বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
৪। রাউজাতুস সাফাভিয়া, মির্জা বেগ বিন হাসান হুসেইনি জুনাবাদী
লেখা শেষ হয় ১০৩৫হ/১৬২৫-৬এ। সাফাভি সাম্রাজ্য পরিবারের শুরু থেকে শাহ সফির সময়কালের ইতিহাস বর্ণনা। শাহ তাহমস্পের কাল বেশ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে এবং হুমায়ুনের পারস্য প্রবাসকাল মোটামুটি বিশদে রয়েছে বইটিতে। গার্মসির থেকে শাহ তাহমস্পের দরবারে আসার পথ, অনুষ্ঠান, সম্বর্ধনা ইত্যাদি বিশদ বর্ণনা আমরা পাচ্ছি মির্জা বেগ বিন হাসান হুসেইনি জুনাবাদীর লেখায়। কিন্তু তারিখইআমীর মাহামুদএর মত শাহের দরবারে হুমায়ুনের অধিষ্ঠান বা তাঁর কান্দাহারে ফিরে যাওয়ার বর্ণনা খুবই সংক্ষিপ্তাকারে সারা হয়েছে। কান্দাহারে হুমায়ুনের দ্বিতীয় অবরোধের কথাও উল্লেখ করেন নি লেখক। তারিখইআমীর মাহামুদ, তারিখইইলচিই নিজাম শাহ এবং আফজালুততাওয়ারিখএর লেখার আঙ্গিক কিন্তু বেশ আলাদা হলেও রাউজাতুস সাফাভিয়ায় আমীর মহম্মদের অনপনেয় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তা সত্ত্বেও বলতে হবে মির্জা বেগের লেখায় মাঝেমধ্যেই বেশ কিছু নতুন তথ্যের সমাহার লক্ষ্য না করে পারি না। কয়েক বছর আগে শ্রী ইভানভের মাধ্যমে তেহরান থেকে কেনা রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের পুথিটা অনুসরণ করেছি। ক্যাটালগে এর নাম নেই। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আরও একটা পুথি আছে।
৫। খুলাসাইমাকাল, মহম্মদ তাহিরবিনমহম্মদইয়ুসুফ কাজভিনি
দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের সময়ে লেখা (১০৫২হ-১০৭৭/১৬৪২-১৬৬৭)। লেখক সাফাভি দরবারি ইতিহাসকার। খুলাসাইমাকালএ আমরা ইরানে হুমায়ুনের পরিভ্রমণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাচ্ছি। পারস্যে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে হুমায়ুন যে চিঠি শাহকে পাঠিয়েছিলেন তার নকল তিনি বইতে উল্লেখ করেছেন। হুমায়ুনকে যে সব উৎসব পরবে সম্মান জানানো হয়েছিল তার বর্ণনা পাচ্ছি। সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে যে সব ইতিহাস লেখা হয়েছে খুলাসাইমাকাল সে সবের থেকে কিছুটা হলেও আলাদা। কিছু ঠিক তারিখ, কিছু ভুল তারিখও আছে। কান্দাহারের অবরোধের খবর নেই বইতে। অন্য ঐতিহাসিকের লেখার কিছু তারিখ, কিছু তথ্য খুলাসাইমাকাল থেকে ঝালিয়ে নেওয়া যায়। আমি একমাত্র বদলিয়ান পুথিটাই ব্যবহার করেছি।
৬। নুসাখই জাহানারা, কাজি আহমদ বিন মুহম্মদ আলগাফফারি
৯৭২হ/১৫৬৩তে লেখা। পূর্ব দেশের সাধারণ ইতিহাস। তিনি সাফাভি রাজ পরিবারের ইতিহাসও আলোচনা করেছেন। সাফাভি দরবারে হুমায়ুনের যে ক’দিন অবস্থান করেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখেছেন বইতে। কিন্তু শাহের গ্রীষ্ম রাজধানীতে হুমায়ুনের যাওয়া বা ফেরার বর্ণনা নেই। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নকলটা ব্যবহার করেছি।
৭। তারিখইআলামারাই আব্বাসি, ইসকান্দার মুনসি
১০৩৮হ/১৬২৯এ লেখা শেষ হয়। ইসকান্দার মুনসিকে পারস্যের সাফাভি ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ হিসেবে ধরা হয়। তারিখইআলামারাই আব্বাসি তেহরান আর বম্বেতে লিথোগ্রাফ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আমি তেহরানের সংস্করণটাই ব্যবহার করেছি বুহার ৫২ পাণ্ডুলিপি। ছটা পাণ্ডুলিপি আছে বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটিতে এবং একটা ঢাকার হাকিম হাবিবুর রহমান সাহেবের (ছোট কাটরার হাকিম হাবিবুর রহমান (১৮৮১-১৯৪৭) ইউনানী চিকিৎসক, সাহিত্যসেবী, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে পুথির একটি সংগ্রহ আছে। তাঁর সংগ্রহে ছিল ইসকান্দার মুনসির তারিখইআলামারাই আব্বাসি। তাঁর উর্দু ভাষায় দেওয়া বেতারকথিকা ‘ঢাকা পচাস বরস পহলে’ বাংলা অনুবাদ এবং প্রকাশ পেয়েছে। ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্রে খ্যাতিমান চিকিৎসক। হাকিম হাবিবুর রহমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খুবই প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন। তিনি ১৮৮১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার ছোট কাটরা মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বেশির ভাগ ছেলেমেয়েদের মতো তিনি বাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ঢাকা মাদ্রাসা ও কানপুর দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন। লক্ষ্ণৌ, দিল্লিও আগ্রাতে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ লাভের পর তিনি ১৯০৪ সালে চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। হাকিম হাবিবুর রহমান ছিলেন নওয়াব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ১৯৩০ সালে ঢাকায় ‘তিবিবয়া হাবিবিয়া কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ববাংলার মানুষকে ইউনানী চিকিৎসা সেবা দানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯৩৯ সালে ‘শেফা-উল-মুলক’ খেতাবে ভূষিত করেন। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি প্রচুর লেখালেখি করেন। তিনি ১৯০৬ সালে উর্দু মাসিক পত্র আল-মাশরিক সম্পাদনা করেন। ১৯২৪ সালে তিনি খাজা আদেলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘যাদু’ নামে অপর একটি উর্দু মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি মাত্র দু’বছর টিকেছিল। হাকিম হাবিবুর রহমান প্রায়শ ‘আহসান’ ছদ্মনাম বা তখল্লুস নামে লিখতেন। তাঁর অসংখ্য লেখার মধ্যে রয়েছে আল-ফারিক, হায়াত-ই-সুকরত, আসুদগান-ই-ঢাকা এবং ঢাকা পঁঞ্চাশ বারাস পহলে। সর্বশেষ উল্লিখিত বইটিতে রয়েছে তাঁর সময়ে ঢাকা শহরের অধিবাসীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাঞ্জল বর্ণনা। সে যুগের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের ব্যবহৃত ভাষা উর্দু হওয়ায় একজন বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও হাকিম হাবিবুর রহমানের সকল রচনাই ছিল উর্দু ভাষায়।তিনি পান্ডুলিপি, মুদ্রা, যুদ্ধাস্ত্র প্রভৃতির সংগ্রহকারী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর অধিকাংশ রচনা ও সংগ্রহ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে Habibur Rahman Collections শিরোনামে সংরক্ষিত আছে। ১৯৩৬ সালে তিনি ঢাকা জাদুঘরকে তাঁর সংগৃহীত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা মিলিয়ে মোট ২৩১টি পুরনো মুদ্রা দান করেন। ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয় – বাংলাপিডিয়া) কাছেও আছে, এটা পুরোনো কিন্তু খুব সুন্দর। আমি দেখেছি তেহরান সংস্করণের সঙ্গে অন্য পাণ্ডুলিপির বেশ পার্থক্য আছে। তেহরান আর বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটির ৯০, ৯১ পাণ্ডুলিপিতে পারস্যে ঢোকার অনুমতি চেয়ে হুমায়ুন যে চিঠি শাহকে পাঠিয়েছিলেন, সেটি আছে। কিন্তু অন্য পাণ্ডুলিপিতে চিঠিটা তো নেই এবং ইরাণে হুমায়ুনের প্রবাস বর্ণনাও ছোট করে সারা হয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটির ৮৯ নম্বর পাণ্ডুলিপি বেশ পুরোনো, তারিখ ১০৭৯-৮০হ। ঢাকার নকলটি আওরঙ্গজেবের আমলের। তেহরানের ৯০ নম্বর পাণ্ডুলিপি এবং এশিয়াটিক সোসাইটির ৯১ নম্বরে কান্দাহারকে দেখানো হয়েছে ভারতবর্ষ আর ইরাণের বিবাদস্থল হিসেবে। ইসকান্দার মুনসি বলছেন হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস সময়ের একটা বড় অংশের চিঠি তিনি নিয়েছেন আবুলফজলের আকবরনামা থেকে। হুমায়ুনের ইরানে সময়ের কথা বলতে গিয়ে জীবনহাসানইরুমুলুর আহসানুলতাওয়ারিখকে সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এরস্কিনের মন্তব্যটি ‘তিনি বেশ কিছু ভারতীয় ঐতিহাসিকের লেখা বিশেষ করে আবুল ফজলের বই থেকে বহু ঘটনা তুলেছেন’ কিছুটা রঙ চড়ানো হলেও তাতে অনেকটাই সত্যের ছোঁয়া আছে। (চলবে)