হুতোম প্যাঁচার নকশায় ‘দুর্গাপূজা’-শীর্ষক আখ্যানে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখেছেন, “এদিকে দেখতে দেখতে দিনমণি যেন সম্বৎসরের পুজোর আমোদের সঙ্গে অস্ত গেলেন। সন্ধ্যাবধূ বিচ্ছেদবসন পরিধান করে দেখা দিলেন। কর্মকর্ত্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করে, নীলকণ্ঠ শঙ্খচিল উড়িয়ে ‘দাদা গো’ ‘দিদি গো’ বাজনার সঙ্গে ঘট নিয়ে ঘরমুখো হলেন। বাড়ীতে পৌঁছে পূর্ণঘটকে প্রণাম করে শান্তিজল নিলেন, পরে কাঁচা হলুদ ও ঘটজল খেয়ে পরস্পরকে কোলাকুলি কল্লেন। অবশেষে কলাপাতে দুর্গানাম লিখে সিদ্ধি খেয়ে বিজয়ার উপসংহার হলো।”
নীলকণ্ঠ পাখি এখন আর ওড়ানো হয় না, আইনের বেড়াজালে এসব এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। ঘটজল কেউ আর খায় কিনা জানা নেই, তবে ‘দাদা গো দিদি গো’ বাজনা নিয়ে কোথাও কোনও ব্যাখ্যা পাইনি। এমনকি আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য় টীকাকার অরুণ সেন মহাশয়ও এই বাজনা বিষয়ে কোনও টীকাভাষ্য দেননি।
‘দাদা গো, দিদি গো’ বাজনাটি তাহলে কী? এটি কোন গানের সঙ্গে বাজতো? কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানাই বড়িশা সাবর্ণচৌধুরী বংশের উত্তরপুরুষ জ্যোতির্ময় রায়চৌধুরী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে এই বাজনা তাঁদের চারশ বছরের বেশি প্রাচীন দুর্গাপূজায় এখনও বাজে। মূল কথাটি হল, ‘দাদা গো দিদি গো, এমন সুন্দর প্রতিমাখানি কোথায় ফেলে এলে গো’। এই সুরেই বাজতে থাকে বিসর্জন সেরে ঘরে ফেরার বাজনা। এটি যে এই বনেদিবাড়ির পুজোর অনুষঙ্গ ছিল, সেটি বলাই বাহুল্য।
কলকাতার সব থেকে পুরনো দুর্গাপুজো বললেই যে পুজোর কথা মাথায় আসে সেটি হল সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো। ইতিহাস একটু ঘাঁটতেই হয়। ৯৭৫ সালে আদিশূর ছিলেন এই বাংলার শাসক। বাংলায় যাতে হিন্দুধর্ম স্বমহিমায় বজায় থাকে তার জন্য তিনি কনৌজ থেকে ৫ জন ব্রাহ্মণকে নিয়ে আসেন। এঁদের বলা হত যাজ্ঞিক পঞ্চমহর্ষি। আদিশূর যে পাঁচজন যাজ্ঞিক মহর্ষিকে কান্যকুব্জ থেকে বঙ্গে নিয়ে আসেন, তাঁরা রাঢ়ে আবাস গ্রহণ করেন। হরি মিশ্রের কুলগ্রন্থে এই পাঁচজন মহর্ষিকে কোথায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার বিস্তৃত বিবরণ আছে। কান্যকুব্জ থেকে আসা মহর্ষিদের যে পাঁচটি গ্রামে থাকতে দেওয়া হয়ে সেগুলি হল—পঞ্চকোটি, কঙ্কগ্রাম, কামকোটি, বটগ্রাম ও হরিকোটি গোপ ব্রহ্মপুরী। পঞ্চকোটির অধুনা নাম পঞ্চকোট বা মানভূমি। তেমন কামকোটির বর্তমান নাম হল বীরভূম কামকোটি। হরিকোটি গোপ ব্রহ্মপুরী এখন ‘হরিকুঠি গোপ-এ পরিণত হয়েছে মেদিনীপুরে। শাণ্ডিল্য গোত্রের ভট্টনারায়ণ ছিলেন পঞ্চমহর্ষির একজন। তিনি চতুষ্পাঠীতে ছাত্র পড়ানোর দায়িত্ব পান কালীঘাটে। কালীঘাটে তীর্থ করতে যেতে হয় অরণ্যপরিবেষ্টিত শ্বাপদসংকুল কলিকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুরের মধ্য দিয়ে।
যাজ্ঞিক পঞ্চমহর্ষির আর একজন ছিলেন বেদগর্ভ। এঁকেই এই সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আদিপুরুষ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
১৬১০ সালে এই পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু হয়। শুরু করেন বংশের আদিপুরুষ লক্ষীকান্ত মজুমদার (রায়চৌধুরী)। কলকাতা তখন অরণ্যময়, শ্বাপদসঙ্কুল জনপদ। কলকাতার এই প্রিমিটিভ সময়ে বড়িশার এই সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে শুরু হচ্ছে আদি দুর্গাপুজো। প্রথমে গোলপাতা এবং মাটি দিয়ে আটচালা মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তারপর কালক্রমে সেটি পাল্টে পাকা আটচালা করা হয়। আর এখন প্রতি বছর দেবী দুর্গা সেখানেই পূজিত হন।
আটচালার পাকা থামগুলো সাবর্ণপরিবারের বহু পুরনো পুজোর নানান ইতিহাসের সাক্ষী। যদিও এই পরিবারের একটি আদিপুজো ছিল, কিন্তু পরে ১০-১১ টি বাড়তি পুজো শুরু হয়। এখন বড়িশায় মোট ৬টি পুজো হয়। এই পুজোগুলো আটচালা বাড়ি, বড়বাড়ি, মেজ বাড়ি, মাঝের বাড়ি, বেনাকি বাড়ি, এবং কালীকিঙ্কর ভবন নামে প্রসিদ্ধ। এছাড়াও এই বাড়ির আরও দুটি পুজো হয় নিমতা এবং বিরাটি বাড়িতে।
সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়িতে তিন মতে পুজো হয় দেবী দুর্গার। পঞ্চমী থেকে সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ পর্যন্ত বৈষ্ণব মতে পুজো। শাস্ত্র অনুযায়ী, সপ্তমীতে এক দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি আসেন মহাদেব। তাই ওই দিন পুজোর রীতি বদলে হয় শৈব মতে। আর সন্ধিপুজোর বলি হওয়ার পর থেকে তন্ত্র মতে পুজো হয়। পুজোর এই বিশেষ রীতির নাম ত্রিধারা। সময় বদলালেও, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এখনও একইরকম রয়েছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গা পুজো।
বহু মানুষের সমাগম হয় এই বাড়িতে। ঠাকুর দেখার সঙ্গে ইতিহাসকে চাক্ষুষ করতে আসেন অনেকেই। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে আজও সনাতনী নিয়ম রীতি মেনেই পুজো হয়ে থাকে। তবে বিসর্জনের সময় দাদা গো, দিদি গো সুরে বাজনা আর বাজে কিনা আমার জানা নেই। কালের বাদ্যধ্বনি গঙ্গার বিষণ্ণ ঘাটগুলিতে যেন ঘুরপাক খেতে থাকে।