চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
১। দুই সম্রাট মুখোমুখি
হুমায়ুনের সঙ্গে শাহ, কী ধরণের ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে গুরুতর মতভেদ বর্তমান। মুঘল ভারতবর্ষের ঐতিহাসিকেরা স্বাভাবিকভাবে সাফাভি দরবারে হুমায়ুনের সঙ্গে শাহের দ্বন্দ্ব, অপমান ইত্যাদি নিয়ে একটিও বাক্য খরচ করেন নি। তারা পুরো ঘটনাকে উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী সম্মান দেওয়ার অধ্যায় হিসেবে উপস্থিত করেছেন। অন্যদিকে আমরা দেখি জৌহরের খোলামেলা, সোজা সরল স্মৃতির ঝাঁপি খোলা বয়ান। সাফাভি ঐতিহাসিকেরা স্বাভাবিকভাবে ঘটনার ওপর চিনির সিরার পরত চড়িয়েছেন – কারন আগেই আলোচনা করেছি, আশ্রয় নিতে আসা কোনও এক রাজার সঙ্গে শাহ দুর্ব্যবহার করছেন, এই অমানবিক আচরণটা হয়ত তারা লিখতে চান নি। শাহ নিজে বলেছেন তিনি হুমায়ুনের সঙ্গে মার্জিত ব্যবহার করেছেন [১]। জৌহর ছাড়া মাত্র একজন ঐতিহাসিক শারাফ খান শাহনামে বা হিস্ট্রি অব কুর্দিস্তানে অন্য ধরণের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন।
আমীর মহম্মদ জানাচ্ছেন হুমায়ুন ঘোড়া থেকে নেমে শাহের শিবিরের দিকে এগোতে থাকলেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে, পথ দেখিয়ে সামনে চললেন বাহরম মির্জা আর সাম মির্জা। জৌহর বলছেন দূর থেকে হুমায়ুনকে এগিয়ে আসতে দেখে শাহ তাহমস্প উঠে পাতা কার্পেট ছাড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে এলেন। হুমায়ুন সামনে পৌঁছলে তিনি হুমায়ুনকে জড়িয়ে ধরলেন, কার্পেটের ওপর ডান দিকে আসনে বসালেন আদর করে [২]। হুমায়ুনের স্বাস্থ্য, যাত্রা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করছিলেন মৃদুস্বরে। আলাপ-আলোচনার মাঝের দিকে শাহ তাঁকে পারসিক টুপি, তাজ উপহার দিতে চাইলেন। হুমায়ুন মুহূর্তের মধ্যে রাজি হয়ে বললেন এই তাজ মহানতার চিহ্ন, তিনি আনন্দ সহকারে তাজ পরবেন। হুমায়ুনের বাক্য শাহকে উদ্বেল করে তুলল – নিজের হাতে হুমায়ুনকে তাজ পরিয়ে দিলেন শাহ [৩]।
জৌহর, খুর শাহ আর আবুলফজল হুমায়ুনের অভ্যর্থনা আর সম্মাননার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন [৪]। ভৃত্যরা হাতে হাত লাগিয়ে তাঁবু আর বিশাল প্যাভেলিয়ন খাড়া করল, রাজকীয় সাজসজ্জা করা হল — কারিগরদের অলৌকিক সাজসজ্জার দক্ষতায়, ছবির সাজানোর স্বতস্ফূর্ততায়, বৈঠকের জন্যে অপেক্ষা করা রাজকীয় বাসস্থান উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুহূর্তের মধ্যে [১]। উপস্থিত হওয়া প্রত্যেক আমন্ত্রিতর নাম উচ্চারণ করে বিউগল বাজানো হল। উৎসবের মধ্যেই শাহের অনুরোধে হুমায়ুনের খানসামা একটি কাপড় পেতে দিলেন। খুর শাহ বলছেন, উৎসব উপলক্ষ্যে হুমায়ুন শাহ তাহমস্পকে, সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের পরিবার থেকে পাওয়া রুবি, এমারেল্ড, সাড়ে ছয় মিস্কাল ওজনের হিরে উপহার দিলেন [২]।
আবুলফজল দুই সম্রাটের বৈঠকের তারিখ বলছেন জুমাদাঅলআওল ৯৫১, ২১ জুলাই থেকে ১৯ আগস্ট ১৫৪৪ [৩]। আমরা দেখেছি হুমায়ুন সাবজাওর ছেড়েছেন ২১ রাবিউসসানি ৯৫১, ১৫ জুলাই ১৫৪৪। সাবজাওর থেকে সুফিয়াবাদের ৭০ মাইল পেরিয়েছেন দুই থেকে তিন দিন ধরে। সুফিয়াবাদ থেকে দামাঘানের ১৪০ মাইল পার হয়েছেন হয়ত্ পাঁচ বা ছয় দিনে। আমরা বিস্তামে হুমায়ুনের আসার তারিখ পেলাম ৬ জুমাদাঅলআওল ৯৫১, ২৬ জুলাই ১৫৪৪। বিস্তাম থেকে সামনানের দূরত্ব ১১০ মাইল পার হয়েছেন অন্তত চার দিনে। সামনান থেকে রায় প্রায় ১০০ মাইল, সেটাও অন্তত চার দিন লেগেছে; মাথায় রাখতে হবে দার্স কেল্লায় তিনি কয়েক দিন থেকেছেন। সেখানেই তিনি শাহের চিঠি হাতে পেয়েছেন। সেখানে যদি তিনি এক সপ্তাহও থাকেন, তাহলে তিনি কাজভিনের দিকে রওনা হয়েছেন ২১ জুমাদাঅলআওল ৯৫১, ১০ আগস্ট ১৫৪৪। রায় থেকে কাজভিনের দূরত্ব কম করে ৯০ মাইল। কাজভিনে তিনি থেকেছেন তিন দিন। কাজভিন থেকে অবহর আর সুলতানিয়ার দূরত্ব ৬০ মাইল [৫]। ফলে দুই রাষ্ট্র প্রধানের মধ্যে বৈঠক আয়োজিত হচ্ছে জুমাদাঅলআওল-এর শেষে, ১৫৪৪-এর আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে [৬]।
২। জৌহর আমাদের পথ নির্দেশক – শাহের রাষ্ট্রে আতিথ্য নেওয়া হুমায়ুনের জীবনে তিন পর্ব
শাহের রাজ্যে বাস করা হুমায়ুনের দিনগুলির বিশদ বিবরণ আমরা পাই না, কারন সেটা একজনও ঐতিহাসিক লেখেন নি। শাহের দরবার থেকে ফেরার পথের বর্ণনা দিয়েছেন বায়াজিদ। আবুলফজলের থেকে বিশদ বিবরণ আশাকরা গেলেও তিনিও তাঁর চাকরিদাতা বাবার প্রবাসকাল সংক্ষিপ্তাকারে সেরেছেন। একমাত্র বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন জৌহর, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তাঁর বর্ণনায় পারম্পর্য যেমন নেই, তেমনি ঘটনাবলীর তারিখ নিয়েও সমস্যা আছে। আর সাধারণভাবে যক্সে কোনও ঘটনা বর্ণনায় প্রগলভ সাফাভি ঐতিহাসিকরাও এ বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ। নিজাম শাহের রাজদূত খুর শাহ, সেই সময় ইরাণে ছিলেন, তার লেখায় কিছু উল্লেখ পাই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। সাফাভি দরবারে পৌঁছবার আগে আমীর মহম্মদ হুমায়ুনের জীবন নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন। ঐতিহাসিকেরা তাই এই পর্বে জৌহরকেই অনুসরণ করেছেন, এবং তাঁড় বক্তব্যের প্রমান জোগাড় করেছেন অন্য সূত্র ধরে।
শাহের দরবারে হুমায়ুনের অবস্থানকে আমরা তিনটি উল্লেখযোগ্য পর্বে ভাগ করতে পারব। প্রথম পর্বে শাহ হুমায়ুনকে নিজের ধর্ম বিশ্বাসে কথাবার্তায় প্রভাবিত করে শিয়া ধর্মে দীক্ষিত করানোর চেষ্টা করেছেন; দ্বিতীয় পর্ব চলবে দুমাস — হুমায়ুনকে শাহ জোর করে নিজের মতে আনার উদ্যমে; তৃতীয় পর্বে দুই পক্ষ একটা চলনসই মিটমাটের রাস্তায় উপনীত হয়ে দীর্ঘকাল পাশাপাশি কাটাবেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহ হুমায়ুনকে তাঁর হারানো রাজ্য উদ্ধার করার প্রস্তুতিতে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় এই পর্ব শেষ হবে।
৩। হুমায়ুন আর শাহ তাহমস্পের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারন
শুরু সময় থেকে শাহ উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে হুমায়ুনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন [১]। জৌহরের সূত্রে সুই সম্রাটের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারন আর তার ব্যপ্তি আন্দাজ করতে পারি। হুমায়ুন সাফাভি দরবারে উপস্থিত হওয়ার পরে রুস্তম কোকা, খাজা গাজি, সুলতান মামুদের মত কামরানের অনুগামী কিছু উচপদস্থ আমলা মক্কা যাওয়ার পথে শাহের দরবারে হাজির হন। তারা শাহকে জানান হুমায়ুন তার ভাইকে ছেড়ে এসেছেন নিজের অদক্ষতা, অযোগ্যতার জন্যে এবং শাহ যদি তাদের বাহিনী সাহায্য দেন, তারা কান্দাহার জয় করে, সেই অঞ্চল তাঁকে উপহার দেবেন [২]। দ্বিতীয়ত তুর্কোমান আর পারসিক আমলারা শাহকে বোঝান তিনি যদি হুমায়ুনের সঙ্গে তাদের রাজ্য উদ্ধারে পাঠান, তাহলে হুমায়ুন তার বাবা বাবরের মত বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন। বাবর প্রথম শাহ ইসমাইলের থেকে সাহায্য নিয়ে উজবেগদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নাজম বেগ এবং ১২,০০০ সেনা খতম করেন। পারসিকদের বহুকালের অভিযোগ ঘাজদাওয়ান লড়াইতে বাবরের বিশ্বাসঘাতকতার [৩]। তৃতীয়ত গুজরাট জয় করে ফেরার পথে তিনি ১২টা উত্তর তীরে নিজের নাম আর বাকি দ্বিতীয় শ্রেণীর তীরে শাহ তাহমস্পের নাম লেখেন। এই ঘটনাও শাহের দপ্তরে বাড়িয়ে চড়িয়ে উপস্থিত করা হয়েছে। শাহ স্পষ্টভাবে হুমায়ুনের থেকে জানতে চাইলেন, ইরাণ যেহেতু ভারতবর্ষের থেকে আকারে ছোট, তাই কী তিনি শাহকে তাঁর তুলনায় নিকৃষ্ট শাসক মনে করেন [১]? তাছাড়া চতুর্থত কামরান নিজে শাহকে ভায়ের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ জানিয়ে চিঠি লিখেছেন [২]।
জৌহরের সূত্রে জানলাম স্পষ্টভাবে দুপক্ষের দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার জন্যে যে সব ঘটনা দায়ী সে সবগুলো অনুঘটক হিসেবে তো ছিলই; কিন্তু দ্বন্দ্বের কারন আরও গভীর — অনেকটা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিকও বটে। বিশেষ করে সাফাভি আর চাঘতাই পরিবারের পরম্পরার শিয়া সুন্নি মতাদর্শের দ্বন্দ্ব। শাহের খোলামেলা স্তাবক জন ম্যালকমের শাহ তাহমস্প যে তার বাবা, প্রথম শাহ ইসমাইলের মত ধর্মান্ধ শাসক ছিলেন এবং উভয়েই সুন্নিদের দমন করে শিয়া মত প্রতিষ্ঠা করার কোনও পথ যে ছাড়েন নি সে কথা উল্লেখ করতে দ্বিধা করেন নি [৩]। হুমায়ুন এবং তাঁর অধিকাংশ অনুগামী সুন্নি। ফলে শাহ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন [৪]। জৌহরের লেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় শাহের ধর্মান্ধতা হুমায়ুনের প্রবাস জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছিল। রাজনৈতিক কারনও দুই সম্রাটের সম্পর্ক বিষিয়ে যাওয়ার জন্যে দায়ি। ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করা বাবর ছিলেন প্রথম শাহ ইসমাইলের অবিশ্বস্ত বন্ধু। দুই সম্রাটের পূর্বপুরুষের মধ্যেকার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব বর্তমান সময়েও দুই সম্রাটের জীবনে ছায়া ফেলেছে। ফরিস্তা এবং বাদাউনি উভয়েই বলছেন শাহের সামনে এই বিষয়টা আলাদা করে উত্থাপন করেন বাহারম মির্জা [৫]। সাফাভি রাজবংশের প্রাক্তন শত্রু বাবরের পুত্র হুমায়ুন ভাগ্য বিড়ম্বনায় আজ শাহের রাজত্বে আশ্রয় নিয়েছেন — ফলে শুরু থেকেই পারিবারিক অসম্মানের শোধ তোলার মানসিকতা শাহের ছিল। এই দুই বিষয় একসঙ্গে জুড়ে পারসিক রাজবংশের অনুগৃহীত হয়ে পড়া হুমায়ুনকে ধারাবাহিক অসম্মনানের পরিবেশের দিকে ঠেলে দেবে। এক সময় শাহ হুমায়ুনকে হত্যা করারও পরিকল্পনা সেরেফেলেছিলেন; কিন্তু শাহের বোনের হস্তক্ষেপ আর মন্ত্রীর কৌশলী পরামর্শ হুমায়ুনের প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। (চলবে)