বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
খ। সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা বই
১। তারিখইআমীর মাহামুদ আমীর মাহামুদ বিন খন্দ আমীর
৯৫৭হ/১৫৫০-এ বইটী লেখেন। তিনি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হাবিবুসসিয়ারের লেখক খন্দ আমীরের [সাধারণ লব্জে খন্দমীর বা খন্দামীর] পুত্র লিখেছেন শাহ ইসমাইল আর শাহ তাহমস্পের সময়ক্রম নিয়ে। শাহ তাহমস্পের রাজত্বে ইরানজুড়ে হুমায়ুনের ভ্রমণ বিশেষ করফে কান্দাহার থেকে শাহ তাহমস্পের দরবার পর্যন্ত যাত্রা, বিভিন্ন উৎসব, পরবে অংশ নেওয়া, ভ্রমণকালে বিভিন্ন তীর্থস্থান যাওয়া ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন সুচারুভাবে। ইরাণে হুমায়ুনের কাজকর্মের বিশদতম বর্ণনা তারিখইআমীর মাহামুদের মত অন্য কোনও ঐতিহাসিক লেখেন নি। হুমায়ুনের হেরাট আর মশদে আগমণের প্রতিক্রিয়ায় আহমদ সুলতান শামলুর, হেরাটের প্রশাসক মহম্মদ খান শারাফুদ্দিনকে পাঠানো সমীক্ষা বইতে উল্লিখিত হয়েছে। হেরাটে মহম্মদ খান হুমায়ুনের সম্মানে যে উৎসব আয়োজন করেন, তার বিশদ বিবরণও আছে। বরং তিনি শাহের দরবারে হুমায়ুন যে ক’দিন থেকেছেন বা কান্দাহার ফেরত যাওয়ার বর্ণনাও সংক্ষিপ্তাকারে সেরেছেন। তবে কান্দাহারের দুটো অবরোধের বিশদ বর্ণনা আছে। তিনি যেহেতু শাহ তাহমস্পের দরবারি ঐতিহাসিক, তাই শাহ যেভাবে হুমায়ুনকে বেইজ্জতি করেছেন তার বিন্দুমাত্রও উল্লেখ নেই, তেমনি দিনক্ষণ বা তারিখ বর্ণনায় যতটা বিশ্বস্ত থাকার কথা, তিনি সেই সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। ইরাণী দৃষ্টিভঙ্গীতে হুমায়ুনের ইরাণ অভিবাসন বিষয়ে সার্বিকভাবে জ্ঞানার্জনে বইই তারিখই আমীর মাহামুদের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনীয় নয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দুটি নকল আছে, আমি ২৯৩৯টি ব্যবহার করেছি কারন আমার মনে হয়েছে ওই নকলটাই তুলনামূলকভাবে ভাল অবস্থায় রয়েছে।
২। তারিখইইলচিই নিজাম শাহ খুর শাহ বিন কুবাদুল হুসেইনির
লেখা বইটি শেষ হয় ৯৭১হ/১৫৬৩-৪ নাগাদ। সাধারণ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেও লেখক যেহেতু বহহুকাল পারস্যে থেকেছেন, তাই শাহী সুলতানদের নিয়েও লিখেছেন। তিনি দক্ষিণের নিজাম শাহের প্রতিনিধি/রাজদূত হয়ে ৯৫২ রজবে পারস্যের রাই শহরে পৌঁছন। তিনি শাহের দরবারে দেড় বছর কাটান। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ৯৭১এও আমরা তাঁকে শাহের দরবারে দেখি। তিনি যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে ইরাণে রয়েছেন, তাই তাঁর দৃষ্টিতে ইতিহাস লেখা সব সময় অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে পঠিত হয়েছে। হুমায়ুন কান্দাহার ছাড়ার এক বছর পরে খুর শাহ ইরাণে পৌঁছন এবং শাহের দরবারে অনেক দিন থেকেছেন। তাই জৌহর বা বায়াজিদ বা অন্য ঐতিহাসিকের তুলনায় একমাত্র খুর শাহরই হুমায়ুনের শাহী দরবারি উপস্থিতি বা ইরাণে তাঁর ঘোরাঘুরি বিষয়ে বিশদে জানা সম্ভব ছিল। অথচ খুর শাহ খুব বিশদে, অথবা খুব সংক্ষেপেও হুমায়ুন সম্বন্ধে লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। ইরাণে প্রবেশ করার অনুমতি চেয়ে হুমায়ুন প্রথম যে চিঠি শাহকে লেখেন, তার প্রতিলিপি আমরা জৌহর ছাড়া একমাত্র খুর শাহের লেখায় পাই। তিনি হুমায়ুনের গার্মসির থেকে শাহের দরবার যাত্রা পথ, উৎসব পরব, তাঁকে সম্বর্ধনা ইত্যাদির বর্ণনা দিলেও আমীর মহম্মদের মত তিনিও হুমায়ুনের ফেরৎ যাত্রা নিয়ে খুব কিছু বলেন না বা পারসিকদের হাত থেকে কান্দাহার দখলের উল্লেখই তাঁর লেখায় নেই। হুমায়ুন শাহকে যে হিরে উপহার দিয়েছেন সে কথা লিখেছেন। যদিও তিনি দক্ষিণের রাজার প্রতিনিধি হিসেবে পারস্যের দরবারে আসীন ছিলেন, কিন্তু তিনি যে ইতিহাস লিখেছেন সেটা মূলত পারসিক দৃষ্টিভঙ্গীরই বিস্তৃত বর্ণনা, এবং সেই জন্যেই শাহের হাতে হুমায়ুনের অপমান ইত্যাদি তাঁর লেখায় উঠে আসে না। ঘটনাবলী ঘটার সমান্তরাল সময়ে ইতিহাস লেখা সত্ত্বেও সরময়সারণী তার লেখায় বহুবারই গুলিয়েছে। তবুও তারিখইইলচিই নিজাম শাহ হুমায়ুনের ইরাণ প্রবাসের অন্যতম বিশ্বস্ত প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ২৩৫১৩ আর ১৫৩, দুটো নকলই আমি ব্যবহার করেছি।
৩। আফজালুততাওয়ারিখ
প্রথম শাহ আব্বাসের (১৫৮৭-১৬২৯) সময়ে লেখা বইটিতে শাহ তাহমস্পের সমগ্র আমল, সিংহাসনে আরোহন থেকে প্রয়াণ পর্যন্ত সময় বিশদে আলোচনা করা হয়েছে। হুমায়ুনের শাহের দরবারে অভিবাসন এবং সেখানে তার কাজকর্ম ইত্যাদি মোটামুটি বিশদে আলোচিত হয়েছে। অনামা লেখক বেশ কয়েকবার আকবরনামার নাম নিয়েছেন। আফজালুততাওয়ারিখ একমাত্র সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীর ইতিহাস যেখানে হেরাটের প্রশাসককে শাহের ফরমান পাঠানোর খবর দেওয়া হয়েছে; সমস্যা হল এখানে যে ফারমানের কথা উল্লিখিত হয়েছে তার বয়ান অনেকটাই বায়াজিদ বা আকবরনামায় উল্লিখিত ফারমানের থেকে আলাদা। তিনি সরকারি নথিপত্র সহজেই জোগাড় করতে পারতেন, তার প্রমান হল তার বইতে বিপুল সংখ্যক ফারমান, সরকারি নির্দেশ, চিঠি ইত্যাদি ঠাঁই পাওয়া। আফজালুততাওয়ারিখএই পাচ্ছি হুমায়ুনের চিঠির উত্তরে শাহের চিঠি। শাহের দরবারে পৌঁছনো যত বিশদে বইতে উল্লিখিত হয়েছে ঠিক ততটাই সংক্ষিপ্তিতে তার ইরান থেকে কান্দাহার ফেরার বর্ণনা লেখা হয়েছে। সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা হয়েছে বলেই ইরাণ রাজের হাতে হুমায়ুনের লাঞ্ছনা বইতে ঠাঁই পায় নি। কান্দাহার অবরোধের কথা বয়াল হয়েছে কিন্তু তারিখইআমীর মাহামুদএর মত বিশদে নয়। তারিখইআমীর মাহামুদএর তুলনায় গুণমানে খুব সমৃদ্ধ না হলেও আফজালুততাওয়ারিখ বইতে কিন্তু পলাতক মুঘল সাম্রাজ্যের ইরাণ প্রবাস বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। একমাত্র নকলটি আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। আমি সেটাই ব্যবহার করেছি। (চলবে)