দ্বিতীয় অধ্যায়
খলিফা প্রস্তাব দেওয়ার পরেও, তিনি কীভাবে খাজার সিংহাসনের বসানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সম্রাটের মনোনয়নকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হলেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাচ্ছি খাজা নিজামউদ্দিন আহমদএর তবাক-ই-আকবরিতে [এবং অতি অবশ্যই আবুলফজলের বয়ানে]। নিজামউদ্দিন আহমদ বর্ণনাটা পেয়েছেন, তাঁর বাবা, ঘটনার সময় উপস্থিত, প্রত্যক্ষ্যদর্শী অভিজাত আমলা মহম্মদ মাকিম হেরাভি সূত্রে। তিনি বলছেন বাবর হুমায়ুনকে মনোনীত করা সত্ত্বেও খলিফা, হুমায়ুন (এবং তাঁর অন্য ভাইদের) সিংহাসনে আরোহনের বিষয়টি অবজ্ঞা করে নিজের পছন্দমত প্রার্থী, সম্রাটের শালা মাহাদি খাজাকে সিংহাসনে বসাবার পরিকল্পনা আঁটলেন। সম্রাট তখনও প্রয়াত হন নি, অথচ তিনি সিংহাসনে আরোহন করার প্রস্তাব পেয়েছেন অর্থাৎ তিনি অদূর ভবিষ্যতে সিংহাসনে আরোহন করবেন, এই ভাবনাতেই খাজার মাথা ঘুরে গেল — তিনি উদ্ধত আচরণ করে ধরাকে সরা দেখতে শুরু করলেন। সে সময় একদিন মাকিম [মাকিমের সরকারি পদ ছিল দেওয়ানি বুয়ুতাত এবং তিনি শাহী গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকও ছিলেন] খাজার কাছাকাছি ছিলেন। খাজার সঙ্গে খলিফা দেখা করতে আসা মাত্র সম্রাটের ভৃত্য এসে তাঁকে এত্তেলা দিয়ে বলল সম্রাট তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। খাজা, খলিফাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। খলিফা বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই, মাকিমের উপস্থিতি ভুলে বলে খাজা উঠলেন, ‘সর্বশক্তিমান আমায় সিংহাসনে অভিষিক্ত করার পরেই প্রথম কাজ হবে তার মত বিশ্বসঘাতকদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া’। এই স্বগতোক্তির পর তার খেয়াল হয়েছে মাকিম তো সেই ঘরে রয়েছেন, মাকিম বুঝলেন হাওয়া গরম। তিনি পালাতে যাবেন, সেই মুহূর্তে খাজা এসে তার কান ধরে গরগর করে বলেউঠলেন, ‘ওহে তাজিক [মূল অর্থ দাস, মাটিকাটার মুনিস], লাল জিভ, সবুজ মাথাকে হাওয়া করে দেয় [O Tajik it is the red tongue that gives the green head to the wind] অর্থাৎ জ্ঞানীরা জিভকে সামলে রাখে। খাজার থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি দৌড়ে খলিফার সঙ্গে দেখা করে খাজার বক্তব্য উপস্থাপন করে বললেন, আপনার দৃষ্টিপথে শাহজাদা হুমায়ুন বা তাঁর দক্ষ বাহুবলী ভাইরা থাকা সত্ত্বেও আনুগত্য আর হৃদয়ের সমস্ত আশা এমন এক অজানা, প্রায়-অচেনা, ভুল পরিবারের মানুষকে সিংহাসনে বসাবার মনস্থ করেছিলেন, যে সিদ্ধান্তের অন্তিম ফল আপনি এবং আপনার মত কিছু উচ্চপদস্থ মানুষের প্রাণদানের ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু হওয়া সম্ভব ছিল কী?’ খলিফা বুঝলেন তিনি কী ভুলই না করতে যাচ্ছিলেন। তিনি মাহাদি খাজাকে গ্রেফতার করে অন্তরীণ করলেন, সম্রাটের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করলেন।
বাবরের মৃত্যু হলে, তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রয়াণ সংবাদ বহুক্ষণ কাউকে জানানো হয় নি। কাকে সিংহাসনে বসানো যায় তাই নিয়ে বহুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললেও এক ভারতীয় আমীর আরাইশ খান যখন জানালেন বেশিক্ষণ সিংহাসন খালি রাখা উচিৎ নয়, তখন সকলে সচকিত হয়ে উচিৎ সিদ্ধান্ত নিলেন হুমায়ুনের পক্ষেই। ১৫৩০-এর ৩০ ডিসেম্বর হুমায়ুন বিধিবদ্ধভাবে সিংহাসনে আরোহন করলেন।
তবাকতের সৃষ্টিকর্তা নিজামুদ্দিন আহমেদের বয়ানে আমরা চক্রান্তের জাল কাটিয়ে হুমায়ুনের সিংহাসন আরোহনের ঘটনাবলী জানতে পারলাম। নিজামুদ্দিন ছিলেন প্রশিক্ষিত, বিশ্বস্ত যোদ্ধা, আকবরের সময়ের বকশি। তাঁর ইতিহাসচর্চা বহুকাল নির্ভরযোগ্য তথ্যের আধার হিসেবে গণ্য হয়েছে। তাঁর বাবা নিশ্চই খাজার লাঞ্ছনা শেষ দিন অবদি ভোলেন নি, প্রত্যেকটি পল নিশ্চই তাঁকে অপমান করার স্মৃতি দগদগে ঘাএর মত জেগেছিল এবং তিনি অবশ্যই সেই ঘটনা বিস্তৃত আকারে পুত্রকে জানিয়েছিলেন স্মৃতির ঝাঁপি খুলে। নিজামুদ্দিন বাবার লাঞ্ছনা লুকোন নি, চিনির সিরার প্রলেপ দিয়ে তাকে সহনীয় করেও আমাদের সামনে উপস্থিত করেন নি – ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থেকে বাবার থেকে শোনা মূল ঘটনা বাবার বয়ান অনুযায়ীই বিবৃত করেছেন। নিজামুদ্দিন হুমায়ুনের ভাগ্য বিড়ম্বনার, বিড়ম্বিত সত্য উপস্থিত করেন পাঠকের সামনে। বক্তার ইন্টিগ্রিটিতে আকবর আর আবুলফজল মোহিত হয়েছিলেন, তাই সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ঠাঁই হয়েছিল দরবারি ইতিহাস আকবরনামায়।
তবে তাঁর এই বয়ানে অন্যবাদক শ্রীমতী বেভারিজ সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। বাবরের মৃত্যুর ২০ বছর পরে লেখকের জন্ম আর ঘটনা ঘটার ৬০ বছর পরে সেটি লিপিবদ্ধ হচ্ছে, এই বিষয়টা অনুবাদক বেভারিজ মেনে নিতে পারেন নি। তাছাড়া খলিফা একা একাই চার শাহজাদার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে এমন এক মানুষ মাহাদি খাজাকে আকবরের উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, যিনি শুধু বা অন্য কোনও শাসক পরিবারের মানুষ নন, ব্যক্তিগতভাবে যার শৌর্য প্রকাশের ইতিহাস নেই – তাই গোটা ব্যাপারটাই বেভারিজের খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় নি – বানোয়াত মনে হয়েছিল। তাছাড়া তিনি মনে করেন তাবাকতএ খাজার পরিচয়ে গলতি আছে, দামাদ বা জওয়ান শব্দগুলি খাজা সম্বন্ধে প্রযুক্ত হওয়ার নয়।
তবে তিনি নিজামুদ্দিনের গোটা বয়ানকে বাতিল করছেন না, বরং বলছেন নিজামুদ্দিনের বয়ানটা আংশিক ভুল, খলিফা সম্রাট হিসেবে খাজাকে বাছেন নি, বেছেছিলেন আকবরের বড় জামাই তৈমুরী বংশধর মহম্মদ জামান মির্জাকে। চার পুত্র ছাড়া বাবরের ঘনিষ্ঠতম পছন্দের মানুষ ছিলেন তার ৩৫ বছর বয়সী বড় জামাই মহম্মদ জামান মির্জা। বাবরের মেয়ে মাসুমা সুলতান বেগম [কে {একই নামে বাবরের স্ত্রীও আছেন} তার বোন গুলবদন ‘মাহ চাচা’ (বড় দিদি চাঁদ) নামে ডাকতেন] সূত্রে এবং সুলতান বাইকারার বংশের উত্তরাধিকার সূত্রে, খাজার তুলনায় তার রাজবংশের যোগ ছিল, এবং একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী তৈমুরী আর চাঘতাই দুই বংশের উত্তরাধিকারী হওয়ায় বাবরের বড় জামাই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ঘর্ঘরা যুদ্ধের (১৫২৯) পর শ্রীমতী বেভারেজ তাঁকে স্বাধীন শাসক হিসেবে গণ্য করেছেন বাবরের বক্তব্য সূত্রে (বাবর লিখছেন, ‘তাঁকে শিরোপা, তরোয়াল, একটি কোমরবন্ধ, তিপুচাক ঘোড়া এবং একটি ছাতাও দেওয়া হল’। এই উক্তি থেকে প্রমান হয় না বড় জামাইকে তিনি স্বাধীন শাসকের মর্যাদা দিচ্ছেন; অবশ্যই অভিজাত হিসেবে তাঁর গুরুত্ব বাড়ছে ঠিকই কিন্তু কোনওভাবেই এই সম্মাননা স্বাধীন শাসকের নয়। খুরমকে শাহজাহান উপাধি দেওয়া হলে কী তিনি স্বাধীন শাসক হয়েছিলেন?)। তিনি লিখছেন, in honouring the Mirza thus, the king’s intentions were to leave the son-in-law in charge of Hindustan, and himself to move on to Kabul, or to other territories further north, i.e., more important parts of his empire। বাবরের ইচ্ছায় মাহাম বেগ হুমায়ুনকে আগরায় ডাকিয়ে আনেন। হুমায়ুন আগরায় পৌঁছলে বাবর তার উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বিজয় অভিযান কিছু দিনের জন্যে স্থগিত রাখেন এবং জামান মির্জাকে হিন্দুস্তানের প্রশাসক হিসেবে বসাবার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু হুমায়ুনের অসুস্থতা, বাবরের ছেলের রোগ নিজের দেহে নেওয়া এবং হুমায়ুনকে উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করার ঘটনাবলী এত তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে তিনি দামাদকে সিংহাসনে বসানোর কথাটা ভাবার ফুরসতই পান নি। নিজামুদ্দিন ৬০ বছর পরে ভুল করছেন এবং খাজার নাম নিচ্ছেন। (চলবে)