ষষ্ঠ অধ্যায়
কান্দাহার নিয়ে পারস্য আর হিন্দুস্তানের দ্বন্দ্ব
২। হুমায়ুনের, পারসিকদের বিরুদ্ধে কান্দাহার কেল্লা অবরোধ
আহসানুততাওয়ারিখে বলা হয়েছে কেল্লা দখলের ৪ দিনের মধ্যে দু-পক্ষের মধ্যে গণ্ডগোল শুরু হয়; পারসিক সৈন্যদের একটি দল কাবুল আর গজনি দখল করে, সেই দুটি শহর হুমায়ুনের ভৃত্যদের হাতে তুলে দেওয়ার শাহী নির্দেশ তোয়াক্কা না করে, হুমায়ুনের বিনাঅনুমতিতেই ইরানে ফিরে যায়। উলুঘ মির্জার ভাবনা ছিল বাদাঘ খানের কবল থেকে কেল্লা দখল নিয়ে মহিলাদের কেল্লার সুরক্ষা বৃত্তে রেখে কাবুল দখল অভিযানে রওনা হওয়া। হুমায়ুন উলুঘ মির্জার এই পরিকল্পনা সমর্থন করেছিলেন [৮]। আমীর মহম্মদ বলছেন বাদাঘ খানের কান্দাহার শহর নিয়ন্ত্রণ করছেন আর, যে ক’জন পারসিক সেনা হুমায়ুনের সঙ্গে ছিলেন, তাদের নিয়ে হুমায়ুন কান্দাহারের বাইরে থানাগেড়েছেন। এইরকম এক অসহায় অবস্থায় হুমায়ুন ঘনিষ্ঠদের থেকে ইতিকর্তব্য বিষয়ে সুপরামর্শ চাইলেন। উলুঘ মির্জা বললেন কিজিলবাস বাহিনী হুমায়ুনের দলের এবং স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে, উপরন্তু তারা শাহের নির্দেশ উপেক্ষা করেই, হুমায়ুনের অনুমতি না নিয়েই ইরাণে ফিরে গেছে; তাছাড়া কান্দাহার একসময় হুমায়ুনের রাজত্বের অধীনে ছিল; সেটি বর্তমানে পারসিক সেনানায়ক বাদাঘ খানের হাতে, এবং চাঘতাইরা যাতে কেল্লায় ঢুকতে না পারে তার জন্যে কেল্লার দরজায় পাহারা বসিয়ে রেখেছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেল্লা দখল নিয়ে সেখানে মহিলা আর অন্যান্য রসদ রেখে কাবুল রওনা হওয়া দরকার। এই পরিকল্পনা হুমায়ুনের খুব পছন্দ হল। কাবুলে যাওয়ার আগেই কান্দাহার দখলের পরিকল্পনা করলেন হুমায়ুন। আফজুলুসতাওয়ারিখ শুধু বলছে হুমায়ুন কাবুল দখলের সিদ্ধান্তে মনস্থির করলেন; তিনি অভিজাতদের পরামর্শে কান্দাহার কেল্লা দখল নিয়ে সেখানে মহিলা আর রসদ রেখে কাবুলের দিকে সেনা অভিযান করতে বদ্ধপরিকর হলেন [২]।
হুমায়ুনের সঙ্গে থাকা আমীরেরা কান্দাহার কেল্লা দখলের সিদ্ধান্তে একমত হলেন। শাহজাদা মুরাদের প্রয়াণের পরের সময়ে উদ্ভুত ঘটনাবলীতে তিনি কাবুল রওনা হওয়ার আগেই কেল্লা দখল করার সিদ্ধান্ত পাকা করলেন। কামরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সফল করার জন্যে রসদ সরবরাহের প্রধান শিবির, রসদের গুদামঘর আর অসামরিক জনগণের সুরক্ষা-বাসের স্থান হিসেবে কান্দাহার শহর ব্যবহার করা ছিল হুমায়ুনের কান্দাহার কেল্লা দখলের প্রাথমিক যুক্তি। তবে অন্য পারসিক ইতিহাসে আলাদা অনেক যুক্তি দেখানো হয়েছে, এবং হয়ত সে সব কারনও তাঁর কেল্লা দখলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে থাকবে। কাফি খান বলছেন মোদ্দা কথা, বৈরাম খান এবং অন্য সেনা আমলা কান্দাহারের রণনৈতিক মূল্য সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন এবং তারা সে অঞ্চল যে কোনও মূল্যে দখল করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন [৩]। আলমকরাইআব্বাসি যদিও পারসিক দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে লেখা, সেই বইতে বলা হচ্ছে, হুমায়ুন তখনও ঘটনাবলীর প্রবাহের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারেন নি। তাই তাঁর সঙ্গের বেসামরিক লোকজন এবং রসদ রাখার উপযুক্ত ভাণ্ডার না থাকায় হুমায়ুন বাদাঘ খানের থেকে কান্দাহার কেল্লা দখল নিলেন [৪]। হুমায়ুনের বাহিনী এখন বেশ বড়। বহু হিন্দুস্তানি তার বাহিনীতে যোগ দেওয়ায়, সেনাবাহিনীর কলেবর বাড়িয়েছে, বাড়িয়েছে তার মনের জোরও [৫]। ততদিনে মির্জা হিন্দাল, মির্জা কামরানের কাবুল থেকে পালিয়ে এসে হুমায়ুনের সঙ্গে জোট বাঁধলেন [৬]। আফজালুততাওউয়ারিখে বলা হচ্ছে আশেপাশের বহু এলাকা থেকে হুমায়ুনের সেনাদলে বহু ছোট বড় সামরিক বাহিনী যোগ দিতে আসছিল [৭]। হুমায়ুনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর বহর তখন পাঁচ হাজার [৮]। পারসিক বাহিনীর বড় সংখ্যা দেশে ফিরে গেছে [৯]। বাদাঘ খানের জোর কমেছে। পারসিকেরা, কান্দাহারের আশেপাশের বণিকদের ১৭০০ ঘোরা বেচে দিয়েছিল। হুমায়ুন সে সব ঘোড়া কিনে নিজের বাহিনীর জোর বাড়ালেন [১০]। ফলে এই সব নানান ঘটনাবলী হুমায়ুনকে কান্দাহার কেল্লা আক্রমন করার সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করছিল।
৩। কান্দাহারের দ্বিতীয় অবরোধ
এতসব অনুকূল কারন থাকা সত্ত্বেও হুমায়ুনের মনে হচ্ছিল চরম বলপ্রয়োগ করেও কান্দাহার কেল্লা দখল করা সহজ হবে না। আবার করে নতুন রণনীতি তৈরি হল। হুমায়ুন বাদাঘ খানের প্রতি দূত পাঠিয়ে মির্জা আসকরিকে কেল্লা কারাগারে বন্দী রাখার অনুমতি নিলেন। বাদাঘ খান হুমায়ুনের প্রস্তাবে গররাজি হলেন না। সিদ্ধান্ত হল মির্জা আসকরির হাত বদলের সময় কান্দাহারের আসেপাশে অঞ্চলের লুকিয়ে থাকা সেনা আক্রমনে চলে আসবে। বৈরাম খান বাহিনী নিয়ে থাকলেন গান্দিগান দরজায়। উলুঘ মির্জা আর হাজি মহম্মদ বাহিনী নিয়ে থাকলেন মশহুর দরজার কাছে আর নতুন দরজায় থাকলেন মুইয়াস বেগ। সামগ্রিক পরিকল্পনা রূপায়নের দায়িত্বে থাকলেন হাজি মহম্মদ [১]।
হুমায়ুনের কান্দাহার দখলের চেষ্টা নিয়ে পারসিকেরা বেশ উদ্বিগ্ন হচ্ছিল। প্রতিষেধক হিসেবে তারা অচেনা কাউকেই কেল্লা-শহরে ঢুকতে দিচ্ছিল না [২]। এই নজরদারির মধ্যেই কয়েকজন মুঘল আর হিন্দুস্তানি সেনা উটের পিঠে ঘাস আর জ্বালানি কাঠ চাপিয়ে কেল্লায় ঢুকল। কয়েক দিন মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে কেল্লায় ঢোকা, বেরোনোর পালা চলছিল। এক রাতে মাথার ঘাসের বোঝায় অস্ত্র লুকিয়ে কেল্লায় ঢোকার সময় মূল দরজার পাহারাদারদের খুন করে অবরোধকারীরা, দূরে তখন একটা বড় বাহিনী কেল্লায় ঢোকার জন্যে অপেক্ষমান। একটু দূরে দাঁড়ানো হাজি মহম্মদ উট নিয়ে ঢুকতে চাইলে তাদের প্রহরীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তিনি সাফাই দিলেন বাদগা খানের নির্দেশে আসকরিকে নিয়ে তিনি কেল্লায় ঢুকবেন। কিন্তু বাদাঘ খানের নির্দেশের ওপর কেল্লার প্রহরীরা আস্থা রাখতে পারল না। ভোরের দিকে পারসিকদের সঙ্গে ঘোরতর বিতর্কে জড়িয়ে পড়া হাজি মহম্মদ আর উলুঘ মির্জার দুশ জন সেনা পারসিক প্রহরীদের হত্যা করে মাশুর দরজা দিয়ে কেল্লায় ঢুকে পড়ে। বৈরাম খান গান্দিগান দরজা দিয়ে ঢোকেন [৩]। তৈমুরিয়াদের আক্রমনে পারসিকেরা এতই অবাক হয়ে যায় যে প্রতিরোধ খাড়া করতে না পেরে মূল কেল্লার ভিতরে [সিটাডেল] আশ্রয় নেয়। উজ্জীবিত চাঘতাইদের প্রতিরোধ করা বৃথা বুঝতে পেরে বাদাঘ খান বাহিনী নিয়ে কেল্লা ছেড়ে পারস্যে চলে যান। হুমায়ুন মির্জা কামরান আর পারসিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কান্দাহার কেল্লা উদ্ধার করলেন। আরিফ কান্দাহারি বলছেন বৈরাম খান শাহ তাহমস্পের আস্থাভাজন [persona grata] ব্যক্তি ছিলেন বলেই হুমায়ুন কান্দাহার সংক্রান্ত রাজকীয় বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর হাতে অর্পণ করে কান্দাহার শহরের দায়িত্বও বৈরাম খানের হাতে তুলে দিলেন। হুমায়ুন শাহ তাহমস্পকে লিখলেন বাদাঘ খান যেহেতু দুর্ব্যবহার করে চলে গেছেন, এবং শাহজাদা মুরাদও প্রয়াত, বৈরাম খান যেহেতু তাঁর অনুগত ভৃত্য [৪], তাই তিনি বাধ্য হচ্ছেন কান্দাহারকে বৈরামের জায়গির হিসেবে অর্পণ করতে এবং শহরটি তার রাজস্বদায়ী হিসেবেই স্বীকৃত হবে। শাহ এই প্রস্তাব সমর্থন করে হামদান অঞ্চল থেকে বাহারলু গোষ্ঠীর সেনা কান্দাহারে পাঠালেন। কান্দাহার বৈরাম খানের অধীনেই থাকল [১]।
হুমায়ুনের কান্দাহার অধিকারের তারিখ কোনও ইতিহাসেই উল্লিখিত হয় নি। জৌহরের সূত্রে পাচ্ছি প্রথম এবং দ্বিতীয় অবরোধের মধ্যে অন্তত এক মাসের পার্থক্য ছিল। তিনি পারসিকদের হাতে [প্রথমবার] কেল্লা তুলে দেওয়ার পরে খিলজা বাগে অন্তত একমাস কাটান [২]। হুমায়ুন ৭ সেপ্টেম্বর ১৫৪৫ কেল্লা পারিসিকদের হাতে তুলে দেন। ফলে দ্বিতীয়বার কান্দাহার দখল কোনওভাবেই ঐ বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে হওয়ার কথা নয় [৩]। (চলবে)