উচ্ছেদ হওয়া কাশ্মীরী পণ্ডিতদের সমস্যার মূল খুঁজে পাওয়া যাবে না যদি না আমরা ১৯৪৭-এ দেশিয় রাজ্যগুলোর ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অন্ধকারে থাকি। এই লেখার প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করব কাশ্মীরের ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া বেশ কিছু বিষয় এবং তারে ফল নিয়ে, দ্বিতীয়পর্বে আলোচনা করব পণ্ডিতদের সমস্যা এবং চলতে থাকা মিথ্যাচার নিয়ে।
আজকে ৩৭০, ৩৫এ ইত্যাদি ধারা নিয়ে আলোচনা নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে আমাদের ব্রিটিশ উপনিবেশ, যাদের দেশিয় স্বাধীন করদ রাজ্য আখ্যা দিত তাদের ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার ইতিহাস একটু বুঝে আমরা কাশ্মীরের ভারত ইউনিয়নে যোগ দেওয়া এবং তার পরে সমস্যা এবং ফল নিয়ে আলোচনা করব।
দেশিয় স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিকে দুটো নীতিতে ভারতের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের কথা হয়েছিল। এক, ভৌগোলিক অবস্থান, দুই, ধর্মীয়। জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ, কাশ্মীর এই বড় ৩ রাজ্য স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদের প্রজারা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুসলিম শাসিত। আবার কাশ্মীর হিন্দু শাসিত হলেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ, পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল এবং জুনাগড় পাকিস্তানে যোগ দিয়েও দিয়েছিল। অথচ ভারত সেনা পাঠিয়ে জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদকে দখল করে। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সূত্র অনুযায়ী পাকিস্তানের সঙ্গে লাগোয়া সীমান্ত আছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হলে সেই দেশের পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার কথা। এই সূত্রে কাশ্মীরের যেমন পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা তেমনি অবিভক্ত বাংলা কোনও ভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে জোড়ার কথা নয়। অথচ পাকিস্তানের সীমান্তের সঙ্গে বাংলা লাগোয়া না হলেও বাংলা ভাগ করে পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীর ভারত ইউনিয়নে জুড়েগেল। এই বুঝভুম্বুল গোলকধাঁধাঁর ইতিহাস আজও দক্ষিণ এশিয়াকে পশ্চিম শক্তি প্রণোদিত রাজনৈতিক ভুলভুলাইয়ায় ঘুরপাক খাওয়াচ্ছে।

আমাদের এই আলোচনায় কাশ্মীর রাজ্যের ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার শর্ত আলোচনা করতে হবে। কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে জুড়েছিল মহারাজা হরি সিং শর্ত সাপেক্ষে। মহারাজা হরি সিং ৩৭০, ৩৫এ ইত্যাদি ধারা শর্তসাপেক্ষে ভারতভুক্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই আলোচনায় কাশ্মীর হিন্দু অধ্যুষিত ছিল তাকে মুসলমান অধ্যুষিত করা হয়েছে, সঙ্ঘীদের এই প্রচারের বেলুন ফুটো করা দরকার। আইনব্যবসায়ী এ জি নুরানি দ্য কাশ্মীর ডিসপিউট ১৯৪৭-২০১২ বইতে লর্ড মাউন্টব্যাটনকে লেখা জহরলাল নেহেরুর চিঠি উল্লেখ করে বলেন, জম্মুর মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ। জম্মুর ৬১ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা বর্তমানে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন? গণহত্যা, যে গণহত্যার ব্যাখ্যায় পরে কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নাম উঠে আসবে।
*** ১৯৪৭ সালের ১৬ই জানুয়ারি হোরাস আলেক্সান্ডার ব্রিটিশ পত্রিকা ‘The Spectator’-এ উল্লেখ করেন, ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে জম্মুতে নিহত মুসলিমের সংখ্যা ২ লক্ষেরও বেশি।
*** লন্ডনের ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকায় ১৯৪৮ সালের ১০ অগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে: “2,37,000 Muslims were systematically exterminated – unless they escaped to Pakistan along the border – by the forces of the Dogra State headed by the Maharaja in person and aided by Hindus and Sikhs. This happened in October 1947, five days before the Pathan invasion and nine days before the Maharaja’s accession to India.”।
*** ‘The Statesman’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক ইয়ান স্টেফেনস তাঁর ‘Horned Moon’ বইতেও জম্মুতে ২ লক্ষের বেশি মুসলিম নিধনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছেন।
ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর, গান্ধীর বক্তব্যেও এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সমর্থন মেলে। তিনি লেখেন, “The Hindus and Sikhs of Jammu and those who had gone there from outside killed Muslims. The Maharaja of Kashmir is responsible for what is happening there…Muslim women have been dishonoured.”

ব্রিটিশ সাংবাদিকদের লেখালেখিতে উল্লেখিত পরিসংখ্যান থেকে একথা পরিষ্কার, জম্মুতে অন্ততপক্ষে ২ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ ৫০ হাজারের কাছাকাছি মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ব্রিটিশ সাংবাদিক ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী জম্মুর সাংবাদিক বেদ ভাসিন এবং অল্পকিছু সাংবাদিক জম্মু গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হন, লেখালেখি করেন। অবশ্য এজন্য বেদ ভাসিনকে গ্রেপ্তারের হুমকিও দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হল, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারা ছিলেন?
হরি সিং আশঙ্কা ছিল, কাশ্মীর মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হতে পারেন। ‘Being the Other: The Muslim in India’ বইতে লেখক সৈয়দ নাকভি ১৯৪৯-এর ১৭ এপ্রিল বল্লভভাই প্যাটেলকে লেখা জহরলাল নেহেরুর চিঠির সূত্র উল্লেখ করে বলেন, হরি সিং যেনতেন প্রকারেণ জম্মুকে নিজেদের অধীনে রাখতে চেয়েছিলেন। নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেলকে এটা তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন। জম্মুর হত্যাকাণ্ডটা সংঘটিত হয়েছিল পাকিস্তানি পাঠানদের জম্মু-কাশ্মীর আক্রমণের পাঁচদিন এবং ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন স্বাক্ষরের ন’দিন আগে। সাংবাদিক বেদ ভাসিন-এর মতে, হরি সিং-এর ডোগরা সেনা, আরএসএস কর্মী, হিন্দু মহাসভার কর্মী, পাঞ্জাব ও অন্যান্য প্রদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের যোগসাজশে জম্মুতে ব্যাপক মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালানো হলেও প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাশ্মীর প্রদেশের মুসলিমরা একজন কাশ্মীরি পণ্ডিতকেও হেনস্থা করেনি, হত্যা দূরে থাক। সেই সময়ে কাশ্মীরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল সম্পূর্ণ অটুট। ওইসময় জম্মুর উধমপুর, ছেনানি, রামনগর, রিয়াসি, বাদেরওয়, ছাম্ব, দেবা বাটালা, আখনুর, কাটুয়া-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় আবালবৃদ্ধবনিতা বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বেদ ভাসিন বলছেন, জম্মুর মুসলিম নিধনে ডোগরা সেনাদের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) কর্মীরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এমনকি এই হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গেও আরএসএস, হিন্দু মহাসভার মতো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি যুক্ত ছিল।
কাশ্মীর ভারতে সংযুক্ত হওয়ার পরে, ১৯৪৮ সালের মার্চে ক্ষমতাসীন শেখ আবদুল্লা স্বায়ত্বশাসনের সুবাদে ব্যাপক ভূমি সংস্কার শুরু করেন। জমিদারদের মোট জমির পরিমাণ বেঁধে দিয়ে (২২ একর), চার লক্ষ একর জমি রাতারাতি ক্রোক করে এবং ক্রোক করা জমির জন্য কোনও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাতে ডোগরা রাজপুত এবং কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিয়ে তৈরি হিন্দু জমিদারগোষ্ঠী প্রবল অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৪৭-এ হরি সিংহের প্রত্যক্ষ মদতে তৈরি হয়েছিল ‘জম্মু প্রজা পরিষদ’ যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আরএসএস সদস্য বলরাজ মাধোক। সেই সময় থেকেই প্রজা পরিষদ ও জনসঙ্ঘ কাশ্মীরের ‘বিশেষ সুবিধা’-র বিপক্ষে সোচ্চার হতে থাকে। তার চূড়ান্ত পরিণতি মোদি-শার সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিলুপ্তি।
কাশ্মীরী পণ্ডিতদের আজকের হালতের জন্যে দায়ি কে?
এই প্রশ্নর উত্তর পেতে গেলে সে মুহূর্তে দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে নজর দিতে হবে। ১৯৮০-র জোট রাজনীতির পরীক্ষানিরীক্ষায় লাভ হল একমাত্র বিজেপির। সেই সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তারাই শেষ অবদি ভারতীয় রাজীতিতে আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকতে পেরেছে। ১৯৮০তে ইন্দিরা গান্ধীর আবির্ভাব, চার বছর পরে তাঁর হত্যাকাণ্ড, রাজীব গান্ধীর জ্যোতিষ্কসম উদয়, জনসঙ্ঘ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টিতে রূপান্তরিত হওয়া বিজেপির লোকসভায় ২টি আসন দখল বিজেপিকে অক্সিজেন যোগাল। তারপরে দোয়াব অঞ্চলের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ দিয়ে প্রচুর জল বয়েগেছে, রাজীব গান্ধী ক্ষমতার বাইরে। ব্রাহ্মণ-বানিয়া দলের ওবিসি পিছড়েবর্গ রাজনীতির শুরু। কেন্দ্রে তখন মান্ডার রাজা ক্ষমতায়। রাজার সরকারের দুপাশে দুই ঠ্যাকনা বিজেপি আর বামপন্থীরা। কংগ্রেস বিরোধীপক্ষ। বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাধন করতে ব্যস্ত। ভোটে জেতার জন্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিজেপি। বিশ্বনাথপ্রতাপের কমন্ডল রাজনীতি আটকাতে বিজেপির কমণ্ডল রাজনীতির আবির্ভাব। হাতিয়ার ধর্মীয় ভাবাবেগ আর হিন্দু অস্মিতায় আঘাত। এই জন্যে দরকার টাটকা কিছু ঘটনা; বিখ্যাত হিন্দুগোষ্ঠীর উচ্ছেদকাণ্ড হলে সোনায় সোহাগা। ততদিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কাশ্মীর লাগোয়া আফগানিস্তানে সিআইএ-মুজাহিদিনদের জোটের বিরুদ্ধে লড়াইতে ল্যাজেগোবরে হয়ে রাশিয়ার কাবুল ত্যাগ। রুশ এবং সিআই-এর অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান মুজাহিদিনদের জন্যে আমেরিকা নতুন অপারেশনের ভূখণ্ড হল কাশ্মীর। টোপ হল কাশ্মীরী পণ্ডিত।

১৯ জানুয়ারী ১৯৯০। এক দিকে বিজেপি অন্যদিকে বামপন্থীদের সমর্থনে কেন্দ্রে জনতা দল সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ান, বর্তমান জোট সঙ্গী নিতিশ কুমার, মেনকা গান্ধী, জর্জ ফার্নান্ডেজ (অটল সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী), আরিফ মহম্মদ খান (কেরালার বর্তমান রাজ্যপাল), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সইদ (পিডিপি নেতা ২০১৪ বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী… কিছুদিন আগেও মেয়ে মেহবুবা মুফতির সাথে বিজেপির জোট)। কাশ্মীরে ফারুক আব্দুল্লার সরকার ভেঙে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হল।
দ্বিতীয়বার রাজ্যপাল হলেন একদা ইন্দিরার ডান হাত আর পরে সংঘীদের গুডবয় জগমোহন মালহোত্র। যেদিন জগমোহন মালহোত্রা রাজ্যপাল হলেন সেই ১৯ তারিখ রাতে কাশ্মিরী পন্ডিতদের ঘর ত্যাগ করতে বলাহল। তার ১০ মাস পরে অক্টোবরে লালকৃষ্ণ আদবানী শুরু করবেন রথযাত্রা। রথযাত্রার জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেন জানুয়ারি থেকে উচ্ছেদ হতে থাকা কাশ্মীরী পণ্ডিতেরা। তারা পড়লেন পরিকল্পিত শাঁড়াশি আক্রমনের মুখে। একদিকে বিজেপির উদগ্র ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায় তারা রথযাত্রার জ্বালানি হল জম্মু-কাশ্মীর থেকে জগমোহনের পরিকল্পনায়। অন্যদিকে আফগানিস্তানে বেকার হয়ে পড়া মুজাহিদিনদের অস্ত্রের মুখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হল। দুপক্ষই তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বোড়ে বানাল কাশ্মীরি পণ্ডিতদের। বিজেপি তাদের দুঃখদুর্দশাকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করল, আর মুজাহিদিনরা তাদের ব্যবহার করল কাশ্মীরে তাণ্ডব চালিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার উদ্দেশ্যে।
অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারে জগমোহন মালহোত্রা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন। ২০১৬ জগমোহন মালহোত্রা পদ্মবিভুষণ পেলেন, কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া কাশ্মীরী পণ্ডিতদের ভাগ্য পরিবর্তন হল না। তাবলীন সিং ‘ট্রাজেডি অব এররস’ বইতে দাবি করছেন জম্মু কাশ্মীরের রাজ্যপাল হিসাবে জগমোহন মালহোত্রা-র নিয়োগ কেন্দ্রীয় সরকারের ঐতিহাসিক ভুল। নবনির্বাচিত ভিপি সিং এর সরকারে এমন কেউ ছিল না যে এই সত্য কথাটি ভি পি সিং এর কানে তুলবে। আজ আমরা জানি রাজ্যপাল হিসেবে জগমোহনের নিয়োগ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের ভুল পদক্ষেপ ছিল না, বরং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বিজেপির দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় বিভেদের পরিকল্পনায় সাথী হয়েছিলেন তিনি। যে ঘটনা বিজেপি দু-দশক ধরে ব্যবহার করবে ভোটের মাইলেজ পেতে।
সেই মাইলেজ আজকেও বক্স অফিসে পেতে মরিয়া সঙ্ঘীরা। কাশ্মীরী পণ্ডিতদের ঘা থেকে চুঁইয়ে পড়া ব্যথাকে বক্স অফিসের ক্যাশবাক্সে ব্যবহার করে আর্থিক লাভ পেতে আর ধর্মীয় বিভেদ তৈরিতে পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী তৈরি করেছেন ‘দ্য কাশ্মীরী ফাইলস’। লালনটপ ওয়েবসাইটে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে পরিচালক বলেছেন আমেরিকার কশ্মীরী পণ্ডিতদের সংগঠন তাঁর চলচ্চিত্রে আর্থিকভাবে বিনিয়োগ করেছে।
আমাদের কথা
১। ওপরের দীর্ঘ আলোচনাভিত্তি করে খুব স্পষ্টভাবে বলা যাক, যে সময় জম্মু-কাশ্মীর থেকে পণ্ডিতদের ‘তাড়ানো’র কথা সিনেমায় সঙ্ঘীদের বকলমে থালাবাজানো বুদ্ধিজীবিরা বলছেন, সে সময় দিল্লিতে ভাজপা আর বামপন্থীদের সমর্থিত মাণ্ডার রাজা বিশ্বনাথ প্রতাপের সরকার। কংগ্রেস বিরোধীপক্ষ। সঙ্ঘী জগমোহন জম্মু-কাশ্মীরের প্রশাসক। ফলে পণ্ডিতদের কংগ্রেসি আমলে জম্মু-কাশ্মীর থেকে হঠিয়ে দেওয়ার দাবির কোনও ভিত্তি নেই। বরং কংগ্রেসের দাবি রাজীব গান্ধী কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নিয়ে পার্লামেন্ট ঘেরাও করেছিলেন।

২। কাশ্মীর ফাইলস একবারও আমাদের আলোচ্য তথ্যগুলো তাদের সিনেমায় জানায় নি। সমস্ত দোষ কংগ্রেস, আরবান নক্সাল, ইত্যাদি সহজ জেলযোগ্য টার্গেটের ওপর চাপিয়ে, এই ঘটনার তিন প্রধান কারিগর রথিদাঙ্গু লালকৃষ্ণ আদবানি, শ্যামামুন্সি অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং কাশ্মীরের মাঠে গিয়ে লেঙ্গি ফরোয়ার্ড খেলে কাশ্মীরী পণ্ডিতদের উচ্ছেদের নাটেরগুরু সঙ্ঘী জগমোহনকে আলতো করে পর্দার পিছনে রেখে দিয়েছে।
৩। সে সময়ে লালকৃষ্ণর রথযাত্রার উত্থানের পিঠোপিঠি সিআই-এর মদতপুষ্ট কাশ্মীরি জঙ্গী দল-এর উত্থান ঘটে। দুজন-দু-জনের আয়না ছবি। বিজেপির রাজনীতিতে জ্বালানি হিসেবে কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা ব্যবহৃত হল। কাশ্মীরী পণ্ডিতদের একটা বড় অংশ ক্ষমতার অলিন্দে থাকায় তাদের ইস্যুটা সংবাদপত্রের ভাষায় জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হল। কাশ্মীরী পণ্ডিতদের হাহাকার আর অভিশাপে দেশ ভরে গেল। অথচ এর মাত্র এক দশক আগে লোকসভায় শ্যামামুন্সি বাজপেয়ীর বক্তৃতার উস্কানিতে ঘটে যাওয়া নেলি গণহত্যা নিয়ে সক্কলে এমন কী ক্ষমতাকেন্দ্রের ক্ষমতাপ্রাপ্ত বাঙ্গালিরা চুপ।
৪। ১৯৯০-এর পরে ১৩ দিন-সহ ভাজপা চারবার সরকার গড়েছে, কিছু স্তোকবাক্য ছাড়া পণ্ডিতদের নিয়ে সমাধানের কথা শোনা যায় নি। আজ হঠাত কেন ‘জাগিয়া উঠিল প্রাণ’? ২০১৪ পর থেকে বা ৩৫৬ বিশেষ আইন রদ করার পর থেকে কে তাদের পুনর্বাসনে বারণ করেছিল? কংগ্রেসের দাবি গত কয়েকবছর ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে পুনর্বাসনের প্যাকেজের কথা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করছেন সেটা মনমোহন সিং-এর ইউপিএ সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছে।
৫। মোদি সরকারের পুলিশের হিসেবে ১৯৯০ থেকে মাত্র জঙ্গীদের হাতে ৮৯ জন কাশ্মীরি পণ্ডিত মারাগেছেন, সেই সময় অন্তত তার ২০ গুণ মুসলমান এবং অন্যান্য সমাজের মানুষ মারাগেছেন। ৮৯ জন মারা যাওয়া যদি গণহত্যা হয়, তাহলে ২৫০ বছরে কয়েক কোটি বাঙালির গণহত্যাকে কী বলা যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই।