দ্বিতীয় অধ্যায়
সিস্তান এবং হেরাটে হুমায়ুন
৬। হুমায়ুনের হেরাট বাস, নওরোজ উৎসব
হেরাটের সৌন্দর্য হুমায়ুনের মন কেড়ে নিল। প্রফুল্ল মনে বেশ কয়েক দিন তিনি সেখানে রয়ে গেলেন — জৌহরের বয়ানে এক মাস আর রাজদূত খুর শাহের বয়ানে ২০ দিন। তিনি হেরাটে বহু দর্শনীয় স্থান, প্রখ্যাত সন্তদের মাজার, প্রয়াত সুলতানদের স্মৃতিস্তম্ভ ঘুরে দেখলেন। হেরাটের সন্ত খাজা আবদুল্লা আনসারির মাজার, বাগ মুরাদ, বাগ খিয়াবান, বাগ জাঘান, বাগ জাহানারা এবং বাগ সাফিদও গেলেন। গুলবদন বেগম বলছেন, মহামহিম সব কটা বাগান, ফুলের বাগান, সুলতান হুসেন মির্জার তৈরির নানা স্থাপত্য এবং প্রাচীন কালের নানান বিশাল স্থাপত্য ঘুরে দেখেন। রাজদূত খুর শাহ বলছেন মহামহিম খুরসানে যে সব কাঠামো দেখেছেন, তার থেকে ভাল কাঠামো তিনি ভারতবর্ষে দেখেন নি – অসামান্য প্রাসাদ, বাড়ি, বাগান, খাল খুরাসানকে বেহেস্ত বানিয়ে রেখেছে [৭]।
হুমায়ুনের বেশ কয়েক দিন হেরাটে থেকে যাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নওরোজ উৎসবে অংশ নেওয়া। আফজালুততাওয়ারিখে নওরোজ উৎসবের বিশদ বর্ণনা আছে। দু-থাক কালীনের ওপর রাখা সিংহসাসনে হুমায়ুনকে বসানো হল। ডান দিকে শাহজাদা মহম্মদ মির্জা আর বাঁ দিকে মীর মহম্মদ ইয়ুসুফ সদর বসলেন। ইরাণি প্রথা অনুযায়ী অভিজাত দরবারি সে দিন শাহজাদা আর সুলতানদের উপহার দিলেন। প্রথমে শাহজাদা মহম্মদ খানকে উপহার দেওয়া হল, তার পর হুমায়ুনকে উপহার দেওয়া হল। উপহারগুলো রাখার দায়িত্ব নিলেন বৈরাম বেগ আর হাজি মহম্মদ। সে দিন হুমায়ুন ৮,০০০ তুমান উপহার পেলেন। বিখ্যাত আবৃত্তিকার সাবীর শাহ এবং মহম্মদ কাজভিনি, হার্প বাজানোয় দক্ষ উস্তাদ কাশিম এবং গান বাজনার কলাবন্তরা অনুষ্ঠানকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিল। আমাদের ধারণা বেহেস্তের ভেনাসেরা অনুষ্ঠানের নির্ঘত স্বর্গীয় সুধা আনন্দিত চিত্তে পান না করে পারে নি।
হেরাটে থাকাকালীন প্রত্যেক সপ্তাহে হুমায়ুন শাহের থেকে শুভেচ্ছা বার্তা এবং উপহার পেয়েছেন [২]। যতদিন না হুমায়ুন শাহের দরবারে পৌঁছবেন, মহম্মদ খান সম্রাটকে প্রয়োজনীয় সব কিছু সরবরাহ করেছেন; ফলে হুমায়ুনকে দৈনিক চাহিদা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় নি [৩]।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের জোড়াপাতা
হেরাটে পা রাখা এবং হেরাট থেকে চলে যাওয়ার সময়ক্রম
হুমায়ুনের হেরাটে আসা এবং চলে যাওয়ার সময়ক্রম নিয়ে সেই সময়ের সূত্রগুলির মধ্যে বিতর্ক আছে। আকবরনামা বলছেন শাহী বাহিনী জাহানারা বাগানে পৌঁছন ১ জিলকাদা ৯৫০, ২৭ জানুয়ারি ১৫৪৪। কিন্তু আবুলফজল যে তারিখ লিখছেন, তার সঙ্গে মহম্মদ খানের যে চিঠি শাহ পাচ্ছেন ১২ জিলহজ্জ্ব, ৮ মার্চ ১৫৪৪, তার তারিখের পার্থক্য আছে; মহম্মদ খান হুমায়ুন হেরাটে প্রবেশের আগে শাহকে শাহী দিলের হেরাটে আসার সংবাদ জানিয়েছিলেন। হুমায়ুন শাহের থেকে অনুমতি পাওয়ার পরেই হেরাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। হুমায়ুন গার্মসির থেকে শাহকে চিঠি লিখেছেন ১ শাওয়াল ৯৫০, ২৯ ডিসেম্বর ১৫৪৩। হুমায়ুন যেহেতু গার্মসিরে বেশিদিন থাকতে পারেন নি, তিনি গার্মসির থেকে বেরিয়ে সিস্তানে পৌঁছন জানুয়ারির প্রথম পাদে। সংবাদ পেয়েই দেরি না করে আহমদ সুলতান মহম্মদ খানকে চিঠি লেখেন, মহম্মদ খান জানান শাহকে [৫]। শাহ যে জানুয়ারির মাঝামাঝিই সংবাদটা পেয়েছেন, এ তথ্যে কোনও ভুল থাকার কথা নয়। ফলে হুমায়ুন হেরাটে পৌঁছনোর তারিখ ১ জিলকাদা বা ২৭ জানুয়ারি হওয়ার সুযোগ খুবই কম। তবে রওজাতুসসাফাভিয়া, মাদানইআখবারইআহমদি, ইকবালনামা আর বুহলারের ৪৫ নং পাণ্ডুলিপিতে হুমায়ুনের হেরাটে পৌঁছনোর তারিখ দেওয়া হচ্ছে ১ জিলকাদা। আমীর আমাহামুদ বলছেন মহম্মদ খান হুমায়ুনকে অভ্যররথনা করতে যান ১ জিলকাদা বা ২৭ জানুয়ারি [৬]। জৌহর সূত্রে আমরা জানছি হুমায়ুন হেরাটে ১ মাস থাকছেন, তাহলে তিনি হেরাট থেকে রওনা হচ্ছেন ফেব্রুয়ারির শেষে ২৯ বা ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৫৪৪। সমস্যা হল, এই তারিখের সঙ্গে হুমায়ুনের হেরাটে নওরোজ উৎসবে অংশ নেওয়ার তারিখ মিলছে না [৭]। নওরোজ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে ২১ মার্চ [১]। ফলে, কিছু বইপত্রের সুবাদে আমাদের হয় সিদ্ধান্ত করতে হয় হুমায়ুন হেরাটে থেকেছেন দেড় মাসের বেশি ১ জিলকাদা থেকে মার্চে নওরোজ উৎসব শুরু হওয়ার সময় পর্যন্ত; না হয় আহসানুততাওয়ারিখ সূত্রে সিদ্ধান্ত করতে হয়, হুমায়ুন পৌঁছেছিলেন ২০ জিলকাদা ৯৫০ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৫৪৪ এবং আফজালুততাওয়ারিখ বলছে মহম্মদ খান হুমায়ুনকে অভ্যররথনা জানাতে যান শনিবার ২৬ জিলকাদা বা ২১ ফেব্রুয়ারি। তারিখইইলচিইনিজামশাহ আর তারিখইইব্রাহিমি শুধু বলছে হুমায়ুন হেরাটে পৌঁছেছেন ৬৫০ জিলকাদায় [২]। আমরা যদি ১ জিলকাদা তারিখটিকে হুমায়ুন আসার তারিখ হিসেবে মান্যতা দিই তাহলে জৌহরের দেওয়া ১ মাস ধরে হেরাটে হুমায়ুনের সময় কাটানোর হিসেব মেলে না। এই তারিখের সঙ্গে আবুলফজলের দেওয়া তথ্য নওরোজ খুব কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হবে বা আফজালুততাওয়ারিখের তথ্য বসন্ত এল বলে, মিলছে না [৩]। আফজালুততাওয়ারিখের তথ্য বলছে হুমায়ুন হেরাটে পৌঁছন ২১ জিলকাদা ৯৫০ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৫৪৪। এর সঙ্গে হুমায়ুন হেরাটে এক মাস বাস করেছেন, নওরোজ আর বসন্ত খুব কাছে এসেছে আর হুমায়ুন হেরাটে নওরোজ উৎসব দেখেছেন, এই সব কটা তথ্য মিলে যাচ্ছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম হুমায়ুন সিস্তানে এক মাসের বেশি সময় থেকেছেন।
ওপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার আবুলফজল যে বলছেন শাহ মহম্মদ খানের চিঠি ১২ জিলহজ্জ্ব ৯৫০ ৮ মার্চ ১৫৪৪-এ হাতে পাচ্ছেন, এই তথ্যে গরমিল আছে। আফজালুততাওয়ারিখের সূত্রে আমরা জানতে পারছি, মহম্মদ খানের চিঠি দরবারে পৌঁছচ্ছে মঙ্গলবার ৫ শাওয়াল ৯৫০, ২ জানুয়ারি ১৫৪৪ [৪]। হুমায়ুন গার্মসির থেকে ১ শাওয়াল ৯৫০ ২৯ ডিসেম্বর ১৫৪৩-এ শাহকে চিঠি লিখেছেন এবং তাঁর সিস্তানে পৌঁছবার পরে আহমদ শাহ, মহম্মদ খানকে তার আগমনের বার্তা দিয়ে শাহকে চিঠি লিখছেন। এই ঘটোনাক্রম ঘটছে দু-তিনদিনের মধ্যে।
বেভারিজ বলছেন মাসির-ই-রহিমিতে বলা হয়েছে জিলহজ্জ্ব’র পারসিক মাস দায়ইখুজিস্তা [৫]। পারসিক মাস দাই ডিসেম্বরের সমতুল, এবং হুমায়ুন জানুয়ারি মাস শুরুর আগে পারস্যে প্রবেশ করেন নি। তারিখ-ই-আমীরমহম্মদ সূত্রে জানছি হুমায়ুন সিস্তানে প্রবেশের আগে মহম্মদ খান শাহকে চিঠি লেখেন নি। ফলে ১২ দায়-ই-খুজিস্তা তারিখকে মেনে নেওয়া সম্ভব নয় [৬]। (চলবে)