বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
৮। আহসানুততাওয়ারিখ, হাসানইরুমলু
৯৮৫হ/১৫৭৭-৭৬এর দিকে বইটি লেখা শেষ হয়। যদিও বইটা পূর্ব দেশের ইতিহাস অবলম্বন করে লেখা হয়েছে, কিন্তু জোর দেওয়া হয়েছে সাফাভি সাম্রাজ্য’র শুরু সময় থেকে শাহদের জীবনী কথনে। শাহ তাহমস্পের জীবন এবং পারস্যে হুমায়ুনের থাকালীন সময়ের বর্ণনা তারিখইইলচিই নিজাম শাহ বা খুলাসাইমাকালএর তুলনীয় কিন্তু খুব বেশি সময়ের ধারাবাহিকতা রাখতে পারেন নি; যেহেতু তিনি সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বইটা লিখেছেন তাই স্বাভাবিকভাবে অন্য ঐতিহাসিকের মতই শাহী দরবারে হুমায়ুনের লাঞ্ছনা ইত্যাদির বর্ণনা উল্লেখ করা থেকে পাঠকদের বঞ্চিত রেখেছেন।কান্দাহারের দুটি অবরোধই তিনি উল্লেখ করেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে গাইকোয়াড ওরিয়েন্টাল সিরিজেস।
৯। শারাফ নামা, শারাফ খান
লেখা হয় ১০০৫হ/১৫৯৬-৯৭তে। বইটি মূলত কুর্দ সমাজের ইতিহাস। কিন্তু বইতে শাহ তাহমস্পের রাজত্বকাল এবং হুমায়ুনের ইরান প্রবাসকাল সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হয়েছে। শাহী পরিবারের প্রধান হিসেবে তাহমস্পের অথিথিপরায়ণতার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। একমাত্র তার সূত্রেই আমরা জানতে পারি একদা শাহ, হুমায়ুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। অন্য ঐতিহাসিকের থেকেও বেশ কিছু তথ্য তিনি আহরণ করেছেন। শারাফ নামা সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ১৮৬০-৬২তে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
১০। লাবুত তাওয়ারিখ, ইয়াহিয়া বিন আবদুল লতিফ
৯৪৮হ/১৫৪১-এ লেখা। বইতে অতীত থেকে ১৫৪১ পর্যন্ত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। পরের দিকের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত আকারে লেখা হয়েছে। ইয়াহিয়া বিন আবদুল লতিফএর লেখায় শাহ তাহমস্প বিস্তৃতভাবে এসেছে বলেই বইটির মূল্য পরবর্তী ঐতিহাসিকদের কাছে বেড়েছে। ইরানে হুমায়ুনের অধিষ্ঠান নিয়ে খুব বেশি বাগবিস্তার করেন নি। আমি ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরি পাটনার পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
১১। তাজকিরাইশাহতাহমস্প
৯৮৪হ/১৫৭৬-এ লেখা। অনেকেরই ধারণা তাজকিরাইশাহতাহমস্প হল শাহ তাহমস্পএর নিজের হাতে লেখা আত্মজীবনী। আশা করা গিয়েছিল, এই বইতে শাহী অতিথি হুমায়ুন নিয়ে শাহ মুখ খুলবেন। কিন্তু তিনি নিরব থেকেছেন। তিনি একবারইমাত্র হুমায়ুনের নাম নিয়েছেন। এর থেকে প্রমান হয় যে শাহ হুমায়ুনকে কোন চোখে দেখতেন। হুমায়ুন যে সব অঞ্চলে ঘুরেছেন, স্মৃতিকথা সূত্রে সে অঞ্চল বিষয়ে আমরা বিশদ জ্ঞান অর্জন করি। বইটি বার্লিন আর কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।
১২। জুবদাতুলতাওয়ারিখ, মহম্মদ আফজল হুসেইনি
১০৬৩হ/১৬৫২ নাগাদ লেখা শেষ হয়। সাফাভি রাজত্বকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ইতিহাসের বর্ণনা জুবদাতুলতাওয়ারিখএ করেছেন মহম্মদ আফজল হুসেইনি। ম্যালকম আর মোরল দাবি করছেন বইটি সাফাভি রাজত্ব আর পারসিক ইতিহাস বিষয়ে মূল্যবান আকর। কিন্তু হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস সময়কাল নিয়ে তিনি যতটা পারাযায় সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেছেন। আমি পাটনার ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। লন্ডনের নকলটা বেশ ভাল।
১৩। ফাওয়াইদইসাফাভিয়া, আবদুল হাসান বিন ইব্রাহিম কাজভিনি
১২১১হ/১৭৯৬-৯৭তে লেখা। শাহ ইসমাইল থেকে শেষ সাফাভি শাহ, সুলতান আবুল ফাতাহ মহম্মদ মির্জা পর্যন্ত রাজার ইতিহাস। সুলতান আবুল ফাতাহ মহম্মদ মির্জা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বন্দী হিসেবে লখনৌতে বাস করেছেন। ফাওয়াইদইসাফাভিয়ায় হুমায়ুনের সাফাভি দরবারে যাত্রা এবং কান্দাহারে ফেরত আসা এবং পথে হুমায়ুনের সম্মানে আয়োজিত উৎসব, শিকার ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। শাহ তাহমস্পকে হিরে উপহার দেওয়া ঘটনার বিশদ বর্ণনা দেওয়া আছে বইতে। সাধারণভাবে ইরানে হুমায়ুন বিষয়ে জানতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বই। আমি ইন্ডিয়া অফিস পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
১৪। শাহনামাইকাশিমি, মির্জা কাশিম গুণবাদী
৯৭১হ/১৫৬৩-৬৪-র পরের সময়ে লেখা শেষ হয়। শাহ ইসমাইল আর শাহ তাহমস্পের ব্যক্তিগত ইতিহাস কাব্যাকারে লেখা। মির্জা কাশিম গুণবাদী থেকে আবুলফজল, শাহ তাহমস্প আর হুমায়ুনের মধ্যে বৈঠকের বর্ণনাটি নিয়েছেন। শাহ ইসমাইল নিয়ে লেখা দফতরটি লখনৌতে আলাদা করে ছাপা হয়েছে, পাণ্ডুলিপি বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটিতে আছে। কিন্তু শাহ তাহমস্পকে নিয়ে লেখা দ্বিতীয় দফতর ছাপা হয় নি এবং দুষ্প্রাপ্যও বটে। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৩৩০ পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি।
এই বিষয়ে আরও কিছু লেখা —
১। ইন্ডিয়া অফিসের ২২৪ নং পাণ্ডুলিপিতে (তারিখবিহীন) হুমায়ুনের ইরান পলায়ন এবং কান্দাহার দখল নিয়ে আলোচনা আছে। শাহ তাহমস্প, হেরাটের প্রসাসক মহম্মদ খানকে যে ফরমান পাঠিয়েছিলেন সেটি উল্লেখ করে হুমায়ুনের ইরানে ঘোরাফেরা, হেরাটে আবির্ভূত হওয়া, মিয়ানায় হুমায়ুনকে শাহের বিদায় সম্বর্ধনা থেকে কান্দাহারে আসা এবং শাহজাদা মুরাদের অধীনে সেনাপতিদের নাম উল্লেখ এবং যে সব অভিজাত প্রবাসকালে হুমায়ুনের সঙ্গে থেকেছেন, তাদের নাম উল্লেখ আছে। আবুলফজলকে গভীরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
২। হফত রিসালা-ই-তাকুইমুলবুলদান। তারিখবিহীন বুহার ৪৫ নম্বর পাণ্ডুলিপি। বিভিন্ন ঘটনার সাতটি সংগৃহীত নথি নির্ভর করে মুঘল আমলের ইতিহাস। এটিতে হেরাটের প্রসাশক মহম্মদ খানকে পাঠানো শাহ তাহমস্পের ফরমানটি রয়েছে। এছাড়াও ইরানে হুমায়ুনের প্রবাসকালের ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাচ্ছি। এই পুথির বয়ান ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ২২৪ নং বইএর অনুরূপ।
৩। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৭৬৮৮ নং পাণ্ডুলিপি। এই পাণ্ডুলিপিতে আলপ আরসালান সেলজুকির সময় থেকে দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের সময় পর্যন্ত, রাষ্ট্র প্রধানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রখ্যাত, পাশের দেশের দূত, সম্রাট, দেশগুলোর উজির পারস্য প্রধানকে পাঠানো এবং তার কাছে আসা পাঠানো চিঠির সংকলন। লেখক আবুল কাশিম ইভাঘলি হায়দার ছিলেন শাহ সফির আমলা, তাকেই বুইটা উতসর্গ করেছিলেন, কিন্তু লেখাটি শেষ হয় তাঁর উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় শাহ আব্বাসএর ১০৫২হ/১৬৪২-৪৩ সময়ে। বইটি গুরুত্বপূর্ণ কারন, বইতে হুমায়ুন এবং শাহ তাহমস্পের পস্পরকে পাঠানো বেশ কয়েকটা চিঠি আছে, যা অন্য কোনও বইতে নেই।
৪। ইনায়তনামা, ইনায়ত খান রসিক, ১১৬৩হ/১৭৫০এ। মুঘল আমলের সম্রাট এবং অভিজাতদের চিঠি এবং নথি সংক্রান্ত বই। এটায় পারস্যে ঢোকার জন্যে হুমায়ুনের শাহ তাহমস্পকে পাঠানো চিঠি এবং তার জবাবের বয়ান উল্লিখত হয়েছে। আমি ইন্ডিয়া অফিসের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও একটা নকল আছে। (চলবে)