার কবরের ওপর পরিচয় খোদাই করা পাথর লাগিয়ে দেন জাহাঙ্গীর।
শেষ ১৯ মাসের পঞ্জিকা/ঘটনাক্রম তুলে দেওয়াগেল
১৫২৯
১। হুমায়ুন বাদাকশন থেকেও আগরা পৌঁছলেন জুলাই
২। হুমায়ুন আগরায় থাকলেন জুলাই আগস্ট
৩। তাঁকে সম্ভলে পাঠানো হল আগস্টে
১৫৩০
৪। সম্ভলে হুমায়ুন আর লাহোরে বাবর থাকলেন আগস্ট থেকে জানুয়ারি
৫। সম্ভলে হুমায়ুনের অসুস্থতা, জানুয়ারি
৬। আগরায় এলেন জানুয়ারির শেষে
৭। বাবরের আত্মদান ফেব্রুয়ারি
৮। হুমায়ুন সুস্থ হলেন মার্চ
৯। হুমায়ুন কিলিঞ্জরে কাটালেন মার্চ থেকে আগস্ট
১০। হুমায়ুনকে আগরা ডাকিয়ে আনা হল আগস্টে
১১। বাবরের দুই কন্যার বিয়ে হল সেপ্টেম্বরে
১২। হুমায়ুনের সিংহাসনে আরোহন ২৩ ডিসেম্বর
১৩। বাবরের মৃত্যু ২৬ ডিসেম্বর (চলবে)