| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আমি চাই না জন্মদিনে আমার কেউ ছবি তুলুক… মান্না দে : ছবি ও লেখা অশোক মজুমদার

Reporter
অশোক মজুমদার / ১১৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২২

২০১২ এক দুপুরে শান্তনু বসু (জয়েন্ট সেক্রেটারি সিএমও) আমায় ফোন করে বললেন, “অশোকদা একটু রাইটার্স আসতে পারবে ম্যাডাম (মুখ্যমন্ত্রী) তোমায় খোঁজ করছেন। লোক পাঠিয়ে দেখলাম প্রেস কর্নারে তুমি নেই…”

আমি তখন আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করি। ফোনটা পেয়ে হেঁটেই রাইটার্সে পৌঁছে যাই।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ঢুকতেই দিদি বললো, “অশোক আমার কিছু ছবি আছে, তোর সময় মত একটু কপি করে দিস?”

ভাগ্যিস ক্যামেরাটা ছিলো। সত্যি বলতে কি আমি ভেবেছিলাম বিশেষ কেউ দেখা করতে আসছেন।

বললাম, “এক্ষুনি করে দিচ্ছি।”

“যা পাশের ঘরে যা, সব গোছানো আছে।”

ছবিগুলো কপি করে যাবার সময় দিদিকে বললাম, “দিদি আমি কাল থাকছি না। একটু ব্যঙ্গালোর যাবো….”

এমনি বললাম। কোন কারণ ছিল না।

দিদি বললো, “কেন? ওখানে কি হয়েছে? কি জন্য যাচ্ছিস?”

বললাম, “না না ঘটনা কিছু ঘটেনি। আসলে কাল মান্না দে-র জন্মদিন। আমি নিজে থেকেই যাব। শুনেছি ওনার শরীর খুব খারাপ। ভাবছি কিছু ছবি তুলে রাখি।”

দিদি শুনেই বলল, “বাআআ এ তো খুব ভালো কাজ। আমরাও ওনাকে বঙ্গবিভুষণ দিতে চাই। যাক তুই যখন যাচ্ছিস আমার হয়ে ওনাকে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে আমার প্রণাম জানাস।”…বলেই ব্যাগ থেকে গোল করে পাকানো কিছু টাকা আমার হাতে দিয়ে দিলেন।

দিদির টাকা দেবার পদ্ধতিটা অদ্ভুত। বেশ লাগে। আমরা যারা কাছাকাছি থাকি তারাই জানি। টাকাগুলো মোড়ানো থাকে একমাত্র দিদিই জানেন কোন মোরানোতে কত টাকা আছে। এতো মন্দিরে যায় সেখানেও নিজের হাতে দিলেও বা অধিকাংশ সময় ওনার পিএসও দিদির নির্দেশ মতো ওই ভাবেই টাকা দেন।

“শোন এই টাকায় একটা ভালো ফুলের বোকে মান্নাদার হাতে দিবি। আর বলবি আমরা ওনাকে কলকাতায় এনে সম্বর্ধনা দিতে চাই। বলবি গানমেলায় মান্না দেকে বঙ্গবিভূষণও দেবো। মান্না দা শারীরিক অসুস্থর জন্য না আসতে পারলে আমি নিজে গিয়ে ওনাকে পুরস্কার তুলে দিয়ে আসবো।”…দিদির নির্দেশ।

কথার ভিতরেই টাকাটা গুনে দেখি প্রায় চার হাজার টাকা রয়েছে।

আমি বললাম, “এত টাকা কি হবে?”

দিদি বলল, “রাখ।”

বললাম, “আমি কাল পৌঁছে চেষ্টা করবো মান্নাদার সাথে তোমার কথা বলিয়ে দিতে।”

শুনে দিদি বলল, “তাহলে তো খুব ভালো হয়। আমি যদি মিটিং বা কোনো কাজে ব্যাস্ত থাকি তাহলে তুই শান্তনুকে ফোন করবি। ও ঠিক আমায় খুঁজে নেবে।”

আমি শান্তনু বসুকে দিদি রেলমন্ত্রী হওয়া থেকে চিনি। আমার দেখা এই একমাত্র আইএএস যে বুক খোলা টিশার্ট পরে থাকে। খুব নম্র স্বভাব। এবং দক্ষ অফিসার। দিদি খুবই পছন্দ করেন। এই মুহূর্তে আইএনসিএ-সহ পিডিসিএল-এর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি।

দিদি বললো, “সাবধানে যাস। পারলে রাতে ফোন করে জানাস কি হলো।”

প্রণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

আবার হেঁটে হেঁটেই সাদা বাড়ির কালো গ্রিল (আনন্দবাজার পত্রিকা) অফিসে ফিরলাম। আসলে আনন্দবাজার অফিস থেকে রাইটার্স হেঁটে আসলে সব চেয়ে কম সময় লাগে।

আমি যে মান্নাদের জন্মদিনে কাল যাব এ কথা আমার ফটোগ্রাফার বন্ধুবান্ধব তো নয় এমনকি নিউজ এডিটর হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জানাইনি। শুধু হীরককে বললাম কাল একটু কাজ আছে আসতে পারবো না।

আমি এরকম না জানিয়ে আনন্দবাজারে থাকাকালীন নিজের টাকায় ছুটি নিয়ে কাউকে না বলে বহু কাজ করেছি। অফিস কখনো কখনো সেই খরচ আমায় দিলেও বহু সময় প্রশ্ন তুলেছে, “এটা কি তোমায় অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছিলো?”

বলতাম, “না।”… তাহলে কোন টাকাই পেতাম না। কিন্তু আমি জানি একটা ভালো ছবি তুলতে গেলে অ্যাসাইনমেন্ট-এর ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না।

আমি জানতাম, আনন্দবাজার পত্রিকায় বহু গুণী সিনিয়র ফটোগ্রাফার কাজ করতেন। মুখে যতই ভাব হাসি খুশি থাকনা কেন, চোরাস্রোতের মতো ভিতরে একটা কম্পিটিশন থাকতো। তাই মাঝে মাঝে আমার মতো কাজ করে নিতাম। এতে আমার নিজের টাকা লাগলেও ছবিটা প্রকাশিত হবার পর সাংবাদিক-সহ ফটো বন্ধুরা এমন কি সাধারণ মানুষ যখন প্রশংসা করতেন। সেটাই নিজের কাছে বড়ো মনে হতো। আমাদের সকল চিত্র সাংবাদিকদের এক্সক্লুসিভ ছবি পাবলিশড হলে আমার খুব আনন্দ হতো।

আমার কলিগ-সহ অনেক সাংবাদিক বন্ধু আমায় বলতো, “কেন নিজের পয়সায় অ্যাসাইনমেন্ট করিস?”

কোন উত্তর না দিয়ে নীরব থাকাটাই আমি শ্রেয় মনে করতাম। তাছাড়া কথাটা তো ঠিক। একটা প্রফেশনাল কাগজে নিজের টাকা দিয়ে…???

যাক সেসব কথা, মূল ঘটনায় আসি…

মান্নাদার জন্মদিনের খবরটা আমায় বিখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তি ঘোষ ডালহৌসি এসবিআই অফিসের নিচে চা খেতে খেতে আমায় বলেছিলো। সাথে এটাও বলেছিলো, “আমি কাকার জন্মদিনে যাব।”

সুপর্ণ মান্নাদাকে কাকা বলেই ডাকতো। আমরা সকলেই জানি সুপর্ণ নিজেও একজন বিখ্যাত সুরকার। গানও লেখে। খুবই গুণী ছেলে। আমার ওর অফিসের নিচে চা খাবার আমন্ত্রণ থাকতো। শুধু চা-এর টানে নয় আসলে সুপর্ণর কাছে গান জগতের অনেক খবর থাকতো। আমার কলকাতার পাতায় খুব কাজে লাগতো।

শুনেই ঠিক করি মান্নাদার জন্মদিনে যাবো। তাছাড়া সুপর্ণ বললো কাকার শরীর খুব খারাপ। ভাবলাম, মান্নাদার অনেক বয়স হয়েছে, কলকাতায় এই কিংবদন্তি মহান গায়কের অনেক অনেক ছবি আমি তুলেছি। এখন ব্যঙ্গালোরের বাড়িতে মেয়ে জামাই এর সঙ্গে থাকে। জন্মদিনে ব্যাঙ্গালোর গিয়েই কিছু ছবি তুলে রাখি। সেই ঠিকানা আমি সুপর্ণর থেকেই পাই।

যথারীতি পরদিন ভোরের ফ্লাইটে আমি ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে একটা গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে ফুলের দোকানে যাই সেখান থেকে ভালো বোকে কিনে ব্যঙ্গালোরের মান্নাদার বাড়িতে পৌঁছে যাই।

প্রায় সকাল দশটা। রাস্তায় মানুষ তো দূর একটা কাক, কুকুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। খুব হাই ফাই এলাকা। সুন্দর একটা পাঁচিল ঘেরা বাড়ি। আমি ঢুকতে গেলেই কেয়ারটেকার-সহ একজন লোক হিন্দিতে আমায় বলে, “মান্না সাব ঘর মে নেহি হ্যায়।”

কেন যেন মনে হল ওরা মিথ্যে বলছে। কারণ জায়গাটা এতোই নিস্তব্ধ যে বাড়ির ভিতরে খুব আসতে হলেও অনেকের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম।

আজ হয়তো জন্মদিন বলে ওদের বলে দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি আসে তাহলে যেন বলা হয় মান্না দে বাড়ি নেই। আসে পাশে এমন কোনো মানুষ কাওকে দেখতেও পাচ্ছি না যে কিছু জানবো। উফফফ পুরো ভুতুড়ে এলাকা।

আসলে যারা মান্নাদের কাছাকাছি এসেছে মেলামেশা করেছে তারা সবাই জানে মান্না দে একটু খিটখিটে স্বভাবের এবং ওনার মুখে কিছু বাঁধে না। কিন্তু তার ভিতরেই এতো মজার মজার কথা বলেন। সবাই হাসলেও নিজে কিন্তু নরমাল থাকেন।

শেষ দিকে আমি খুব যেতাম মান্নাদার কাছে। তখন ওনার স্ত্রী বেঁচে ছিলেন। এক জন্মদিনে মান্নাদাকে নিয়ে হাওড়ার জগন্নাথ ঘাট থেকে নৌকোয় চড়িয়ে ছবি তুলেছিলাম। সে এক অভিজ্ঞতা অন্যদিন বলবো।

এদিকে বাড়িতে ঢোকার কোনো উপায় না দেখে আমি মান্নাদের বাড়ির উল্টো দিকে গাছের তলায় বসে পড়লাম। খুব খিদে পেয়েছে তার সাথে তেষ্টা। ত্রিসীমানায় কোন চা, খাবারের দোকানও নেই। দুটো বাচ্চা ছেলে রঙিন সাইকেল নিয়ে আশেপাশে ঘুরছিল ওদের কাছে হিন্দিতে জল চাইলাম।

ওরা অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘরে চলে গেল।

এক ফেরিওয়ালা ফল বেচতে এসেছে, তার কাছে কলা আপেল কিনে জলের খোঁজ করলাম। তিনি আমায় রাস্তা বাতলে দিল কিন্তু সেটাও অনেক দূর। ভাবলাম যদি বাড়িটা হারিয়ে ফেলি বা বাড়ির ভিতর থেকে খোঁজ করে? কি দরকার বাড়ির কাছেই থাকি!!

সকাল দশটায় এসেছি এখন প্রায় একটা বাজে। ফল খেয়ে পায়চারি করছি। ভাবছি, ছবি কি তোলা যাবে না? মনে হচ্ছে পাঁচিল ডিঙিয়ে ভিতরে চলে যাই!!

সেসব কিছুই না করে গুটিগুটি আবার একবার গিয়ে কেয়ারটেকারের কাছে চিৎকার করে বললাম, “আমি আনন্দবাজার পত্রিকা কলকাতা থেকে এসেছি। আমার নাম অশোক মজুমদার। মান্নাদা আমায় চেনেন।”…. চিৎকার করে বললাম যাতে ঘরের ভিতরের কেউ শুনতে পায়।

চিৎকারের কথাটা শুনে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। কিন্তু বললেন, “বাবা অসুস্থ। তাই আমরা আজ কাউকেই ঘরে ঢুকতে দিচ্ছি না। আপনি গেটেই ফুলটা দিয়ে চলে যান।”… আমার উত্তর না শুনেই উনি দ্রুত ঘরে ঢুকে গেলেন।

অস্থির লাগছে। ভাবছি কি করবো। এতো বাড়ির কাছে এসেও ফিরে যেতে হবে। কাছে আবার দিদির শুভেচ্ছার ফুল। এবার গেট টপকেই দৌড় লাগাবো। শালা আমায় চেনে না তো! ওদিকে সুপর্ণটাও কি এসে ঘরে ঢুকে আছে?? কি জানি। আমায় তো বলেছিল ও দুদিন আগেই আসবে। ফোন ও ধরছে না। আর দেরি নয় যা হয় হবে। এবার ঢুকবোই? যা হয় হবে… মনে মনেই গজগজ করতে লাগলাম।

বেলা তিনটের আশপাশ দেখি একটা ট্যাক্সি থেকে সুপর্ণ নামছে। দৌড়ে গেলাম তার কাছে। বললাম, “আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না সুপর্ণ। তোমার কাকাকে বলো আমি এক মিনিট সময় নেব। আমি আসবো শুনে আমার হাত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফুল পাঠিয়েছেন। প্লিজ সুপর্ণ, একটু দেখো। এবার কিন্তু আমি গেট ক্রাশ করবো। সেই দশটা থেকে রাস্তায় বসে আছি। বহুবার বলেছি, তবুও ঢুকতে দেয়নি।”

সুপর্ণা আমার কথা শুনে বলল, “তুমি চুপ করে অপেক্ষা করো। আমি ভিতরে যাই। কাকার মুড দেখে তোমাকে ডেকে নেব। চিন্তা করোনা। আমার পিছন পিছন বাড়িতে ঢুকো না। জানোই তো কাকার মুড। আমি দেখছি?”

অগত্যা হাঁ করে দাঁড়িয়ে সুপর্ণর বাড়ির ভিতর ঢুকে যাওয়া দেখলাম।

প্রত্যেকটা মিনিট ভাবছি এই আমার ডাক এলো। কিন্তু সেটাও ভাবতে ভাবতে প্রায় চল্লিশ মিনিট কেটে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, এবার আমায় বাড়িটাতে ঢুকতেই হবে। তারপর যা হবে দেখে নেবো। মাথায় রীতিমত প্ল্যান সাজাচ্ছি… হঠাৎ শুনি কেয়ারটেকার আমায় ডাকছেন। বললেন, “আপ আন্দার যাইয়ে।”

তড়িঘড়ি ভিতরে ঢুকে আমি তো সোজা ফুল ক্যামেরা শুদ্ধ ব্যাগ নিয়ে মান্নাদের কাছে গিয়ে প্রথমেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললাম, “মান্নাদা আমি অশোক মজুমদার আপনার অনেক ছবি তুলেছি। আনন্দবাজারে কাজ করি।”

বিরক্তি মুখে মান্নাদা হাত নেড়ে বললেন, “বসুন বসুন। সকাল থেকে আপনি আমাকে ডিস্টার্ব করছেন। আমি কি আপনাকে আসতে বলেছি? সে আপনি যে কাগজ থেকেই আসুন না কেন?”

উল্টোদিকের চেয়ারে চুপ করে বসে আছে সুপর্ণ। জানি তার খারাপ লাগছে। আমি বললাম, “মান্নাদা এই মুহুর্তে আপনি হয়তো আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি আপনাকে নিয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সময় অনেক ছবি তুলেছি। গঙ্গার ঘাটে নৌকার উপর, তখন বৌদি ছিলেন। তবে উনি যাননি গাড়িতে বসে ছিলেন। আপনি আমার কথায় নৌকোর ওপরে একটা গানও গাইলেন।”

মান্নাদা বিরক্ত হয়ে বললেন, “দেখুন, আমার এখন এসব শুনতে ভালো লাগে না। পুরানো কথা রাখুন। ওরকম ছবি অনেকেই আমার তুলেছে। তা বলে কি এরকম ভাবে আপনি চলে আসবেন?”

সবাই চুপ। মনে মনে আমি ভাবছি ঢুকে যখন একবার পরেছি, দেখছি জন্মদিনের ছবি মিস কি করে হয়?

মিনিটখানেক পর ওই ফুলের তোড়াটা দিয়ে বললাম, “মান্নাদা এই ফুলটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপনাকে দিয়ে প্রণাম জানিয়েছেন। আপনি গ্রহণ করুন।”

দাঁত খিঁচিয়ে আমাকে বললেন, “কে মমতা?”

আমি বললাম, “বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”

উনি বললেন, “ও ওই মেয়েটা? আর মুখ্যমন্ত্রীর কথা বলবেন না। আমি আগের সরকারের কাছে একাডেমি করবো বলে জমি চেয়েছিলাম। আমাকে দেয়নি। ওসব রাজনীতিকদের কথা আমায় আর শোনাবেন না।”

আমি বুঝলাম মান্না দের মনে হয়তো কোনো একটা দুঃখ আছে।

এবার সুপর্ণ মুখ খুললেন বললেন, “কাকু আমি অশোককে অনেকদিন ধরে চিনি। ও খুব ভালো ছবি তোলে। ভালো ছেলে। সকাল ১০টা থেকে এখানে অপেক্ষা করছে। তোমার জন্মদিনের ছবি তুলবে বলে এসেছে। আনন্দবাজার পাঠায়নি ও নিজে থেকে এসেছে তোমার ছবি তুলে রাখবে বলে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও আসবেন, সেই কথা জানিয়ে ওর হাতে ফুল পাঠিয়েছেন।”

মান্না দা বললেন, “সে ভালো, মুখ্যমন্ত্রী ফুল পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমি চাই না জন্মদিনে আমার কেউ ছবি তুলুক। অশোক আপনি মিষ্টি খান।”…. বলেই মেয়েকে ডাকলেন।

বাবার কথা মতন তিনিও আমায় এক প্লেট ব্যাঙ্গালোর মার্কা মিষ্টি দিয়ে চলে গেলেন।

আমি চুপ। মান্নাদা আপন মনেই বলছেন, “আমি চাইনা এই রুগ্ন চেহারায় বৃদ্ধ বয়সে কেউ আমার ছবি তুলুক।”

আমি মান্নাদাকে বললাম, “আপনি বারন করেছেন আমি ছবি তুলবো না। জন্মদিনে একটা প্রণাম করেছি এতেই আমি ধন্য। এই সুযোগ কজন পায়? কিন্তু একটা অনুরোধ, আপনি অনুমতি দিলে আমি কি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোনে ধরতে পারি? দিদি আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন।”

মান্নাদা বললেন, “মমতা আমার সাথে কথা বলবে?”

আমি বললাম, হ্যাঁ….বলেই সরাসরি জয়েন্ট সেক্রেটারি শান্তনু বোসকে ফোনে ধরলাম।

শান্তনু বললো, “অশোকদা ধরো দেখি ম্যাডাম কি করছেন?”

এক মিনিট পর আমায় ফোন করে শান্তনু বলল, “এবার তুমি সরাসরি ম্যাডামকে ফোন করো।”

মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে বললাম, “দিদি মান্নাদা আমার সামনে বসে আছেন। আপনি কথা বলুন। “…বলেই মান্নাদাকে ফোনটা দিলাম।

ওপাশ থেকে মুখ্যমন্ত্রী কি বলছেন তা আমার জানা নেই। কিন্তু এতক্ষণ মান্নাদা আমার ওপর যে রাগ দেখাচ্ছিলেন সেটা দেখলাম দিদির সাথে কথা বলতে বলতে কেমন জলের মতো গলে যাচ্ছে…. হাসছেন!!

প্রায় ৩৫ মিনিটের কাছাকাছি মান্নাদা মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বললেন। অনেক কথার ভেতরে যেটুকু বুঝলাম মান্নাদা বলছে, “শরীর ভালো থাকলে আমি অবশ্যই যাব। আমারও আপনাকে দেখার ইচ্ছা রইল।”

আমি আর সুপর্ণ ইশারায় মিটি মিটি হাসছি। ফোনটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে মান্নাদা নিজের মেয়েকে বলল, “অশোককে মিষ্টি দিয়েছো?”

তারপর বলতে শুরু করলেন, “মমতা খুব ভালো। অনেক লড়াই করে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। আমি ওনার অনেক গল্প শুনেছি। জানো অশোক, আমার না এখন আর মানুষ ভালো লাগে না। এই বয়সে কি আর জন্মদিন।”

আমি ঘাড় নাড়লাম।

দেখলাম জন্মদিনে সুপর্ণর দেওয়া গীতাঞ্জলি টেবিলের উপর রাখা ছিল। সুপর্ণর দিকে তাকিয়ে মান্নাদা বলল,”সুপর্ণ আমার শেষ ইচ্ছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা অ্যালবাম করার।”

সুপর্ণা বলল, “কাকা হবেই। তাই এটা এনেছি। আপনি প্রিপারেশন নিন। আমি সব দেখে নেবো।”

দেখলাম মান্নাদা নিজেই টেবিল থেকে গীতাঞ্জলি বইটা তুলে নিজের মতো গুন গুন করছেন।

আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা সব তো হলো কিন্তু আমার ছবি তোলার কি হবে? ক্যামেরাটা বার করবো?

হঠাৎ দেখি গীতাঞ্জলি থেকে একটা গান করতে করতে মান্নাদা হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। এই মুহুর্তে গানের লাইনটা মনে পড়ছে না। চোখের জলে চশমা ভিজে গেছে। নাক দিয়ে সুতোর মতন সিকনি বেরোচ্ছে।

আমি সুপর্ণ অবাক। ভিতর থেকে মেয়ে জামাই চলে এসেছে। আমি ভাবলাম এটাই সুযোগ ছবি তোলার…. কেউ আমায় দেখছে না।

চেয়ারের নিচে আমার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। দেখি সুপর্ণ আমায় ইশারা করে না না করছে।

ধুর তখন কে কার কথা শোনে। চিত্র সাংবাদিকদের এটাই গুন আবার এটাই দোষ। মহূর্ত ধরে রাখাটাই আমাদের কাজ।

দেখলাম সবাই মিলে মান্নাদাকে সান্তনা দিচ্ছেন। আমি ততক্ষনে ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছি। মান্নাদাও একটু শান্ত।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমি মান্নাদাকে বললাম, “মান্নাদা আমি এবার উঠবো ?”

মান্নাদা জানতে চাইলো আমি আজই চলে যাব কিনা…

আমি বললাম, “না আমি কাল সকালে যাব।”

একবার আস্তে করে বললাম, “মান্নাদা মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ফুল নিয়ে আপনার একটা ছবি তুলতে পারি?

বললেন, “তোলো না।”

ভাবছিলাম এই মান্নাদা কিছুক্ষণ আগেই আমায় যা করলেন? ছবি তুলে দ্রুত আর একবার প্রণাম করে বেরিয়ে পরলাম।

বেরোনোর সময় সুপর্ণর সাথে চোখাচোখি হতেই দুজনের মুখেই হাসি।

এয়ারপোর্ট এর কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম। কারণ কাল ভোরেই কলকাতা ফিরবো। আনন্দবাজারে মান্নাদার কান্নার ছবি পাঠিয়ে দিলাম। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকে ফুলের ছবি দিয়ে জন্মদিনে দিদির শুভেচ্ছার কথা জানালাম।

সেদিন সব টিভিতেই আমার স্টিল ছবি দিয়ে খবর হয়। কিছু প্রিন্ট মিডিয়াকে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ফুল হাতে মান্নাদার ছবিও দিলাম। কিন্তু কান্নার ছবি একমাত্র সাদা বাড়ির কালো গ্রিলের (আনন্দবাজার)।

রাতে দিদিকে ফোনে পেলাম না।

পরের দিন ফিরে দিদিকে রাইটার্স গিয়ে সব ঘটনা জানিয়ে বাকি টাকাটা দিতে গেলাম। প্রায় ধমকে বললেন, “ওটা তোর কাছেই রাখ।”

তারপর, “গানমেলায় যদি মান্না দে না আসতে পারেন তাহলে ২০১৩ সালে আমি নিজেই বঙ্গবিভূষণ ব্যাঙ্গালোরের বাড়িতেই ওনাকে দিয়ে আসবো। তুই খুব ভালো কাজ করেছিস।”

নিউজ এডিটর হীরক বললো, “তুমি কখন গেলে? কখন এলে উফফফ পারো বটে। তবে ছবিটা খুব ভালো হয়েছে বস (অভিক সরকার) ও বলেছেন।”

ভালো মন্দ কি বলবো… সত্যি আমি জানিনা। কারণ ছবিতেই আমার যাবতীয় ভাবনা। তাই আমি জানতেও চাই না ছবির বাইরে। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতাই আমার জীবনের সম্পদ।

মান্নাদার কান্নার ছবির নিচে ছবিটা, ২০১৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে মান্নাদার গলায় সোনার মেডেল পরিয়ে দিচ্ছেন। তার সাথে বঙ্গবিভূষণতো আছেই। এই ছবিও একমাত্র আমার তোলা।

মান্নাদা আর নেই সেই সময় আমরা দার্জিলিং সফরে। মনে আছে মুখ্যমন্ত্রী শুনেই মন্ত্রী অরূপ আর ইন্দ্রনীল কে কলকাতা চলে যেতে নির্দেশ দিয়ে বলেন ব্যাঙ্গালোরের বাড়িতে যোগাযোগ করতে….”আমরা কলকাতায় গান স্যালুট দিয়ে ওনাকে শ্রদ্ধা জানাবো। রবীন্দ্রসদনে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করবো।”

মুখ্যমন্ত্রী দার্জিলিং থেকেই অনেক উদ্যোগ নেন। কিন্তু মান্নাদার মেয়ের একগুঁয়েমিতে আমরা বাংলার মানুষ ওনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বঞ্চিত হই। কি কারণ ওই মেয়েই বলতে পারবেন।

আজ ছবিওয়ালার গল্পে মান্না দের সঙ্গে কাটানো সামান্য একটি মুহূর্তের কথা শেয়ার করে নিলাম। কিন্তু আমার ঝুলিতে ওনার সঙ্গে কাটানো বহু ছবির স্মৃতি ছাড়াও রয়েছে ওনার গানকে সঙ্গী করে ছোট থেকে বড়ো হবার এই দীর্ঘ যাত্রাপথ। ওনার কফি হাউসের আড্ডায় মেতে ওঠেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে মান্না দে আপামর ভারতবাসীর সুখ দুঃখের সাথী। ওনার গান নিঝুম দুপুরে কিংবা একলা রাতের নির্জনতায় আমাদের জীবনে এক অদ্ভুত শান্তির প্রলেপ। কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে আমাদের রোজনামচায় এভাবেই বেঁচে আছেন।

ছবি ও লেখা : অশোক মজুমদার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২২

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev