বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
১৩। তারিখইহাক্কি, শেখ আবদুল হক দেহলভি
১০০৮/১৫৯৯-এর লেখা; আকবরের সময়ের মুইজুদ্দিন মহম্মদ বিন সামের আমল থেকে লেখা ইতিহাস। হুমায়ুনের ইতিহাস খুবই সংক্ষেপিত। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়াম আর অক্সফোর্ডের বদলিয়ান সংস্করণ ব্যবহার করেছি।
১৪। মাজামিউলআখবার, মহম্মদ শরিফুল হুসেইনি, বিখ্যাত ওয়াকুই নামে
১০০০/১৫৯১তে লেখা। সাধারণভাবে মুসলমান সময়ের ইতিহাস। বইতে দেখাযায় আবুলফজল আর নিজামুদ্দিনের প্রভাবমুক্ত হয়ে মুঘল আমলের ইতিহাস লেখা হয়েছে। লেখক আকবরের প্রশাসনে ১৫৯০-এর দশকে ছিলেন। মাজামিউলআখবার হুমায়ুনের পারসিক প্রবাস আলোচনা করেছে। তুলনামূলকভাবে তারিখইহক্ক থেকে বিশদে লেখা। ঘটনাক্রম অনুসরণযোগ্য। আমি ইওন্ডিয়ান অফিস লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
১৫। জুবাদুলইতাওয়ারিখ, নুরুল হক
১০১৫/১৬০৫এ লেখা। মুইজুদ্দিন মহম্মদ বিন সামের সময় থেকে জাহাঙ্গীরের সিংহাসনে ওঠার সময় পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে লেখা। তারিখইহাক্কির লেখক শেখ আবদুল হক দেহলভির সন্তান। জুবাদুলইতাওয়ারিখএর সুনাম আছে মধ্যযুগের ঠিকঠাক ইতিহাস হিসেবে। কিন্তু জুবাদুলইতাওয়ারিখ, হুমায়ুনের ইরান প্রবাস নিয়ে তারিখইহক্কিকে অনুসরণ করেছে। অন্যান্য ইতিহাসের তুলনায় এই বইতে নতুন তথ্য নেই। আমি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
১৬। রাউজাতুততাহিরিন, তাহির মহম্মদ হাসান ইমাদুদ্দিন
১০১৫/১৬০৭-০৭-এর সময়ের লেখা। পূর্ব দেশের মুসলমানের ইতিহাস, আকবরের শেষ দিন পর্যন্ত সময় আলোচিত হয়েছে। তিনি যখন বইটা লেখেন ততদিনে আকবরের দরবারে তাঁর দুই দশকের বেশি সময় কেটেছে। হুমায়ুনের প্রবাস জীবন লিখতে গিয়ে তিনি নিজামুদ্দিনকে অনুসরণ করছেন। কিন্তু বইটির গুরুত্ব হল, তাঁর লেখা তথ্যগুলো অন্যদের লেখা তথ্যকে প্রতিষ্ঠা করে। কলকাতার বুহার লাইব্রেরিতে একটা খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি আছে, হুমায়ুনের রাজত্ব নিয়ে আলোচনা খণ্ডিত। তাঁড় প্রবাসকালের বর্ণনা নেই। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নকলটা আমি ব্যবহার করেছি।
১৭। মাদানইআখবারইআহমদি, আহমদ বিন বাহবল
১০২৩/১৬১৪য় লেখা। দুই খণ্ডে সাধারণ বিশ্ব ইতিহাস। দ্বিতীয় অংশে চাঘতাই বংশ থেকে তৈমুর হয়ে জাহাঙ্গির পর্যন্ত সময় আলোচিত হয়েছে। তিনি যে হুমায়ুনের ইরাণ প্রবাস নিয়ে আলোচনা করেন, সেটা অনেকটা আবুলফজলের সঙ্গে মেলে; তিনি হেরাটের প্রশাসককে দেওয়া শাহেরর ফরমান ব্যবহার করেছেন। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির নকলটা বেশ ভাল অবস্থায় আছে, মাত্র একবারের জন্যে হাতে পেয়েছিলাম।
১৮। ইকবালনামা, মুতামদ খান
১০২৯/১৬১৯-২০তে লেখা। তিনটে খণ্ড। প্রথমটা মহম্মদ বিন সাম থেকে হুমায়ুনের সময় পর্যন্ত। দ্বিতীয়টা আকবরের সময় অবধি। তৃতীয়টা জাহাঙ্গীরের রাজত্ব – এই অংশটা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। হুমায়ুনের প্রবাস বিষয়ে মুতামদ খান আবুলফজলের আকবরনামা অনুসরণকারী। নতুন তথ্য বলতে প্রায় কিছুই নেই। আমি ইন্ডিয়া অফিসের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। দ্বিতীয় খণ্ডটা কলকাতার বুহার লাইব্রেরিতে আছে।
১৯। তারিখইখানদানিতিমুরিয়া
আকবরের সময় লেখা। তৈমুরের ইতিহাস, আর তার দুই ইরানের উত্তরাধিকারীসহ বাবর, হুমায়ুন আর আকবরের ২২তম বছর পর্যন্ত লেখা। লেখকের নাম নেই। হুমায়ুনের প্রবাসকাল নিয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে, তবে এটা নিজামুদ্দিনের তারিখইআলফির অনুরূপ। তথ্যের মিল এতই যে তিনি নিজামুদ্দিন থেকে কোন তথ্য ধার নিয়েছেন বা উভয়েই কোন মৌলিক ইতিহাস থেকে তথ্য নিয়েছেন সেটা বলা মুশকিল। ঐতিহাসিক পাঠ্য হিসেবে ততটা গুরুত্ব পায় না, কিন্তু মুঘল চিত্রকলার আলোচনা হিসেবে অনন্য। পাটনার ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপি আছে।
২০। হুমায়ুনামা
কবিতাছন্দে লেখা। আকবরের সময়ের রচনা। মহাকাব্যিক আঙ্গিকে হুমায়ুনের জীবন ধরা হয়েছে। লেখকের নাম নেই, তারিখ উল্লেখ নেই। আকবরের রাজত্বে বইটা লেখার প্রমান এর ছত্রে ছত্রে ধরা আছে। লেখকের আদর্শ করেছেন শাহনামার আঙ্গিক। ড. গনি বলছেন বাদাউনির ধারণা বইটার লেখক মনযারি (Manzari), শাহনামার আঙ্গিকে হুমায়ুননামা লিখেছেন। বিবলিওথেকা লিন্ডেসিয়ানার তালিকায় ৪৩১ নং পাণ্ডুলিপিকে ইকবালনামা বা তারিখইহুমায়ুন বাদশা বলা হয়েছে, লেখক ফৈজি বিন মুবারক। হুমায়ুননামা আদৌ ইকবালনামা কী না তার তুলনা করতে গেলে দুটিকে পাশাপাশি ফেলে আলোচনা করতে হবে, তবেই এই দাবির সত্যতা নির্ধারণ হবে। কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে হুমায়ুননামার গুরুত্ব খুব বেশি নয়, বিশেষ করে হুমায়ুনের ইরাণ প্রবাস নিয়ে। হুমায়ুননামা, ইকবালনামা না হলে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একমাত্র পাণ্ডুলিপি নং ১৭৯৭ আমি ব্যবহার করেছি।
২১। তারিখইআকবরি, আরিফ কান্দাহারি
আকবরের আমলে বইটি লেখা হয়। শুরু হয়েছে মুসলমান যুগ থেকে শেষ হয়েছে আকবরের আমল আলোচনায়। তাও আকবরের আমলের পুরোটা আলোচিত নয়, খণ্ডাংশ রয়েছে। ২৮ পাতা থেকে হুমায়ুনের সময় আলোচনা করেছেন আরিফ। আকবরের প্রথম জীবন আলোচনায় কান্দাহারের অবরোধের ঘটনাবলী সংক্ষিপ্তাকারে উঠে এসেছে। আমি স্যর যদুনাথ সরকারের রামপুর পাণ্ডুলিপির নকল ব্যবহার করেছি। ভারতবর্ষে এটাই একটা নকল।
২২। তাজকিরাতুল মুলক রিফিউদ্দিন শিরাজি
১৬১১, ১০২০হ-তে লেখেন। যদিও তিনি দক্ষিণের সাম্রাজ্যের ইতিহাস লিখেছেন, কিন্তু একসঙ্গে হিন্দুস্তানে মুঘল সাম্রাজ্য এবং ইরানের সাফাভি সাম্রাজ্য নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি হুমায়ুনের রাজত্বকাল এবং ইরাণে হুমায়ুনের প্রবাসকাল নিয়ে বহু তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু সে সব তথ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যতা খুব কম। দক্ষিণের হায়দারাবাদের সালার জঙ্গ জাদুঘরের বইটি থেকে স্যর যদুনাথ সরকারের করা নকলটি আমি ব্যবহার করেছি।
২৩। আহসানুলতাওয়ারিখ বা মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখ হাসান বিন মুহম্মদুলখাকিয়ুশ শিরাজি
বইটি লেখেন ১৬১০-১১, ১০১৯ হ-তে। লেখক শিরাজ অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়ে আকবরের রাজত্বে অভিবাসিত হয়ে এসে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনে নানান পদে চাকরি করেছেন। আহসানুলতাওয়ারিখ হল প্রাচীন কাল থেকে ১০১৯ হ পর্যন্ত সময়ের সাধারণ ইতিহাস। তবে হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস নিয়ে তিনি খুব কিছু লিখে যান নি। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ১৬৪৯ নং আর পাবলিক লাইব্রেরি লাহোরের পাণ্ডুলিপিটি ব্যবহার করেছি।
২৪। জাফরুলওয়ালিয়া বি মুজফফর ওয়া আলিয়া, আবদুল্লা মুহম্মদ বিন উমর আল-মাক্কি
জাফরুলওয়ালিয়া বি মুজফফর ওয়া আলিয়া বইটা লেখা শেষ করেন ১০২০হ/১৬১১য়। তিনি আরবিক ভাষায় গুজরাটের ইতিহাস লিখলেও হুমায়ুনের রাজত্বের সাধারণ ইতিহাসও বইটিতে আমরা পাচ্ছি। মূলত আবুলফজলকে অনুসরণ করলেও বইতে বেশ কিছু নতুন তথ্য উল্লেখ করেছেন, যেমন শাহকে হুমায়ুনের হিরে উপহার দেওয়া। সম্পাদনা করেছেন এ ডি রস ইন্ডিয়ান টেক্সটস সিরিজে প্রকাশিত হয়েছে। এটি ১৬১১য় লেখা শেষ হয়। মীরাটিসিকান্দরি থেকে লেখক উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
২৫। তারিখইশাহি বা তারিখইসালাতিনইআফাঘিনা, আহমদ ইয়াদগার
১৬১৪হ/১০২৩ নাগাদ বই লেখা শেষ করেন। মূলত হিন্দুস্তানে আফগান শাসকদের নিয়ে বইটা লেখা কিন্তু শেষ হয়েছে বাবর আর হুমায়ুনের রাজত্বকালে। হুমায়ুনের ইরান প্রবাসের বেশ বিস্তৃত বর্ণনা আছে আর কান্দাহার অবরোধ নিয়েও লেখা হয়েছে। তিনি নাজিমুদ্দিন আহমদকে অনুসরণ করেছেন। প্রকাশক রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, বইটি সম্পাদনা করেছেন ড হিদায়ত হোসেইন।
২৬। শুভইসাদিক মহম্মদ সাদিক
১০৪৬হ/১৬৩৯এ লেখা শেষ করেন। মূলত বিস্তৃত আকারে বিশ্ব ইতিহাস এবং তাঁর সময় পর্যন্ত মুঘল আমলের ইতিহাসও লিখেছেন। হুমায়ুনের রাজত্বও বিস্তৃত আকারে উল্লিখিত হয়েছে। হুমায়ুনের প্রবাসকাল নিয়ে তিনি ফরিস্তাকে অনুসরণ করেছেন। আমি পাটনার ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
২৭। মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখ, মহম্মদ ইয়ুসুফ
বইটা লেখা শেষ করেন ১০৫৬হ/১৬৪৬। শাহজাহানের রাজত্বকাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিশ্ব ইতিহাস লিখেছেন মহম্মদ ইয়ুসুফ। হুমায়ুনের ইরান অভিবাসন এবং কান্দাহার অবরোধের ইতিহাস নিয়েছেন নিজামুদ্দিনের থেকে। আমি পাটনার ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। (চলবে)