চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
হুমায়ুনের পারস্য ছাড়ার পরের জীবনের কর্মকাণ্ড থেকে মনে হয় নি তিনি হৃদয় থেকে শিয়া ধর্ম মেনে নিয়েছিলেন। অথচ হামিদা বানু বেগম, তাঁর ডান হাত বৈরাম বেগ, এমন কী তাঁর মা মাহাম বেগমও হয়ত ধর্মে শিয়া ছিলেন [৩]। তিনি মশদে দু’দুবার ইমাম রিজার মাজারে গিয়েছেন; পারস্যের অন্যান্য শিয়া সন্তের মাজারেও গিয়েছেন কয়েকবার। ইরানে হুমায়ুন যে শিয়াধর্মের প্রতি অতিআসক্তি প্রদর্শন করেছিলেন, এই কথা আজ না বললে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। হিন্দুস্তানে তিনি প্রশাসনে শিয়া আমলা নিযুক্ত করেছেন। তাঁর কবিতায় আলির প্রতি তাঁর আন্তরিক নিবেদন এবং শিয়াবিশ্বাসে তাঁর প্রশ্রয়ের বার্তা দেখি [৪]। হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে উদ্ধার করার আগে তিনি মারা যান, এবং ইরান থেকে ফেরার পরে তিনি মন দিয়ে রাজত্ব করতে পেরেছেন, এ কথাও বলা যাবে না। হিন্দুস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি প্রজা তাদের শিয়া সম্রাটকে মেনে নেবে কী না এ বিষয়ে প্রশ্ন ওঠার আগেই তিনি প্রয়াত হল। ফলে তিনি শিয়া ধর্মকে ত্যাগ করে সুন্নি ধর্মে ফিরে এসেছিলেন কী না, সুন্নি হিসেবে প্রয়াত হয়েছিলেন কী না সে তথ্য আজ বলা মুশকিল। তবুও আমরা বলতে পারি, ইতিহাসের পাতায় প্রমান হুমায়ুন শিয়া ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও তিনি মানসিকভাবে শিয়া ধর্মকে হয়ত গ্রহণ করেন নি। শিয়া ধর্ম নিয়ে তার উচ্ছ্বাস, তাঁকে শিয়া ধর্মে তাঁর অনন্ত মতি, এসব পারস্য প্রবাসে নিরাপদে টিকে থাকার, শাহের থেকে হিন্দুস্তান উদ্ধারে সাহায্য চাওয়ার কূটনৈতিক মুখোশ মাত্র।
কান্দাহার নিয়ে তার অবস্থান পরিবর্তনের মতই ধর্ম পরিবর্তন বিষয়ে শাহকে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেটাও উল্লঙ্ঘন করতে পারতেন। বাদাউনির বয়ান অনুযায়ী হুমায়ুন হিন্দুস্তান উদ্ধারে তার বাহিনীর নেতৃত্বে শিয়া সেনাপতি সুন্নি শায়েখ হামিদ নিয়ে ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেন নি। হুমায়ুনের বক্তব্য, তার সেনারা অধিকাংশ রফিজি, তাদের নামের সঙ্গে আলির নাম জুড়ে আছে। তাছাড়া তাঁর ঠাকুর্দার নাম ছিল দ্বিতীয় খলিফার নামে, এবং শাইখকে তার বিশ্বাস রক্ষার বিশুদ্ধতার আশ্বাস দিয়েছেন, যা সেই ধর্মান্ধ ঐতিহাসিকের কাছেও সুন্নিবাদ ছাড়া আর কিছুই নির্দেশ করে না [৫]। সত্য হল কাজি জাহান হুমায়ুনকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি প্রবাসে অসহায়; তারা [শাহ] যে পথে আপনাকে চালাতে চাইছেন, আপনি সেই পথে চলার কথা ভাবুন’ [৬]। তাঁর ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসের বিনিময়ে প্রবাসে তিনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছে। ধর্ম বিশ্বাস বিষয়ে তিনি বাবরের দেখানো পথই অনুসরণ করেছেন। বাবর শাহ ইসমাইলিদের মনে বিশ্বাস উৎপাদনের জন্যে নিজে এবং তাঁর সেনাদের পারসিক তাজ পরাতে বাধ্য হয়েছিলেন, মুদ্রায় ১২ ইমামের নাম খোদাই করেছিলেন [১]।
৭। তৃতীয় পর্ব — বিদায় উৎসব — শাহের সঙ্গে শেষ দিন
সাফাভি দরবারে হুমায়ুনের এর পরের বাকি দিনগুলো শান্তিতেই কেটেছে। তখতই সুলেইমান [আক্ষরিক অর্থে সলোমনের সিংহাসন; বাস্তবে পাহাড়; আজকে located near the town of Darazinda in the Dera Ismail Khan Subdivision of Khyber Pakhtunkhwa, Pakistan] অঞ্চলে শিকার, আনন্দ বিহার এবং উৎসব আয়োজনে শেষ দিনগুলো ভালই কাটছিল। বেশ কয়েকটি উৎসব আর আনন্দ অনুষ্ঠানের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন বায়াজিদ; তখতইসুলেইমানের অনুষ্ঠানগুলোয় তিনিও উপস্থিত ছিলেন [২]। তখত-ই-সুলেইমান, সাভুক বুলাক, হাউজিসুলেইমান আর আকিজিয়ারত অঞ্চলে শিকার উৎসব আয়োজন করা হল। বেভারিজ বলছেন সাভুক বুলাক হল তখতইসুলেইমান অঞ্চলের কাছে সুজ বুলাক [৩] — এখানে হুমায়ুন আর শাহ দুজনে একসঙ্গে শিকার করতে জঙ্গলে প্রবেশ করেন, তাদের পিছনে আসেন শাহের দুই ভাই বাহারাম মির্জা আর সাম মির্জা। এরপরে প্রবেশ করেন বৈরাম বেগ, তারপরে অন্য আমলা। দুপক্ষেরই আমলাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বৈরাম বেগ [৪]। আরেকটা শিকার উৎসব আয়জিত হল সুলেইমান হ্রদ অঞ্চলে। সুই সম্রাট পোলো খেললেন এবং তীরান্দাজিও অভ্যাস করলেন। তীরান্দাজিতে বৈরাম বেগ আর জাহি মহম্মদ কোকি চূড়ান্ত দক্ষতা প্রদর্শন করে প্রথমজন খান আর দ্বিতীয়জন সুলতান উপাধি লাভ করেন [৫]। শেষ শিকার উৎসব আয়োজিত হয় আকিজিয়ারত অঞ্চলে। এটা সাফাভি রাজত্বের গ্রীষ্মাবকাশ রাজধানীর কাছে সুরলাক অঞ্চলে অবস্থিত [৬]। গুলবদন বলছেন হামিদা বানু বেগম এই শিকার উৎসব দূর থেকে দেখেন এবং শাহ তামস্পের বোন/বিবি [জৌহর বলছেন বোন, কিন্তু আধুনিক ইতিহাস বলছে রাজ্ঞী] সুলতানম শাহের ঘোড়ায় চড়েন।
হুমায়ুনের শেষতম বিশাল বিদায় অনুষ্ঠান আয়জন করেন শাহ তাহমস্প। সাত দিন ধরে চলল এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। জৌহর উৎসব অনুষ্ঠানের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। মাঠ কয়েকস্তর কার্পেটে ঢেকে ফেলে ৬০০টা আকাশছোঁয়া তাঁবু খাঁটানো হল রাজকীয় ভঙ্গীমায় [১]। ১২ সেনা সঙ্গীত দল রাজকীয় অভিজাত অভ্যাগতদের আমন্ত্রণের জন্যে বাজনা নিয়ে তৈরি। বিখ্যাত সুলতানেরা, উচ্চপদের খানেরা, মির্জারা এবং বাহিনীর সেনাপতিরা একে একে আবির্ভূত হলেন উৎসবে অংশ নিতে। অনুষ্ঠান চলল তিনদিনধরে। প্রথম দিন প্রত্যেককে খেলাত উপহার দেওয়া হল; যতরকম খাওয়ার তৈরি করা সম্ভব, সব ক’টি উপস্থিত করা হল অভ্যাগতদের জন্যে। দ্বিতীয় দিন হুমায়ুনের ফেরত যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি বৈঠক আয়জন হয়। শাহ বললেন তাঁকে রাজত্ব উদ্ধার করার জন্য যথেষ্ট পরিমান তাঁবু, ঘোড়া, উট এবং অন্যান্য রসদ দেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে পুত্র মুরাদ ১২,০০০ বাছাবাছা ঘোড়সওয়ার সেনা নিয়ে তাঁর ফেরার রাস্তায় সিস্তানে অপেক্ষা করছে। তৃতীয় দিন দুই সম্রাট তীরান্দাজিতে দিন কাটালেন [২]।
৮। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বিচ্ছেদ
শেষ উৎসব অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার পর দুই রাষ্ট্র প্রধান আলাদা হলেন। সকালে হুমায়ুন আশ্রয় দেওয়া অভ্যাগতকে সম্মান জানাতে গেলেন। হুমায়ুন ঢুকে দেখলেন শাহ একটা ছোট কার্পেটকে তিন ভাঁজ করে বসে আছেন। শাহের পাতা কার্পেটে তাঁর বসার জায়গা নেই। মনঃক্ষুণ্ণ হুমায়ুন মাটিতে বসতে যাবেন, এমন সময় জনৈক মুঘল হাজি মহমকদ কাসা তার তুণীরের ঢাকাটি খুলে মাটিতে হুমায়ুনের বসার জন্যে বিছিয়ে দিয়ে তাঁর মান বাঁচালেন। শাহের এই ছোট্ট ব্যবহার থেকে আমরা সাফাভি দরবারে মুঘল রাজের অভ্যর্থনার সামগ্রিক চরিত্রটি আন্দাজ করতে পারি [৩]।
হুমায়ুন এবং শাহ দুজনেই তখতইসুলাইমান থেকে বার হয় ৮ মাইল দূরত্বে শিবির ফেললেন। এখানে হুমায়ুন তার আশ্রয়দাতার জন্যে উৎসব আয়োজন করলেন। শাহের পছন্দ অনুযায়ী হিন্দুস্তানি খাবার পেশ করা হল। রান্না শাহের দারুন পছন্দ হল। ভাতের সঙ্গে মটরশুঁটি ইরাণে খুবই বিখ্যাত খাওয়ার।
এখান থেকে দুই সম্রাট মিয়ানায় পৌঁছলেন [৪]। শাহের অনুরোধে হুমায়ুন তার সহকারীদের পিছনে রেখে একাই শাহের সঙ্গে গেলেন চার মাইল দূরত্বে [৫]। প্রচণ্ড বর্ষায় হুমায়ুনকে শাহের তাঁবুতে থাকতে হল। এই ক’দিন হুমায়ুনকে তাঁর সব থেকে ভাল ব্যবহার উজাড় করে দিয়েছিলেন পারস্যের। এই প্রথম তিনি হুমায়ুনের কাছে ক্ষমা চাইলেন — তার শব্দবন্ধ হুমায়ুনের হৃদয় আর্দ্র করল চিরতরে — ‘হে হুমায়ুন, আমার পক্ষ থেকে যদি কোনও কিছুর অভাব থেকে থাকে, আপনার মহৎ হৃদয় তাকে নিশ্চই ক্ষমা করবে’। দুজনের বিচ্ছিন্ন হওয়ার দৃশ্যটি জৌহর বিশদে লিখেছেন — ‘বর্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে পরেই শাহ নানান অপরূপ রত্নে খচিত ধারালো ছোরা আর দুটো আপেল হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হুমায়ুন পাদশা, আমরা এক্ষুণিই আলাদা আলাদা পথে রওনা হব, বিদায় অভিবাদন গ্রহণ করুন’। হুমায়ুন শাহের হাতের তলায় তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন, শাহ শুধু বললেন, ‘গ্রহণ করুন’। দুজন দুজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শাহ হাত নামিয়ে তাঁর হাতে উপহারগুলো রেখে, ‘সর্বশক্তিমানের সদিচ্ছা আপনার সঙ্গে থাকুক’ বলে তাঁকে বিদায় জানালেন [২]। (চলবে)