চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
২। কাজভিনে দ্বিতীয়বার
আদারবিল থেকে হুমায়ুনের কাজভিনে আসার পথ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। জৌহরের নিরিখে হুমায়ুন খারদাবিল, তারুম এবং সরখাব হয়ে কাজভিনে পৌঁছন [১]। আবুলফজল বলছেন খলখল, তারুম এবং খারাজবিল হয়ে ফিরছেন — কিন্তু তিনি হুমায়ুনের কাজভিন ফেরার কথা আদৌ উল্লেখ করছেন না [২]। মসিরইরহিমি অন্য রাস্তা বলছে খলখল, মনজিল এবং খারজাবিল [৩]। আলমআরাইআব্বাসি বলছে আরদাবিল হয়ে ফেরেন তিনি খলখল এবং তারুমের পথে [৪]।
খলখল জেলার প্রধান শহরের নামও খলখল। এটি আরদাবিলের দক্ষিণে অবস্থিত [৫]। সারাব বা সরকাব তাবরিজ থেকে আরদাবিল যাওয়ার পথে পড়ে। মুস্তাউফি বলছেন এই শহর তাবরিজ থেকে তিনদিনের পথ আর আরদাবিল থেকে দুদিনের পথ [৬]। গিলান আর কাজভিনের মধ্যেকার শহর হল তারুম [৭]। মনে হয় না হুমায়ুন তারুমের মত দূরত্বের শহরে এসে সারাব শহরে আসবেন। সারাব, আরদাবিল থেকে মাত্র দুদিনের পথ। এই পথের বর্ণনা আমরা জৌহরের লেখায় পাই। হয়ত তিনি সারাব পৌঁছনোর আগে খলখল গিয়ে থাকবেন। হুমায়ুনের পথটা এরকম হওয়া স্বাভাবিক — আরদাবিল থেকে সরব, সেখান থেকে খলখল। এরপর খলখল থেকে তারুম, সেখান থেকে মনজিল, মনজিল থেকে ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে কাজভিনে পৌঁছলেন। জৌহর যে খারাজবিল বা খরদাবিলের কথা বলছেন সেটা মানচিত্রে পাই না বা একজনও ঐতিহাসিকের লেখাতে দেখি না। আবুলফজল বলছেন হুমায়ুন সেখানে তিন বা চারদিন কাটান। আবুলফজলের যাত্রার সূচী দেখে মনে হয় এটা তারুম আর কাজভিনের মধ্যে আর জৌহরের লেখা সূত্রে মনে হয় আরদাবিল আর তারুমের মাঝে [৮]।
শাহ’র সারলাক থেকে কাজভিনে পৌঁছনোর দিন, হুমায়ুনও কাজভিনে ঢুকলেন। হুমায়ুন কেন এতদিন নিজ রাজ্য উদ্ধারে ব্রতী না হয়ে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেখে স্বাভাবিকভাবে শাহ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি অবিলম্বে মিথর খিয়ালিকে নির্দেশ দিলেন হুমায়ুনকে যেন সেই মুহূর্তে কাজভিন ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং দেখা হয় তিনি যেন ১২ লগ পথ পেরোচ্ছেন। হুমায়ুন কাজভিনে বিশ্রাম না নিয়ই বাধ্য হলেন দলবল নিয়ে রওনা হতে। কাজভিনে তার দ্বিতীয়বারের আসাটা খুব একটা সুখদ অভিজ্ঞতা হল না।
হুমায়ুনের কাজভিনে দ্বিতীয়বার আসার কথা ভারতবর্ষীয় ইতিহাস সূত্রে আমরা জৌহর আর মাসির-ই-রহিমিতে শুধু পাই। সাফাভি দু-একটা সূত্র বলছে হুমায়ুন তাবরিজ আর আরদাবিল থেকে ফেরার পথে কাজভিনে থেকে যান, এখানেই শাহ তাঁকে থেকে বিদায় সম্ভাষোণ করেন কারন তিনি কাজভিন তাবরিজ আর আরদাবিলে তাকে বিদায় দিতে পারেন নি। জৌহর ছাড়া একজনও ইতিহাসকার এমন কী মাসির-ই-রহিমিতেও হুমায়ুনকে মুহূর্তের মধ্যে শহর ছাড়তে বাধ্য করার সংবাদ পাই না। জৌহরকে অবিশ্বাস করার কারন নেই। অন্যান্যরা কেন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করে গেলেন, সেটা আমরা এর আগে কয়েকবারই আলোচনা করেছি [২]।
৩। কাজভিন থেকে মশদ
হুমাইয়ুনের বাহিনী দার্স পৌঁছতেই শাহের নির্দেশে হুমায়ুনের রাঁধুনি ইয়াকুবকে চার ঘোড়সওয়ার মিলে খুন করে [৩]। শাহের চেম্বারলেইন সুলতানকে অভিযোগ করেছিলেন তাকে কোনও এক দিন পারসিক তাজ নিয়ে কথা চলার সময় ইয়াকুব অসম্মানজনক কথা বলেছিল। এই রকম ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি হুমায়ুনের প্রতি শাহের মনে বিন্দুমাত্র সম্মানবোধ ছিল না, না হলে তিনি কীভাবে হুমায়ুনের দলের একজন কর্মীকে, হুমায়ুনের অনুমতি না নিয়ে খুন করার নির্দেশ দিতে পারেন?
বেশ কয়েকদিন প্রায় একটানা হাঁটার পরে হুমায়ুনের বাহিনী সবজাওরে পৌঁছোল। মীর শামসুদ্দিন আলি সুলতান তাদের যথাযোগ্য সম্মান দিলেন, দড়িতে নাচ আর তীরান্দাজির দক্ষতা দেখালেন। আবুলফজল বলছেন হুমায়ুন হামিদা বানু বেগম এবং তার সহায়ককে সোজা রাস্তায় হাজি মহম্মদ খানের সুরক্ষায় মিয়ানা থেকে কান্দাহারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হাজি সবজাওরে দলের সঙ্গে যোগ দিলেন [১]। জৌহর বলছেন সবজাওর থেকে হুমায়ুন তার বেগমকে তাবাস [২] হয়ে যাওয়ার জন্যে রওনা করে দিলেন আর নিজে মশদের দিকে এগোলেন [৩]। বায়াজিদ বলছেন হুমায়ুন মশদ পৌঁছেছিলেন জাকি গিরিখাত পার হয়ে।
মশদেও সেখানকার প্রশাসক এবং আমিরেরা তাঁকে বিপুল অভ্যর্থনা জানালেন। আবুলফজল বলছেন কয়েকদিন এখানে থেথাকার পর তিনি শাহকে বাকি সেনা বাহিনী পাঠাবার বার্তা পাঠালেন। জৌহরের বক্তব্য তীর্থের শহরে হুমায়ুন এক সপ্তাহ থাকলেন — তখন বরফপাত শুরু হয়েছে। তিনি ইমাম আলি রাজার মাজারে গেলেন। সেখানে দেখলেন তিনি যে ধনুকের ছিলা সেই দরজায় টাঙ্গিয়ে গিয়েছিলেন, সেটি তখনও আছে [৪]। বায়াজিদ বলছেন বৈরাম খান মশদ থেকে বিটার আমন্ড গাছের একটা ডাল ভেঙে নিয়ে আসেন। কাবুল যাওয়ার পথে হাজারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় সেই ডালকে নিজের বাহুতে বেঁধে শুভ আক্রমণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করবেন [৫]। মাশদের আমীরেরা হুমায়ুন আর বৈরামকে একসঙ্গে দেখল। প্রখ্যাত এনিগমাটিস্ট মৌলানা জামশিদ এবং কবি মুল্লা হাইরাতি পূণ্য শহরে হুমায়ুনের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এখান থেকেই বৈরাম খান কবি মুল্লা হাইরাতির পৃষ্ঠপোষক হলেন [৬]।
৪। মশদ থেকে সিস্তান
হুমায়ুনের খোদিত লিপি থেকে প্রমান ১৪ শাওয়াল ৯৫১ ২৯ ডিসেম্বর ১৫৪৪-এ জামে আসেন। বাজায়িদের দেওয়া মশদের তারিখ ১৫ ডিসেম্বরের সঙ্গে তার জামে আসার তারিখটা মেলে। একই সঙ্গে জৌহর যে বলেছেন, সেখানে তিনি কমকরে এক সপ্তাহ ছিলেন, সেই তথ্যটাও মিলে যায় [৭]। একটা বিষয় পরিষ্কার হল হুমায়ুন মশদ থেকে জামে দ্বিতীয়বার এলেন [৮]। তারিখ-ই-ইব্রাহিমিতেও একই কথা উল্লিখিত আছে [৯]। অন্য কোনও ভারতীয় বা সাফাভি ইতিহাসে জামে তাঁর দ্বিতীয়বার আসার উল্লেখ পাই না।
জৌহর, আবুলফজল বলছেন হুমায়ুন মশদ থেকে রোবাত তারাকে গেলেন [১০]। তারাকে তিনি বহু সমস্যার মুখোমুখি হবেন। এটি ইসফাহানের কাছে এবং ইসফাহাম থেকে কুমের মধ্যে পড়ে; মশদ থেকে ৫০০ মাইল দূরে। রোবাত তারাক থেকে জৌহর বলছেন হুমায়ুন লেঙ্গারে শাহ কাশিমইআনোয়ারের মাজারে গেলেন। শাহ কাশিমইআনোয়ারের মাজার যেহেতু জাম [২] জেলায় অবস্থিত, লেঙ্গারও তাই জাম জেলায় অবস্থিত হওয়া উচিৎ। এবং তাই হয়েছে, এটি তুরাবাতইশেইখ থেকে ১৫ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত [৩]। লেঙ্গার মশদ থেকে ৯০ মাইল দূরত্বে। হুমায়ুনের লক্ষ্য যেহেতু সিস্তান, তাই তার উচিৎ ছিল মশদ থেকে ল্যাঙ্গার, ল্যাঙ্গার থেকে রোবাত তারক আসা; সেটা না করে তিনি রোবাত তারক থেকে উত্তর-পূর্বের ল্যাঙ্গার গেলেন। তাহলে তাঁর রাস্তাও ছোট হত এবং সহজে, সোজা সিস্তান থেকে তাবাসে পৌঁছতে পারতেন। জৌহর বা আবুলফজল কেউই বলেন নি, কেন হুমায়ুন মশদ থেকে রোবাত তারকের মত দূরের এলাকায় গিয়ে আবার সেই রাস্তায় লাঙ্গারে ফিরে এলেন। রোবাত তারকের কোনও গুরুত্বই ছিল না, ইয়াকুত বলছেন এটি একটা ছোট শহর মাত্র [৪]। মশদ থেকে রোবাত তারকের ১০০০ মাইল এবং রোবার তারাক থেকে ল্যাঙ্গার এই গোতা রাস্তা এক মাসের কমে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। এমতাবস্থায় হুমায়ুন জামে যে ২৯ ডিসেম্বর ১৫৪৪ খোদায় করেছেন, সেই সময়ে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না। এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার আবুলফজল আর জৌহরের তারক কোনও ভাবে রোবাত তারক বা ইয়াকুতের ইসফাহানের কাছের রোবাত তারক হওয়া সম্ভব ছিল না; এটা হওয়া দরকার ছিল মশদের ৮ মাইল দক্ষিণ পূর্বের তুরুক শহর [৫]।
ফলে একটা বিষয় পরিষ্কার ল্যাঙ্গার থেকে হুমায়ুন জামে গেছেন অর্থাৎ তুরাবাতইশেইখ জাম এবং সেখান থেকে খারজির্দ গেলেন, সেখান থেকে খাজা কাশিমইআনোয়ারে মাথা ঠেকাতে যান। ল্যাঙ্গারে শাহ কাশিমইআলোয়ারের মাজারে হুমায়ুন গিয়েছেন, জৌহরের দেওয়া এই তথ্যটায় গণ্ডগোল আছে কারন এটা খারজির্দ থেকে ৯০ মাইল দক্ষিণে। খারজির্দে বাহিনীর একটা অংশ হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দিল [৬]।
জাম থেকে বেরিয়ে হুমায়ুঙ্কাহ কেল্লায় পৌঁছলেন; বেভারেজ একে চিহ্নিত করছেন কাখ হিসেবে [৭]। কাখ অবশ্যই মশদ থেকে সিস্তানের রাস্তায় পড়ে, কিন্তু আরেকটা জায়গা আছে যার নাম কিলাইকাখ; গোল্ডস্মিথ জায়গাটি নিয়ে যে বর্নণা দিয়েছেন, তার সঙ্গে জৌহরের [৮] তথ্য মিলে যায় যে এই কিলাইকাহতেই ১২ জন ইমামের একজন ইমাম অদৃশ্য হয়েছিলেন; সেই মাজার থেকে ঢাক ঢোলের আওয়াজ উঠছিল [১]। বিভারিজ একে কাখ পড়েছেন, ফলে এটার অবস্থান হয়েছে ইসফাহান আর সিস্তানের মধ্যে; কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ঠিক নয়, কারন হুমায়ুন ইসফাহানের কাছের রোবাত তারকে যান নি, এবং জৌহরের বর্ণনা কাখের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ নয়।
জৌহর বলছেন হুমায়ুন কিলাইকাখ থেকে তাবাস পৌঁছন। মাথায় রাখতে হবে তাবাস কিলাকির থেকে কিলাকিকাহ, তাবাদ মাসিনান, যতদূরসম্ভব বিরজান্দের থেকে ৬০ মাইল দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত। তিনি এটার কথাই হয়ত বলতে চেয়েছেন। জাম থেকে কিলাইকাহের মধ্যে জামের অবস্থান। স্বাভাবিকভাবে হুমায়ুনের পক্ষে তাবাস হয়ে কিলাইকাহতে পৌঁছনোই বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা ছিল। মসির-ই-রহিমি বলছে হুমায়ুন সিস্তান পৌঁছেছিলেন মশদ থেকে আখ আর উখ কেল্লা হয়ে [২]। উক হল সিজিস্তান বা সিস্তানের কেল্লা। এটির অবস্থান ফাতাহ এবং জারাঞ্জের মধ্যের অঞ্চলে [৩]। হুমায়ুন সিস্তানের দিকে যাওয়ার জন্যে পূর্বের দিকে কিলাইকাখ অবদি এসে সেখান থেকে উত্তরপশ্চিমের তাবাসে পৌঁছে দক্ষিণপশ্চিমের উক ছোঁয়া রাস্তা ধরলেন। আমাদের কাছে তাঁর যুক্তিপূর্ণ যাত্রা পথ হতে পারত – জাম থেকে তাবাস, তাবাস থেকে কিকাইকাখ, সেখান থেকে উক হয়ে সিস্তানে প্রবেশ করা [৪]।
শাহ পুত্র শাহজাদা মুরাদ পারসিক বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্তানের দিকে যাত্রা করা হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দেবেন সিস্তান শহরে। বাহিনী নিরীক্ষণের জন্যে হুমায়ুন সিস্তানে এক সপ্তাহ কাটাবেন। কোনও ইতিহাসকার বলছেন মুরাদ এনেছিলেন ১০,০০০ ঘোড়সওয়ার, কারোর মতে ১২,০০০; সঙ্গে ৩০০ শাহের নিজস্ব বিশেষ ককেসাসিয় দেহরক্ষী বাহিনী। কাজভিন থেকে বেরিয়ে সিস্তানে তারা থানা গেড়েছে বালক শাহজাদা মুরাদের নামে, কিন্তু বাগদা খানের নেতৃত্বে। শাহজাদা মুরাদের নেতৃত্বে আসা সেনাপতিদের নামোল্লেখ করছেন বায়াজিদ; টুকেছেন আবুলফজল। বায়াজিদ ১৮ জনের সঙ্গে আবুলফজল আরও ৮ জনের নাম অতিরিক্ত জুড়েছেন। ইন্টারেস্টিং হল যে বিশাল সংখ্যক উচ্চপদস্থ সেনানী হুমায়ুনকে হিন্দুস্তান উদ্ধার করার জন্য ইরাণ থেকে এসেছিলেন, তার মধ্যে একজন মির্জা জাহান শাহের নাতি মহম্মদ মির্জা, বৈরাম খানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
এখন হুমায়ুন ইরাণ ছাড়তে তৈরি। হাতে ১২,০০০ [যতদূরসম্ভব ১২,০০০ কিজিলবাস] ঘোড়সওয়ার আর ৩০০ বিশেষভাবে যুদ্ধ প্রশিক্ষিত শাহের ৩০০ ব্যক্তিগত দেহরক্ষী নিয়ে এবারে প্রবেশ করবেন ভাই বিতর্কিত মির্জা কামরানের নিয়ন্ত্রিত রাজত্বে। (চলবে)