২০১০ সালে ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুগো শ্যাভেজ (Hugo Chavez) এক নির্বাচনী বক্তৃতায় তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “I am not an individual, I am the people”। কথাটা যে সর্বৈব সত্য, এমনটা নিশ্চয় নয়। শাশ্বত বলেও গণ্য করার নয়। আবার কথাটা যে একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার এমনটাও কিন্তু নয়। হুগো শ্যাভেজ যে অর্থে প্রয়োগ করেছিলেন তার থেকে বৃহত্তর পরিধিতে যদি বাক্যটিকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে নিশ্চিতভাবে কথাটার ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হল ‘গণ’-র আড়ালে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে যথাসম্ভব নিরাপদ জীবনকে আঁকড়ে ধরে চলা। অর্থাৎ, ব্যক্তি সত্ত্বার ব্যতিক্রমী বিচক্ষণতাকে ছাপিয়ে গোষ্ঠী সত্ত্বার চিন্তাধারার গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে বিলীন করে জীবন পথকে যথাসম্ভব নিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ করা। কখনো মানুষ তা করে থাকে সচেতনভাবে, কখনো বা অবচেতনেই। কিন্তু জীবনের স্থিতিশীলতাকে টিকিয়ে রাখার অমোঘ তাগিদে এটাই আপামর আমজনতার সহজাত প্রবৃত্তি। এই জগৎসংসারে ব্যতিক্রমী কিছু মানুষ নিশ্চয়ই রয়েছেন। তবে সিংহভাগ জনতাই কিন্তু জীবনের চুলচেরা হিসেবকে যতটা না মিলিয়ে দেখেন যুক্তিসঙ্গত বিচারবুদ্ধি প্রযুক্ত করে, তার থেকে ঢের বেশি গা ভাসিয়ে দেন গোষ্ঠী ভাবনার ওপর অপার বিশ্বাস রেখে। অর্থাৎ, সমাজের সংখ্যাগুরু মানুষ যে সকল ক্রিয়াকলাপের ওপর ভরসা রেখে অনেকটাই সুখে আছেন বলে বেশিরভাগ মানুষের বিশ্বাস, আরও একটু নিরাপদ জীবনের হাতছানিতে দল বেঁধে আমজনতা সেই সকল ক্রিয়াকলাপের প্রতিই অনুরাগ প্রবণ হয়ে পড়েন। এর পেছনে গুঢ় উদ্দেশ্য একটাই। স্থিতিশীল নিরাপদ জীবনযাপনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ঠিক যে কারণে প্রতিবাদী মানুষদের থেকে তুষ্ট করে চলা মানুষদেরই ভিড়েই সমাজটা চিরকাল থিকথিক।
বিশিষ্ট ভারতীয় মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ অমিত আব্রাহাম বলেছিলেন, “The two great movers of the human mind are the desire of good and the fear of evil”। মানব মননের এক প্রান্তে যেমন রয়েছে জীবনের থেকে ভালো কিছু প্রাপ্তির উদগ্র বাসনা, আবার অন্য প্রান্ত জুড়ে রয়েছে অশুভ জীবন পরিণতির গভীর আশঙ্কা। এই দুই প্রান্তকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার বাসনায় মানুষ প্রবৃত্তিজাত হয়ে এমন কিছু বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে, যা যুক্তিগত উপলব্ধিকে ছাপিয়ে গোষ্ঠীগত ভাবনার ওপর মানুষকে প্রবলভাবে নির্ভরশীল করে তোলে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষই সাধারণত তুষ্ট করে চলতে চায় দুই ধরনের প্রান্তিক বিশ্বাসকে। প্রথমটা হল, মানুষ যাকে বা যাদের থেকে উপকৃত হতে পারে বলে বিশ্বাস করে … যেমন ঈশ্বর, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, অফিসের বস ইত্যাদি। দ্বিতীয়টা হল, মানুষ যাকে বা যাদের থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্বাস করে … যেমন সাপ থেকে শুরু করে ঈশ্বর, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, অফিসের বস ইত্যাদি পর্যন্ত। মোটামুটি ভাবে দেখা যায় যে, মানুষ যাকে বা যাদের থেকে উপকৃত হতে পারে বলে বিশ্বাস করে, তাঁদের থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও বিশ্বাস করে। যেমন ঈশ্বর, রাজনৈতিক নেতা নেত্রী, অফিসের বস ইত্যাদি। সুতরাং, এই সকল সম্প্রদায়কে তুষ্ট করে চলা বেশিরভাগ মানুষেরই সহজাত প্রবৃত্তি। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যাদের থেকে মানুষ উপকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্বাস করে, তাদেরকে তুষ্ট করে চলা কেনই বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হতে যাবে? এই জগৎসংসারের সিংহভাগ মানুষই তাঁদের নিজস্ব বৃত্তের কেন্দ্রকে যে পরিসরে ঘুরে চলেন, সেই বৃত্তের বাইরের পৃথিবীটার পরিসরকেও অনুরূপ ভেবে ফেলেন। অর্থাৎ, বেশিরভাগ মানুষই তুষ্টিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তা সে আত্মতুষ্টি হোক, বা অপরের থেকে তুষ্টির কামনায় হোক। যেহেতু মানুষ নিজে তুষ্টিতে আনন্দ উপভোগ করে থাকেন, সেহেতু তাঁদের আরাধ্য দেবতা বা অনুসৃত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাও একইরকম তুষ্টিতে আনন্দিত হয়ে কৃপা বর্ষণ করবেন এমনটাই আম মানুষ ভেবে বসেন।
যেমন ধরা যাক, বেশিরভাগ মানুষই কোন পুরস্কার, উপহার বা উৎকোচ পেলে মনে মনে খুশি হন এবং প্রবৃত্তিজাত কারণেই সেই পুরস্কার দাতা বা উপহার-উৎকোচ দাতার প্রতি গ্রহীতা খানিকটা কৃতজ্ঞ হয়ে পড়েন। এই মনোভাবের উদ্দীপনা থেকেই কিন্তু মানুষ কৃপা লাভের আশায় সচেতন মনে সোনাদানা, শাড়ি, পশুবলী ইত্যাদি সহ উপঢৌকন বা উৎকোচ সহকারে ঈশ্বরকেও তুষ্ট করার বাসনায় মেতে ওঠে। যে মানুষ সচেতনভাবে ঈশ্বরের কাছে এত দানসামগ্রী অকাতরে নিবেদন করতে পারেন, সেই মানুষই কিন্তু অবচেতনে বিলক্ষণ জানেন যে এই সকল পার্থিব উৎকোচ ও উপঢৌকনে আসলে ঈশ্বরের আগ্রহ বা প্রয়োজন কোনটাই নেই। তাই ঈশ্বর উপাসনাকে যতই অন্তরাত্মার নিবেদন হিসেবে কেতাবি আলোচনায় স্থান দেওয়া হোক না কেন, হয়তো এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি মন্দির, মসজিদ, গির্জায় না গিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে করে নিতে পারেন।
অথচ এই সকল দানসামগ্রীতে যে মানুষগুলোর জীবন বাঁচতে পারে, সেই ক্লিষ্ট মানুষগুলোর জন্য জীবনভর প্রায় কিছুই করা হয়ে ওঠে না। কারণ দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হতভাগ্য মানুষগুলো ঈশ্বরের প্রতি কার্পণ্যহীন ভাবে দান করা মানুষগুলোর জীবনে উপকার বা ক্ষতি কোনটাই করতে পারবে না বলেই ভেবে নেওয়া হয়। যেহেতু উপকার বা ক্ষতি কোনটার আশঙ্কাই থাকছে না, তাই মানুষও তুষ্ট করার পথে হাঁটতে চায় না। ঠিক একই কারণে ঈশ্বরের মাথায় ঘটি ঘটি জল এবং দুধ ঢালার এতটুকুও খামতি যাঁদের থাকে না, সেই মানুষগুলোই কিন্তু রাস্তার পাশে ধুঁকতে থাকা শীর্ণ গাছের গোঁড়াতে একবিন্দু জল ঢালতে বা পূজিত ঈশ্বরের উপাসনা গৃহের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রুগ্ন, অপুষ্ট শিশুদের মুখে একবিন্দু দুধ ঢালতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করেন না।
মানব সৃষ্টির সূচনাপর্ব থেকেই মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাঁচতে শিখেছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বয়ে চলা অভ্যাসের কারণে মানুষ শুধুমাত্র পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপরই আস্থাশীল হতে শেখেনি, গোষ্ঠীগত বিশ্বাসের ওপরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তিই হল জীবনকে ঘিরে অপেক্ষাকৃত দৃঢ় নিরাপত্তা বলয়ের অন্বেষণ। যেহেতু অন্য কোন মানুষ কোন একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে তাঁর জীবনকে বলিষ্ঠ নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে ফেলতে পেরেছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে ফেলেছে, সেহেতু সেই বিশ্বাসকে অন্ধভাবে অনুকরণ করলে হয়তো বা নিজের জীবনকেও অধিকতর নিরাপদে রাখা যাবে, এই বিশ্বাসের প্রতি অকুণ্ঠ আস্থাই আম মানুষের সুখ অন্বেষণের প্রধানতম ভরসা হয়ে ওঠে। তাই জীবনে প্রাপ্তিলাভের বাসনায় চেতনা সৃষ্ট যুক্তিকে ডিঙিয়ে বিশ্বাসের আধিপত্যই আম মানুষকে অধিকতর প্রভাবিত করে ফেলে। মানুষ যে তাঁর নিজস্ব স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে, এটাই কিন্তু স্বাভাবিক এবং এটাই প্রায় সকল মানুষেরই সহজাত প্রবৃত্তি। ঠিক সেই কারণেই স্থিতিশীল ও নিরাপদ জীবনযাপনের তাগিদ যুক্তি নির্ভর চিন্তাধারাকে ছাপিয়ে গোষ্ঠী বিশ্বাসের ওপর মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে। সমাজের সিংহভাগ মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তির কারণ হুগো শ্যাভেজের “I am not an individual, I am the people” এই শব্ধবন্ধটির আক্ষরিক অর্থের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। মানুষ, বিশেষত ভারতবর্ষের মানুষ, যদি সমবেত বিশ্বাসের থেকে যুক্তি নির্ভর ব্যক্তি চেতনার ওপর অধিকতর ভরসা রাখতে পারতো, তাহলে হয়তো মানুষের মন থেকে অযৌক্তিক বিশ্বাসগুলোকে উৎপাটিত করার জন্য একবিংশ শতাব্দীতেও বিজ্ঞানের লড়াইটা এতটা দুরূহ হয়ে দাঁড়াত না।
লেখক : ড. দেবর্ষি ভট্টাচার্য, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বানিজ্য বিভাগ, বঙ্গবাসী সান্ধ্য কলেজ, কলকাতা, এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি (আইআইএএস), সিমলা, হিমাচল প্রদেশ, ইমেইল : ratulbhat07@gmail.com