দ্বিতীয় অধ্যায়
অনুবাদক শ্রীমতী বিভারিজ জামাইএর পক্ষে দাঁড়ানোর এই যুক্তিটুকুই দিচ্ছেন। কিন্তু কেন মাহাদি খাজার জায়গায় মহম্মদ জামানকে সম্রাট পদে বাছা হল সে বিষয়ে তাঁর যুক্তির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বলতে পারি,
১) তৎকালীন কোনও ঐতিহাসিক মহম্মদ জামান মির্জাকে সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে চিহ্নিত করেন নি;
২) বিভারিজ যে দামাদ শব্দের ওপর যোগ দিয়ে মির্জার পক্ষ নিচ্ছেন, সে যুক্তিটাও চরম হাস্যকর। দক্ষিণ এশিয়ায় দামাদ শব্দ জামাই, শালা, শ্বশুর ইত্যাদি প্রায় এই ধরণের নানা সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করা যায় এবং প্রয়োগ অনুযায়ী তার মানে বদলে যায়। ফলে দামাদ অর্থে শুধু জামাই বোঝায় না। দুজন লেখক স্পষ্টভাবে বাবরের সঙ্গে খলিফারর নমিনির সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন, প্রথমজন বাবরের কন্যা গুলবদন বেগম, তিনি স্পষ্টভাবে ‘ইয়াজনা’ বলেছেন আর খন্দআমীর হাবিবুসসিয়ারে নাম করে বলছেন তিনি বাবরের বড় বোন খানজাদা বেগমকে বিবাহ করেছেন — দুজইনেই মাহাদি খাজার নাম নিয়েছেন।
৩) একইভাবে ‘জোয়ান’ বা যুবা বলতে আমরা ৩০ বছরের মানুষকেও বলতে পারি আবার ৫০ বছরের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সম্পদের প্রাচুর্যওয়ালা, সুস্থ ব্যবহারের মানুষকেও জোয়ান আখ্যা দিতে পারি। যদিও তিনি ৫০ বছর বয়সী, কিন্তু আমাদের এই আলোচনায় তিনি জোয়ান না হওয়ার কারন নেই।
৪) তাঁর যুক্তি ছিল সিংহাসনে কোনও তৈমুরীর আসীন হওয়ার কথা। মহদি খাজা তৈমুরী না হলেও, মির্জা কিন্তু তৈমুরী বংশজাত। আর যদি ধরেই নি হুমায়ুনকে খলিফা অপছন্দ করতেন, তাহলে হুমায়ুনের পরে কামরান বা অন্য ২ তৈমুরী ভাইএর কথাও ভাবতে পারতেন তিনি। তাছাড়া ছিলেন মহম্মদ সুলতান মির্জা আর তার বাচ্চারা, তারাও সুলতান হুসেইন বায়কারার বংশোদ্ভুত। আর ছিল ক) মহম্মদ সুলেইমান আর তার পুত্র ইবরাহিম মির্জা, খ) ইয়াদগার নাসির মির্জা, বাবরের ভাইপো, গ) মির্জা সৈয়দী আহমেদ আর তার পুত্র সুলতান আহমেদ এবং নাতি আবদুল বাকি ঘ) কিচিক মির্জা। তাছাড়া সরাসরি সুলতান হুসেইন বায়কারার উত্তরাধিকারীও ছিলেন। যদি শুধু তৈমুরী বংশের কাউকে বেছে নিতে হয়, তাহলে পছন্দের প্রচুর সুযোগ ছিল। এদের মধ্যে মহম্মদ সুলতান মির্জা ছিলেন যোগ্যতম, বহু যুদ্ধের নায়কও তিনি। বলা দরকার শ্রীমতী বেভারেজের হুমায়ুনের মাথামোটাত্ব বা মাজাদি খাজার বাবরের প্রতি অনানুগত্য নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না, সেই সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি তার যুক্তি সাজিয়েছেন। যাই হোক আমাদের নিজামুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিটা শব্দ মান্যতা দিচ্ছি। ক) তিনি সোজা ভাষায় ইতিহাস লিখেছেন। তাঁর ইতিহাসচর্চা সন্দেহের ঊর্ধ্বে এবং অসামান্য। ঘটোনাটি প্রমানিত, এবং প্রশাসনের নানান শ্রেণীর আমলা তার বক্তব্যকে মান্যতা দিয়েছেন। খ) মাহাদি খাজাকে খলিফা সিংহাসনে আরোহনের প্রস্তাব দেন, এবং খলিফা যাকে বাছলেন, তিনি আদৌ বাবুরি বা তৈমুরী কী না, তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা ছিল না। খাজা, মুসলমান সমাজে সর্বমান্য সৈয়দ, সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত এবং প্রখ্যাত আমীরও ছিলেন, যিনি তার জীবন উতসর্গ করেছিলেন সাম্রাজ্যের জন্যে। গ) মাহাদি খাজা ছিলেন খলিফার বন্ধু। তিনিই দরবারে মাহম বেগের বিপুল প্রভাব নিজেই বা খানজাদা বেগমের মাধ্যমে প্রশমিত করতে পারতেন।
খলিফা যখন সিংহাসনের জন্যে প্রতিনিধি বাছছেন, তখন তার ধারণা ছিল না এর ফলে সেই মানুষটা একরোখা বদমেজাজি হয়ে উঠবেন। যখনই তিনি বুঝলেন যে তিনি বোকামো করেছেন, মুহূর্তের মধ্যে তিনি হুমায়ুনের পাশে এসে দাঁড়ালেন। খলিফা বা মাহাদি হাসানের ভবিষ্যৎ কী হল সে বিষয়ে ইতিহাস খুব বেশি সরব নয়। অনেকেই মনে করেন খলিফাত মন্ত্রীত্ব যায় নি, এবং অতীতকর্মের জন্য তাঁকে হুমায়ুন শাস্তি দেন নি। তাঁর ছোট ভাই জুনায়েদ বারলাস জৌণপুর এবং আরও অনেক সুবার প্রশাসক হিসেবে কাজ করেছেন। হুমায়ুনের রাজত্বকালে খলিফা প্রয়াত হলে, তাঁর স্ত্রী হুমায়ুনের জেনানায় থাকতে শুরু করেন এবং হুমায়ুন সাম্রাজ্য হারানোর পরে মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনিও তাদের সঙ্গে অনুগমন করেন। তাঁর দুই পুত্র মুহিব খান আর খালিদ বেগ হুমায়ুনের রাজত্বে বিখ্যাত হন।
মাহাদি খানও বেঁচে ছিলেন, খানজাদার স্বামী হিসেবে শাহী পরিবার অংশ হিসেবে। সাত বছর পর তার বোন সুলতানমের বিয়ে হয় হিন্দাল মির্জার সঙ্গে। বিয়ের সময় খাজা হাত ভর্তি করে উপহার দেন। হিন্দালের সঙ্গে তিনিও কাবুলে যান। হিন্দাল মারা যাওয়ার কিছু মাস পরেই তিনিও প্রাণ হারান। দুজনকেই কাবুলে কবর দেওয়া হয়।
অর্থাৎ সম্রাটের বিরুদ্ধে চক্রান্তের সঙ্গী দুই রাজপুরুষ শাস্তি না পেয়ে, তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচেছিলেন বহুকাল। তাদের বৃহত্তর পরিবারের প্রতিও হুমায়ুন বিদ্বেষ পোষণ করেন নি।
দিল্লির আমীর খুসরুর মাজারে মাহাদি খাজার নামে প্রোথিত শিলায় লেখা আছে ‘সৈয়দের মহিমা আর মর্যাদায় উন্নীত’। (চলবে)