বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
৬। তবাকতই আকবরি, নিজামুদ্দিন আহমদ
১৫৯৩/৯৪তে লেখা শেষ হয়। নিজামুদ্দিন বক্তব্যে খোলামেলা, অন্যরা যে ধরণের পক্ষপাতি অবস্থান নেয়, সেটা তাঁর ছিল না। সার্বিকভাবে ইরানে হুমায়ুনের প্রবাসকাল তিনি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে, যদিও সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থিত করেছেন। তৎকালীন সময়ের লেখ্য পরম্পরা অনুসারে অযথা যেমন চাটু-স্তুতি করেন নি, তেমনি বর্ণনায় বাড়াবাড়িও করেন নি, তিনি হয়ত অনেক কিছুই বর্ণনা করেন নি, কিন্তু সে সব উদ্দেশ্যপূর্ণ ছিল না। হুমায়ুনের পারস্য প্রবাসের বর্ণনা অনেকটাই অভিনব এবং জৌহর আর আবুলফজলের থেকে আলাদা কিসিমের। আমি লখনৌ আর বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটির নকল দুটোই ব্যবহার করেছি।
৭। মুন্তাখাবুততাওয়ারিখ, আবদুল কাদির বাদাউনি
১০০৪/১৫৯৬তে লেখা। বাদাউনি, মূলত নিজামুদ্দিনের লেখা অনুসরন করেছেন, কিন্তু তার লেখায় [প্রশিক্ষিত ঐতিহাসিক হিসেবেই হয়ত — অনুবাদক] মাঝেমধ্যে নতুন তথ্যের ঝলক দেখতে পাই। হুমায়ুনের ইরাণ প্রবাস জীবনের বহু ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যদিও সে সব খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা। একমাত্র তাঁর লেখা থেকেই ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়ে শাহের সঙ্গে হুমায়ুনের দ্বন্দ্বর বর্ণনা পাচ্ছি অনেকটা বিশ্বস্তভাবে। বিভিন্ন তীর্থে হুমায়ুনের যাত্রার বিশদ বিবরণ বাদাউনি লিখেছেন। তাঁর লেখার ইংরেজি সংস্করণ বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশ করেছে।
৮। গুলসনইইব্রাহিমি বা তারিখইফরিস্তা, মহম্মদ কাশিম হিন্দু শাহ, ফরিস্তা নামে প্রখ্যাত
দক্ষিণের ঐতিহাসিক। বইটা লেখা শেষ হয় ১০১৫/১৬০৬-০৭এ। তিনি আবুলফজল, নিজামুদ্দিন, বাদাউনির বইএর ওপর নির্ভর করে ইতিহাস লিখছেন। তা সত্ত্বেও ফরিস্তার লেখা ইতিহাসে আমরা অসামান্য নিজস্বতার ছাপ খুঁজে পাই। ফরিস্তা সংক্ষিপ্ত, প্রণালীবদ্ধ এবং অনেকটাই পক্ষপাতহীন — যেটা বাদাউনি আর আবুলফজলের কাজের মধ্যে প্রভূতভাবেই বিদ্যমান। তাঁর আলোচনা মূল বিষয়কে অক্ষণ্ড ধরেই বিকশিত হয়েছে, ব্যক্তিগত জীবন বা পারিবারিক ইতিহাসের ছোঁয়া নেই। হুমায়ুনের প্রবাস জীবন নিয়ে ফরিস্তার আলোচনা ভাল, সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্তৃত ভাবে হুমায়ুন আর শাহের সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। তারিখইফরিস্তাটি বম্বে আর লখনৌতে লিথোপ্রক্রিয়ায় ছাপা হয়েছে, আমি উভয় সংস্করণই ব্যবহার করেছি।
[অতীতের ইতিহাসচর্চা নিয়ে শ্রদ্ধাবোধই তৈরি হয় না — অথচ মুঘল আমলে উত্তরের মুঘল হিন্দুস্তানে লেখা ইতিহাস দক্ষিণে খুব সহজে প্রবাহিত হচ্ছে মাত্র এক দশকেই, এই তথ্য ইতিহাসে খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে দেখি নি। পশ্চিমি দেশগুলো থেকে থেকে পালিয়ে আসা জেসুঈট মিশনারিরা এশিয়ার তিন এলাকা, ভারত, পারস্য আর চিন থেকে নানান বই রোমের গ্রন্থাগারে পাঠাচ্ছেন এবং সেখান থেকে সে সব বই ইওরোপিয় ভাষাগুলোয় অনুবাদ হয়ে বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরিতে পৌঁছে যাচ্ছে। এ সব কাণ্ডকে পশ্চিমের দেশগুলোর নবজাগরণের মৌলকর্ম জ্ঞানচর্চার ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে। তাই নিয়ে কত বাখান, আদিখ্যেতা, কত পিঠচাপড়ানি, এবং একে নবজাগরণের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
অথচ মুঘল আমলে উত্তরের দরবারে ইতিহাস ১০ বছরের মধ্যে দক্ষিণে চলে যাচ্ছে আর দক্ষিণের ইতিহাস উত্তরে আসছে বিন্ধ্য পেরিয়ে, এবং সে সব বইএর তথ্য অবলম্বন করে দক্ষিণের, উত্তরের ইতিহাস লেখা হচ্ছে — এই তথ্য তত্ত্ব ভাবনার প্রবাহমানতা নিয়ে কোনও দিন কোনও আলোচনা, উচ্ছ্বাস আমি অন্তত দেখি নি। দক্ষিণের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ফরিস্তা গুলসনইইব্রাহিমি বা তারিখইফরিস্তা ইতিহাস লিখছেন ১০১৫/১৬০৬-০৭এ মূলত আবুলফজল, নিজামুদ্দিন, বাদাউনি, গুলবদন ইত্যাদির বইএর ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ এক অঞ্চলের ইতিহাস অন্য অঞ্চলে খুব সহজে চলে যাচ্ছে! আজ এ সব আমরা জানি না; আলোচনাই হয় না — নিজেদের ইতিহাসচর্চা নিয়ে শ্রদ্ধা তৈরি হওয়া তো দূরস্থান।
ফরিস্তাকে নিয়ে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে যাই [এ সব কথা আককাল কেই বা বলে!]। মনন আহমেদ আসিফ দ্য লস অব হিন্দুস্তান বইতে বলছেন দক্ষিণের ঐতিহাসিক মহম্মদ কাশিম হিন্দু শাহ, ফরিস্তার তারিখিফরিস্তা বা ফরিস্তার লিখিত ইতিহাস অবলম্বন করে ডাও রচনা করলেন হিস্টোরি অব (হি)ইন্দোস্তা … ট্রান্সলেটেড ফ্রম মহম্মদ কাসিম ফরিস্তা অব দেহল…। এটাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বপ্রথম ভারতবর্ষীয় ইতিহাস ভাষ্য। প্রাচ্যবাদী কর্নেল ডাও, লেফটানেন্ট এন্ডারসন, ক্যাপ্টেন স্কট আর কর্নেল ব্রিগসের ফরিস্তা উপাত্ত নির্ভর সাম্রাজ্যবাদী লুঠবন্ধুতাত্ত্বিকতার বর্ননা সাম্রাজ্য মতে হয়ে উঠল (হি)ইন্দোস্তানের ইতিহাস — মুসলমানেদের ভারত আগমন এবং হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের বয়ান নির্মানের যুগের অবতারণা ঘটল। পোপ আরবান যে ইসলাম ফোবিয়ায় ক্রুসেডের ডাক দিয়েছিলেন, সেটি নতুন করে এই চারজন লেখকের হাতে চোলাই হয়ে মুসলমান ধর্মান্ধতার ইতিহাস, মুসলমান শাসকদের হাতে মন্দির ধ্বংস, হিন্দুদের জোর করে ইসলামে রূপান্তর এবং মুঘল শাসকদের হিন্দুদের প্রতি বিমাতৃসুলভ নীতি নির্ণয়ের বয়ানে রূপান্তরিত হয়ে মান্য ইতিহাসের সাম্রাজ্যবাদী বয়ান হয়ে উঠল এবং এই তাত্ত্বিকতা রূপায়িত হল উপনিবেশিক নবজাগরণীয় এবং আজকের সঙ্ঘী হিন্দুত্বের তত্ত্বে। ডাও, ব্রিগস এবং কিছুটা এণ্ডারসন আর স্কটের বইএর চূড়ান্ত কাটতি হওয়ায় এরা ঐতিহাসিক এবং সর্বজনমান্য দার্শনিকে রূপান্তরিত হলেন — এদের লিখন পদ্ধতি মান্য ইতিহাসে পরিণত হল। — অনুবাদক]
৯। মসিরইরহিমি, আবদুল বাকি নাহবন্দি
১০২৫/১৬১৬য় লেখা। বইটা যদিও বৈরাম খানের পুত্র আবদুল রহিম খানইখানানের স্মৃতিকথা, প্রথম খণ্ডে ভারতবর্ষীয় ইতিহাস লিখিত হয়েছে। মসিরইরহিমি হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছে। যদিও তিনি আবুলফজলের থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু বেশ কিছু নতুন তথ্য আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে জাম আর মশদ ভ্রমণ সংক্রান্ত অংশে। দ্বিতীয় খণ্ডে বৈরাম খানের জীবনী সূত্রে হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস আলোচিত হয়েছে। ফলে হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস নিয়ে মসিরইরহিমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচ্য। বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশনা।
১০। তারিখইআলফি, জাগর বেগ আসফ খান
৯৯৭/১৫৮৮-৮৯তে রচিত। তারিখইআলফি অনেকেরই রচনা, কিন্তু আমাদের আলোচিত হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস পর্ব চতুর্থ খণ্ডে পাওয়া যায়; এই অংশের রচনা জাগর বেগ আসফ খানের। নিজামুদ্দিন মূলত তারিখই আলফি অনুসরণ করেছেন। দুটিতেই তথ্যগুলো খুব কাছাকাছির, কিন্তু ভাষা আর আঙ্গিক আলাদা। এতে হুমায়ুনের পারস্যবাসের সময়ে খুব বেশি তারিখ উল্লিখিত হয় নি। তারিখইআকবরির সমস্যাগুল এই বইতেও আছে। আমি ইন্ডিয়া অফিসের নকলটি ব্যবহার করেছি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও একটা গোটা আলফি আছে। এর গুণগত মান ইন্ডিয়া অফিসের মত নয়।
১১। হফত ইকলিম, আমিন আহমেদ রিজভি
১০০২/১৫৯৩-৯৪তে লেখা। বইটি ইতিহাস আঙ্গিকে লেখা নয়। মূলত জীবনী আর ভৌগোলিক পরিচয় ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়েছে বইতে। তবে আগরা নির্ভর ভারতবর্ষীয় ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমিন আহমেদ রিজভি বিদেশি। তিনি ভারতবর্ষে এসে বহুকাল থেকেছেন। পারসিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ফলে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু তিনি খুবই সংক্ষেপে বর্ণনা সেরেছেন। বইটির গুরুত্ব হল, আমিন আহমেদ রিজভি যেহেতু দরবারি ঐতিহাসিক নয়, তার বইএর দৃষ্টিভঙ্গী অধ্যয়ন জরুরি। দুটি পাণ্ডুলিপি নির্ভর বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটির বই আমি মূলত অনুসরণ করেছি।
১২। তারিখইইব্রাহিমি, ইব্রাহিম বিন হারির
লেখা ৯৫৭/১৫৫০। পূর্ব দেশের সাধারণ ইতিহাস, ১৫৫০ থেকে ইসলামি সাম্রাজ্যের বাখান। হুমায়ুনের ইরান প্রবাসকালের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হিয়েছেন হারির। অধিকাংশ ঐতিহাসিক নিজামুদ্দিন বা আবুলফজলকে অনুসরণ করেছেন, কিন্তু হারির একটু অন্যরকম বক্তব্য উপস্থিত করেছেন। পারসিক বা ভারতবর্ষীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে হারির হুমায়ুনের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের একমাত্র ঠিকঠাক সময়কাল উল্লেখ করেছেন। যদিও সব তারিখই ঠিক নয়, কিন্তু অধিকাংশ ঘটনার ক্রম তৈরিতে সমস্যা হয় না। তারিখইইব্রাহিমি হুমায়ুনের পারস্যে যাওয়া বা ফেরা নিয়ে মোটামুটি ঠিক তারিখ এবং ঘটনা আলোচনা করলেও, হুমায়ুন আর শাহের সম্পর্ক, ঘটনাবলী নিয়ে বাক্যব্যয় করে নি। আমি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপিটি ব্যবহার করেছি। অক্সফোর্ডের বদলিয়ানএও একটা পাণ্ডুলিপি আছে, Catalogue of THE PERSIAN, TURKISH, HINDUSTANI, AND PUSHTU MANUSCRIPTS IN THE BODLEIAN LIBRARY BEGUN BY PROFESSOR ED. SACHAU বলছেন এই ইতিহাসটি খুব সংক্ষেপে লেখা হলেও নির্দিষ্ট ঘটনাবলী বর্ণনা এবং ঘটনাক্রম বিষয়ে অতীব আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি। (চলবে)