দ্বিতীয় অধ্যায়
সাম্রাজ্যের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বাবর। তার দীর্ঘকালের প্রশাসন চালানোর দক্ষতা, পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সেনা করার মানসিকতা এবং খানওয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাভিযান সংগঠিত করে তিনি সম্রাটের সামনে নিজেকে অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিপন্ন করেছিলেন। খলিফা ছাড়াও তিনি আরও তিনটে পদ অলঙ্কৃত করতেন আমীর, উকিল এবং সুলতান। পারিবারিক উপাধি সৈয়দ, খাজা আর বারলাস তুর্ক, তাঁর বংশের উচ্চমর্যাদা জ্ঞাপন করে। উচ্চপদের ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কম ছিল না। তার ছোট ভাই জুনায়েদ বারলাস বাবরের বোন শহরবানুকে বিবাহ করে। কন্যা গুলবর্গ বেগম সিন্ধুর শাহ হুসেইন আরঘুনকে বিয়ে করে, পুত্র মুহিব আলি শাহ হুসেইনের সৎ কন্যা নাহিদকে বিবাহ করে। তাঁর খলিফা সম্মানের মাত্রা বোঝা যায় তিনি এবং স্ত্রী সুলতানম বেগম যখন মাত্র ৬ বছরের গুলবদন বেগমের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেই বাচ্চা মেয়ে তাঁকে দেখে, তাঁর সামাজিক সম্মান বুঝে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং তাঁদের প্রভূত সম্মান জানিয়ে আমন্ত্রণ জানান। পাল্টা সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি শিশু গুলবদনকে রাতভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁকে ৬০০০ শাহরুখি আর পাঁচটা ঘোড়া আর তাঁর স্ত্রী ৩০০০ শাহরুখি আর তিনটে ঘোড়া উপহার দেন। খানওয়ার যুদ্ধের পরে তাঁকে ‘হজরত সুলতানের আত্মার আত্মীয় এবং খাকান সাম্রাজ্যের মুকুট অভিধা দেওয়া হয়। হুমায়ুনের দুর্ভাগ্য, সম্রাটের অনুমতি এবং তিনি স্বয়ং উপস্থিত থাকা থাকা সত্ত্বেও, খলিফা তাঁর সিংহাসনে আরোহনকে বৈধতা দিতে চান নি। তাঁকে মনোনীত করেন খানজাদা বেগমের স্বামী বাবরের জামাই সৈয়দ মাহাদি খাজা। এই বিষয়ে পরে আলোচনায় আসব।
কিন্তু সম্রাট বাবরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে হুমায়ুনের সিংহাসনে আরোহনের প্রক্রিয়াকে খলিফার চ্যালেঞ্জ জানানোর নিশ্চই কোনও কারন থেকে থাকবে। হয়ত তার মনে হয়েছিল হুমায়ুন পরিচালিত রাজত্বে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। মুঘল হিন্দুস্তানে সাম্রাজ্যের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। মুঘলেরা তখনও আশেপাশের অঞ্চল নিজেদের তাঁবেতে আনতে পারে নি। সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল তখনও। হয়ত খলিফা ভাবছিলেন সেই মুহূর্তে রাজা পরিবর্তন সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন নয়, সাম্রাজ্যের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। মনে হয় খলিফার মনে তিন বছর আগের বাদাকশনে যাওয়ার সময়(১৫২৭) হুমায়ুনের দিল্লির খাজাঞ্চিখানা লুঠের স্মৃতি ফিকে হয়ে যায় নি, তিনি হয়ত এই দুষ্কর্মকে ক্ষমার অযোগ্য বলে আজও মনে করেন। তাছাড়া তার হয়ত মনে পড়ছিল সেই ঘটনায় হুমায়ুনকে শাস্তি দেওয়া তো দূরস্থান পানিপথ আর খানওয়া যুদ্ধের পর সম্রাট বাবর হুমায়ুনকে হাত উপচেপড়া উপহার দিলেন দ্বিধা না করেই। খলিফা জানতেন না যে হুমায়ুন বাদাকশনে গিয়েছেন সম্রাটের অনুমতি নিয়েই ফলে তার ধারণা হয়েছিল হুমায়ুন দায় ঝেড়েও ফেলে বাদাকশনে পালাচ্ছেন। সম্রাটের পরের পদে সাম্রাজ্য চালানোর পদাধিকারী হয়ে খলিফা বাবরের ওপর শিয়া মাহাম বেগের অতুলনীয় প্রভাবকে মেনে নিতে পারেন নি [মাহামের মহলে দিলদার বেগমের ছেলে হিন্দাল বড় হয়েছে। বাবরের পাশে সিংহাসনে বসতেন মাহাম। মাহাম সুলতান হুসেইন প্রখ্যাত বাইকারার আত্মীয় ছিলেন, জিন্দা-পীর আহমদ জানের বংশধর। ফলে বাবর ছাড়াও মুঘল সাম্রাজ্য পরম্পরায় মাহামের প্রভাব অতুলনীয় ছিল। মাথায় রাখতে হবে সুন্নি মুঘল সম্রাটের বহু রাজ্ঞী শিয়া ধর্মাবলম্বী ছিলেন]। যদিও মুঘল সাম্রাজ্যের আমলাদের মধ্যে ইরানি-তুরানি দ্বন্দ্ব পরের দিকে ব্যপ্ত হয়েছে, কিন্তু আমরা দেখলাম, সেই দ্বন্দ্বের শেকড় চারিয়েছে বাবরের আমল থেকেই। স্বাভাবিকভাবের তাঁর ধারণা ছিল তুর্কি আমীর অভিজাতরা এ সব ইস্যুতে নিশ্চিতভাবে খলিফার পাশে দাঁড়াবেন। ফলে খলিফার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল, যে হুমায়ুনের সিংহাসন লাভ সাম্রাজ্যের স্বার্থপূরণ করবে না। তিনি এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করলেন।
সমস্যা হল খলিফা তাঁর প্রভাব খাটাতে অনেকটা এগিয়ে গেলেন। তিনি শুধু সম্রাটের বড় ছেলেই নয়, সম্রাটের একটিও পুত্রকে সিংহাসনের যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলেন। কামরান হুমায়ুনের থেকে ৬ বছরের, আসকরি ৮ বছরের আর হিন্দাল ১০ বছরের ছোট। ফলে হুমায়ুন ছাড়া একজন শাহজাদার বালকত্ব কাটেনি। খলিফা, বয়সে বাবরের থেকেও বড় ছিলেন, ৩৫ বছর বাবর-সঙ্গ করেছেন। আমরা ধরে নিতেই পারি সিংহাসনে আরোহনের বিরোধিতা করেছেন খলিফা সম্পূর্ণ আত্মস্বার্থেই।
তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ হল সিংহাসনে আরোহন করানোর জন্যে কাউকে নির্দিষ্ট করা। তিনি সম্রাট হিসেবে মনোনীত করলেন, বাবরের থেকে ৫ বছরের বড় খানজাদা বেগমের স্বামী সৈয়দ মহম্মদ মাহাদি খাজা তিমরিজিকে। অনেকে বলেন তিনি মাহামের আত্মীয়, ফলে তিনি যে উচ্চবংশজাত ছিলেন, সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। তিনি বাবরের দিয়ানবেগী হিসেবে কাজ করেছেন এবং ১০০০০ সেনা নিয়ে বুখারা অভিযান করেন। পানিপথ আর খানুয়ায় তিনি মুঘল বাহিনীর বাঁ দিকের ডানায় ছিলেন আর হুমায়ুন ডান দিকের ডানায়। প্রথম যুদ্ধের পর যে দল দিল্লি অধিকার করতে যাচ্ছিল, সেই দলে তাঁকে প্রধান করে জুড়ে দিলেন বাবর এবং আগরায় গেলেন হুমায়ুন। ফলে তিনি যে খুবই প্রখ্যাত আমীর এবং খুব কম করে ২০ বছর সাম্রাজ্যকে পণ্য সরবরাহ করেছেন এ বিষয়ে ইতিহাস সাক্ষী।
খানজাদার স্বামী হওয়ার সুযোগ নিয়ে তিনি সাম্রাজ্য জুড়ে, প্রাসাদজুড়ে, যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রভাব খাটিয়েছেন। তবে খানজাদা, বাবরের বড় বোন হওয়ায় মাহাদির থেকে খানজাদার প্রভাব অনেক বেশি ছিল। তবে দুজনের পক্ষে ক্ষমতা বিস্তারের কাজ করেছেন মাহাদি স্বয়ং। ফলে কর্ম দক্ষতা, বংশ পরিচয়ে তিনি সিংহাসন দখলের দৌড়ে সবার আগে এগিয়ে গেছেন। (চলবে)