তৃতীয় অধ্যায়
হুমায়ুনের রাজত্ব। ১৫৩০-৩১-এ কিলিঞ্জর অভিযান
হুমায়ুন ২৩ বছরে, ৩০ ডিসেম্বর ১৫৩০-এ সিংহাসনে আরোহন করলেন। মধ্যযুগীয় রাজাদের মত সিংহাসনে আরোহন করার প্রথা অনুযায়ী প্রজাদের তিনি মুক্ত হস্তে দান দিলেন, পূর্বজ’র রাজত্বের আমলাদের সম্মান দিলেন, অনুগামীদের মাইনে বাড়ালেন এবং উপযুক্ত উপাধি খেতাব অর্পণ করলেন, পরিবারের অনুগত সম্মানিত আমীর শাহজাদাদের সম্মান দিলেন। কামরান কাবুল আর কান্দাহার শাসনের অধিকার পেলেন, কিন্তু তাকে প্রশাসনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হল না। আসকরিকে সম্ভল শাসনে পাঠালেন। ছোট ভাই হিন্দালকে, বাবরের প্রিয় ছুটি কাটানোর অঞ্চল আলওয়ারের শাসক করা হল। দূরের বাদাকশান সুলেইমান মির্জার অধীনে থাকল। আর পূর্ব দিকের সীমান্তের শিবির স্থাপন করা হল জৌনপুর। সেই অঞ্চল প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হল সুলতান জুনায়েদ বারলাসকে। সিংহাসনে আরোহনের আনন্দ সম্পূর্ণ হল বিশাল শাহী চড়ুইভাতি আয়োজন করে। এই উপলক্ষ্যে নৌকোভর্তি সোনা পাত্রে করে [জনগণের মধ্যে] বিতরণ করা হল।
সিংহাসনে আরোহনের সময় উত্তরাধিকার সূত্রে হুমায়ুন যে মুঘল সাম্রাজ্য অর্জন করলেন তার বিস্তৃতি বিষয়ে একটা ধারণা তৈরি করা যাক। উত্তর-পশ্চিমে আমুদরিয়া ছিল শেষ সীমান্ত, বলখ, কুন্দুজ আর বাদাকশন তিন শহরের সঙ্গে কাবুল, গজনি আর কান্দাহার মুঘল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রখ্যাত হেরাট হয়ত মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল না, সেটি পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মুঘল হিন্দুস্তানে পাঞ্জাব আর মুলতান বাবর দখল করেছিলেন। পাঞ্জাব আর মুলতান দখলের আগেই, আমীর তৈমুরের বংশধর হিসেবে, বাবর এটিকে তাঁর সাম্রাজ্যের অংশ ভেবেনিয়েছিলেন। দক্ষিণ পশ্চিম দিকে আধুনিক পাঞ্জাব ছিল তার সীমান্ত। অবোহর, সিরসা, হানসি, হিসার মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও গণেশগড়, হনুমানগড়, জিতপুরা তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। মুলতানের দক্ষিণে সিন্ধ অঞ্চল আরঘুন সম্রাট শাহ বেগ আর পুত্র মির্জা শাহ বেগের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ভূখণ্ডে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে তিনি বড় ছেলেদের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে পাঠালেন। অর্থাৎ হুমায়ুন গেলেন বাদাকশনে, কামরানের নিয়ন্ত্রণে গেল কাবুল, গজনী আর কান্দাহার, আর আসকরি গেলেন মূলতান। আমরা আগেই বলেছি, বাবার তৈরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে তিনি কামরানকে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার প্রশাসক মনোনীত করেছিলেন। পরে তিনি তাকে পাঞ্জাব আর মুলতান শুদ্ধ শতদ্রুর পূর্ব পাড় পর্যন্ত অঞ্চল অবাধে আধা-স্বাধীন শাসনের অধিকার দিলেন। আসকরি গেলেন সম্ভলে আর হিন্দাল আলোয়ারে। আলোয়ার, ঢোলপুর আর গোয়ালিয়র এবং আরও পূর্বে কল্পি, কিলিঞ্জর আর বেনারস হল মুঘল হিন্দুস্তানের দক্ষিণ সীমান্ত। আমরা যদি পূর্বের দিকে এগোই তাহলে দেখব, মুঘল হিন্দুস্তানের সীমানা হল যমুনা নদীর দক্ষিণে এলাহাবাদের সীমান্ত পর্যন্ত।
পশ্চিমে যমুনা আর গঙ্গার মধ্যের দোয়াব অঞ্চলে দুই রাজধানী দিল্লি আর আগরা; পূর্বে পানিপথ এবং খানুয়া জেতার পরে এলাহাবাদ, চুনার আর বেনারস দখলে এল। গঙ্গার উত্তরে সম্ভল, বাহারাইচ, লখনৌ, অযোধ্যা, গোরখপুর এবং বালিয়া — এই হল সীমান্ত। পূর্ব সীমান্ত নিয়ন্ত্রিত হল জৌনপুর সদরে প্রশাসকের মাধ্যমে।
এস কে ব্যানার্জী হুমায়ুন বাদশাহ বইতে লিখছেন বাবর খুব বেশি দিন হল সাম্রাজ্য তৈরি করেন নি, পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের রশিগুলো খুবই পলকা ছিল। যদিও জনগণ শাসকদের বিরুদ্ধে তখনও বিদ্রোহ শানান নি, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা খুব একটা যে মসৃণ গতিতে চলছিল, এমন দাবি করা যাবে না। প্রশাসন চালানোয় তখনও মুঘলদের এবং সম্রাটের দক্ষতা তৈরি হয় নি, কেম্ব্রিজ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ায় বলা হয়েছে, তখনও সাম্রজ্য তরবারি বা সইফ-এর [তরবারি] জোরে চলছিল, কলম বা কালামির জোরে নয়। (C. H. I., Vol. IV, page 21 has, the scheme of Government Was stil saifi (by the sword) not qalami (by the pen))। বাবর সাধারণত প্রদেশগুলোয় একজন প্রশাসক বসাতেন, তার সঙ্গে থাকতেন একজন দেওয়ান এবং মাঝারিগোছের আমলাদের মধ্যে থাকতেন শিকদার এবং কোতোয়াল। তাছাড়া কেন্দ্রিয়ভাবে পছন্দের ব্যক্তিকে স্থানীয় অঞ্চলগুলোতে জায়গিরদার নিযুক্ত করা হত। বাবর এর বেশি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে যেতে পারেন নি। তাঁর সব থেকে বড় ব্যর্থতা হল গ্রামের সঙ্গে কেন্দ্রিয় সরকারের সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়া।
প্রজাদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করল; হিন্দুরা বশ্যতা স্বীকার করল কারন তাদের [সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিকভাবে] কিছুই হারাতে হয় নি, নতুন শাসক হিন্দু প্রজাদের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে চাপ দেয় নি। আর মুসলমানেরা দেখল লোদি শাসনের তুলনায় মুঘল শাসন তুলনামূলক অনেক শ্রেয়। তবে ভারতবর্ষীয় আফগানেরা শাসন ক্ষমতার হাত বদল সহজে মেনে নিল না। বাহালুল লোদির সময় ১৪৫১ থেকেই লোদিরা দিল্লি শাসন করছে। কয়েকশ বছর ধরেই উত্তর ভারতে আফগানেরা লড়াকু শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, সুনাম অর্জন করেছে। তারা বাবরকে হিন্দুস্তানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল শাসন করার মানসিকতায় নয়, বরং সুলতান ইবরাহিম লোদিকে উচ্ছেদ করারর কাজে সাহায্য করতে। প্রথমদিকে বাবর ইবরাহিম লোদির চাচা আলম খান আলাউদ্দিনকে দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে বসাবারে মনস্থ করেছিলেন কিন্তু আলম খান আলাউদ্দিনের শাসন অযোগ্যতায় তিনি মন পাল্টান। কিন্তু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত দিলয়ার খান, আরাইশ খান, মুল্লা মহম্মদ মজহব, ইসমাইল জিলওয়ানি, মালিক বিবান জিলওয়ানি, মহম্মদ খান নুয়ানি এবং শাহ মহম্মদ ফারমুলির সামরিক সাহায্য এবং একের পর এক দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি মন বদলালেন, নিজেই বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তারপর একের পর এক সাফল্য তাঁকে পানিপথে বিজয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তার একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল, সেনাপতি হিসেবে সফল অতীত কারনামে এবং প্রশাসন চালানোর যোগ্যতাই ভারতবর্ষীয় জনগণ তাঁকে যোগ্য শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। শুধু একটা গোষ্ঠী বাদে তাঁর আশা অপূর্ণ থাকে নি। ভারতবর্ষীয় আফগানেরা তাঁর সাফল্যের পথে প্রবল কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। তারা বাবর এবং সামগ্রিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যকে দখলদারি শাসন হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং আফগানেরা দিল্লির ক্ষমতা হারানো মেনে না নিতে পেরে মুঘল সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সমস্যা হল আফগানেরা নিজস্বার্থবন্দী গোষ্ঠী এবং তারা বুঝতে পারে নি, লোদি শাসন আমলে তারা তাদের শাসন করার চরিত্রে নিজেরাই হারিয়ে বসেছিল, এবং আফগানদের আত্মসম্মানও মুঘলদের শাসন মানতে অস্বীকার করেছে। বাবর আর হুমায়ুনের সমঝোতার চেষ্টাতেও আফগানেরা নির্বিকার থেকেছে। তারা শাসন ক্ষমতা ছাড়া, নতুন মুঘল সাম্রাজ্যের আমলাতন্ত্রের অংশ হিসেবে জুড়ে থাকতে অস্বীকার করেছে।
হুমায়ুনের বাবার সময় থেকে আফগান বিরোধিতা তুঙ্গে উঠতে থাকে। বাবর সেই বিরোধিতা তিনটে সাম্রাজ্য নীতিতে কিছুটা সামলাতে পেরেছিলেন ১) তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সামরিক অভিযান; ২) প্রশাসন চালাতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে প্রাধান্য না দেওয়া; ৩) উচ্চস্তরের মোঙ্গল কৃষ্টির প্রচারপ্রসার। কিন্তু হুমায়ুনের সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার সামনে আফগানেরা বড় হুমকি হয়ে উঠছিল। তিনি ক্ষমতায় এসে বুঝতে পারছিলেন, সাম্রাজ্য সীমান্তে বেশ কিছু আকফগান গোষ্ঠীপতি তাকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চহ্ন করে উঠেপড়ে লেগেছেন ১) লাঙ্গাদের ওপর বিজয়ী হওয়া মির্জা শাহ হিউসেইন আরঘুন; ২) মহারাণা সঙ্গের পুত্র মহারাণা রতন সিংহ; ৩) গুজরাটের বাহাদুর শাহের মালওয়া দখল; ৪) দক্ষিণ বিহারের কম ক্ষমতাশালী জালালুদ্দিন নুহানি এবং অন্য আফগান। এই রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন দক্ষ চতুর শের খান; ৫) আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র নুসরত শাহ।
হুমায়ুন তাঁর রাজত্বের শুরুর দিকে এই গোষ্ঠী প্রধান, রাজা, সুলতান বা জমিদারদের এলাকা অধিকার করতে চান নি; তার মধ্যে উদগ্র সাম্রাজ্য বাড়ানোর অদম্য ইচ্ছের অভাব ছিল। কিন্তু তিনি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন তাঁর সিংহাসন আরোহনের সংবাদে উত্তেজিত হয়ে অনেকেই সমস্যা তৈরি করার ভাবনা ভাবছেন।
তাছাড়া তাকে একটা পাকিয়ে ওঠা সমস্যা সামলাতে তাকে নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হয়েছে — সেটা হল সিংহাসন দখল নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। তৈমুরী পরিবারের প্রত্যেক শাহজাদার নজর থাকত সিংহাসন দখলের দিকে। তাছাড়া যে সব শাহজাদা দূর সুবায় প্রশাসনে থাকতেন তাদের লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা। যেমন কামরান বড় ভায়ের প্রতি নামমাত্র আনুগত্য জানিয়ে স্বাধীন প্রশাসন পরিচালনা করতেন। সীমান্ত প্রদেশের শাসক হিসেবে তিনি পারস্য আর মধ্য এশিয়ার সঙ্গে উপযুক্ত সম্পর্ক রেখে, হুমায়ুনের উদ্বেগ কমিয়েছেন। কিন্তু কাবুল আর কান্দাহারে প্রায় অর্ধ-স্বাধীনভাবে প্রশাসন চালাবার অর্থ ছিল দিল্লির প্রতিযোগী হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করা এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সম্পদ দুভাগে ভাগ করা। পরের দিকে আসকরি আর হিন্দালও কামরানের রাস্তায় হেঁটে ভায়ের প্রতিযোগী হয়ে উঠতে গিয়ে সাম্রাজ্যকে দুর্বল করেছেন। (চলবে)