| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পারস্যে হুমায়ুন : সুকুমার রায়, (২০তম কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৬৯০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

সপ্তম অধ্যায়

সিদ্ধান্ত

১। প্রবাস জীবন শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি সময়ে কান্দাহার উদ্ধার হল

ইরানে হুমায়ুনের জীবন নিয়ে বহু প্রশ্ন অনুতর

পারসিকদের হাত থেকে কান্দাহার উদ্ধার হুমায়ুনের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল কারন, তিনি সেই মুহূর্তে তার প্রবাস জীবন শেষ করে শাহের রাজত্বের বাইরে পা দিয়েছেন। কান্দাহার দখল করে, কেল্লা-শহর রক্ষার তার প্রধানতম ভরসার আমলার হাতে অর্পণ করার পরে তার প্রধানতম লক্ষ্য হিন্দুস্তান সাম্রাজ্য উদ্ধারের মধ্যবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে গজনী আর কাবুল উদ্ধারের পরিকল্পনা করলেন। হুমায়ুনের ইরান প্রবাস জীবন আলোচনায় বেশ কিছু প্রশ্ন খুব সহজেই উঠে আসে — সাফাভি দরবার থেকে হুমায়ুনের সঙ্গে কী ধরণের ব্যবহার করা হয়েছিল? ইরানের শাহের সঙ্গে তাঁর কী ধরণের রাজনৈতিক সম্বন্ধ তৈরি হয়? কান্দাহার দখল নিয়ে হুমায়ুনের মনে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধবোধ তৈরি হয়েছিল? হুমায়ুন কী তার পূর্বজদের রাজত্ব উদ্ধার করেছিলেন পারসিক সামরিক সাহায্যে? পারস্য প্রবাস জীবনের ফল কী ছিল?

২। হুমায়ুনের সঙ্গে শাহের ব্যবহার

শাহের সঙ্গে হুমায়ুনের দ্বিমুখী সম্পর্ক তৈরি হয় কখনও সম্মান-অপমান, কখনও শত্রুতা-আতিথেয়তা, কখনও বদান্যতা-নীচতায় দুজনের সম্পর্ক ঘোরাফেরা করেছে [১]। মনে হয় ধর্মান্ধতার জন্যই শাহ তাহমস্প, তার রাজকীয় আশ্রয়প্রার্থী হুমায়ুনের সঙ্গে অধিকাংশ সময়ে শীতল আর দুর্ব্যবহার করেছেন। তাঁর এই মনোভাব পরিবর্তিত হয়, হুমায়ুন শিয়া ধর্মে আশ্রয় নেওয়ার পরেই। শাহের দুর্ব্যবহারের জন্যে অনেক সময়ই হুমায়ুনের জীবন সংশয় হয় এবং তিনি বাধ্য হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করার পরেই অনেকটা শারীরিকভাবে নিরাপদ বোধ করতে থাকেন। একই সঙ্গে বলা দরকার তিনি যে ইমামের ধর্ম শাহের রাজত্বে বরণ করে নিলেন, তারপরে শাহের রাজত্ব ছাড়ার থেকে কিন্তু কিন্তু তিনি সেই ধর্ম পালনের উৎসাহ দেখান নি। শাহের রাজত্বে হুমায়ুনের শিয়া ধর্মে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা হুমায়ুনের জীবনে, বা তাঁর রাজত্বের ধর্মীয় পরিবেশে খুব বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না; ইরানে হুমায়ুনের ধর্ম পরিবর্তন শুধু একটা রাজনৈতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছিল মাত্র, তার বেশি কিছুই নয়।

৩। শাহ তামস্পের সঙ্গে হুমায়ুনের রাজনৈতিক সম্পর্ক

হুমায়ুন ইরান প্রবাসে ধর্মীয় বিশ্বাস পাত্রান্তর করতে বাধ্য হলেও, তিনি কিন্তু রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র বিসর্জন দেন নি। শাহ, হুমায়ুনকে আর্থিক এবং অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহ কিন্তু হুমায়ুনের সঙ্গী-সাথীদের বিভিন্ন খেতাব দিতে শুরু করেন। কিন্তু সাম্রাজ্য উদ্ধারের পরে, হুমায়ুন হিন্দুস্তানে শাহের আনুগত্য মেনেছেন, এমন কোনও উদাহরণ পাই না। শাহের উপাধি দেওয়া বিষয়ে সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা আফজালুততাওয়ারিখ লিখছে শাহ, হুমায়ুনের পক্ষে বৈরাম বেগ এবং হাজি মহম্মদকে খান আর সুলতান উপাধি দিলেন [১]। কান্দাহার দখল নেওয়ার পরে তিনি শাহকে জানান কান্দাহার প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হল বৈরাম খানকে এবং সে শাহের অধীনেই থাকবে, এবং একই সঙ্গে কান্দাহারও শাহের রাজস্বদায়ী অঞ্ছল হিসেবে গণ্য হবে। এটাকে আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে না গণ্য করে পরিবর্তিত পরিবেশে কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে গণ্য করা দরকার। কারন হুমায়ুন তখন খুবই নাজুক রাজনৈতিক অবস্থায় ছিলেন। শাহকে না চটিয়ে, তাঁকে রসেবশে রেখে, সাফাভি রাজত্বের সীমান্তের শহর কান্দাহারে হুমায়ুনের বিশ্বস্ত সেনানায়ককে সেই মুহূর্তে বসানোর দরকার ছিল তাঁর আগামী পরিকল্পনা হিন্দুস্তান উদ্ধার করার লক্ষ্যে। কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণ কার্যত হুমায়ুনের হাতে থাকলেও তিনি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় কান্দাহারের ওপর শাহের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বাস্তবে হুমায়ুন যা করতে চান [fait accompli] সেই বিষয়টি লুকিয়ে রেখে, তিনি যা করছিলেন, সেটা শাহকে বর্ণনা করেছেন। অন্য দিকে শাহ, হুমায়ুনের fait accompliটি বুঝতে পেরেও এই বিষয়ে অতিরিক্ত বিপদ ডেকে আনায় রাজি হলেন না [২]।

হুমায়ুনকে লেখা চিঠিতে আশ্রয়ে থাকা সম্রাটকে যে উপাধিতে শাহ সম্বোধন করেছেন, সেই উদাহরণ থেকে শাহের রাজত্বে আশ্রয় নেওয়া হুমায়ুনের রাজনৈতিক স্বাধীনতাবোধের ইঙ্গিত পাওয়া যায় [৩]। তাঁর রাজত্বে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে হুমায়ুনের প্রথম চিঠির উত্তরে তিনি হুমায়ুনকে বাদশা অভিধায় অভিহিত করেছেন [৪]। হেরাটের প্রশাসক মহম্মদ খানকে লেখা হুমায়ুককে অভ্যর্থনা জানানোর ফরমানে শাহ, হুমায়ুনকে বাদশা এবং নবাব দুটো অভিধাতেই অভিহিত করেছেন [৫]। মশদে প্রবেশের চিঠির উত্তরে শাহ হুমায়ুনকে বাদশা বা নবাব, এ সবের কোনও একটা রাজকীয় অভিধায় অভিহিত না করে নবাবআলিমাকাম উপাধিতে সম্বোধিত করেছেন [৬]। যে চিঠিগুলো শাহ হুমায়ুনের উদ্দেশ্যে ইরানের বাইরে লিখেছেন, সেখানে তিনি হুমায়ুনকে বাদশা উপাধিতেই অভিহিত করেছেন [৭]।

শাহের ববাব উপাধি ব্যবহারে অনেকেই মনে করতে পারেন, তিনি হুমায়ুনকে অন্তঃপাতি রাজা হিসেবে গণ্য করছেন। কিন্তু এই ধারনাটাও ঠিক নয়। শাহ নিজেই নবাবইহুমায়ুন উপাধি ব্যবহার করতেন [৮]। আমীর মাহামুদ শাহ তাহমস্পএর [৯] উদ্দেশ্যে নবাবের নানান ভ্যারাইটি নবাবইজাঁহাপনা, নবাবইকামিয়াবইআশরফ, নবাবইকামিয়াব ইত্যাদি উপাধি ব্যবহার করেছেন [১০]। পারসিক দৃষ্টিভঙ্গীতে, পারসিক দরবারি আমলার লেখা খুলসাইমাকাল শাহের উপাধি হিসেবে নবাবইআশরফ উপাধি ব্যবহার করেছেন [১১]। ইস্কান্দার মুনসি শাহের উপাধি হিসেবে নবাবইহুমায়ুন ব্যবহার করেছেন অক্লেশে। কান্দাহারপর্বে, শাহের চিঠির সূত্রে অথবা হুমায়ুনের সঙ্গে শাহের ব্যবহারে শাহ যে হুমায়ুনকে অধীনস্থ আমীর হিসেবে ট্রিট করছেন, এমন কোনও উদাহরণ বা ইঙ্গিত পাই না। হুমায়ুনের দুঃখজনক মৃত্যুর পরে শাহ’র পক্ষ থেকে আকবরকে লেখা দূঃখ প্রকাশ করা চিঠিতে আকবরের যে উপাধি শাহ ব্যবহার করেছেন, তাতে কোনওভাবেই তিনি চাঘতাই সম্রাট পরিবারকে তাঁর অধীনস্থ কর্মচারী হিসেবে ভাবছেন না, এই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে [১]।

৪। কান্দাহার দখল কী বিশ্বাসঘাতকতা ছিল, হুমায়ুন কী মরমে অপরাধবোধে মরেছিলেন?

দ্বিতীয়বার পারসিকদের হাত থেকে কান্দাহার দখল নেওয়ার পর হুমায়ুনের মনে হয়েছিল, তিনি শাহের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। শাহের নির্দেশ ছিল হুমায়ুন শাহর বান্দাদের হাতে কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবেন [২]। যদি পারসিক বাহিনী কান্দাহারিদের ওপর অত্যাচার চালায়, যদি পারসিক সেনাপতি খারাপ ব্যবহার করে হুমায়ুনের লোকেদের কেল্লায় থাকতে না দেয়, যদি তারা হুমায়ুনকে কাবুল বাদাকশান আর গজনি উদ্ধার করার কাজে সাহায্য না করে, এই সব সমস্যা সমাধানের জন্যে শাহকে লিখতে হবে। সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভারতীয় বর্ণনা আর ইতিহাসে ওপরের এই সব কোনও ঘটনা উল্লিখিত হয় নি, বরং বলা হয়েছে হুমায়ুন যে বলপ্রয়োগ করে কেল্লা দখল করেছে, সেই বিষয়টিকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ যে সার্বিভৌম সম্রাট হুমায়ুনকে আশ্রয় দিলেন, নিরাপত্তা দিলেন, তার নিয়ন্ত্রিত কেল্লার দরজা তিনি ভেঙে ঢুকে সেতি দখল করলেন।  পারসিকদের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণটি ছিল হুমায়ুনকে না জানিয়ে পারিসিক বাহিনীর ফেরত যাওয়া [৩]। শাহ যে এই ঘটনার জন্যে বিন্দুমাত্রও দায়ি এমন কোনও সূত্র পাওয়া যায় না। তারা যে শাহকে অন্ধকার রেখেই ফিরে গিয়েছেন, এ তথ্য পরিষ্কার। বাস্তব হল হুমায়ুনকে যদি মুঘল হিন্দুস্তান দখলের উদ্দেশ্যে কাবুল বাদাকশান আর গজনি দখল করতে হয়, তাহলে তার দিক থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কান্দাহার দখলে রাখতেই হবে, তাঁর অন্য কোনও উপায় নেই। কিন্তু এই দখলদারি করতে গিয়ে কান্দাহার নিয়ে শাহকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষিতে, হুমায়ুনের মনে হয়েছে তিনি শাহের বিশ্বাস ভেবগেছেন। কিন্তু পারসিক বাহিনীর আছাড় আচরন মুঘলদের খেপিয়ে তুলেছিল। ফলে কান্দাহার দখল করা নিয়ে হুমায়ুনের বিন্দুমাত্র সংকোচ ছিল না। তিনি সেনাবাহিনী বানিয়ে ফেলেছেন, আর তিনি শাহের রাজত্বের বাইরে আছেন, তাই ভবিষ্যতে, তার আশ্রয়দাতার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা নিয়েই তিনি কান্দাহার দখলের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারেন নি। কিন্তু হুমায়ুনের কাজটা কী বিশ্বাসঘাতকতা নয়? [১]

৫। হুমায়ুন কী পারসিক সাহায্য নিয়ে পিতৃপুরুষের তৈরি সাম্রাজ্য উদ্ধার করেছিলেন?

হুমায়ুন যে নিজের বলে, নিজের বাহিনী দিয়ে, নিজের উজ্জ্বীবিত অনুগামীদের কাজ লাগিয়ে হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্য উদ্ধার করেছিলেন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। তবুও হুমায়ুনকে কিছুটা হলেও শাহ, সাম্রাজ্য বাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছেন, সেই বিষয়টিকে স্বীকার করতে হবে। বিস্ত দখল, গার্মসর পর্যন্ত বাধাহীন সামরিক অভিযান সম্ভব হয়েছিল পারসিক বাহিনীর জন্যে। পারসিক বাহিনীই মির্জা আসকরি আর মির্জা কামরানের দখল করা কান্দাহার কেল্লা উদ্ধার করেছিল এটাও বাস্তব তথ্য। কান্দাহারের প্রথম অবরোধ কামরানকে অস্বস্তিতে রেখেছিল, আসকরিকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল। আরও বড় ব্যাপার হল দল পাল্টে বিভিন্ন গোষ্ঠীপতি হুমায়ুনের দলে যোগ দেওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর পরেই কিন্তু পারসিকদের নিয়ন্ত্রণ থেকে হুমায়ুন কান্দাহার দখল নিতে পারলেন। প্রাথমিকস্তরে ইরানিয়রা না থাকলে হুমায়ুনের কান্দাহার দখল নেওয়া পর্যন্ত রাস্তা পরিষ্কার হয় না; হুমায়ুনের পক্ষে কান্দাহারকে প্রধান শিবির বানিয়ে তার সাম্রাজ্য দখল সম্ভব হয় না। কারন কান্দাহার বা অন্যান্য কেল্লায় যোগ্য সেনাপতিদের হারিয়েছিল ইরানিয় সেনাবাহিনী। পারসিকদের সহায়তায় দিনের পর দিন অবরোধ চালিয়ে কান্দাহার দখল করার পর হুমায়ুন সেই সময়ের বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে, কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয়বার কেল্লা দখলে নেন। সেজন্যে তাঁকে কিন্তু যুদ্ধ করতে হয় নি বরং তিনি পারসিকদের চমকে দিতেই coup de mainএর ফলে কেল্লার পতন হল। আগামী দশ বছরে কামরান, আফগান, বলখ এবং বাদাকশন উদ্ধারের কাজে কান্দাহার মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি হিসেবে কাজ করবে। আমরা বলতে পারি ইরানিদের সাহায্য নিয়ে নিজের বাহিনী কাজে লাগিয়ে তিনি সাম্রাজ্য উদ্ধার করলেন [২]।

৬। হুমায়ুনের পারস্য প্রবাসে লাভ

কৃতজ্ঞ হুমায়ুন বরাবরই শাহের মূল্যবান সাহায্য স্বীকার করেছেন। নিজের সাম্রাজ্যে ফিরে আসার পরে তিনি শাহকে যতগুলো চিঠি লিখেছেন, প্রত্যেকটাতেই শাহকে অমূল্য জোটসঙ্গীর স্বীকৃতি দিয়েছেন। একটা চিঠিতে দেখি, তিনি ইরাণ ছাড়ার পরে মির্জা কামরান নিয়ে এবং বলখ এবং বাদাকশান এবং অন্যান্য ঘটনা বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন [১]। শাহ তাহমস্প হুমায়ুনকে বহু চিঠি লিখছেন, কিন্তু অধিকাংশ লিখেছেন আফগানিস্তানে হুমায়ুনের ভাগ্য পরীক্ষার সময়। একটা চিঠিতে তিনি দুজনের জোটে নিয়ে আশিসবাণী দিয়ে জোটের মাহাত্ম্য এবং গুরুত্ব বর্ণনা করছেন [৩]। কাবুল জয়ের পরে দূত ওয়ালাদ বেগকে পাঠিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন [৪]। সাম্রাজ্য উদ্ধারের পরে হুমায়ুন, পারস্যে প্রতিনিধি পাঠিয়ে শাহকে শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁর অমূল্য সাহায্যের জন্যে দৃতিজ্ঞতা জানান [৫]। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবরকে চিঠি পাঠিয়ে শাহ জানিয়েছিলেন পারস্যে হুমায়ুনের প্রবাস জীবন শুধু দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কই বিকশিত করে নি, দুই দেশ আরও কাছাকাছি এসেছে [৬]। আকবর যখন সাম্রাজ্যের ভিত তৈরি করছেন, সে সময় পারস্য থেকে বিপুল সংখ্যক ইরানী প্রশাসক, কবি, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এসে ইন্দো-মুসলমান সভ্যতাকে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে [৭]। হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস খুবই অপমানজনক এবং দুখদ হলেও একেবারে নিষ্ফল বলা যাবে না। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev