চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
৪। প্রথম পর্ব – হুমায়ুনকে ধর্মান্তর করণের উদ্যোগ
অভ্যর্থনা সমাদর পর্ব শেষ হওয়ার পরে হুমায়ুনকে রাখা হল বাহারম মির্জার প্রাসাদে। তাকে গরম জলে স্নান করানো হল, চুলও কাটানো হল। পরের দিন সকালে শাহ সুলতানিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার তোড়জোড় করার সময় হুমায়ুন শাহকে শ্রদ্ধা জানালেও শাহ, হুমায়ুনের কথার উত্তর দিলেন না [১]। ক্ষুব্ধ হুমায়ুন শাহের সঙ্গে সুলতানিয়া পর্যন্ত গেলেন। সুলতানিয়ায় সুলতান মহম্মদ খুদাবন্দের মাজারে থাকলেন [২]। হুমায়ুন শাহের মত অনুদার মানুষের আশ্রয়ে থাকার জন্যে মনস্তাপ করছিলেন। শাহ হুমায়ুনকে সংবাদ পাঠালেন তিনি যদি শিয়া ধর্ম গ্রহণ করেন, তাহলে সাফাভি সাম্রাজ্য তাঁকে [রাজ্য উদ্ধারের] সমস্ত সাহায্য দেবে, না হলে প্রবাসী সম্রাটকে আগুণে পোড়ানোর নির্দেশ দেবেন। উত্তরে হুমায়ুন জানালেন তাঁর রাজা হওয়ার সাধ শেষ হয়ে গেছে, তিনি ধর্ম পালনে মক্কায় যেতে চান, এবং তীর্থে যেতে চেয়েই তাঁর পারস্যে প্রবেশ। হুমায়ুনের অসহায় মানসিক অবস্থা বুঝে শাহ তাঁকে আবার নতুন একটা বার্তা পাঢ়িয়ে বললেন, তিনি সুন্নি ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন; তাঁর ভাল লাগছে সুন্নি রাজা হুমায়ুন তার নিয়ন্ত্রণে বাস করছেন। হুমায়ুনের কাছে তিনি কাজি জাহানকে পাঠালেন, যাতে বিপদে পড়া হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলে কোনও একটা সমঝোতা সূত্র তৈরি করতে পারেন [৩]। শাহ, কাজিকে জানালেন হুমায়ুনের জন্যে বয়ান তৈরি করতে। কাজি জাহান হুমায়ুনের সকাশে এলেন তিনটে আলাদা আলাদা কাগজ নিয়ে। হুমায়ুন দুটো কাগজের বয়ান পড়ে সহজেই সম্মতি দিলেন, গোল বাধল তৃতীয় কাগজের বয়ান নিয়ে। শাহ তাঁর তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করতে শুরু করলেন কাজি জাহানের নাম ধরে। কাজি জাহান আবার শাহের কাছে গিয়ে হুমায়ুনের কাছে ফেরত এসে, তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, আপাতত কিছু দিনের জন্যে সবুর করুন। এখন অবাধ্যতা দেখানোর সময় নয়। হুমায়ুন অভিযোগের স্বরে বললেন, শাহ মনে করেন ধর্ম বাধ্যবাধকতারই জায়গা [৪]। তবুও তিনি তৃতীয় কাগজের বয়ানে সম্মতি দিলেন [৫]। কাগজের বয়ানে সম্মতি জানানোর তথ্য নিয়েছি জৌহর আর ফৈজি সিরহিন্দির লেখাপত্র থেকে। কাগজে কী লেখা ছিল, যে বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্রও রা কাড়েন নি। কিন্তু কাগজে লিখিত বয়ান হুমায়ুনের কাছে এতই অবমাননাকর লেগেছে এবং শাহের ধর্মান্ধতা অসহিষ্ণুতাও তাঁর কাছে এতই আশ্চর্যের ঠেকেছে তিনি শেষ অবদি কোনও ঝুঁকি না নিয়ে বাধ্য হয়েছেন শিয়া ধর্মে দীক্ষিত হতে।
স্যর যদুনাথ এবং জওহরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি পাণ্ডুলিপিতে অন্য বয়ান পাচ্ছি — হুমায়ুন যখন সুলতান মহম্মদ খুদাবন্দের মাজারে গম্বুজের তলায় বসে ছিলেন, তার কাছে কাজি জাহান এলেন। হুমায়ুন কাজি জাহানকে শাহের অপ্রসন্নতা বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। তিনি উত্তর দিলেন শাহের ভৃত্যরা ঠিক পথে নেই, তারা প্রায়ই ধর্ম-বিরোধী মন্তব্য করে থাকে; শাহ এখন খুবই ক্ষুব্ধ। হুমায়ুন বললেন হৃদয় থেকে তিনি ইমামদের অনুগত শিষ্য। কাজি জাহান শাহ তামস্পের হাতে লেখা তিনটে কাগজ এনে তাঁকে দুটো দিলেন। হুমায়ুন আসন থেকে উঠে তাঁবুর কোনায় গেলেন এবং নবি এবং ইমামদের বিরোধীদের নিন্দা করলেন উঁচু গলায়। তিনি তৃতীয় কাগজ হাতে নিলেন এবং শাহের উপস্থিতিতে পড়ে ইমামদের ধর্ম গ্রহণ করলেন [১]।
শেষ দুটো পাণ্ডুলিপিতে, হুমায়ুন যদি শিয়াপন্থ গ্রহণ না করে তাহলে শাহ তামস্প তাঁকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, এই ঘটনার উল্লেখ পাই না।
এর পরে শিকারের আয়োজন করা হল। হুমায়ুন শাহের সঙ্গে শিকারে গেলেন। শিকার তিন দিন ধরে চলল। কুরচিদের যেখানে রাখা হয়েছিল, সেই অঞ্চল থেকে কয়েকটা হরিণ পালিয়ে গেল। পলাতক হরিণ পিছু প্রত্যেককে এক তুমান আর ঘোড়া জরিমান করা হল [২]।
ইরানে হুমায়ুনের গতিবিধির নিয়ন্ত্রণ শাহের হাতেই ছিল বরাবরই; রাজ্যে ঘোরাফেরায় তাঁর নিজস্ব স্বাধীনতা ছিল না। শিকার পর্ব শেষ হলে শাহ বাহরম মির্জাকে নির্দেশ দিলেন তখতইসুলেইমান কুঁড়েঘরে হুমায়ুনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে [৩]। সারা রাত যাত্রা করে হুমায়ুন সকালে সেখানে পৌঁছলেন। দেখলেন সেখানে খাঁচায় বহু প্রাণী আটকে রাখা হয়েছে। তিনি দু-একটাকে হত্যা করলেন। তখতইসুলেইমানে একটি গুহায় বেশ কয়েকজন রাজকীয় বন্দী রাখা ছিল। পরের দিন তখত-ই-সুলেইমানের থেকে ৮ মাইল দূরে তিনি শিকার করতে গেলেন। শাহ তাহমস্প, হুমায়ুনের সঙ্গে শিকার দলে যোগ দিলেন। নির্দেশ ছিল তার নির্দেশ ছাড়া কোনও আমলা, এমন কী তার ভায়েরাও একটাও তীর ছুঁড়তে পারবে না।হুমায়ুনের দক্ষতা আন্দাজ করতে শাহ একমাত্র তাঁকেই তীরান্দাজির অনুমতি দিলেন। তিনি একটি হরিণ মারলেন; পারসিকেরা হুমায়ুনের দক্ষতায় অবাক হল। তাঁকে শিকার করা ৯টা হরিন উপহার দেওয়া হয়।
শিকার ক্ষেত্রে দলটা থাকল ৭ দিন ধরে রাজকীয় তাঁবু খাঁটিয়ে। এক দিন হুমায়ুন কয়েকটা হিরে আর কয়েকটা রুবি বোইরাম বেগের হাতদিয়ে পাঠালেন; বার্তাটা ছিল তিনি এই রত্নগুলো পেয়েছেন ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের প্রাসাদ থেকে এবং এর মধ্যে একটা কোহিনুরও ছিল [১]। শাহ অমূল্য রত্নগুলো দেখেই মোহিত; হিসেব করে বুঝলেন এগুলির মূল্য সব কিছুর চাইতেও অনেক বেশি। তিনি রত্নগুলো পেয়ে এত খুশি হলেন যে বৈরাম বেগকে, খান উপাধি অর্পণ করলেন [২]।
অধীনস্থ কর্মচারীকে শাহ উপাধি দান করায় হুমায়ুন তীব্র অপমানিত বোধ করলেন, তাঁর সম্মানে আঘাত লাগল। হুমায়ুনের রাজ্য ছিল না; কিন্তু তিনি ইরানে প্রবাসী হয়েছেন রাজার ভূমিকাতেই — শাহের অধীনস্থ রাজা হিসেবে নয়। বৈরামকে যে উপাধিই শাহ দিন না কেন, সেই কর্মটি আদতে শাহের গৌরব বৃদ্ধি করল আর হুমায়ুন যে তাঁর অধীনস্থ রাজা, সেই বার্তা ছড়িয়ে দিল ইরাণ জুড়ে। আবদুল বাকি সমস্যাটা বুঝেছেন বলেই, তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন দুই রাজাই বৈরাম বেগকে খান উপাধি দান করলেন যৌথভাবে [১]। কাজভিনে বৈরাম শাহের নির্দেশে পারসিক টুপি বা তাজ পড়তে অস্বীকার করেছিলেন অন্য রাজার কর্মচারী হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে। কিন্তু বৈরাম দেখলেন তিনি যাঁর জন্যে লড়াই করলেন প্রাণ ঝুঁকি নিয়ে, সেই রাজাই যখন তার মানসম্মান বিলিয়ে দিলেন, রাজার দেওয়া তাজ পরলেন, এমন কী ধর্মও পাল্টে নিলেন; তার পক্ষে নতুন সময়ে প্রবাসে, একদা তাঁর জন্ম দেশে বসে সেই দেশের রাজার থেকে সম্মান নিতে আর প্রত্যাখ্যান করলেন না। যদিও বৈরামের আনুগত্য তাঁকে সম্মান নিতে বাধা দিচ্ছিল প্রবলভাবেই। (চলবে)