প্রথম অধ্যায়
শাহজাদা হুমায়ুন, ১৫০৮-৩০
হুমায়ুনের জন্মের আগে বাবরের জীবনে স্থায়ীত্ব আসে নি। বাবর, ফারঘানার শাসক পিতা উমর শেখ মির্জার উত্তরাধিকারী মনোনীত হন ১৪৯৪-তে। কিন্তু সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গেই দুই কাকার সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বাবরকে সাহায্য করতে যেন প্রকৃতি দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। বিপক্ষ শিবির মহামারী আক্রান্ত হলে দুই কাকা মারা যান এবং বাবরের আক্রান্ত হওয়ার দুশ্চিন্তা দূর হয়। দু-বছর পর আকবর সমরখন্দ জয় করলেও, দুর্ভাগ্যক্রমে তাকে সমরখন্দের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়। নতুন করে ভাগ্য তাকে আবার ১৫০০-তে সমরখন্দে ক্ষমতায় আরোহন করতে সাহায্য করে। এবারে বাবরের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী শত্রুর আবির্ভাব হয় শাইবানি খান। তিনি বাবরকে ১৫০১-০২-তে সমরখন্দের ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেন সরইপুলের যুদ্ধে হারিয়ে। তিন বছর পর অক্টোবর ১৫০৪-এ বাবর কাবুল দখল করে। ৬ মার্চ ১৫০৮-এ বাবরের বড় ছেলে নাসিরুদ্দিন মহম্মদ হুমায়ুন মির্জা জন্মগ্রহণ করে। পুত্রের জন্ম বাবার কাছে নতুন সময়ের বার্তা বয়ে আনল। উজবেগীদের সঙ্গে তীব্র শত্রুতায় মধ্য এশিয় অঞ্চলে তৈমুরীরা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে; হয় উজবেগী অথবা ঘরশত্রুদের আক্রমনে একে একে তৈমুরী শূরবীর নিহত হতে থাকে। বাবরের জীবিতকালে শেষতম দুজন বিখ্যাতর পতন হল প্রথমত সুলতান হুসেইন বাইকারা, ১৫০৬-এ এবং ১৫০৭-এ তাঁর ছেলেরাও। বাবর যখন আরঘুম সাম্রাজ্যের কবল থেকে কাবুল দখল করছেন। সেই মুহূর্তে একমাত্র তিনিই শেষ গর্বিত তৈমুরী গোষ্ঠীপতি, যিনি শুধুই বাহুবলের জোরে বিশাল বড় এলাকার অধিপতি হয়েছেন। প্রজাদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। পূর্ব শাসক মুকিম আরঘুন আর বাকি চাঘতাইনির নাম তিনি নিজের কাজ দেখিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।
১৫০৮-এ যখন তাঁর ভাগ্য পাল্টানোর বড় ছেলে হুমায়ুন জন্ম নিচ্ছেন, তখন তিনি আর শুধুই এক ভাগ্যবিড়ম্বিত শাসক অথবা এক ভাগ্যান্বেষী সামরিক নেতা নন, তিনি একটি অঞ্চলে নিজগুণে শাসক হওয়ার অধিকার অর্জন করেছেন। যে অঞ্চল অশান্তিতে মুখ ডুবিয়েছিল দীর্ঘকাল, সেই অঞ্চলকে তিনি স্থায়িত্ব দিয়েছেন নিজগুণে। পুত্র সন্তানের জন্ম হওয়ায় তার উত্তরাধিকারী নিশ্চিত হল। এর পরেই তাঁর প্রশাসনের স্থায়ী নীতি তৈরি হতে থাকে। এতদিন তিনি নিজের নাম মির্জা উপাধি ব্যবহার করলেও পুত্র সন্তানের জন্মের পরে তিনি পাদশা উপাধি গ্রহণ করবেন। রাজকীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে স্বয়ং বাবর লিখছেন, প্রত্যেকটি ছোট বড় বেগের দেওয়া উপহারে তৈরি হল বিপুল টঙ্কার পাহাড়, এই পরিমান সম্পদ এর আগে কেউ দেখেনি’। পুত্রের জন্মের প্রভাব আমরা বুঝতে পারব তাঁর লেখা সময় চিহ্নিত অক্ষরে [ক্রোনোগ্রাম] — শাহইফিরুজকাদার [বিজয়ী ঐশ্বর্যের শাহ], পাদশাইসাফশিকান [থাকবন্দীভাঙা শাহ] [পাদটিকায় লিখছেন অন্য ক্রোনোগ্রামগুলো হল ১] দুলান হুমায়ুন খান, ২] খুশ বাদ, কেউ বলছেন হুশ বাস – অনুবাদক]।
শ্রীমতি বেভারেজ সম্রাট বাবরের পুত্র জন্মানোর সঙ্গে পাদশা উপাধি গ্রহনের গুরুত্বটি অনুধাবন করতে পারেন নি। বুঝতে পারলাম না, গুলবদন বেগমের পরিষ্কারভাবে লেখা বইয়ান সত্ত্বেও তিনি কী করে লিখলেন ঘটনার কার্যক্রম সে দিকে ইঙ্গিত করে না? হুমায়ুনের বোন গুণবতী গুলবদন হুমায়ুন নামায় লিখছেন, ‘সেই বছরেই তিনি [বাবর] আমীরদের এবং বাকি বিশ্বকে নির্দেশ দিলেন তাঁকে সম্রাট [পাদশা] নামে অভিহিত করতে। হুমায়ুনের জন্মের আগে পর্যন্ত তাঁকে মির্জা বাবর নামে অভিহিত করা হত… মহামহিম হুমায়ুনের জন্মবর্ষ থেকেই নিজেকে পাদশা নামে অভিহিত করা শুরু করলেন তিনি’।
সুলতান হুসেইন বাইকারার সঙ্গে হেরাটে ১৫০৬-এ দেখা করতে গিয়ে হুমায়ুনেরর মা মাহাম বেগমের সঙ্গে বাবরের বিবাহ হয়। ইতিহাসে প্রখ্যাত মাহাম বেগম, সুলতান হুসেইনের আত্মীয় এবং খুরাসানের প্রখ্যাত সুফি তুরবাতইজামের আহমদের বংশের কন্যা। এই দুই তথ্য প্রমান করে তিনি শিয়ামতাবলম্বী। পন্থ পার্থক্য স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসায় বিভেদ আনতে পারে নি। বেভারেজ বলছেন মহম্মদের জীবনে যেমন আয়েশার প্রভাব, তেমনি বাবরের জীবনে মাহামের গুরুত্ব। মাহমের জন্ম নিয়ে যে কথা বেভারেজ বলেছেন, সে সব আমরা পরের অধ্যায়ে আলোচনা করব।
মুসলমান পরিবারের পুত্রের পড়াশোনা শুরু হয় চান্দ্র মাসের ৪ বছরে, ৪ মাস, ৪ দিন থেকে। বাবরের মত বিদ্যানুরাগী পরিবার যে সেই পরম্পরা অনুসরণ করবে তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে। বাবরের প্রিয়তম পুত্র ছিলেন হুমায়ুন। বাবরের হুমায়ুনের প্রতি ভালবাসা আন্দাজ করতে পারি গুলবদনের লেখা বাবরের উদ্ধৃতিতে ‘মাহম! পুত্রদের মধ্যে আমি সব থেকে বেশি ভালবাসি হুমায়ুনকে’। বাবর নিশ্চই তাঁর প্রিয় পুত্রের শিক্ষা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন! বাবরনামায় আমরা ছেলেকে শিক্ষা দেওয়া বিষয়ে বাবরের উতসাহের বেশ কিছু বর্ণনা পাচ্ছি। ১৫২৬-এ পানিপথের যুদ্ধের আগে গাজি খান লোদির গ্রন্থাগারের কিছু বই তিনি হুমায়ুনকে উপহার দেন। পুত্রকে লেখা চিঠিতে হুমায়ুন যেভাবে পুত্রের পড়া শোনা করার সময় আল-আমন শব্দের ব্যবহার, বানান, উচ্চারণ ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক করছেন এবং শেষে বলছেন, অলঙ্কার বাক্যের মৌলিক অর্থকে ঢেকে দেয়’। ভবিষ্যতে ভাব বিস্তার ছাড়াই লেখালিখি কোরো, সাধারণ, পরিষ্কার শব্দ ব্যবহার কোরো, যাতে পাঠকদের খাটতে কম হয়’! তিনি নিজের কিছু লেখার নমুনা শাহজাদাকে বোঝার জন্যে পাঠালেন।
হুমায়ুন চারটে আলাদা আলাদা ভাষা শিখেছেন — তুর্কি, আরবি, পারসিক আর হিন্দি [বলা ভাল হিন্দৌভি]। মায়ের ভাষা ছিল তুর্কি। অধিকাংশ মুঘল নারী পুরুষ আত্মীয় তুর্কি জবানে কথা বলতেন; সকলেই তুর্কিস্তান থেকে আভিবাসিত হয়েছিলেন। প্রত্যেক মুসলমানকে আরবি ভাষা শিখতেই হত, যেহেতু কোরান আরবি ভাষাতেই লেখা। ধর্মীয় সম্মিলনে প্রতিটি শিশু আরবি পাঠ শুনত। তাঁর হাতে লেখা পারসিক ভাষায় লেখা গজল আর রুবায়েত সংকলনের একটি দিওয়ান আজ আমাদের হাতে এসেছে। তাছাড়া আকবরনামা, তুরাব ওয়ালির তারিখইগুজরাট, ফরিস্তার সাধারণ ইতিহাস এবং আরও বহু বইতে আমরা শাহজাদার লেখা কবিতা দেখি। হুমাইয়ুন অঙ্ক, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা আর জ্যোতিষও সমান্তরালভাবে পড়েছেন। (চলবে)