চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
৫। দ্বিতীয় পর্ব — দুমাস কথা বন্ধ
শিকারের আনন্দময় উত্তেজনা থিতিয়ে এলে দুই সম্রাট পরস্পরের থেকে বেশ কিছু কাল বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলেন। পরের দুমাস দুজনের মুখ দেখাদেখি, আলাপআলোচনা সবই বন্ধ রইল [২]। কিন্তু কেন শাহ, তাঁর আশ্রয়ে থাকা আশ্রিত সম্রাটের মুখ দেখা বন্ধ করলেন, এ বিষয় নিয়ে জৌহর বাক্যব্যয় করেন নি। আমাদের মনে হয় সেই সময়েই হুমায়ুনের প্রতি শাহের ক্রোধ তুঙ্গে ওঠে। অথচ আমরা যেন মাথায় রাখি, ততদিনে হুমায়ুন তার চরিত্র বিরোধী পারসিক তাজ পরার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন, কাজি জাহানের আনা কাগজে নিমরাজি হয়েও বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করেছেন। আমরা কেউ জানি না কাগজগুলোয় কী লেখা ছিল; তবে জৌহর নিশ্চিতভাবে বলছেন দুটোতে অন্তত ধর্ম পরিবর্তনের নির্দেশ বা পরামর্শ ছিল এবং শাহের উপস্থিতিতে তিনি সেই কাজটাও শেষ করেছেন। শুরু থেকেই শাহ, হুমায়ুনকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্যে চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু হুমায়ুন যদি শাহের প্রধানতম প্রস্তাব, ধর্ম পরিবর্তনের প্রস্তানা মেনে নেন, তাহলে শাহ কেন হুমায়ুনের ওপর মানসিক হিংসা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন, এ তথ্য আজ বোঝা দায়। মুঘল আর সাফাভি সাম্রাজ্য পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আছেই, থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু হুমায়ুন তো প্রবাসে এসেছেন, ক্ষমতাহীন, শাহের নিয়ন্ত্রণেও আছেন; এবং তিনি যেমন করে ধর্মীয় বিশ্বাস এক আশ্রিত রাজার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন, সেইভাবে তাঁর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব হুমায়ুনের ওপর তখনও চাপান নি। এমনও হতে পারে হয়ত হুমায়ুনের ধর্ম পরিবর্তনের পরের সময় তাঁর আচার আচরণে শাহ অখুশি ছিলেন। ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনাটা ঘটেছে গোপনে, জনগণের, এমন কী আমলাদের চোখের আড়ালে; হয়ত তিনি প্রকাশ্য সমাবেশ ঘটয়ে হুমায়ুনের ধর্মপরিবর্তনের পরিকল্পনা করছিলেন।
ইরানের প্রবাসকালে এই পর্বে হুমায়ুন এবং শাহের দ্বন্দ্বের বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। আবুলফজল একস্তবকে এই সময়ের বর্ণনা সেরেছেন — ‘In the intervals between these glorious seasons of fortunate conjunctions a cloudiness of heart was created on both sides through-the instigation of sundry strifemongers, but the turbidity did not last long, and was washed. away by the waters of cleansing.’।
শাহের ভাই, বাহারাম মির্জার ইতিহাসে বারবার হুমায়ুনের বিরুদ্ধে শাহের মনে বিষ ভরে দেওয়ার চেষ্টা দেখি। অথচ জৌহর বলছেন শুরু থেকে বাহারাম মির্জা হুমায়ুনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং বন্ধুত্বপিয়াসী [১]।
একদিন দুই সম্রটের আলোচনার সভায়, শাহ তামস্প, হুমায়ুনকে হারের প্রসঙ্গ তুলে কারন জিজ্ঞাসা করলেন। হুমায়ুন উত্তর দিলেন, ভাইদের বিরোধের জন্যে তার ভাগ্য বিপর্যয়। বাহারাম মির্জা কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন হুমায়ুনের উত্তর শুনে তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হলেন আর শত্রু হলেন, শাহের মন হুমায়ুনের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলার জন্যে সর্বস্বপণ করলেন [২]। ফরিস্তা থেকে এ বিষয়ে আমরা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছি। হুমায়ুনের উত্তরে শাহ বললেন, ‘আপনি ভাইদের সঙ্গে ঠিক আচরণ করেন নি’। আলোচনা চলতে চলতে খাওয়ার সময় চলে এল, খাওয়ার দাওয়ারও এল। শাহের ভাই বাহারাম খান সেই বৈঠকের প্রথম থেকেই দুই সম্রাটের সামনে হাত ধোয়ার পাত্র, বদনা নিয়ে সাধারণ ভৃত্যের মত দাঁড়িয়েছিলেন। শাহ বললেন, হুমায়ুন যদি ভাইদের সঙ্গে এই রকম ব্যবহার করতেন, তাহলে ভাল হত [৩]। এর পর থেকে বাহারাম মির্জা হুমায়ুনের শত্রু হলেন। অনুগামীদের ডেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন হুমায়ুনের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শাহ তাদের মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন [৪]।
বাহারাম যে শাহের কান ভাঙানোর উদ্যম নিয়েছিলেন, সেটা কত দূর সফল হয়েছিল আজ বলা মুশকিল। বাদাউনি বলছেন বাহারাম মির্জা ঘাজওয়াদান যুদ্ধে বাবরের বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টা শাহকে মনে করিয়ে দিলেন। তার বক্তব্য ছিল বিশ্বাসঘাতকের ছেলেকে সাহায্য করা আত্মঘাতী হতে পারে। শুধু যে বাহারামের কানভাঙানিতে শাহ হুমায়ুনের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করে দিয়েছিলেন এমন নাও হতে পারে [কারন যে ভাইকে শাহ হাত ধোয়ানোর কাজে ব্যবহার করে, শাহের রাজত্বের থাকবন্দীতে তার ভায়ের গুরুত্ব এক বদনা বওয়া রাজকীয় ভৃত্যের সমান — অনুবাদক]; নিশ্চই তার আরও গুরুত্বপূর্ণ কারন আছে, যার জন্যে শাহ একজন বিদেশি, আশ্রয় চেয়ে আসা অভ্যাগতর সঙ্গে প্রায় কারাগার বন্দীর মত আচরণ করবেন।
স্টূয়ার্টের জৌহর এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জৌহরের পাণ্ডুলিপির বয়ান হল শাহ হুমায়ুনকে খুব করার পরিকল্পনা ছকে ফেলেরছিলেন। অথচ সুর যদুনাথ সরকার এবং পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির পাণ্ডুলিপির কোথাও শাহের হুমায়ুনকে খুন করার ইচ্ছের উল্লেখ নেই। জৌহরের ইন্ডিয়া অফিস পাণ্ডুলিপি এবং ফৈজী সিরহিন্দি জানাচ্ছেন শাহ একবার হুমকি দিয়েছিলেন হুমায়ুন যদি নবা শিয়া ধর্ম গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে তিনি আগুনে ছুঁড়ে ফেলবেন — কিন্তু তিনি যে হুমায়ুনের প্রাণ নেওয়ার চক্রান্ত করেছেন, এমন কোনও ইঙ্গিত তাদের লেখায় নেই। বাদাউনির কিছু পাণ্ডুলিপিতে পাচ্ছি বাহারাম মির্জা শুধু যে হুমায়ুনের পরিকল্পনা বানচাল করারই পরিকল্পনা করে নি, সে হুমায়ুনকে শেষ করে দেওয়ারও চক্রান্ত করেছিল। নিজামুদ্দিন বলছেন, হুমায়ুনকে খুন করার জন্যে বাহারাম, দাদা শাহকে প্ররোচিত করে [৫]। ব্রিগসের ফরিস্তা বলছেন ‘হুমায়ুন একটা সময় জীবনের আশংকা করছিলেন’ কিন্তু কোথাও লেখেন নি বাহারাম বা শাহ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে চন্তান্ত রচনা করেছেন [৬]। শারাফ খান স্টুয়ার্টের জৌহর আর ব্রিটিশ পাণ্ডুলিপি শাহের হুমায়ুনের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিষয়ে একমত। সারাফ নামা একটা সময়ে শাহ, হুমায়ুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্যে মনস্থির করেছিলেন [১]।
ছোটখাটো পার্থক্য শিকেয় তুলে রাখলেও ওপরের আলোচনায় একটা বিষয় পরিষ্কার হুমায়ুনের জীবন নেওয়ার জন্যে কোনও একটা সময় শাহ মনস্থির করেছিলেন। তার পরিকল্পনায় জল ঢেলে দেন তাঁর বোন সুলতানাম বেগম, হুমায়ুনের জীবনের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে। তিনি ভাইকে অনুরোধ করেন, তিনি তুর্কি, উজবেগ, ককেসাসিয় এবং ইওরোপিয়দের হাতে কোণঠাসা — হুমায়ুনকে খুন করলে তিনি আরও একজন নতুন শত্রু বাড়বে। হয় তার ভাই, না হয় তার পুত্র কেউ না কেউ তার হয়ে প্রতিশোধ নিতে আসবে — তিনি যদি হুমায়ুনকে সাহায্য না করতে চান তাহলে তাকে না মেরে চলে যেতে দিন। শাহ তাঁর বোনের যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে মাথা থেকে হুমায়ুনকে হত্যার পরিকল্পনা বাতিল করলেন [২]। জৌহরের অন্য পাণ্ডুলিপি সুলতানম বেগমের আরেক রকম আবেদন উল্লেখ করেছে। তিনি শাসক ভাইকে বলেন তিনি শাহের ভাল চান, তাই কিছু স্বার্থবাদী মানুষের কথায় প্রভাবিত না হয়ে, হুমায়ুনের হিন্দুস্তান রাজ্য উদ্ধারের জন্যে যথাযোগ্য সাহায্য করুন। শাহের সামনে সুলতানম আলি এবং তাঁর পুত্রদের প্রতি আনুগত্যের হুমায়ুনের লেখা কবিতা পড়ে শোনান [৩]। তাঁর কথার উত্তরে শাহ বলেন এত দিনব তার আমীরেরা তাঁকে ভুল পথে চালিত করছিল, এত দিনে তিনি ঠিক পরামর্শ পেলেন [৪]।
সুলতানম বেগম ছাড়া যে মানুষটা শাহকে যোগ্য পরামর্শ দিয়েছেন, তার নাম কাজি জাহান, শাহের রাজত্বের দেওয়ান। প্রভাবশালী চিকিৎসক হাকিম নুরুদ্দিনও প্রবাসে হুমায়ুনের দুঃখের দিনে তার সহায়ক হয়ে শাহের মাথা থেকে হুমায়ুন সম্বন্ধে সব রকম ভুল ধারণা দূর করতে সাহায্য করেছেন। তুর্কি সীমান্তে নিযুক্ত শাহ তামস্পের ছোট ভাই আলকাস মির্জা, দাদা শাহকে চিঠি লিখে রাজকীয় অতিথির পাশে দাঁড়ানো এবং যথাযোগ্য আতিথেয়তা দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেন [৫]। বাহারাম মির্জা বিষয়ে নিজামুদ্দিন, বাদাউনি, তারিখ-ই-আলফি, তারিখ-ই-খানদান-ই-তৈমুরিয়া এবং ফরিস্তার মনোভাবের বিরোধিতা করেছেন জৌহর। তাঁর মতে বাহারাম মির্জা সুলতানম বেগমের মতই হুমায়ুনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং শাহকে হুমায়ুন বিষয়ে পজিটিভ স্ট্যান্ড নিতে ক্রমাগত পরামর্শ দিয়েছেন। (চলবে)