| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আমি ভালো নেই অশোক — মনিশংকর মুখোপাধ্যায় : অশোক মজুমদার

Reporter
অশোক মজুমদার / ৩২৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৩

সাহিত্যিক মনিশংকর মুখোপাধ্যায়-এর জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

মনিশংকর মুখোপাধ্যায়….এই মহান সাহিত্যিক শংকর নামে আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের একজন স্তম্ভ যাঁকে আজ বাঙালী প্রায় ভুলতে বসেছে। নবপ্রজন্ম নাম শুনেছে কি-না সন্দেহ!!

আমি অনেকদিন ধরেই মনে মনে ভেবেছি মনিশংকরদাকে নিয়ে কিছু কথা বলবো, তবে আমার সীমিত জ্ঞানে ওনাকে ব্যাখ্যা করার সাহস করে উঠতে পারছিলাম না। গতকাল রাতে মনিদাকে ফোন করে কুশল জিজ্ঞাসা করতে যখন বললেন, “আমি ভালো নেই অশোক।”

তারপর থেকেই বারবার শুধু অতীতের স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে একটি মোটা চেহারার মজার মানুষের কথা যাঁর এক একটি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের রত্ন সমান। কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার সংস্কৃতিবান বাঙালী আজ তাঁর কেউ খোঁজই রাখেনা।

মণিদা… যাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় আনন্দবাজারে কাজ করার সূত্রে। সাদা বাড়ির কালো গ্রিলের পেছনেই ভিক্টোরিয়া হাউসে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই এর হেড অফিস (CESC)। এখানেই মণিদা চাকরি করতেন। চাকরী কথাটা না বলে বলা ভালো গোয়েঙ্কা কোম্পানি ও পরিবারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষ এই মনিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে সাহিত্যিক শংকর।

কর্পোরেট জগতের মানুষ হয়েও মণিদা অত্যন্ত ভদ্র রুচিবান মানুষ। মণিদার সাহিত্যের আলোচনা করার মত ধৃষ্টতা, সাহস বা পড়াশোনা কোনোটাই আমার নেই। কিন্তু এটা হলফ করে বলতেই পারি আমাদের মণিদা আড্ডাবাজ, রসিক, পরোপকারী, ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন। বহুবার মণিদার অফিসে গিয়ে কত গল্প করেছি। পাঁচ মিনিট কথা বললেই কতকিছু শিখতে পারতাম।

আমি যতটুকু মণিদার সান্নিধ্য পেয়েছি তাতে কিছু ধারনা আমার মণিদাকে নিয়ে হয়েছে। যদিও এটা ভুল হতে পারে। তাই লেখার শুরুতেই মণিদা তো বটেই পাঠকদের কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যা আমার একান্তই ব্যাক্তিগত ধারণা তার থেকেই কিছু কথা আপনাদের শেয়ার করবো….আজকের ছবিওয়ালার গল্পে।

ভিক্টোরিয়া হাউস সিইএসসির হেড অফিস, সঞ্জীব গোয়েঙ্কা-সহ বহু অফিসাররা এখানে বসেন। ধর্মতলা থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ের শুরুতেই বাঁদিকে স্যার আশুতোষ মুখার্জির মূর্তির পেছনেই তিনটি পুরোনো লাইট স্ট্যান্ডের এই ঐতিহ্যপূর্ণ বাড়ি।

সাংবাদিক চিত্রসংবাদিকদের কাছে এই ভিক্টোরিয়া হাউস খুব পরিচিত। কারণ ইলেকট্রিক বিল এর দাম বাড়ানো নিয়ে এই বাড়ির সামনে সব রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময় এখানে বিক্ষোভ করেছেন। ভাঙচুর অবধি করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ করেছেন বোধহয় এসইউসিআই দলের কর্মীরা। অনেকবার এই বিক্ষোভের চেহারা এমন হত যে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ টিয়ার গ্যাস, গুলিও চালিয়েছে।

এসপ্লানেড ইস্ট, রানী রাসমণি রোড, মেট্রোর উল্টোদিক, ভিক্টোরিয়া হাউস আশি নব্বইয়ের দশকে এই এলাকায় ঘুরলেই আমাদের মত সার্ভাইভ করা ফটোগ্রাফারদের কিছু না কিছু সাবজেক্ট পেয়ে যেতাম। সেই বিক্ষোভ লাঠি গুলি এখন গ্রহণের মতো হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল গুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়া, আর টিভিতে মুখে রঙ মেখে হাত নেড়ে শুধু বাতেলা দেয়। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে বোকা বাক্সের ক্ষমতা এখন অপরিসীম। যাক এসব কথা…

ভিক্টোরিয়া হাউসের টপফ্লোরেই ছিলো মণিশংকরদার অফিস। সেই ফ্লোরেই সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বসেন। আমার আনন্দবাজারের কলকাতার পাতার জন্য সাহিত্যিক মনিশংকরদার ছবি তুলবো ভাবলাম। ওনার নম্বর নিয়েছিলাম বিশিষ্ট সাংবাদিক রাজনৈতিক প্রতিবেদক আমার বন্ধু দেবাশীষ ভট্টাচার্যের কাছ থেকে। সাংবাদিক মহলে ভালোবেসে তাকে অনেকেই মামা বলে। এমন কি আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও দেবাশীষদা বলে ডাকলেও বহু সময় মামাও বলেন।

দেবাশীষ দীর্ঘ সাংবাদিকতায় বহু রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী। ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এর ছাত্র। আড্ডা মারলে সময় সেখানেই থমকে দাঁড়ায়। যে কোনো বিষয়ের ওপর একটা আস্ত ডিকশনারি। এই দেবাশীষের সাথে মণিদার সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর আমি জানতাম। নম্বরটা পেয়ে একদিন সরাসরি মণিদার মোবাইলে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করি।

মণিদা বললেন, “তোমার যেদিন ইচ্ছা লাঞ্চের পর একটা ফোন করে চলে এসো। আমি চাকরী করা মানুষ। তোমাদের হাউসের লোকেদের মতো আমি ভিআইপি না।”

প্রথম দিনের কথাতেই আমি সত্যি খুব আপ্লুত হয়ে যাই। কিন্তু একটু কিরকম লাগেও… যাইহোক একদিন ফোন করে ভিক্টোরিয়া হাউসে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ গল্পের ভিতরে মণিদা বললেন, “অশোক… তুমি ছবি তুলবে না?”

আমি একটি অ্যালবাম দেখিয়ে বললাম, “মণিদা আপনি বসে আছেন অফিসের কাজ করছেন এগুলো আমার ছবির সাবজেক্ট নয়। এই দেখুন আমি কলকাতার পাতার জন্য কিরকম ছবি তুলি।”

সেই সময়কার নানা গুণী মানুষ ও সেলিব্রেটিদের কলকাতার পাতায় যে সব ছবি বেরিয়েছে তার একটা অ্যালবাম কাছে রাখতাম। এটা আমার অনেক কাজে লাগতো। ধরুন পণ্ডিত রবিশঙ্কর বৌদি অমলাশংকরকে জড়িয়ে বিছানায় বসে আছেন বা বিসমিল্লাহ লুঙ্গি ছেঁড়া গেঞ্জি পরে গান গাইছেন কিংবা আলী আকবর সেলুনে চুল কাটছেন….এরকম বহু ছবি দেখলে গুণী মানুষরা বুঝতে পারতো আমি ঠিক কি ছবি তুলতে চাই।

“মণিদা আপনার সঙ্গে একটু খোলা মেলা কথা বললেই আমি বুঝে যাবো কি ছবি তুলবো। আমার পড়াশোনা নামমাত্র। আপনার সাহিত্য নিয়েও খুব কিছু জানি না। এটা জানি আপনি খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ঈশ্বর নিয়ে থাকেন। রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সম্পর্কে আপনার গভীর রিসার্চ আছে। অনেক বই আছে। আমি তো আবার উল্টো পুরাণ। আমার ঈশ্বর মানুষ। আপনাদের মত পুজো আর্চায় ভক্তি নেই আমার। কিন্তু যেসব মানুষ বিশ্বাস করে যা কিছু করেন। আমি শুধু দেখি। ওই যে কথাটা আছে না… বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমি শুনেছি আপনার সাথে বেলুড় মঠের খুব যোগাযোগ আমি আপনার সাথে মহারাজদের কাছে যেতে চাই। ওই সব মহারাজদের সাথে কথা বললেই আমি অনেক ছবির সাবজেক্ট পেয়ে যাবো। প্লীজ মণিদা আমায় এই সুযোগটা করে দিন।”

ছবি : অশোক মজুমদার

সবটুকু শুনে মণিদা বললেন, “তবে তো অশোক কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তুমি তো জানোই দেখছি, আমি বিবেকানন্দ ও ঠাকুর রামকৃষ্ণের উপরে রিসার্চ করে বই লিখছি। আরো চেষ্টা করছি। এই ব্যাপারে বেলুড় মঠের মহারাজরা আমায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। একটা বই প্রায় শেষ। আমি কিছুদিন পর প্রেসিডেন্ট মহারাজকে সেই বই দিতে যাব। আমি সাধারণত এসব ছবি তুলতে চাই না কিন্তু তুমি যেভাবে লেগে পরে আছো আমি ঠিক সময় মত তোমায় জানাবো। সেদিন তুমি এসো….”

এরপরই আমি মণিদার জন্যই বেলুড় মঠের বহু এক্সক্লুসিভ ছবি তোলার সুযোগ পাই। মণিদার ভিতরে যে রত্ন রয়েছে তা অনুভব করি। যদিও তা ব্যাখ্যা করার ভাষা আমার জানা নেই। বেলুড়ের প্রেসিডেন্ট মহারাজ নিজের জন্মদিনে কেক কাটছেন এই ছবি মণিদার জন্যই আমি তুলতে পেরেছি।

মণিদার সঙ্গে যখন আড্ডা মেরে, গল্প করে নানান কথায় একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলাম, কেন জানিনা আমার মনের ভেতর মণিদার সাহিত্য নিয়ে আর মেনস্ট্রিমে যেসব সাহিত্যিকরা আছে তাদের সঙ্গে একটা তুলনামূলক আলোচনা আমার মনের মধ্যে এসে যেতো। সুনীলদা, শীর্ষেন্দুদা, শ্যামলদা-সহ বহু লেখকের সঙ্গে মণিদার সাহিত্য এগুলো নিয়ে নানান প্রশ্ন আমার মনে কিলবিল করতো।

আমি সব কথা এখানে লিখতে পারবো না। তাতে মণিদা দুঃখ পাবে। অযথা একটা বিতর্ক হবে। বিশ্বাস ভঙ্গ হবে। সবাই শ্রেষ্ঠ। পেলে না মারাদোনা কে বিখ্যাত ফুটবলার এই আলোচনা আমার কাছে অনর্থক।

কিন্তু এটা বলতে দ্বিধা নেই যে শংকরের সাহিত্যকে আমরা বাঙালীরা কি ঠিক মূল্যায়ন করেছি? আমি নিজেই স্বীকার করছি চৌরঙ্গী, জন অরণ্য, সীমাবদ্ধের মত উপন্যাস অবলম্বনে বিখ্যাত সিনেমাগুলি দেখার পরই ওনার সাহিত্যের প্রতি আমার আকর্ষন আরও তীব্র হয়। সত্যি বলতে শংকরের যে কটা উপন্যাস পড়েছি তার প্রত্যেকটার সূক্ষ মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আমায় ভাবিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় কেমন নিঃস্ব, রিক্ত করে দিয়েছে মনকে। যার রেশ বহুদিন আমাকে আবিষ্ট রাখতো। ভাবলে এখনও বুঁদ হয়ে যাই।

আজ আমার নিজেরই লজ্জা লাগে যে, এই কলকাতা শহরেই মণিশংকরদা বেঁচে আছেন অথচ যাঁর কোন খোঁজ আমরা কেউ রাখিনা। শুধু তাই নয় তাঁর সাহিত্য নিয়েও কোনো আলোচনা দেখিনা কোথাও। মণিদাও কোথাও যায় না। ভাবলে অবাক লাগে শংকরের মত সাহিত্যিক নব্বইয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে এই ২০২০ সালে সাহিত্য একাডেমি পেয়েছেন। আসলে যাঁকে মূল্যায়নই করতে পারিনি তাঁকে পুরস্কারে সম্মানিত করার ভাবনা আসার কথাও নয়।

কলেজের এক বন্ধুকে একবার বলেছিলাম দেশ পত্রিকায় তিন বছরে একটা কবিতা বেরোলেই সেই ব্যক্তি দেখি কবি হয়ে যায়। কিন্তু দেশে একটা কবিতাও প্রকাশিত না হওয়া ব্যক্তিও কিন্তু অনেক মানুষের কাছে কবি। আমি এরকম অনেক কবি সাহিত্যিক কে চিনি জানি বুঝিও।

দেশ পত্রিকার (সাদা বাড়ির কালো গ্রিলে) যাঁরা নম্বর ওয়ান সাহিত্যিক ছিলেন তাঁদের সঙ্গে মনিদার কোথাও একটা দূরত্ব ছিল। এটা আমার ব্যাক্তিগত মত। আনন্দবাজার-সহ বহু বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক সম্মেলনের সঙ্গে মণিদার আড্ডা দেখা গল্প সভা এগুলো কমই দেখেছি। এই দূরত্ব শুধুমাত্র জীবনযাপন তো বটেই লেখালিখি বন্ধুত্ব সব জায়গাতেই দূর থেকে দেখেছিলাম।

মণিদার ভেতরে একটা হয়তো অভিমান ছিলো। তবে এটা আমার ক্ষমতার বাইরে যে, আপনাদের ঠিক বোঝাতে পারবোনা আমি ঠিক কি বলতে চাইছি। উনি অসামান্য একটা ব্যক্তিত্বের আড়ালে নিজেকে ভীষন গুটিয়ে রাখতেন। কর্পোরেট জগতের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিলো বলেই কি ওই আড়ালটা এত পরিশীলিত? কি জানি… হয়তো তাই!!

আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় ধরুন বাংলা সাহিত্যে মণিশংকরদা-সহ অনেক সাহিত্যিক এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে ভারতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন। এমন কি ছবিও তুলছেন। কিন্তু ধরুন কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলছেন না। মুখে একটু হাসি দিয়েই শেষ।

মাফ করবেন আমি এখানে কাউকে বড়ো ছোটো করছিনা। বাংলা সাহিত্যে সেই পড়াশোনা আমার নেই। আমার অনেক কথাই লিখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু এটা ঠিক হবে না। মণিশংকরদার বহু কথাই আমি বলতে পারবো না। তবে বাংলা সাহিত্য নিয়ে যারা পড়াশোনা করেন ভাবেন তারা আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা জানি না কিন্তু আমি যতটুকু মণিদার লেখা থেকে বুঝেছি তাতে এটা বলতে বাধা নেই যে মণিদার লেখা সেইসব পাঠকদের মনেও গভীরভাবে ছাপ ফেলে আছে বলেই আমার বিশ্বাস।

মণিশংকরদা আরপিজি গ্রুপে উচ্চপদে চাকরিতে ঢুকেছিলেন যখন রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা বেঁচে ছিলেন। কেন জানিনা আমার মনে হয় মণিদা এই কর্পোরেট জগতের চাকরিটা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। হয়তো কোনো কারণে। কিন্তু ওনার মনের ভেতরে সাহিত্য বটগাছের শিকড়ের মতো বিরাজ করত।

রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা পরবর্তীতে তার ছেলে সঞ্জীব গোয়েঙ্কা দু-জনেই মণিশংকরদাকে প্রচন্ড বিশ্বাস করতেন এবং কর্পোরেট-এ বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মণিদার পরামর্শ নিতেন। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-সহ অনেক মন্ত্রীর সঙ্গেই ছবি তোলার অ্যাসাইনমেন্টে আমি মণিদাকে পেয়েছিলাম। খুব অবাক হতাম কর্পোরেটের মত রুক্ষ শুষ্ক মরুভূমির মাঝে মণিদা কি সযত্নে সাহিত্যিক অনুভূতির গভীরতা আগলে রাখতে পারতেন। এমন দুর্লভ অনুভূতির সাহিত্যিক কজন পৃথিবীতে আছে আমি জানিনা।

বেলুড় মঠের সঙ্গে আমার গভীরভাবে যোগাযোগ মণিদার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল। তিনজন প্রেসিডেন্ট মহারাজ গম্ভীরানন্দ, স্বামী রঙ্গনাথানন্দ, স্বামী আত্মস্থানন্দজি এই সব প্রেসিডেন্ট মহারাজকে আমি ফোন করে কথা বলতে পারতাম, এটা মনিদার জন্যই। এবার ভাবুন তো লক্ষ লক্ষ কেন কোটি কোটি মানুষের ভগবানের সাথে আমি ফোনে কথা বলছি।

বিবেকানন্দ এবং ঠাকুরের উপর কোন বই প্রকাশিত হলে মনিদা আমায় জানাতো। আমি সেই ছবি তুলে কলকাতার পাতায় প্রকাশ করতাম। দেখেছিলাম কি অগাধ ভক্তিভরে মণিদা ওই মোটা শরীর নিয়েও প্রেসিডেন্ট মহারাজের পায়ের কাছে শুয়ে প্রণাম করতেন। যদিও এই ধরনের ছবি আমি কখনো দিইনি। প্রেসিডেন্ট মহারাজের জন্মদিনে কেক কাটছেন এ ছবিও আমি তুলতে পেরেছি এই সবই সম্ভব হয়েছে মণিদার জন্য।

পোস্টের ছবিটিও বেলুড় মঠে তোলা। এইদিন মণিদা একশো পঁচিশ বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্তের লেখা উপন্যাস “সুলোচনা” যা অজানার অন্ধকার থেকে তুলে এনে বেলুড় মঠ ও মিশনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গহনানন্দের হাতে জ্ঞাপন করছেন।

সাহিত্যিক শংকরের লেখা বিবেকানন্দ, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা মায়ের সম্পর্কে যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করেন এককথায় রিসার্চ ওয়ার্কের যেসব বই তাঁরা পড়তে চান সেগুলো বছরের পর বছর আবার পাবলিশড করতে হচ্ছে। পাঠকরা বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ বহু কিছু অজানা, অচেনা কথা মণিদার বইয়ের মাধ্যমে জানতে পারছেন। মণিদার প্রাপ্তি এদের মধ্যে জারিত হোক এটাই প্রার্থনা

বাংলা সাহিত্যের সোনার খনি থেকে মণিশংকরদার মতো রত্নকে আমরা তুলে আনতে পরলাম না এর দায়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে। এ বড়ো দুর্ভাগ্যের। আমি সামান্য ছবিওয়ালা… আমার চোখ আর মন দিয়ে যতটুকু সাহিত্যিক শংকরকে বুঝেছি তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়। আগামী প্রজন্মের কাছে শুধু অনুরোধ যে ওনার লেখনী সত্তাটুকুর অন্তত সন্মান করুন। ওনার বই পড়ুন। তাতে অন্তত ওনার লেখক মননের সঙ্গে পরিচয় হবে। মণিদার মত সাহিত্যিক বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে।

মণিদা আপনি ভালো নেই এটা শুনতে চাই না। আপনি একটা বই লেখার কাজ করছেন। জানি শরীর আপনাকে বিরক্ত করছে। এর ভিতরেই আপনি আমাদের অমূল্য সেই বই শেষ করবেন। আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলাম। আপনি ভালো থাকুন আরও অনেক অজানা তথ্য ভরা বই আমাদের উপহার দিন।

মণিদা আপনি আমার প্রণাম নেবেন। আবেগের জায়গা থেকে অনেক কথা বলে ফেললাম বলে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। আপনি ভালো থাকুন।

১৮.১১.২০২৩

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “আমি ভালো নেই অশোক — মনিশংকর মুখোপাধ্যায় : অশোক মজুমদার”

  1. পার্থ রায় says:

    প্রিয় সাহিত্যিক এবং ওনার সাথে প্রতিবেদকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে লেখাটা খুব ভাল লাগল ????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev