প্রথম অধ্যায়
হুমায়ুন পারস্যমুখে যাত্রা
১। ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য উদ্ধারের সমস্ত আশা ছেড়ে কান্দাহারের দিকে যাত্রা করলেন
কনৌজ যুদ্ধের তিন বছর দুমাস বাদে ৭ রবিউলআখির ৯৫০/১১ জুলাই ১৫৪৩ ভারতবর্ষ উদ্ধারের সমস্ত আশা জলাঞ্জলি দিয়ে হুমায়ুন জুন [১] অঞ্চল ছেড়ে ভাই কামরানের রাজ্য কান্দাহারে স্থায়ী বসবাস করার মানসিকতায় রওনা হলেন [২]। মুঘল বাহিনী কোন রাস্তায় কান্দাহার যাচ্ছিল, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভিন্নমত। শাহী বাহিনীর সঙ্গে থাকা জওহর লিখছেন, জুন থেকে সিওয়ান এবং সিহর থেকে গান্দাভা হয়ে শাল মস্তাঙ্গ রাস্তা ধরেন তারা। আবুলফজল কিন্তু অন্য একটা রাস্তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলছেন হুমায়ুন শিবি হয়ে শালে পৌঁছন। আর শালে পৌঁছেই তিনি কামরানের শয়তানি পরিকল্পনা আঁচ করতে পারলেন। শাল থেকে কান্দাহারের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করে মস্তাঙ্গের দিকে রওনা হল মুঘল সম্রাটের বাহিনী। অন্যদিকে গুলবদনের বয়ানে মনে হয় তিনি শিবিকে দূরে রেখে শাল হয়ে মস্তাঙ্গ পৌঁছেছিলেন। ভক্ষর থেকে মস্তাঙ্গ পর্যন্ত কোন রাস্তা হুমায়ুন ধরেছিলেন, সেই তথ্য আজ বার করা মুশকিল। গান্দাভাই হোক বা শিবি, দুটোর একটা ধরে তিনি শাল বা কোয়েটায় পৌঁছন — এটা আবুল ফজলের বয়ান [৩]। মনে হয় হুমায়ুনের রাস্তাটা ছিল এইরকম — জুনে সিন্ধু নদ পেরিয়ে সিওয়ানের দিকে এগোলেন; সিওয়ানের রাস্তা গান্ধাভা হয়ে শিবি গিয়েছে — তিনি সেই রাস্তা ধরে শিবি থেকে শাল [কোয়েটা] যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু রাস্তায় কামরানের শয়তানি পরিকল্পনার খবর পেয়ে আবার মস্তাঙ্গে ফিরে এলেন। বৈরাম বেগ আর তারদি বেগ হুমায়ুনকে শিবিতে পরামর্শ দিলেন শালে এবং মস্তাঙ্গে যাওয়ার জন্যে। সেখানে তিনি চেষ্টা করলে আফগান সেনাপতিদের আর মির্জা আসকরির অনুগামীদের সঙ্গে পেতে পারেন[৪]।
হুমায়ুন বহু কষ্ট সহ্য করে মরুভূমি, এবড়োখেবড়ো রাস্তা, পাহাড়, টিলাভর্তি দুর্গম পথ পেরোলেন তার ছোট্ট মুঘল বাহিনী নিয়ে। রাস্তার দুস্তর কষ্টের বর্ণনা জৌহর বইতে ছবির মত এঁকেছেন। পথে পাহাড়ি ডাকাত দল হুমায়ুনের বাহিনীর প্রচুর রসদ লুঠ, উপযুক্ত রসদ বা শীতের ঠিকমত পরিধেয় না থাকা অবস্থায় পাহাড়ি শীতে প্রায় জমে যাওয়ার অবস্থা কাটিয়ে দরবারি দল কান্দাহারের ১৫০ মাইল দক্ষিণ-পুর্বে মাস্তাঙ্গে পৌঁছতে পারল কঠোর মানসিক দৃঢ়তায়। জুন থেকে শালে পৌঁছবার বেশ কয়েকটা তারিখ পাচ্ছি বিভিন্ন মুঘল সূত্র অনুযায়ী। মনে হয় আবুলফজলের ব্যবহার করা তারিখটাই এমকাত্র নির্ভরযোগ্য। তিনি বলছেন আকবর ১৮ রামজানে ৯৫০/১৬ ডিসেম্বর ১৫৪৩এ কান্দাহার পৌঁছলেন। হুমায়ুন মস্তাঙ্গের শিবির ছেড়ে যাওয়ার পরে পরেই আসকরি হুমায়ুনের ছেড়ে যাওয়া শিবির থেকে আকবরকে কান্দাহারে তুলে নিয়ে যান। কান্দাহারে পৌঁছতে তাঁর দলের ১ সপ্তাহের বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমরা ধরে নিচ্ছি মাস্তাঙ্গে পৌঁছেছিলেন ডিসেম্বরের প্রথমের দিকে। গুলবদনের বর্ণনা উল্লিখিত শীতের পরিবেশের সঙ্গে আলোচ্য সময় মিলে যাচ্ছে, — মস্তাঙ্গ পৌঁছতে না পৌঁছতেই বরফ পড়া শুরু হল আর জৌহর বলছেন, হুমায়ুন তার ফার কোটটা শীতে কাঁপতে থাকা এক বেচারা সেনাপতিকে গা থেকে খুলে পরতে দিলেন। জুন থেকে শালের দূরত্ব ৪৫০ মাইল — এই রাস্তা পেরোতে হুমায়ুনের ৫ মাস লাগার কথা। সিওয়ান থেকে শাল মস্তাঙ্গ বা মস্তাঙ্গ পৌঁছতে ৯ থেকে ১০ দিন লাগার কথা; তাই যদি বাস্তব সত্য হয়, তাহলে জুন থেকে সিওয়ানে পৌঁছতে সাড়ে চার মাসের কাছাকাছি সময় লেগেছে, তার বেশি নয় [১]।
ইতিমধ্যে শাহ হুসেইন, কামরারান আর আসকরি মির্জাকে খবর পাঠিয়ে জানালেন হুমায়ুন কান্দাহারে দিকে এগোচ্ছেন। কামরানের অবর্তমানে মির্জা আসকরি কান্দাহারের সুরক্ষা সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন; তাঁকে কামরান বলে পাঠালেন কেল্লার নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং সম্রাটকে কান্দাহারে ঢুকতে সক্রিয়ভাবে বাধা দিতে। হুমায়ুন মস্তাঙ্গে শিবির ফেলার সংবাদে আসকরি, তরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে হুমায়ুনকে গ্রেফতার করতে জয় বাহাদুর উজবেগকে পাঠালেন; শোনা যায় জয় বাহাদুরের আরেক নাম চুলি উজবেগ, ভারতবর্ষে হুমায়ুন সম্রাটের মুঘল বাহিনীতে মাঝারি পদে কাজ করেছেন। তিনি বর্তমান প্রভু মির্জা আসকরির শয়তানি চাল বিফল করতে স্বয়ং ঘোড়ায় চড়ে দুপুরে বৈরাম বেগের সমীপে পৌঁছে আসকরির মতলব খুলে বলে শাহী বাহিনীকে মুহূর্তের মধ্যে শিবির তুলে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পরামর্শ দিলেন [২]।
বৈরাম শাহী গুলালবরে দৌড়ে কামরান আসার সংবাদ পৌঁছে দিলে মুহূর্তের মধ্যে শাহী দল শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হতে শুরু করল। খাজা মুয়াজ্জম এবং বৈরাম বেগকে নির্দেশ আর দায়িত্ব দেওয়া হল হামিদা বানু বেগম আর শিশু আকবরকে সঙ্গে আনতে। সদ্য মা হওয়া হামিদাকে একটা ঘোড়ায় তুলে দেওয়া হল কিন্তু মুঘল সরদারেরা দেখলেন সদ্যজাত আকবরের পক্ষে যেহেতু সেই সুকঠিন রাস্তা পেরোনো সম্ভব ণোয়, তাই তাঁরা হুমায়ুনকে পরামর্শ দিলেন আকবরকে ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আকবরকে ছেড়ে কান্দাহারের পথ ছেড়ে অন্য দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন হুমায়ুন [১]। কান্দাহার পৌঁছনোর সিদ্ধান্ত পাল্টে তিক্ত বিরক্ত মনে হুমায়ুনের মক্কা মদিনা এবং অন্য যায়গায় তীর্থ করতে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘুরছিল। তার গন্তব্য ঠিকানা আপাতত পারস্য বা ইরান। যদিও হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তীর্থ করতে যাবেন, কিন্তু তার মাথা থেকে রাজত্ব উদ্ধার পরিকল্পনা ঝেড়ে ফেলেন নি; তিনি শাহকে রাজত্ব উদ্ধারের প্রস্তাব দেওয়ার ভাবনা নিয়ে পারস্যের দিকে এগোতে থাকলেন। মাথায় রাখতে হবে, হুমায়ুনের মতি পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক বৈরাম বেগ, তিনি হুমায়ুনকে পারস্য প্রবাসে, হুমায়ুনের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তন করতে শাহকে সামরিক সাহায্য করার অনুরোধ জানানোর পরিকল্পনার জন্মদাতা [২]। পারস্যে হুমায়ুনের কাজকর্ম দেখে মনে হয় সাফাভি সুলতানের সাহায্যে রাজত্ব উদ্ধারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক পরিকল্পনা, সেটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় মক্কা মদিনায় তীর্থ করতে যাওয়ার পরিকল্পনা মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। এটাই ছিল হুমায়ুনের রাজত্ব উদ্ধারের শেষ চেষ্টা।
পারস্যে হুমায়ুনের প্রবাসকাল শুরু হল।
২। মস্তাঙ্গ থেকে সিস্তানের দিকে হুমায়ুনের যাত্রা
হুমায়ুনকে এত তাড়াহুড়ো করে মস্তাঙ্গ ছাড়তে হল যে তিনি শিবিরের সম্পূর্ণ রসদ সঙ্গে নেওয়া বা তাঁবু তোলারও সময় পান নি। বহু সঙ্গী পিছনে ফেলে আসলেন তিনি। পালিয়ে থাকার দুঃখের দিনের প্রথম সময় থেকে একে একে বহু মানুষ, দুর্বিপাকে পড়া পলাতক সম্রাটকে ছেড়ে চলে গেছেন — তিনি নির্বিকার চোখে সে সব দেখেছেন। অনুগামীদের চোখে হুমায়ুনের সম্মান হারানোর একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। হুমায়ুনের ঘোড়া অচল হয়ে গেলে দুর্বিপাকে পড়া পলাতক সম্রাটকে সেনাপতি তারদি বেগ ঘোড়া ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করলেন। প্রবাসে কতজন হুমায়ুনের সঙ্গী হয়েছিলেন, সেই মাথা গুনতি সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক আছে। নিচের দিকের সংখ্যাটা ২২, ওপরের সংখ্যা ৫৬০। আমাদের ধারণা হুমায়ুনের সঙ্গে ৫০ জনের বেশি সঙ্গী থাকার কথা নয়, জৌহর বলছেন সম্রাটের শেষ পর্বে পালানোর সঙ্গী ছিলেন ৪০ জন পুরুষ আর দুজন মহিলা। মাথায় রাখতে হবে, যে সব মানুষ এই পর্ব নিয়ে কিছুটা হলেও কলমপাত করেছেন, তাদের মধ্যে জৌহরই একমাত্র সম্রাটের ছায়া সঙ্গী হিসেবে সারাক্ষণ কাটিয়েছেন। দলে যে দুই মহিলা ছিলেন, তাদের মধ্যে একজনকে জানি, রাজ্ঞী, সদ্য মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া হামিদা বানু বেগম, অন্যজন হাসানের বালুচ স্ত্রী আলি ইশাক আগা [৩]। (চলবে)