বিংশ অধ্যায়
সম্রাট আগরা ছাড়লেন
যুদ্ধ শেষ করে পলাতক মুঘলদের পিছন ধাওয়া করল আফগানেরা। হুমায়ুন, ভৃত্য জওহরের (আফতাবাচি) সঙ্গে গঙ্গা তীরে পৌঁছোলেন। নদী, সমুদ্রের মত চওড়া, হেঁটে পার হওয়ার উপযুক্ত নয়। হুমায়ুন দেখলেন হাওদায় শাহী আমলা বসানো, শাহী ছাপ মাথায় দাগানো মুঘল বাহিনীর যুদ্ধ-সাজের হাতি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে। ঘনিষ্ঠ নজরে দেখে বুঝলেন ব্যক্তিটি পিলখানা [হাতির আস্তাবল] নির্দেশক খোজা আমলা কাফুর। হুমায়ুন, কাফুরের পিছনে হাতিতে চড়ে বসলেন নদী পার হওয়ার বাসনায়। কিন্তু হয় ভয়ে ভীত অথবা হয়ত বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্যে মাহুত বর্ষা-স্ফিত নদী পার হতে অস্বীকার করল। সময় নষ্ট না করে হুমায়ুন মাহুতের মাথা কাটলেন। খোজা আমলা মাহুতের জায়গায় বসিয়ে, হুমায়ুন হাতিকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। ভরা বর্ষার বিপুল স্রোত আর জল ভরা নদীতে দিক ঠিক রেখে হাতিকে ঠিক মত চালিয়ে পার হতে কষ্ট করতে হলেও কিন্তু সেই কাজটা দক্ষ হাতে সামলেছেন খোজা কাফুর। ভিজে নদীকূলে হাতিকে তুলতে এবং নিজেদের পাগড়ি খুলে সম্রাটকে হাতি থেকে নামতে সাহায্য করেছেন আগেই নদী পেরিয়ে পশ্চিমপারে উঠে দাঁড়িয়ে থাকা সেনারা। বলা হয়েছে এই দলে ছিলেন পরের সময় প্রখ্যাত শামসুদ্দিন আতকা খান। এই কাজের জন্যে তিনি পরের দিকে উপযুক্তভাবে সম্মানিত হবেন।
আসকরি মির্জা, হিন্দাল মির্জা, ইয়াদগার নাসির মির্জাও কিছু পরে নদী পেরিয়ে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দিলে, দলটা আগরার দিকে রওনা হয়ে গেল শাহী রাস্তা ধরে। তারা যখন ভোনগাঁও পেরোচ্ছিলেন সে সময় সেই অঞ্চলের লোকজন সম্রাটের বাহিনীকে আক্রমন করে, ‘তাদের না কী অভ্যেস পরাজিত সেনাদলকে লুঠ করা’। এই গোলোযোগে ইয়াদগার নাসির খান তীরের ঘায়ে আহত হলেন। ইয়াদগার নাসির খান, আসকরিকে গ্রামের মানুষজনকে শাস্তি দেওয়ার অনুরোধ করলে আসকরি অপমানিত হন এবং দুজনের মধ্য্যে ঝগড়া হয় এবং এক সময় দুজন দুজনকে ঘোড়ার ছপটি দিয়ে মারতে থাকেন। মুঘল বাহিনীর মধ্যে আত্মলাঞ্ছনা আর গোলযোগ চরমে ওঠে। শেষ পর্যন্ত দুঃশাসিত গ্রামীনদের শাস্তি দেওয়া হয় এবং শাহী দল আগরার দিকে যাত্রা বজায় রাখে।
পরের দিকে শাহী দল রাজপথ ছেড়ে মৈনপুরী-ফিরোজাবাদ-আগরা রাস্তা ধরে। আজ যেখানে তাজ মহলের মহতাব বাগ, সে সময় হুমায়ুনের প্রাসাদ সেখনে ছিল, পরে শাহজাহান তাঁর পূর্বজর প্রাসাদ ভেঙে মহতাব (চার) বাগ তৈরি করেন। হুমায়ুন সেখানে ঢূকলেন না। তিনি গেলেন প্রখ্যাত সন্ত সৈয়দ রাফিউদ্দিন (আবুলফজলের মা সন্তের পরিবারের কন্যা। সন্তই শের শাহের রাজত্বে পুরন মলের মৃত্যুর ফতোয়া দেন। তিনি যেহেতু সাফাভি, তাছাড়া হাসান এবং হুসেইনি সৈয়দও, তাই তাঁর শিয়া প্রবণতা থাকা স্বাভাবিক — অনুবাদক) সাফাভির দরবারে। সন্ত পলাতক সম্রাটের সঙ্গে সাধারণ খাওয়াদাওয়া করলেন — পাইনবাদাম আর ঘি-এর গন্ধওয়ালা গরম ভাত, নুন জল আর সরষেতে ডোবানো বেগুনের আচার, তেঁতুলে চোবানো মুরগির ঝোল (সন্তের আশ্রমে খাদ্যের মেনুর অংশটা পেয়েছি https://kitchensofhistory.wordpress.com/tag/sayyid-rafiuddin-safavi/ থেকে)।
পলাতক হতমান সম্রাট যুদ্ধ ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে প্রাসাদে ঢুকলেন না, অনুগামীদের তাঁর সঙ্গে সন্তের আশ্রমে দেখা করতে বললেন। কামরান ছাড়া ভাইরা এবং অন্য মির্জা আগরার সিক্রিতে জড়ো হল আগামী দিনের ইতিকর্তব্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে। কিন্তু তারা জানে শত্রু পিছনে ধাওয়া করেছে, আলোচনা সভা বেশিক্ষণ চালানো প্রত্যেকের অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অনিচ্ছায় সিক্রি ছাড়লেন উত্তর-পশ্চিমের দিকে যাওয়ার তাগিদে। সিক্রিতে একটা সন্দেহজনক ঘটনা ঘটল; কোনও এক অজানা ব্যক্তির গোপন জায়গা থেকে ছোঁড়া তীর হুমায়ুনের গায়ে লাগে না একটুর জন্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তীরান্দাজের খোঁজে দুই প্রহরী পাঠালে তারাও আহত হয়ে ফিরে আসে। হুমায়ুনের ফেরার রাস্তায় সেই হামলা করা গ্রামের কথা মনে এল। তিনি যদিও প্রায় সিংহাসন হারিয়েছেন, কিন্তু পরের ঘটনা থেকে প্রমান তিনি রাজকীয়তা হারান নি, তন্তত তাঁর অনুগামীদের কাছে তখনও তিনিই রাজা। পালাবার সময় মীর ফকর আলি বেখেয়ালে হুমায়ুনের সামনে হেঁটে গিয়ে থাকবেন। হুমায়ুন, ভৃত্য ফকর আলির এই বেয়াদপির জন্যে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। অনুগামী ভৃত্য ফকর আলি আর কোনও দিন সামনে আসেন নি।
বাজাউনায় খবর এল আফগান সেনাপতি মীর ফরিদ গৌর হুমায়ুনের খুব কাছে পৌঁছেগেছেন। আসকরির তাড়ায় দল দ্রুত এগিয়ে চলে। ভরা বর্ষাকালে পথ চলা খুব সুখদ ঘটনা ছিল না। রাস্তায় খাদ্যের অভাব, রোগভোগ লেগেই রইল মুঘল বাহিনীতে। নিজের স্বার্থে হুমায়ুন নির্দেশ দিলেন দুপাশের বাহিনী তাকে সুরক্ষা দেবে, বাকি আমীরেরা পিছনে থাকবে। তখনও তিনি কাউকে তাঁর সামনে থাকতে দিচ্ছিলেন না, যদি কেউ সামনে যায়ও তাদের পরিবার ধ্বংসের হুমকিও ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন। তখনও তার অনুগামীরা হুমায়ুনের সম্মান বজায় রাখছিলেন।
Hindavi, The Kitchens of Indian History
Sayyid Rafiuddin Safavi — Hindavi, The Kitchens of Indian History
Posts about Sayyid Rafiuddin Safavi written by scribetraveller
তবে হুমায়ুনের বিশাল দলের সকলেই যে তাঁকে একই রকম সম্মান দেখাচ্ছিলেন এমন নয়। শৃঙ্খলা ভাঙার বেশ কিছু উদাহরণ আমরা পাচ্ছি। সাধারণ এক সেনার ঘোড়া ছবিতা বাহাদুর নামে এক অভিজাত বলপ্রয়োগে দখল করলে, সম্রাটের নির্দেশেও সে সেটা ফেরত দিতে অস্বীকার করে। হুমায়ুন তাঁকে তাঁর সামনেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন। পরের কিছু দিন, বর্ষার ফলায় ছবিতা বাহাদুরের মাথা গেঁথে ঊর্ধ্বে তুলে হাঁটানো হল। এই মৃত্যুদণ্ডের ফল ফলল। এর পরে আর কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় নি।
জওহর বলছেন হুমায়ুন আলওয়ার হয়ে গেছেন। হয়ত দিল্লিও ছুঁয়েছেন, কিন্তু বেশি দিনের জন্যে থাকতে পারেন নি। আফগানদের তাড়ায় তাকে নিরন্তর হাঁটতে হয়েছে। ইতিমধ্যে শের শাহ আগরা দখল করেছেন। ফলে হুমায়ুনের দিল্লি থাকার সুযোগ কমেছে। তিনি পশ্চিম দিকে পালাচ্ছেন। তার গন্তব্য সিরিহিন্দ। ইতিমধ্যে শের শাহ দিল্লি দখন নিয়ে সম্রাট হয়েছেন। হুমায়ুন সিংহাসনচ্যুত হলেন।
উপসংহার
ঐতিহাসিকেরা হুমায়ুনকে ব্যর্থতার কাঁটার মুকুট পরিয়েছেন এবং তাঁর শেষ জীবনের দুখদ ঘটনাসূত্রে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছচ্ছেন। লেনপুন কাব্যি করে বলছেন, ‘তিনি সারা জীবন হোঁচট খেয়ে গড়িয়ে পড়ে রাস্তা চলেছেন, পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময়েও সেইভাবেই গেলেন’। ভিনসেন্ট স্মিথ বলছেন, ‘হুমায়ুন যদিও শিক্ষিত ভদ্রবিত্ত, দক্ষতার অভাব না থাকলেও বাবার মত উদ্যমী তৎপরতায় যথেষ্ট খামতি ছিল’। এই বক্তব্যগুলোর মধ্যে অনেকটা সত্যতা থাকলেও তাঁরা হুমায়ুনের চরিত্র বুঝতে এ সব স্থূল পর্যালোচনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ তাকে দেখেছেন হাস্যে-আলাস্যে-লাস্যে সময় কাটানো, রাজকীয়তার চরিত্রবিযুক্ত শাসক, কেউ তাকে নৃশংস গণহুত্যাকারী আর নিষ্ঠুর শাস্তিদাতা হিসেবে।
কিন্তু তৎকালীন সূত্রগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আমরা সামগ্রিক চিত্রটা দেখতে পাই। হুমায়ুন শিল্প প্রেমী, জ্ঞানী, পণ্ডিত, তীব্রভাবে মানবিক, নৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য, সৈনিকের গুণাবলীবিশিষ্ট এবং সেনাপত্যের অধিকারী। তা সত্ত্বেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তার চরিত্রের জন্যে। আমি এই বইতে তার গুণাবলীও যেমন আলোচনা করেছি, তেমনি তার ত্রুটিগুলোও লুকোই নি।