‘কৃষ্ণনগর’ শহর মধ্যযুগের বাংলায় নগর হিসেবে আবির্ভূত হয়। তার আগে ছিল গণ্ডগ্রাম ‘রেউই’। ভগবান কৃষ্ণের উপাসক গোপ সম্প্রদায়ের মানুষেরা সেখানে অধিক সংখ্যায় বাস করতেন বলে রাজা রুদ্র রায় রেউই গ্রামের নাম রাখেন কৃষ্ণনগর। এই কৃষ্ণনগর মাটির পুতুল, গোপাল ভাঁড়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, কৃষ্ণনগর কলেজ, গ্রেস কটেজ, ব্রাহ্মসমাজ, রানীকুঠি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ী, বারোদোলের মেলা, সরপুরিয়া, সরভাজা, জগদ্ধাত্রী পুজোর মতো বেশ কয়েকটি বিষয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু ঐতিহ্যের শহর কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজো তুলনায় অনেকটাই অনালোচিত। এর অন্যতম কারণ মনে হয় ঐতিহ্যের সাথে আড়ম্বরের যুগলবন্দীতে কিছুটা ঘাটতি। কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য থাকলেও, এই পুজো অনেকটাই আঞ্চলিক এবং অনাড়ম্বর।
তবে কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে ২০২২ সাল বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এবছর দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণনগর শহর যেন জনজোয়ারে ভাসলো। জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় যেমন উন্মাদনা দেখা যায়, এবার দুর্গাপূজায় সেই উন্মাদনার দেখা মিলল। আইসল্যান্ডের বিখ্যাত হলগ্রিমস চার্চ দেখার জন্য অষ্টমী, নবমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপের বাইরে প্রধান রাস্তায় দর্শনার্থীদের প্রায় দেড়-দুই কিলোমিটার লাইন দেখতে পাওয়া গেল। ক্লাব একান্নবর্তীর তৃতীয় বর্ষের দুর্গাপুজোয় বড় চমক ছিল আইসল্যান্ডের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক সুউচ্চ হলগ্রিমস চার্চ। দুর্গাপুজোয় এত বড় আয়োজন, আর এই সম্মোহনী আড়ম্বর-এর আগে কৃষ্ণনগর শহর দেখেনি।

ইউরোপের নিও-গথিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন হল আইসল্যান্ডের হলগ্রিমস চার্চ, যেটা গত শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে। তারই দেখা মিলল কৃষ্ণনগরে। আইসল্যান্ড তো বটেই, ইউরোপের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক এটি। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হলগ্রিমস চার্চের উচ্চতা ২৪৪ ফুট (৭৪.৫মিটার)। গির্জার ইতিহাস অনুসন্ধান করলে জানা যায় যে, প্রথমে গির্জাটি অল্প উচ্চতার হবে বলেই ঠিক ছিল। কিন্তু চার্চ অফ আইসল্যান্ডের নেতারা একটি বড় চূড়া চেয়েছিলেন, যেটি আইসল্যান্ডের ক্যাথলিক চার্চ ক্যাথেড্রালকে ছাড়িয়ে যায়। অতঃপর সেই ভাবে পরিকল্পনা করা হয়। আর নির্মাণ সমাপ্তির পর এর উচ্চতা এমনই হয় যে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হলগ্রিমস চার্চ দৃশ্যমান হয়। হলগ্রিমস একটি লুথারিয়ান প্যারিস চার্চ। হলগ্রিমস চার্চ তৈরি হতে প্রায় ৪১ বছর সময় লেগেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি বর্ষ অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে এর নির্মাণকার্য শুরু হয়, যা শেষ হয় ১৯৮৬ সাল নাগাদ। এই গির্জা অতি বৃহৎ, যার ভিতরের অংশই প্রায় ১৮ হাজার বর্গফুট। হলগ্রিমস চার্চকে নিজেদের সাধ্যমত অনুকরণের প্রচেষ্টা করেছে কৃষ্ণনগর একান্নবর্তী ক্লাব। তারা গির্জার সামনে লেইফ এরিকসনের মূর্তিটিও স্থাপন করতে পেরেছেন। আইসল্যান্ড তো বটেই, সমগ্র ইউরোপের অন্যতম সুউচ্চ চার্চ বলে কথা! ‘হলগ্রিমস’কে তাই পুজো উদ্যোক্তারা হুবহু ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, যা দর্শনার্থীদেরও খুব ভালো লেগেছে। হলগ্রিমস চার্চ আইসল্যান্ডের একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবেও চিহ্নিত। সেখানে একজন পর্যটক ভিউয়িং ডেকে উঠতে পারেন এবং আশেপাশের পাহাড় দেখতে পারেন। এহেন বিখ্যাত হলগ্রিমস চার্চ কৃষ্ণনগরে দেখতে কার না ভালো লাগে। এই মণ্ডপ দেখতেই পুজোর কটা দিন দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন কৃষ্ণনগরে। একাধিক পুরস্কারও জিতে নিয়েছে এই পুজো।

কৃষ্ণনগরের সব থেকে বড় দুর্গাপুজোর আয়োজক হিসেবে ইতিমধ্যে ‘একান্নবর্তী’ ক্লাব নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছে। ২০২০ সাল থেকে তারা দুর্গাপুজো শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যেই এই পুজো বড় আয়োজনের নিরিখে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। একটু পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে চায়ের দোকানে বন্ধুদের আড্ডা থেকে এই পুজোর জন্ম। একদিন সেই চায়ের ঠেকে একজন বন্ধু সকলে মিলে একটি দুর্গাপুজো করার প্রস্তাব রাখেন। অধিকাংশ বন্ধু একমত হতেই ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। উল্লেখ্য, কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজোকে ঘিরে উন্মাদনা যেমন তুঙ্গে থাকে, দুর্গাপুজো ঠিক ততটাই ম্রিয়মাণ হয়। পাত্রবাজার বারোয়ারি, ঘূর্ণি তরুণ সংঘের মতো হাতে গোনা দু-একটি বড় পুজো এবং কৃষ্ণনগর রাজবাড়ী, রায়বাড়ী, নীল দুর্গা বাড়ী, তিন ইঞ্চি দুর্গাবাড়ীর মতো কয়েকটি ঐতিহ্যমন্ডিত পুজো— ফিবছর এই থাকে কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর মেজাজ। সেই অভাববোধ থেকেই চায়ের ঠেকের সেই বন্ধুরা ঠিক করে দুর্গাপুজো করতে হলে বেশ বড়সড়ো আকারেই করতে হবে। কৃষ্ণনগরের রাজপথে অর্থাৎ আর এন ঠাকুর রোডে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের বিপরীতে একটি ফাঁকা জায়গায় পুজো হবে বলে স্থির হয়। পুজোর নাম ঠিক করতে গিয়ে তারা পুরোদস্তুর বাঙালিয়ানাকে ধরার চেষ্টা করেন। বাঙালি পরিবারকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার ভাবনা থেকে ‘একান্নবর্তী’ নামটি নির্বাচন করা হয়। তাদের ক্লাবের শ্লোগানই হয় ‘এক নয়, একান্নবর্তী’।

২০২২ সালে এই পুজো তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করল। এই পুজোর জন্য পাড়া থেকে চাঁদা তোলা হয় না, কমিটির সদস্যদের চাঁদা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের মোটা টাকার অনুদানে পুজো হয়। বর্তমানে তাদের কমিটির সদস্য সংখ্যা প্রায় শ’খানেক, যাদের বেশিরভাগই হলেন বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের শিক্ষা সেল ও সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষককুল, আবার কেউবা প্রাক্তন সরকারি কর্মী। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের বিপরীতে গুরু ট্রেনিং মাঠে একান্নবর্তীর পুজোকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজো এবার যেন অন্য মাত্রা পেল। কৃষ্ণনগরের সবথেকে বড় বাজেটের পুজো এটি। প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে এই পুজোর বাজেট ছিল ৯ লক্ষ টাকা। দ্বিতীয় বর্ষে তাদের বাজেট বেড়ে হয় ১৫ লক্ষ টাকা। আর তৃতীয় বর্ষে অর্থাৎ এবার সবকিছু ছাপিয়ে এই পুজোর বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ লক্ষ টাকা। মহালয়ার দিন বেশ ঘটা করে একান্নবর্তীর পুজোর উদ্বোধন হয়।

হলগ্রিমস চার্চের দানবীয় মাধুর্য বজায় রেখে সেটিকে দর্শনার্থীদের সামনে হাজির করা ছিল পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মণ্ডপের ভিতরটিও গির্জার আদলেই গড়া হয়েছিল। আর বিশাল গর্ভগৃহে ছিল একাধিক শিবলিঙ্গ, সঙ্গে বহুরূপে মহাদেব। মণ্ডপ সজ্জায় যেমন ছিল মাতা মেরির পূর্ণাবয়ব মূর্তি, যীশুখ্রীষ্টর প্রতিকৃতি, তেমনি গর্ভগৃহে উমার সাথে ছিলেন মহাদেব, আর দেওয়াল জুড়ে হিন্দু দেবদেবীর পটচিত্র। আয়োজকদের দাবি এর মধ্যে দিয়ে তারা সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। একান্নবর্তীর এবারের দুর্গা প্রতিমাতেও ছিল চমক। প্রতিমা আনা হয় কলকাতার কুমারটুলির বিখ্যাত শিল্পী মোহনবাঁশী রুদ্রপালের ওয়ার্কশপ থেকে— শিল্পী তপন রুদ্রপাল। মণ্ডপের আলোকসজ্জায় ছিলেন শান্তিপুরের শিল্পীরা। এবছর একান্নবর্তীর পুজোর আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল পুজোর গানের এলবাম প্রকাশ। তাদের থিম সং ‘জয়, মা দুর্গা’ মহালয়ার দিন ঘটা করে প্রকাশ করা হয়। কৃষ্ণনগর গানমেলার শিল্পীরা এটি তৈরি করেন। পাশাপাশি এবছর তারা আরো চারটি নতুন পুজোর গান প্রকাশ করেন। যেগুলি গেয়েছেন বাংলার প্রসিদ্ধ সংগীত শিল্পীরা। শ্রীরাধা বন্দোপাধ্যায়, মনোময় ভট্টাচার্য্য, শম্পা কুণ্ডু, রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীর কন্ঠে গানগুলি শোভিত হয়েছে। গানে কথা বসিয়েছেন সৈকত কুণ্ডু। আর সুরারোপ করেছেন সৈকত কুণ্ডু ও রত্নদ্বীপ দাস। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর মেজাজে এক নতুন মাত্রা এনে দেয় ক্লাব ৫১বর্তী।
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।
ধন্যবাদ
খুব ভালো হয়েছে সংবাদটি স্যার
Sir লেখাটা খুব সুন্দর হয়েছে
খুব ভালো সংবাদ স্যার ????????
তোমার ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগল প্রদীপ্ত।
Osm. ☺☺☺khub sundar hoyeche lekha ta ☺
দারুন হয়েছে স্যার
ভালো লাগলে পাঠকেরা কমেন্টে মতামত জানাবেন।
Osm.. Khub sundar hoyeche lekha ta ☺☺☺