উনবিংশ অধ্যায়
২৬ জুন, ১৫৩৯-এ চৌসার যুদ্ধ; ১৭ মে ১৪৫০ কনৌজের যুদ্ধ
শের শাহের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের শেষ মরিয়া লড়াই
১৭ মে ১৫৪০-এ যুদ্ধ শুরু হলে মুঘল সেনা তড়িঘড়ি করে মূল শিবর থেকে তিনটে ডিভিশন নিয়ে নিজেদের সাজিয়ে নিতে থাকে মধ্যকেন্দ্রে ছিল হুমায়ুন আর হায়দার মির্জা, বাঁ দিকে নদীর ধারে ছিল হিন্দাল এবং ডান দিকে উঁচু জায়গায় ছিল ইয়াদগার নাসির খান। অগ্রবাহিনী আসকারির দায়িত্ব ছিল। উস্তাদ আলিকুলির পুত্র মহম্মদ খান রুমি, উস্তাদ আহমেদ রুমি আর হাসান খলিফার নেতৃত্বে ৫ হাজার ম্যাচলক বন্দুকওয়ালা বন্দুকচি ছিল। মুঘলদের বাহিনীতে সংরক্ষিত বাহিনী আর দুপাশে নিরাপত্তা বাহিনী ছিল না।
আফগানদের ছিল সাতটা ডিভিশন — মধ্যে ছিলেন স্বয়ং শের খান, তার সামনে লম্বা করে ট্রেঞ্চ কাটা। ডান দিকে দুই জালাল জালাল খান আর জালাল খান জালু, বীর নিয়াজিরা তাদের বাহিনী নিয়ে ছিল। বাঁ দিকে ছিল কিরানি আফগানদের নিয়ে শের শাহের বড় ছেলে আদিন খান। চার আর পাঁচ ডিভিসন দুপাশে ছড়ানো ছিল, যাতে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে মুঘলদের তুলঘামা রণনীতিকে (Tulughma means dividing the whole army into three parts i.e. Left, Right and Center. The Left and Right divisions were further divided into Forward and Rear divisions. The motive behind this was to attack the enemies from all sides as Babur had a small army and it was difficult to cover more ground and attack the huge forces of Lodi) অকেজো করা যায় এবং মুঘলদের চার দিক দিয়ে বেঁধে ফেলা যায়। খাওয়াস খান আর বার্মাজিদ গৌর ছিলেন ভ্যানগার্ড। আর একটা ডিভিসন রিজার্ভ রাখা হয়েছিল।
আফগানেরা যুদ্ধ শুরু করল মুঘলদের বাঁদিকে আক্রমন করে। উদ্দেশ্য নদীর ধারে শিবির থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা। হিন্দাল মির্জা আর জালাল খান শূরের মধ্যে লড়াই শুরু হল। জালাল খান ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন, আফগানেরা তার বাহিনী সাবাড় করে দিল মুহূর্তের মধ্যে। জালাল খানের বাহিনীতে গণ্ডগোলের সূত্রপাত হচ্ছে দেখে শের শাহ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন্দ্র ছেড়ে সেখানে গিয়ে আক্রমন করবেন। তাকে নিরস্ত্র করেন কুতুব খান সাহুখালী লোদি। তিনি কেন্দ্র ছেড়ে দিলে বাহিনী মনোবল হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে, জেতা যুদ্ধ আফগানেরা হেরে বসবে। শের শাহ অন্য সেনাপতি পাঠালেন সামাল দিতে। হিন্দালের প্রাথমিক সফলতা সত্ত্বেও তিনি সেটাকে ধরে রাখতে পারলেন্ না, একের পর এক সেনাপতি তাদের বাহিনী নিয়ে অবস্থা সামাল দিতে এগিয়ে এলেন। বিশেষ করে নিয়াজীরা বিপুল লড়াই দিল।
দুই দলের অগ্রবাহিনী মুখোমুখি হল, আসকরি শত্রুর আক্রমন এর চাপ নিতে পারলেন না, মূল বাহিনীতে ঢুকে এসে বন্দুকচিদের সামনে কিছুটা অবরোধ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বন্দুকচিদের বারুদ ছোঁড়া বন্ধ হয়েগেল।
তবে মুঘলদের বড় ধাক্কাটা এল ডানদিক থেকে। ইয়াদগার নাসির আর কাসিম হুসেইনদের আদিল খান আর সরমাস্ত খান তাড়িয়ে দিল। ইয়াদগারকে নিজের এলাকা ছেড়ে কেন্দ্রে ঢুকে যেতে হল; এই সুযোগে আফগানেরা মুঘলদের চার দিক ঘিরে ফেলে পিছনের দিকে একটা বাহিনী পাঠিয়ে দেয়।
আফগানেরা ডান দিকটার যুদ্ধটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল। হিন্দাল প্রথম সময়ে সাফল্য পেলেও কেন যে এগোতে পারল না সে যুক্তি আজ আর পরিষ্কার নয়। নতুন বাহিনী এসে পড়ায় জালাল নতুন করে বল পেয়ে আরও তেড়ে ফুঁড়ে আক্রমনে গেল। হিন্দালকে পিছিয়ে যেতে হল। চতুর্থ ডিভিশন উপযুক্ত সময়ে শত্রুর পিছনে আক্রমন করার জন্যে প্রস্তুত হয়।
আফগানদের একের পর এক সাফল্যের ফলে যে সব মুঘল অসামরিক কর্মী মূল শিবিরে ছিল তারা পালাতে শুরু করল। তাড়াহুড়োয় বাহিনী তৈরি করার সময় গুণগত মান দেখা হয় নি, এবারে যুদ্ধে বিপক্ষের চাপে যখন মুঘল বাহিনী কিছুটা নড়বড় করছে সে সময় আর সেই নতুন অসেনা রিক্রুটদের আর শিবিরে রাখা গেল না। তারা শিবিরে থাকা বাকি সেনাদের সঙ্গে মিলে হুড়োহুড়ি করে পালাতে গিয়ে একটা হট্টগোলের পরিবেশ তৈরি হল। আরও বড় সমস্যা তৈরি হল হায়দার মির্জা অসামরিক লোকজনের সঙ্গে সামরিক সেনার মিলমিশ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে আসতে দেওয়ায়; আর একই সঙ্গে কামানের যে সব গাড়ি চামড়ার শৃঙ্খল দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা থাকত, সেই বাঁধন সে খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায়। এই দুটো কাজ সে কেন হতে দিল তার কোনও যুক্তি সে দেখায় নি। এমনও হতে পারে পিছনে বিশাল সংখ্যক মানুষের চাপে সে অসহায় হয়ে পড়ছিল ক্রমশঃ।
কারন যাই হোক এই বিশৃঙ্খলায় যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি যুদ্ধ করা দুই বাহিনীর মধ্যে এসে পড়ে হঠাতই যুদ্ধকে শেষের দিকে নিয়ে যায়। আফগানেরাও রণনীতি পরিবর্তন করে যুদ্ধ থেকে গণহত্যা করতে থাকে। হায়দার মির্জা বলছেন, ১০০০ সেনার বাহিনীর মধ্যে মাত্র ৮ জন ফিরল।
স্পষ্ট করে বলা দরকার ১৪ বছর আগে পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্র বাবর প্রযুক্ত তুলঘামা রণনীতিতেই কনৌজের যুদ্ধে মুঘলদের হারাল আফগানেরা। আফগানদের বিজয়ের জন্যে দায়ি প্রথমত শের শাহের অসামান্য চাতুর্যপূর্ণ রণনীতি, দ্বিতীয়ত হুমায়ুনের অপেশাদার নদী পেরোবার সিদ্ধান্ত।
হুমায়ুনের পরাজয়ের কারনগুলো বিশ্লেষণ করা যাক
১) মুঘলরা এই যুদ্ধের ফলে দিল্লি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারাল। এই হারের জন্যে সর্বাংশে হুমায়ুনকেই দায়ি করা উচিৎ। গোটা যুদ্ধক্ষেত্র একা তার তুতোভাই হায়দার মির্জার নিয়ন্ত্রণে দিয়েছিলেন। হারের যুক্তিতে হুমায়ুন বলেছেন বিপক্ষের দরবেশদের কারনামে, তুকতাকের জন্যে মুঘল বাহিনীর হার হল। হুমায়ুন নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এই সব গল্প বানিয়েছেন। শের শাহ যে তার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে মুঘল বাহিনীকে তুকতাকে বশীভূত করতে দরবেশদের এনেছিলেন, এমন কোনও নিদর্শন পারসিক ইতিহাসেই উল্লিখিত হয় নি। সব থেকে বড় কথা হুমায়ুনের রণক্ষেত্র বুঝতে সীমাবদ্ধতা তার ভায়েরা জানতেন। অথচ কামরান যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি সেটা গ্রহণ করেন নি।
২) ব্যর্থতার আরও একটা কারন হল যুদ্ধ অনভিজ্ঞ সেনা নিয়ে বাহিনী তৈরি করেছিলেন হুমায়ুন, তাদের যুদ্ধ করার অভ্যেস, দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ছিল না। মুঘলদের হয়ে সেনানীরা হয় বাংলার মড়কে মরেছিলেন, না হয় চৌসার যুদ্ধে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছিলেন বা কামরানের সঙ্গে লাহোরে চলে যান। যাদের নিয়ে হুমায়ুন যুদ্ধ করতে এলেন তাদের দিয়ে আর যাই হোক যুদ্ধে জেতা জায় না। হিন্দাল বা কাসিম হুসেইনের মত মুঘল সেনাপতিরা যুদ্ধদক্ষ ছিল; যদিও হায়দার মির্জার দাবি মুঘল সেনাপতিরা ভিতু, কাপুরুষ, শত্রুর আক্রমনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না — হায়দারের এই দাবির ভিত্তি নেই সেটা স্পষ্ট। ঠিক তেমনি তার বয়ান একজনও বন্ধু, মানুষ বা শত্রু আহত হয় নি এই বয়ানকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না।
৩) নির্বোধের হুমায়ুন নদী পার না হলে মুঘলদের এরকম লজ্জাজনক হার হত না আর আফগানেরা এত সহজেও জিততে পারত না। তাছাড়া শিবিরের জন্যে নদীর তীরে নরম জায়গা না বাছলে হারটা লজ্জাজনক হত না।
৪) শুধু সেনাই নয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্যে বেসামরিক গুলাম দলও অদক্ষ ছিল, অনভিজ্ঞ ছিল। (চলবে)