বক্ষ্যমান বইটিতে সিংহাসন হারানো সম্রাট হুমায়ুনের ভারতবর্ষ থেকে শের শাহের প্রতাপে পালিয়ে আফগানিস্তান হয়ে বেশ কয়েক বছর পারস্যে কাটানোর আকর্ষণীয় সময় নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে। হুমায়ুন ভারতবর্ষে মুঘল রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পরে, পুত্র আকবর মুঘল সাম্রাজ্যকে অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন, কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পারস্য দরবারে আশ্রয় নেওয়া হুমায়ুনকে পারসিকেরা সাম্রাজ্য প্রধান শাহের তুলনীয় সম্মান না দেওয়ার ছুতোয় মুঘল দরবারি ঐতিহাসিকেরা পারস্যের সুলতানের প্রতি অজস্র রাজনৈতিক গালি বর্ষণ করেছেন। এর সঙ্গে জুড়েছে চিরকালীন শিয়া আর সুন্নি দ্বন্দ্বটিও। হুমায়ুনকে কী পারস্যে শিয়াপন্থ গ্রহণ করার জন্যে চাপ দেওয়া হয়? যদি তাই হয়, তাহলে কতদূর সেই চাপ পলাতক সম্রাট নিতে পেরেছিলেন সেই প্রশ্নও সঙ্গত কারনে বারবার বিভিন্ন দল তুলেছে। এর উত্তর দিতে গিয়ে মুঘল দরবারের বহু ঐতিহাসিক ঘোলাটে ঘোলাটে আলোচনা করেছেন এবং অনেকে বিষয়টা আলোচনাতেই আনেন নি, স্রেফ উপেক্ষা করেছেন, এড়িয়ে গেছেন। সমস্যা হল ভারতের পারসিক ভাষার ইতিহাস চর্চাকারীদের মতই ইরানী ঐতিহাসিকেরাও এই বিষয় নিয়ে রাজনৈতিকভাবে চুপ থেকেছেন।
বিষয়টা অধ্যাপক সুকুমার রায়ের বইতে বিশদে আলোচিত হয়েছে। পলাতক মুঘল সম্রাটের ভারতবর্ষের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে বিভিন্ন স্থান নাম এবং তারিখ নির্ণয়ে তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছেন এবং ইতিহাসে উল্লিখিত প্রায় সব ক’জন ঐতিহাসিকের কাজ বিচার করেছেন এবং সে বিষয়ে নিজের স্পষ্ট রায়ও দিয়েছেন।
এটি খুব গভীর এবং মনোযোগ আকর্ষণ করার মতই গবেষণা। এই ধরণের আরও বেশি বই ছাপা হয়ে ছাত্রদের হাতে পৌঁছনো দরকার। অধ্যাপক সুকুমার রায় যুবা আকবরের প্রধান এবং শাহী অভিভাবক [আতলিক] বৈরাম খান এবং তাঁর পুত্র, মুঘল দরবারের সুফি কবি এবং সুফি দর্শনের অন্যতম তারকা আবদুর রহিম খানই খানানকে নিয়েও বই লিখেছেন। যুবা গবেষক অধ্যাপকের বক্ষ্যমান বই আমি আদ্যোপান্ত পড়েছি এবং দেশের অতীত ইতিহাস নিয়ে যাদের উৎসাহ আছে, তাদের জন্যে বইটি সুপারিশ করলাম।
যদুনাথ সরকার

মুখবন্ধ
অন্য মুঘল সম্রাটের মত, দুঃখজনকভাবে হুমায়ুনের ইতিহাস ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নি; এবং তাঁর পারস্য প্রবাসের ইতিহাস, ইতিহাসে অন্যতম উপক্ষিত অধ্যায়গুলির মধ্যে অন্যতম বিষয়। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিকেরা ধরে নিয়েছেন এই ঘটনাটা বিদেশে ঘটনায়, এই বিষয়ে আলোচনা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে, পারস্যে হুমায়ুনের প্রবাস-বাস সরাসরি ভারতবর্ষের ইতিহাসের অংশ নয়। অন্যদিকে পারস্যের ঐতিহাসিকদের কাছে হুমায়ুনের পারস্য-বাসের বিষয়টি ভারত সম্রাটের ঘটনাবলীর মধ্যে পরিত্যক্ত অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়েছে। মধ্যযুগের ঐতিহাসিকদের মানসিকতা আধুনিক যুগের ঐতিহাসিকদের মধ্যেও চারিয়েছে। এ বিষয়ে একমাত্র ১৮৫৪য় প্রকাশিত [উইলিয়াম] এরস্কিনের হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া[আন্ডার দ্য টু ফার্স্ট সভরেইন্স অব দ্য হাউস অব তৈমুর, বাবর এন্ড হুমায়ুন] এখনও শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ কাজই নয়, সব থেকে বিশদ কাজও বটে [১]। তিনি সব ক’টা মূল সূত্র অবলম্বন করে বইটি রচনা করেছেন — আবুলফজলের আকবরনামা, নিজামুদ্দিন আহমেদের তবাকত-ই-আকবরি, তারিখই–বাদাউনি, জওহরের রাজকিরা-তুল-ওয়ালিয়াত, বাজায়িদের মুখতাসর, তারিখ-ই-ফিরিস্তা, কাফিখানের মুন্তাখাবু-উ-ওলুবুব এবং ইস্কান্দার মুনসির তারিখ-ই-আলমারা-ই-আব্বাসি [২]। তবে তারিখ-ই-আলমারা-ই-আব্বাসি বাদ দিলে সাফাভি বয়ান তিনি আলোচনায় আনেন নি। কয়েকটা পাণ্ডুলিপিতে হুমায়ুন আর শাহ তামস্পের মধ্যে যে চিঠিচালাচালির নিদর্শন পেয়েছি, সেটাও তার হাতে আসে নি। পারসিক দরবারে হুমায়ুনের যাত্রা এবং তার ফেরত আসাকে তিনি খুবই সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। হুমায়ুনের পারস্য যাত্রার ধারাবাহিক সময় সারণী এবং ভৌগোলিক পরিচয় দেওয়া নিয়ে মাথা ঘামাননি। বিষয়টা খুবই জটিল বলেই আমরা আশাকরতে পারি না, এটি তাঁর বইতে উল্লিখিত হবে। কিন্তু হুমায়ুনকে নিয়ে ইতিহাস লেখকেরা বিদেশের মাটিতে হুমায়ুনের ভাগ্যের উত্থান-পতনেরমত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন না; এবং সত্যি বলতে কী, কিছুটা পারসিক সাহায্য নিয়েই হুমায়ুন তার হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্য উদ্ধার করেছেন। হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস এক দিক থেকে মুঘল পারস্য কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস। কেউ কেউ বলেছেন, হুমায়ুনের পারস্য প্রবাসের গুরুত্ব হল তিনি যতটানা সিংহাসন উদ্ধারের আকর্ষণে উদ্বেলিত ছিলেন, তার থেকে বেশি আফিম সেবনে মত্ত থাকতেন; তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের কাছে হুমায়ুনের সাম্রাজ্যের সিংহাসন হারিয়ে পারস্য প্রবাস যতটা ট্রাজিক ততটাই আকর্ষণীয় [৩]।
ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ইন্ডিয়া অফিস, বদলিয়ান, রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি, আলিগড় ইউনিভার্সিটি, পাঞ্জাব পাবলিক লাইব্রেরি, বাঁকিপুর ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরি, স্যর যদুনাথ সরকারের লাইব্রেরি, এবং হজরতগঞ্জ নবাবের লাইব্রেরিতে ছাপা পান্ডুলিপি, অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির প্রায় সব কটা পড়েছি। বিভিন্ন পাদটিকায় আমি এমন বহু পাণ্ডুলিপির পাঠ ব্যবহার করেছি, যা এর আগে হুমায়ুনের ইতিহাস লেখা ঐতিহাসিকেরা ব্যবহার করেন নি। আশাকরি আমার এই গবেষণা হুমায়ুনের জীবনের এই সময়ে বিস্তৃতভাবে আলো ফেলতে সাহায্য করবে। হুমায়ুনের পারস্য যাত্রাপথ এবং পারস্য থেকে ফেরার পথের অঞ্চলগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি, শাহ তাঁর সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, সে সব কোনও হীনমন্যতা ছাড়াই আলোচনা করেছি এবং তিনি সেখানে যে সব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, সে সে-সব উৎসবের বিশদ বর্ণনাও লিখেছি। হুমায়ুন আদৌ শাহের ধর্ম-বিশ্বাস গ্রহণ করেছিলেন কী না সে বিষয়টিও আমার লেখায় বিশদে এসেছে। প্রবাসের সময়ক্রম নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছি। হুমায়ুন এবং শাহ তামস্পের মধ্যে যে চিঠি চালাচালি হয়েছিল, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই প্রথম কোনও বইতে আলোচিত হল। কান্দাহার অবরোধ বিশদে আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি ভিত্তি করে জওহরের (আফতাবাচি) লেখাকেও নতুনভাবে বিবেচনা করেছি এবং এই আলোচনায় নতুন নতুন তথ্য উঠে এসেছে। পারস্য নিয়ে পারসিক ঐতিহাসিকদের রচনা ব্যবহার করেছি, এবং সে সব পারসিক বা সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতেও বিশদে আলোচনা করেছি।
আমি কৃতজ্ঞতা জানাই ড এস পি মুখার্জী, ব্যারিস্টার ইন ল’কে, তিনি যেভাবে প্রত্যন্ত মফস্বল কলেজ থেকে আমায় তুলে এনে আরও গভীরে পড়াশোনার জন্যে জ্ঞানচর্চার, গবেষণার ভিত্তিভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তার জন্যে কোনও সাধুবাদই যথেষ্ট নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পি এন ব্যানার্জীর থেকে যে সাহায্য পেয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আরও যে কয়েকজন প্রখ্যাত কৃতবিদ্যর সাহায্য পেয়েছি, তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম না নিলে চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে। ভারত ইতিহাসের চূড়ামণি স্যর যদুনাথ সরকারের থেকে পথ নির্দেশনা পেয়েছি, প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়েছি। গবেষণার ছোঁয়াচে রোগ তিনি আমার মধ্যে চারিয়েদিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে থেকে বহু পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়েছেন, হজরতগঞ্জের নবাবের গ্রন্থাগার থেকে ফায়াজুলকাওয়ানিনের কয়েকটা চিঠি জোগাড় করে দিয়েছেন, লাহোরের পাঞ্জাব গ্রন্থাগার থেকে আহশানুততাওয়ারিখের কয়েকটা পাতার নকল জোগাড় করে দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, আমার অধ্যাপক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের থেকে নানান সাহায্য পেয়েছি। তিনিই প্রথম আমার মধ্যে গবেষণা উদ্যমের ভ্রুণ রচনা করেছিলেন। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে আমার পাণ্ডুলিপি আনিয়ে দিয়েছেন। স্যর যদুনাথ এবং ড মজুমদারের সাহায্য না পেলে বইটা দিনের আলো দেখত না।
আমি কৃতজ্ঞ প্রয়াত ড এ এফ রহমান, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালিকা রঞ্জন কানুনগোর কাছেও। আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি সংস্কৃতির স্যর আশুতোষ অধ্যাপক ড এম জেড সিদ্দিকিকে, মধ্যযুগ আর আধুনিক ইতিহাসের স্যর আশুতোষ অধ্যাপক ড আই বি ব্যানার্জী, ইত্যাদি।
সুকুমার রায়
ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
১১ নভেম্বর ১৯৪৭