এবারে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে হাঙ্গেরির সাহিত্যিক লাজলো ক্রাসনাহোরকাইকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাঙ্গেরি ভ্রমণের ঠিক একশ’ বছর পরে। যদিও ২০০২- এ আর একজন হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর নাম ইমরে কের্তেস।
রবীন্দ্রনাথের হাঙ্গেরি ভ্রমণ (১৯২৬) তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য অধ্যায়। এই সফর কেবলমাত্র সাহিত্যিক বা কূটনৈতিক যাত্রা ছিল না, বরং ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের মানবতাবাদী চেতনার এক গভীর সংলাপ ও যোগসূত্র। শান্তিনিকেতনের কবি যখন ইউরোপের অন্তরে, বিশেষত হাঙ্গেরির প্রগতিশীল চিন্তাধারার দেশে পা রাখেন, তখন তিনি এক বিশ্বমানবের প্রতিনিধিরূপে স্বাগত লাভ করেন। এই ভ্রমণ রবীন্দ্র-চিন্তায়, বিশেষত তাঁর মানবতাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবোধ ও সংস্কৃতিসম্প্রীতির ভাবনায় এক গভীর ছাপ ফেলে।
১৯২৬ সালের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইউরোপ সফরে বের হন। এর আগে তিনি ইংল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্স সফর করেছিলেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার, আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ ও পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক বিনিময়কে সুদৃঢ় করা। তখন হাঙ্গেরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এক বিপর্যস্ত সময় অতিক্রম করছিল। সমাজে নতুন করে মানবতাবাদী ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটছিল। এমন এক সময়েই হাঙ্গেরি সরকার রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানায় — একজন প্রাচ্যের কবি হিসেবে, যিনি শান্তি, মানবতা ও বিশ্বসম্প্রীতির বার্তা বহন করেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালের জুন মাসে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে পৌঁছান। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়। রেলস্টেশনে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত হন। সংবাদপত্রগুলো রবীন্দ্রনাথের আগমনকে “পূর্বের আলোর দূত” হিসেবে বর্ণনা করে। হাঙ্গেরির সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক—সবাই তাঁর দর্শন ও কবিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কাউন্টেস এরজেবেত ফোডোর, যিনি কবিকে নিজের প্রাসাদে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর সৌজন্যে রবীন্দ্রনাথকে বালাটন হ্রদের তীরে “বালাটনফুরেড” নামের এক শান্তশীতল গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এখানকার নীরব প্রকৃতি, হ্রদের নীল জলরাশি ও পাহাড়ের গা ঘেঁষে থাকা বনভূমি কবিকে মুগ্ধ করে তোলে।
বালাটনফুরেডে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ একাধিক কবিতা রচনা করেন, যেগুলির মধ্যে ‘ফুলের কুঁড়ি’, ‘দূরদেশ’, ‘পাহাড়ের উপরে’, এবং ‘বসন্ত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য তাঁর কাব্যচিন্তাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। এই সময় তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার বহিরঙ্গের ঝলকানি পেরিয়ে তার অন্তরের মানবিক সুর শুনতে পান।
হাঙ্গেরির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে তিনি যেন নিজের ভারতের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান—যে দেশও যুদ্ধ ও শোষণের ছায়া পেরিয়ে নতুন আশা খুঁজছে।
‘দূরদেশ’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—
“দূরদেশে প্রিয়তম, তোমারই ডাক শুনি নিশীথে,
হৃদয়ে তোমারি সুর বাজে নিঃসঙ্গ হ্রদের তীরে।”
এই কবিতার মর্মবাণী কেবল প্রেম নয়, বরং মানবতার দূরন্ত বন্ধনের প্রতীক।
রবীন্দ্রনাথের আগমন হাঙ্গেরির বুদ্ধিজীবী সমাজে এক আলোড়ন তোলে। তৎকালীন কবি, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদরা তাঁর চিন্তাধারাকে গভীরভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেন। হাঙ্গেরির বিশিষ্ট সাহিত্যিক জর্জি লুকাচ এবং সঙ্গীতকার বেলা বার্তোক রবীন্দ্রনাথের ভাবধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন। হাঙ্গেরির শিক্ষার্থীরা তাঁর বক্তৃতা শুনতে ভিড় জমায়, যেখানে তিনি বলেন—
“পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বিভেদ নয়, মিলনের পথই আমাদের ভবিষ্যৎ।”
এই বক্তব্য পরবর্তী সময়েও হাঙ্গেরির মানবতাবাদী চর্চায় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়ে গিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ হাঙ্গেরিতে প্রাপ্ত আতিথেয়তায় গভীরভাবে আপ্লুত হন। তিনি কাউন্টেস ফোডোরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটি কবিতা উৎসর্গ করেন, যেখানে লিখেছিলেন—
“তোমার দেশে পেয়েছি শান্তি, পেয়েছি হৃদয়ের আদর,
যেন জন্মের কোনো বন্ধন টানল এই দূর প্রান্তরে।”
হাঙ্গেরি সরকার তাঁকে হাঙ্গেরিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রদান করে। পাশাপাশি তাঁর রচনাগুলির অনুবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষত তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ হাঙ্গেরীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
হাঙ্গেরি সফরের অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ফিরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তিনি বলেন, ইউরোপের এই ছোট দেশটি যুদ্ধবিধ্বস্ত হলেও মানসিকভাবে কতটা দৃঢ় ও সংস্কৃতিঅন্তপ্রাণ। তাঁর ভাষায়—
“হাঙ্গেরি আমাকে শিখিয়েছে, সভ্যতার আসল চিহ্ন অর্থে নয়, মনুষ্যত্বে।”
এই অভিজ্ঞতা বিশ্বভারতীর আন্তর্জাতিক ভাবনায় নতুন গতি আনে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বভারতীতে ইউরোপীয় অধ্যয়ন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে হাঙ্গেরির প্রতিনিধিরা যোগ দেন।
হাঙ্গেরি সফরের সময় কবির শারীরিক অবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সফর ও মানসিক ক্লান্তির কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় বালাটনফুরেডের বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা গুইলা লানজার তাঁর চিকিৎসা করেন। কবি পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এই স্থানকে নিজের “দ্বিতীয় আশ্রয়” বলে উল্লেখ করেন। হাঙ্গেরিতে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের সামনে আজও রবীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত আছে, যা তাঁর প্রতি হাঙ্গেরির ভালোবাসার নিদর্শন।
আজও হাঙ্গেরির বালাটনফুরেডে ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর প্রমেনাদ (Rabindranath Tagore Promenade)’ নামে এক মনোরম পথ আছে, যা হ্রদের ধার ঘেঁষে চলে গেছে। সেখানে তাঁর মূর্তি ও স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছর স্থানীয় প্রশাসন ও ভারতীয় দূতাবাসের উদ্যোগে সেখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হয়। এই স্থানটি আজও দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে অমর হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাঙ্গেরি ভ্রমণ ছিল এক মানবতাবাদী সাধকের আত্মিক অভিযাত্রা। এই সফরে তিনি কেবল কবি হিসেবে নন, এক বিশ্বনাগরিক হিসেবে নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর চোখে হাঙ্গেরি হয়ে উঠেছিল শান্তি, সহমর্মিতা ও সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যে সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন, তা আজও সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার এই যে, ১৯২৬-এ হাঙ্গেরি সরকারের আমন্ত্রণে বুদাপেস্টে কবিতাপাঠের আসরে কবিগুরুর উপস্থিতির ৭৬ বছর পরে একজন, আর ১০০ বছর পরে একজন হাঙ্গেরীয় সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন। ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’ এরকম যে ঘটতে পারে কবি নিজেও মনে হয় মানসচক্ষে তা দেখতে পাননি।
রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় বলা যাক, —
“যে দেশ আমার ভাষা বোঝে না, তবু আমার হৃদয় বোঝে—সেই দেশেই আমি মানুষ হই।”